প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

‘শান্তি’র পথ থেকে সরছে না বিএনপি

ডেস্ক রিপোর্ট : দলের মধ্যে দ্বিমত থাকলেও আপাতত শান্তির পথ ছাড়বে না বিএনপি। শিগগির কঠোর কর্মসূচি গ্রহণ না করে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মাধ্যমে জনগণকে সম্পৃক্ত করার পক্ষে দলের হাইকমান্ড। তাদের মতে, কঠোর কর্মসূচি দিলেই সংঘাত ও সহিংসতা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। এতে দলের সাধারণ নেতাকর্মীরা নতুন করে মামলা-হামলায় আবার ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে বৃহত্তর আন্দোলনের ভিত রচনা হবে বলে মনে করেন তারা। অন্যদিকে দলের কট্টরপন্থি সিনিয়র নেতা ও তরুণ নেতাদের একাংশ এখনই হার্ডলাইনে যাওয়ার পক্ষে। তারা মনে করেন, দলের শীর্ষ নেতাকে কারাগারে পাঠানোর পর দলের সর্বোচ্চ শক্তি প্রদর্শন করা উচিত ছিল। অতীতে দলীয়প্রধান গ্রেফতারের প্রতিবাদ ও মুক্তির দাবিতে সারাদেশে ব্যাপক শোডাউনের নজিরই বেশি। এবার কঠোর কর্মসূচি পালন করলে সারাদেশে নেতাকর্মীদের মনোবল আরও চাঙ্গা হতো। ক্ষমতাসীন দল ও বিদেশিদের কাছেও একটি বার্তা পৌঁছে যেত। বর্তমান শান্তিপূর্ণ নরম কর্মসূচি দিয়ে খালেদা জিয়াকে মুক্তি এবং নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আদায় সম্ভব নয়। দলের ওপর সারির নেতাদের নমনীয় নীতি তরুণ নেতাদের অনেকেই বাঁকা চোখে দেখছেন।

সূত্র জানায়, কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে তাকে নিয়েই আগামী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পক্ষে কট্টরপন্থি ও তরুণ নেতারা। অন্যথায় আবারও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ প্রশাসনকে ব্যবহার করে একতরফাভাবে নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়ে যাবে। খালেদা জিয়া ছাড়া সারাদেশের নির্বাচনী মাঠে ভোটারদের কাছে টানার মতো অন্য কোনো কারিশম্যাটিক নেতা বিএনপিতে নেই বলে মনে করেন তারা।

অন্যদিকে, দলের উদারপন্থিরা কোনো কারণে খালেদা জিয়া মুক্ত বা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারলেও নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষে। তারা মনে করেন, এতে বিএনপি ও খালেদা জিয়ার প্রতি মানুষের সহানুভূতি পাওয়া যাবে। ভোটেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। যুক্তি হিসেবে ওই নেতারা বলছেন, এর আগে পৃথিবীর বহু দেশে দলীয়প্রধান কারাগারে থাকা এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার পর ওই দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন নিয়েই বিজয়ী হয়েছে।

সূত্র জানায়, কট্টরপন্থিদের অবস্থানকে উপেক্ষা করেই উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অর্ধশত ‘ইতিবাচক’ রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়েই এগোতে চায় দলের হাইকমান্ড। এসব কর্মসূচি দলীয় নেতাদের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের পরামর্শ অনুযায়ী নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে অনশন, অবস্থান, মানববন্ধন, গণস্বাক্ষর, বিক্ষোভ সমাবেশ, কূটনৈতিক, বিদেশি গণমাধ্যমের বাংলাদেশ প্রতিনিধি ও পেশাজীবীদের সঙ্গে মতবিনিময়সহ বেশ কয়েকটি কর্মসূচি বাস্তবায়নও করেছে দলটি। ডিসেম্বরে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে পর্যায়ক্রমে আগামী দিনগুলোতে বাকি শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক কর্মসূচিগুলো পালন করবে তারা। কর্মসূচি পালনের মূল দাবি হিসেবে থাকছে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নবম সংসদ নির্বাচন। বিএনপির দাবিগুলোর প্রতি জনগণকে সম্পৃক্ত করাই এ মুহূর্তে বিএনপির মূল লক্ষ্য।

সূত্র জানায়, কর্মসূচিতে জনগণকে সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি বিদেশিদের সমর্থন আদায়ে প্রকাশ্যে ও গোপনে নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বিএনপি। তবে কৌশলগত কারণে এ মুহূর্তে কর্মসূচিগুলোর ধরন প্রকাশ করতে রাজি নয় দলটির হাইকমান্ড। ২০ দলীয় জোটের কর্মসূচির পাশাপাশি বিএনপি বিদেশ শাখা এবং দল সমর্থিত বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের ব্যানারেও নানা কর্মসূচি পালন করবে তারা।

সূত্র জানায়, নতুন শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মধ্যে ঢাকায় জনসভার পর প্রতিটি জেলায় জনসভা, সেমিনার, সারাদেশে একযোগে মানববন্ধন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে স্মারকলিপি প্রদান, কূটনীতিকদের মাঝে মাঝে ব্রিফিং, বিএনপির প্রবাসী শাখা এবং পেশাজীবীদের অনুরূপ কর্মসূচি থাকবে। আবার শান্তিপূর্ণ কিছু কর্মসূচি পুনরায়ও করতে পারে দলটি।

এ বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সমকালকে বলেন, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নির্দেশনা অনুযায়ী তারা শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক কর্মসূচি পালন করছেন। তারপরও শত শত নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে গ্রেফতার করা হচ্ছে। শত উস্কানির মধ্যেও ধৈর্যের পরিচয় দিচ্ছেন তারা। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যেকোনো বড় গণতান্ত্রিক দলের মধ্যে নানা মত থাকাই স্বাভাবিক। তবে এ মুহূর্তে বিএনপিতে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনের ক্ষেত্রে ভিন্নমত আছে বলে তার জানা নেই।

উদারপন্থি নেতারা জানান, কারাগারে যাওয়ার আগে বিভিন্ন বৈঠকে খালেদা জিয়া দলীয় নেতাদের আন্দোলনের কর্মসূচির ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়ে গেছেন। তিনি বলেছেন, ‘দাবি যত ছোট হবে, তত বেশি শক্তিশালী হবে। আর স্লোগান যত সহজ হবে, মানুষের মুখে মুখে তা থাকবে’। আন্দোলনের সঙ্গে এক ধরনের উত্তেজনা ও উদ্বেগ জড়িত থাকে। উত্তেজনা এড়িয়ে তারা কর্মসূচি পালন করবে, যা হবে ইতিবাচক রাজনীতির অংশ। মানুষ সংঘাত ও সহিংসতা চায় না। রাজনৈতিক কর্মসূচির পরিবর্তন চায়। বিএনপিকে সেই পরিবর্তনের রাজনীতিই দিতে হবে।

সূত্র জানায়, খালেদা জিয়ার রায়ের দিনও হাইকমান্ডের বরাত দিয়ে শান্তিপূর্ণ প্রতিক্রিয়া জানানোর কথা বলেও ব্যাপক শোডাউন করার পক্ষে ছিলেন কট্টরপন্থিরা। বিএনপির কট্টরপন্থি হিসেবে পরিচিত একজন নেতা সমকালকে বলেন, গত ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়ার মামলার রায়ের দিন দলের নেতাকর্মীদের সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছিল। রায় প্রতিকূলে গেলে একযোগে রাজপথে নামার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছিল। শুধু ঢাকা শহরই নয়, সারাদেশের নেতাকর্মীদের এমন প্রস্তুতি থাকলেও দলের মহাসচিব সংবাদ সম্মেলন করে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এতে সারাদেশে একটা ভিন্ন বার্তা চলে যায়। যার কারণে নেতাকর্মীরা আর মাঠে নামেননি।

খালেদা জিয়ার আদালতে যাওয়ার পথে নেতাকর্মীদের শোডাউনের বিরোধিতা করে দলের একজন স্থায়ী কমিটির সদস্য ক্ষোভ প্রকাশ করেন তখন। তিনি বলেছিলেন, এখনই শোডাউনের নামে শক্তি খরচের দরকার নেই। সময় হোক, শক্তভাবে রাজপথে নামতে হবে।

দলের কট্টরপন্থি হিসেবে পরিচিত অংশটি মনে করছে, বিএনপির শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিকে ক্ষমতাসীন দল ব্যঙ্গ করছে। একইসঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিএনপির শক্তি সম্পর্কে সন্দেহ ঘনীভূত হচ্ছে। দলের সাংগঠনিক শক্তি নিয়েও সংশয় প্রকাশ করছেন অনেকে।

দলের নমনীয় কর্মসূচিতে হতাশা প্রকাশ করে ছাত্রদল, যুবদলসহ তারুণ্যনির্ভর সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা অনেকটা নিষ্ফ্ক্রিয় হয়ে পড়ছেন। তাদের মতে, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনেও জেল-জুলুম সহ্য করতে হচ্ছে। গ্রেফতার আতঙ্কে এখনও তারা নিজ বাসা-বাড়িতে অবস্থান করতে পারছেন না। মামলার সংখ্যা কমছে না। নিখোঁজের তালিকাও দীর্ঘ হচ্ছে। তাই শান্তিপূর্ণ আর কঠোর আন্দোলনের কোনো পার্থক্য খুঁজে পাচ্ছেন না তারা।

দলের কট্টরপরিন্থ হিসেবে পরিচিত একটি অংশ কারাগারে থাকার কারণে উদারপন্থিদের মতকেই প্রাধান্য দিচ্ছে দলটির হাইকমান্ড। আবার উদারপন্থিদের সঙ্গে দল সমর্থিত বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবীদের সমর্থন থাকায় তাদের পাল্লাই ভারী। দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে চলমান মতবিনিময়কালেও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনকে সমর্থন দিচ্ছেন বিভিন্ন পেশাজীবী নেতৃবৃন্দ। এ পরিস্থিতিতে খুব শিগগিরই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি ছেড়ে কঠোর কর্মসূচিতে যাওয়া হচ্ছে না বলে মনে করছেন দলটির নেতাকর্মীরা।

এ বিষয়ে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সমকালকে বলেছেন, সরকার নানাভাবে বিএনপিকে ও নেতাকর্মীদের উস্কানি দিচ্ছে। নির্যাতন করছে। কিন্তু এরপরও তারা সরকারের ফাঁদে পা দেবেন না। এভাবে শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি চালিয়ে জনগণকে আরও সম্পৃক্ত করতে চাচ্ছেন। তাদের উদ্বুদ্ধ করতে চাচ্ছেন। এর ধারাবাহিকতায় তারা কঠোর আন্দোলনে যাবেন। সূত্র : সমাকল

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত