প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

‘প্রেম-সঙ্গম থেকেও বই প্রকাশের অনুভূতি মধুর’

গল্পটা মাহমুদ শাওন এর। একজন কবি, গীতিকবি। যার এবারের বইমেলায় প্রথম বই এসেছে। বইয়ের নাম ‘দখিনের চিলেকোঠায় নরম রোদ’। তার মুখোমুখি হয়েছেন ইমতিয়াজ মেহেদী হাসান

পশ্চিম আকাশে তখনো সূর্য অস্ত যায়নি। নিভু নিভু করছে। পাখিরাও ঘরে ফেরার প্রস্তুতিতে বিভোর। তখন অমর একুশের বইমেলার ১১২ নং স্টলে দেখা গেলো ছোটখাটো একটা জটলা। এগিয়ে গিয়ে দেখা গেলো তরুণ বয়সী একজন সবাইকে অটোগ্রাফ দিচ্ছে। সঙ্গে মেটাচ্ছেন সেলফির আবদারও। পরিচয়ে জানা গেলো, তিনি মাহমুদ শাওন। একজন তরুণ কবি। এবারের বইমেলায় তার প্রথম বই এসেছে।

নোয়াখালীর লক্ষ্মীপুরে জন্ম শাওনের। বেড়ে ওঠাও সেখানে। প্রতিদিন সকালে মোরগের ডাকে ঘুম ভাঙতো তার। যেটা এখন শহুরে নাগরিক কোলাহলে হয় না। খুব মিস করেন তিনি সেই মুহুর্তগুলোকে। গ্রামের ধূলিমাখা মেঠোপথে গরুর গাড়ি ভ্রমণ, ধানক্ষেতে স্বজনদের সঙ্গে কাজ, বিশালাকার দীঘিতে হাত-পা ছোড়াছুড়ি করে গোসল, ডাংগুলি, হা-ডু-ডু, কানামাছি সবকিছুই আজ অতীত। তবুও সেসব খেলে বেড়ায় কবিতা হয়ে তার মাঝে।

রসায়নে স্নাতক সম্পন্ন করা শাওনের শৈশব কেটেছে দুরন্তপনায়। পড়াশোনা-আড্ডার পাশাপাশি বাকীটা সময় তিনি দিয়েছেন গল্প আর কবিতার বই পড়ায়। হুমায়ূন আহমেদের দারুণ ভক্ত শাওন। ছেলেবেলা থেকেই কমবেশি তার বই পড়তেন তিনি। পরিণত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার বোধও ভর করে শাওনের ভেতর। এজন্য স্নাতকে এসে শাওন সিদ্ধান্ত নেন রসায়নে পড়ার। শেষ অবধি শেষও করলেন পড়া। একে একে কেটে গেছে চারটি বছর। এতদিনে তিনি আরো পরিপক্ক।

২০১৪ সাল থেকে শাওনের লেখালেখি শুরু। তবে শুরুটা কবিতা নয়, গান দিয়ে। এ পর্যন্ত ১২টি গান রিলিজ হয়েছে তার। এর মধ্যে কাজী শুভ’র গাওয়া ‘তোর ছোঁয়াতে’ শিরোনামের গানটি সর্বাধিক জনপ্রিয়। জি সিরিজের ব্যানারে গানটি প্রকাশ পেয়েছিলো। গান প্রকাশের আগে প্রচুর পড়াশোনা করেছেন শাওন। রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শামসুর রাহমান, হুমায়ূন আহমেদ, হুমায়ূন আজাদ, জাফর ইকবাল, জয় গোস্বামী, কাজী নজরুল ইসলামের বইয়ে ডুবে থাকতেন। পড়তে পড়তে তার মনে হয়েছে গদ্য এবং পদ্যের ভেতরে কবিতার জায়গাটা অনেক বড়। এবং পদ্যের শক্তিটাও অনেক বেশি। তাই উপরোক্ত লেখকদের মত হওয়া অসম্ভব জানা সত্ত্বেও তার কবিতায় আসা উচিত। তখন থেকেই মূলত শুরু। যা চলছে অদ্যবধি। চলবেও আমৃত্যু, ভাষ্য এই তরুণ কবির।

নিজের প্রথম বই প্রকাশ, এর নেপথ্য গল্প, অনুভূতি সবকিছু এই প্রতিবেদকের সঙ্গে শেয়ার করলেন শাওন। তিনি বলেন, ২০১৬ সালে আমার লিভারের সমস্যা ধরা পড়ে। মানুষের বেঁচে থাকার জন্য সাধারণ মাত্রা থাকে ৪২। সেখানে আমার ছিল ২৬০০ এর উপরে। বাঁচবো, এই ব্যাপারটাই ভুলে গিয়েছিলাম। তখন পরিচয় হলো এ সময়ের তরুণ কবি শোয়েব মাহমুদ ভাইয়ের সঙ্গে। তাকে বললাম, ভাই মরে যাওয়ার আগে আমার একটা শেষ ইচ্ছে আছে। সেটা হচ্ছে, আমি খুব করে চাই আমার একটা কবিতার বই বের হোক। প্রত্যুত্তরে তিনি বললেন, তুমি এই জিনিসটা কেন ভাবছো? আমরা কবিতার মানুষ। আমাদের একটা শ্লোগান আছে। সে মিছিলে তুমিও একজন সৈনিক। তোমাকে বেঁচে থাকতে হবে। কবিতার জন্য বেঁচে থাকতে হবে। ওইদিন শোয়েব ভাই উৎসাহ না জোগালে আজ ছাপার হরফে আমার বই বের হতো না। মানুষ আমাকে কবি বলে সম্বোধন করতো না। কৃতিত্বটা তারই। আমি তার প্রতি অসীম কৃতজ্ঞ। তার প্রতি শ্রদ্ধা-ভালোবাসা অবিরাম।

অনুপ্রেরণা পেয়েই থেমে থাকেন নি শাওন। করেছেন নিরলস পরিশ্রম। অসুস্থ শরীর নিয়ে দীর্ঘ তিন বছর ধরে তৈরি করেছেন বইয়ের পান্ডুলিপি। ৫০০ কবিতা থেকে বাছাই করে বইয়ের ফর্মা অনুযায়ী চূড়ান্ত করেন ৬১টি কবিতা। কিন্তু বইয়ের নাম সিলেকশনে বাঁধে বিপত্তি। শোনালেন সে গল্পও।

শাওন বলেন, বইয়ের নাম সিলেকশনে পড়ি বিড়ম্বনায়। ৩৬টি নাম খসড়া করি। কিন্তু সেখান থেকে একটিও পছন্দ হয়নি। পরে নিজের রুচিতে অরুচি ধরেছে ভেবে ফেসবুকে স্ট্যাটাস এবং বিভিন্ন গ্রুপে পোস্ট দেই। তালিকা থেকে অনেক নাম অনেকের পছন্দ হলেও আমার কেন জানিনা পছন্দ হয়নি। দারুণ সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলাম। এরপর ভাবি, সমুদ্র-প্রকৃতির কাছে গেলে কেমন হয়, যদি মাথায় কিছু আসে! যেই ভাবা সেই কাজ, গেলাম বান্দরবান-কক্সবাজার। নাহ্ কিছুতেই কিছু হলো না। ফিরে এলাম। ভাবতে থাকলাম খসড়া করা ‘মগজে চিলেকোঠার নরম রোদ’ নামটা কেমন যেন দুর্বোধ্য হয়ে যাচ্ছে। পাঠক এতো দুর্বোধ্য শিরোনাম কিংবা বইয়ের ভাষা চায় না। তারা একটু প্রাঞ্জল মধুর ভাষা চায়। যাইহোক, সেদিন ছিল ৭ ডিসেম্বর। আমি আমার ঘরে শুয়েছিলাম। সকালে ঘুম ভাঙলো রৌদ্রের আলোয়। চোখ গেলো জানালায়। বললাম, আরেব্বাহ বিষয়টি তো দারুণ। জানালা দিয়ে নরম রোদ গলে পড়ছে। তখনই বইয়ের নাম ঠিক করলাম ‘দখিনের চিলেকোঠায় নরম রোদ’। এরপর বইয়ের প্রচ্ছদ। কেমন হবে প্রচ্ছদ, কে করবে। প্রথম বই, মানুষের পছন্দ হবে কিনা, এমন সব প্রশ্ন যখন সাইক্লোনের মত মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে। তখন এগিয়ে এলেন কবি শামীম আরেফিন ভাই। তিনি বইয়ের প্রচ্ছদ করে দিলেন। আমাকে অনেকটা অবাক করে দিয়েই বললেন, শাওন ফেসবুকের ইনবক্স চেক করেন। আপনার প্রচ্ছদ রেডি। তখন আমার ভেতর কি যে উত্তেজনা বিরাজ করছিলো, বলে ঠিক বোঝাতে পারবো না। গাড়ীতে ছিলাম, মৌচাক পার হচ্ছিলাম। দাঁড়ানো অবস্থায় তবুও মোবাইলের ডাটা অন করে ফেসবুকে ঢুকলাম। ঢুকেই তো চোখ একেবারে ছানাবড়া আমার, আনন্দ উত্তেজনায় হাত-পা রীতিমত কাঁপছে। স্বর্গসুখ অনুভূত হলো, প্রথম বইয়ের প্রচ্ছদ দেখে। মনে মনে শামীম আরেফিন ভাইকে কৃতজ্ঞতা জানালাম। তার দীর্ঘায়ু কামনা করলাম। এরপর বাসায় ফিরেই মামাকে দেখালাম। বলে রাখা ভালো, ঢাকায় আমি মামার বাসায় থাকি। তিনিই আমার রাজধানীতে সব দেখভাল করেন। তাকে প্রচ্ছদ দেখাতেই তিনি খুশীতে আত্মহারা হয়ে আমায় বুকে জড়িয়ে নিলেন, আদর করে দোয়া করলেন। এর আগে তিনি জানতেন আমি টুকটাক লিখি। কিন্তু কখনো ভাবেন নি আমার বই বের হবে, তাও আবার একুশে বইমেলায়। পান্ডুলিপি জমা দেওয়ার দিনও এমন আরেকটি ঘটনা ঘটে। বাবার হাতে যখন পান্ডুলিটি তুলে দিয়ে বলি, বাবা এটা আমার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। আজ বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে। তিনি তখন পান্ডুলিপিটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ বসে রইলেন। তারপর আমাকে ডেকে মন থেকে দোয়া করে দিলেন। বাবার দোয়া পাওয়ার পর চোখে জল চলে এলো। মনে হলো ছোট্ট এই জীবনে আর কী লাগে! গর্ভধারিণী মায়ের কথা নাই বা বললাম, সে তো জন্ম থেকেই আমাকে আমার সব কাজে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন। ভুল হলে শাসন করে ভালোবাসা দিচ্ছেন। আসলে তারা আছে বলেই জীবনটা এতো সুন্দর, মধুর। এরপর যখন ছাপার হরফে নিজের বই হাতে পেলাম, কী বলব। সে অনুভূতি বোঝাবার নয়। প্রথম প্রেম-চুম্বন-সঙ্গম থেকেও সে মুহুর্ত ছিল মধুর, স্মরণীয়।

কবিতা সব সময় খেলে বেড়ায় মাহমুদ শাওনের ভেতরে। বিশেষ করে যাত্রাপথে সবচেয়ে বেশি কবিতা লেখেন তিনি। তার মতে, ভ্রমণকালই লেখালেখির শ্রেষ্ঠ সময়। বইমেলায় তার প্রকাশিত বইয়ে বিচ্ছেদ-বিরহ বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। তবে আছে দেশপ্রেম-দ্রোহ-কাম-ভালোবাসাও। প্রথম বই হিসেবে পাঁচমিশালি ফ্লেভার আর শব্দশৈলিতে তিনি বইটি সাজিয়েছেন।

আগে বন্ধু-পরিচিতজনরা শাওন বলে ডাকলেও বই প্রকাশের পর থেকে তাকে সবাই কবি বলে ডাকছে। এই অনুভূতিরও কোন ব্যাখা নেই তার কাছে। তিনি বললেন, এই অনুভূতি লিখে-বলে বোঝাবার নয়। শুধুই অনুভবের।

সমসমায়িক কবিদের মধ্যে রাকিবুল হায়দার, শোয়েব মাহমুদ, চৌধুরী ফাহাদের কবিতা দারুণভাবে টানে শাওনকে। সময় পেলেই তাদের কবিতায় হারিয়ে যান তিনি। শাওন বলেন, উনাদের কবিতা পড়লে কোথায় যেন হারিয়ে যাই আমি। অদ্ভূত ভালো লাগা, মুগ্ধতা সৃষ্টি হয়। যেটা বললেও আসলে কম হয়ে যাবে। তারা অনবদ্য, তাদের লেখার চরম ভক্ত আমি। জীবনের বাকি দিনগুলোতেও তাদের লেখা পড়ে যেতে চাই।

শাওনের কবিতার ক্ষেত্রে অবিচ্ছেদ্য ইন্সপিরেশন হলেন তার প্রেমিকা। যিনি তার প্রতিটি কবিতার প্রথম পাঠিকা। সমস্ত ভুল-ত্রুটি তিনিই প্রথম চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন শাওনকে।

শাওন বলেন, ও ছিল বলেই ঠেলে-গুতিয়ে বইটি প্রকাশ হয়েছে। নইলে কি যে হতো। কারণ, আমি ভীষণ রকম এলোমেলো। কোনকিছুই ঠিকঠাক করে উঠতে পারিনা, গুলিয়ে ফেলি।

এখনকার যারা একইসঙ্গে কবি ও গীতিকবি তাদের মধ্যে খুব বেশি মানুষকে চেনেন না, জানেন না শাওন। তিনি বলেন, লতিফুল ইসলাম শিবলী, মারজুক রাসেল ও লুৎফর রহমানের কথা প্রতিমুহুর্তেই মাথার ভেতর ঘুরপাক খায়। লিখতে বসলেই কলমে-লেখনীতে তাদেরকে অনুভব করি। জানি তাদের মতো হতে পারবো না। অত মেধা আমার নেই। তবে এতোটুকু সত্য, পেছন থেকে অণুজ হিসেবে হালটা ধরতে পারবো। চেষ্টা করবো। যদিও তার যোগ্য আমি নই। কিন্তু তারা দোয়া-ভালোবাসা-নির্দেশনা দিলে আমায় রুখে কে!

পরের বইমেলার পান্ডুলিপিও প্রায় শেষ শাওনের। সব ঠিকঠাক থাকলে আগামী বইমেলাতে প্রকাশিত হবে তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ।

শুভ কামনা মাহমুদ শাওনের জন্য। তার আগামীর পথচলা সুন্দর ও শুভ হোক। জয় হোক বাংলা কবিতার।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত