প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আস্থা চায় আ’লীগ
নির্বাচনী বছরে পাল্টাচ্ছে রাজনীতি

রাহাত : বিরোধী রাজনৈতিক মত, পথ ও বক্তব্যে সহিষ্ণু হওয়ার কৌশল নিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। চলতি নির্বাচনী বছরে বিরোধী শক্তিকে ‘স্পেস’ তৈরি করে দিয়ে আস্থায় নেওয়ার চেষ্টা করছেন তারা। কারণ গত দশম জাতীয় সংসদের মতো ‘সমালোচিত’ বা ‘বিতর্কিত’ কোনো নির্বাচন হোক সেটা ক্ষমতাসীনরাও চাইছেন না। তাই অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের স্বার্থে ক্ষমতাসীনরা বিরোধীদের রাজনৈতিক কর্মসূচি ও বক্তব্যের বিপরীতে ‘কঠোর’ আচরণ থেকে সরে আসছে বলে মনে করছেন অনেকে।

বিশেষ করে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার রায় এবং রায়-পরবর্তী ঘটনা থেকে সরকার বিশেষ লাভবান হয়নি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আদালতে হাজির থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন মামলার রায় গ্রহণ করায় এবং রায় পরবর্তী কোনো ধরনের কঠোর কর্মসূচি না দিতে নির্দেশ দেওয়ায় খালেদা জিয়া উল্টো সহানুভূতি পেয়েছেন বলে মনে করছেন কেউ কেউ। বিএনপিও নানাভাবে প্রচার করেছে, সরকার খালেদা জিয়াকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখতেই দুর্নীতির মিথ্যা মামলা দিয়ে তাকে কারারুদ্ধ করেছে।

এ ক্ষেত্রে সরকার বা ক্ষমতাসীনরা আদালতকে ব্যবহার করেছে বলেও অভিযোগ তুলেছেন তারা। ইতোমধ্যে বিএনপিপন্থী বিভিন্ন প্রচারমাধ্যম এবং দলের তৃণমূল নেতাকর্মীরা সর্বত্র এমন বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। রায়-পরবর্তী কোনো ধরনের হঠকারী কর্মসূচিতে না গিয়ে বিএনপি ঠাণ্ডা মাথায় পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে। একইসঙ্গে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত দলকে সংগঠিত করা এবং খালেদার পক্ষে সহানুভূতি আদায়ের কৌশল নিয়ে মাঠে নেমেছে বিএনপি। এ অবস্থায় বিএনপিকে বেকায়দায় ফেলে ক্ষমতাসীনদের লাভবান হওয়ার ছক অনেকটা ভেস্তে গেছে বলে মনে করছেন রাজনীতিসংশ্লিষ্ট অনেকে। তবে আওয়ামী লীগ এ পরিস্থিতিতে সতর্ক অবস্থানে চলে গেছে। খালেদা জিয়ার মামলার রায়কে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের কঠোর কর্মসূচি না দিয়ে বিএনপি নতুন কী ‘ঘোঁট’ পাকাচ্ছে সেদিকেই তীক্ষ্ম নজর রাখছে সরকার।

বিএনপির ব্যাপারে সরকারের হার্ডলাইনের কারণে অনেকের প্রশ্ন, সরকার কি বিএনপিকে ভাঙতে চাইছে? বিএনপিকে বাদ দিয়েই কি আগামী নির্বাচনের আয়োজন চলছে। এর উত্তর দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। সাংবাদিকদের এমনই এক প্রশ্নের জবাবে গত সোমবার তিনি বলেছেন, বিএনপি একটা বড় দল। তারা চান না বিএনপি ভেঙে যাক। এমনকি দলটিকে ভাঙার চেষ্টাও তারা করবেন না।

রাজধানীর রেডিসন হোটেলের সামনে বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিদর্শনে গিয়ে সম্প্রতি তিনি বলেন, ‘বিএনপি ভাঙার জন্য বিএনপি নিজেরাই দায়ী এবং বিএনপির সংকট আমরা ঘনীভূত করব না, আমরা এখানে ফ্যাক্টর না। বিএনপির অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক সংকট ঘনীভূত করার জন্য তারেক জিয়াই যথেষ্ট।’

খালেদা জিয়ার মামলা সম্পর্কে ওবায়দুল কাদের বলেন, আদালতের আদেশে তিনি দণ্ডিত হয়েছেন এবং জেলে গিয়েছেন। খালেদা জিয়া যখন আপিল করবেন, আপিলের বিচারে তাকে মুক্তি দেওয়া যায় কি না, সেটা আদালত বিবেচনা করতে পারেন। এখানে সরকার কোনো হস্তক্ষেপ করেনি, এমনকি ভবিষ্যতেও করবে না।

তার আগে ২২তম জুডিশিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কোর্সের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, সরকার চায় না কাউকে নির্বাচনের বাইরে রেখে নির্বাচন করতে। তবে আইনি বাধায় কেউ নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলে সেক্ষেত্রে সরকারের কোনো দায় নেই।

আওয়ামী লীগ নেতাদের এসব বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বিএনপির ব্যাপরে সরকারের অবস্থান অনেকটা স্পষ্ট হয়ে গেছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বিএনপি বা অন্য বিরোধী কর্মসূচি ও মত প্রকাশকে ‘দমানোর’ চেষ্টা করে সরকার বা ক্ষমতাসীনরা লাভবান হওয়ার চাইতে ক্ষতিগ্রস্তই বেশি হবেন।

সরকার যদি ‘বিরোধীদের’ দমনের কৌশলেই অনড় থাকে তাতে আগামী নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট হবে। সব দলের অংশগ্রহণের মতো পরিবেশ না থাকলে নির্বাচন ফের একতরফা হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। সেটা শেষ বেলায় আওয়ামী লীগের জন্য ‘স্বাস্থ্যকর’ হবে না। বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করতে গিয়ে উল্টো আওয়ামী লীগের অস্তিত্বই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। ভুল কৌশলের কারণে শত ‘ছিদ্র’ থাকার পরও বিএনপিই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে শক্তিশালী দল। টানা তৃতীয় মেয়াদে আওয়ামী জোটের ক্ষমতায় আসা দুরূহ হয়ে পড়বে।

গত ২ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে মো. আবদুল হামিদের মনোনয়নপত্র সংগ্রহের দিন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা মন্তব্য করেছেন, বিএনপি ছাড়া অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ‘বিএনপি একটা বড় দল। তাদের ছাড়া সব দলের অংশগ্রহণ হয় কী করে? বিএনপি ছাড়া অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হবে না।’

সিইসির এ বক্তব্যের মধ্য দিয়েও সরকারের অবস্থান পরিষ্কার হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগ চাইছে একটা অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচন। গতবার বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নিয়ে বড় ধরনের ভুল করেছে এটা যেমন বিএনপি বুঝতে পেরেছে, তেমনি বিএনপি ছাড়া নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতারোহণ আওয়ামী লীগের জন্যও বিব্রতকর বলে মেনে নিয়েছেন আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই। তাই বিএনপিকে যথাসম্ভব আর না ঘাঁটিয়ে আগামী জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে একটি ‘আস্থা’র পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করছে আওয়ামী লীগ। শুধু বিএনপিই নয়, অপরাপর বিরোধী মতের রাজনৈতিক দলগুলোকেও এ পরিবেশের জন্য উৎসাহিত করতে চায় দলটি। এজন্য খালেদার রায়ের পর গত কয়েকদিন সরকার বিএনপিকে তাদের প্রতিক্রিয়ামূলক নানা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনে সহযোগিতা করেছে। এমনকি ‘হার্ডলাইন’ থেকেও সরে এসেছে সরকার।

তবে বিএনপির ‘নরম’ কর্মসূচি যে কোনো সময় ‘গরম’ কর্মসূচিতে রূপ নিতে পারে এ শঙ্কাকে উড়িয়ে দিচ্ছে না ক্ষমতাসীনরা। বিএনপি যেমন এই সময়ে মামলা-গ্রেপ্তারের কৌশল এড়িয়ে আগামী নির্বাচনের জন্য শক্তি সংরক্ষণ ও সঞ্চয়ের কৌশল নিয়েছে তেমনি আওয়ামী লীগও আগামী নির্বাচনের পূর্বে রাজনৈতিক শক্তি-সামর্থ্য প্রদর্শনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। একইসঙ্গে দল এবং সরকারকে মানুষের কাছে অধিকতর গ্রহণযোগ্য করে তুলতে ইতোমধ্যেই শুদ্ধি অভিযানে নেমেছে তারা। এ শুদ্ধি অভিযান চলছে সরকার, ক্ষমতাসীন মহাজোট এবং আওয়ামী লীগের সর্বত্র। বিশেষ করে সরকার, দল ও জোটের বিতর্কিত, সমালোচিত, দায়িত্বে ব্যর্থ লোকজনকে সরিয়ে অপেক্ষাকৃত যোগ্য লোকজনকে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি সরকারের মন্ত্রিসভায় এরকম রদবদল হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে সরকারের শরিকদেরও এ বার্তা দিচ্ছে- সরকারের জনপ্রিয়তা অক্ষুণ্ন রাখতে এবং ক্ষমতা অব্যাহত রাখতে যে কোনো সিদ্ধান্তই কঠোরভাবে নেবেন শেখ হাসিনা। পরিবর্তন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত