প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মেঘালয়ে নির্বাচন: মেঘের রাজ্যে খ্রিস্টান, গোমাংস ও নারী

উৎপল বর্দলৈ : মেঘের দেশে মাথা তোলা, ভারতের ক্ষুদ্র, বর্ণাঢ্য, খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ উপজাতীয় রাজ্য মেঘালয়ে ২৭ ফেব্রুয়ারি ৬০ সদস্যবিশিষ্ট রাজ্য বিধান সভার নির্বাচন হতে যাচ্ছে।

দিল্লিতে ক্ষমতাসীন এবং ভারতের ২৯টি রাজ্যের মধ্যে ২১টিতে ক্ষমতায় থাকা ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) দেশটির প্রত্যন্ত উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ত্রিপুরা ও নাগাল্যান্ডের পাশাপাশি মেঘালয়েও জয়ী হতে চায়।

এখানে নির্বাচনীয় প্রচারণা ঠাণ্ডা, সহজ ও মসৃণ। ভারতের মূল ভূখণ্ডে থাকা রাজ্যগুলোর মতো চেঁচামেচি, উত্তাপ ও কাদা ছোঁড়াছুড়ি এখানে নেই।

বাংলাদেশের সমতল ভূমি থেকে দেখা যাওয়া মেঘালয়ের অর্থ হলো মেঘের আবাস। ২২,৪০০ বর্গ কিলোমিটারের পার্বত্যময় মালভূমিটি বিপুল সৌন্দর্যমণ্ডিত। এর দেবদারু বন, ঝরনা, গুহা, বিশ্বের সবচেয়ে বৃষ্টিবহুল চেরাপুঞ্জি ও মাওয়াসিনরাম এতে জনপ্রিয় পর্যটক গন্তব্যে পরিণত করেছে।

খাসিয়া, জৈন্তিয়া (কিন্দ্রেদনার), গারো, রাভা, হাজং ও টিপরাসহ অনেক উপজাতীয়ের বাস এখানে। এদের কোনো কোনো উপজাতীয় বাংলাদেশেও দেখা যায়। খাসিয়া-নাররা কম্বোডিয়া মন-খেমারদের সাথে সম্পর্কিত। গারোরা তিব্বত-বারমনদের থেকে সৃষ্ট। তাদের আদি বাসভূমি তিব্বত মালভূমি। তারা পরিশ্রমী, হাসিখুশি ও আতিথিপরায়ণ জনগোষ্ঠী।

খাসিয়া-নার ও গারোরা মাতৃতান্ত্রিক সমাজে বাস করে। তারা নারীদের মাধ্যমে তাদের উত্তরাধিকার ও উত্তরসূরি নির্ধারিত হয়। সবচেয়ে ছোট মেয়েই পরিবারের সম্পদের উত্তরাধিকারী হয় এবং মা-বাবার পরিচর্যা করে। তাদের সমাজে স্বামীরা স্ত্রীর বাড়িতে গিয়ে তার পরিবারের সাথে বাস করে। নারীরাই নির্ধারণ করে তারা কাকে বিয়ে করবে বা কার সাথে থাকবে। অনেক সময় স্ত্রী ও শাশুড়ির অধীনে বাস করতে গিয়ে অপদস্ত হয়ে পুরুষরা স্ত্রীদের ত্যাগ করে পালিয়ে যায়। এমন ঘটনা মেঘালয়ে অহরহই ঘটে।

রাজ্যের রাজধানী শিলং খাসিয়া হিলসের ১,৫০০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত। ব্রিটিশরা একে বলত ‘প্রাচ্যের স্কটল্যান্ড।’ ব্রিটিশরা এর শীতল জলবায়ু পছন্দ করত, ১৮৬৪ সালে একে আসাম প্রদেশের প্রশাসনিক সদরদফতর বানিয়েছিল। তারা যখন পোলো খেলত না বা একে অন্যের স্ত্রীর সাথে ফস্টিনস্টি করত না, তখন তারা এখান থেকেই নর-শিকারী গোত্রগুলোকে বশ করার জন্য কঠোর অভিযানে নামত। অস্কারজয়ী অভিনেত্রী জুলি ক্রিস্টি (ডার্লিং, ১৯৬৬) শিলংয়ের লরেটো কনভেন্টে পড়াশোনা করেছিলেন। বাংলার নোবেলজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (গীতাঞ্জলি, ১৯১৩) এখানেই তার অনেক কবিতা লিখেছেন।

শিলং হলো ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় সঙ্গীত রাজধানী। এখানে নোবেলজয়ী বব ডিলনের জন্মদিনে তার নামে প্রতি বছর ২৪ মে একটি উৎসব হয়। উৎসবটি চালু করেছিলেন লো মাজু (৭৪) ১৯৭২ সালে। পর্যটকদের আকর্ষণের জন্য অনানুষ্ঠানিক সমাবেশের জন্য পাব আর ক্যাফেগুলোতে ডিলনের সঙ্গীত নিয়ে তারা এর সূচনা করেছিলেন। রুডি ওয়ালাঙ ও পিরিতি খারবাঙ্গার- লিল মামা টিপস- ভারতের প্রথম সবচেয়ে পরিচিত ব্লুস/সল ব্যান্ড সলমেট চালু করেন ২০০৩ সালে। দি শিলং চেম্বার কোইর সারা বিশ্বে পরিচিত। তারা ২০১৫ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার ভারত সফরকালে গান গেয়েছিলেন।

ভারতীয় কংগ্রেস দলের সভাপতি রাহুল গান্ধী ৩০ জানুয়ারি সলমেট ও অন্যান্য ব্যান্ড নিয়ে শিলং পোলো গ্রাউন্ডে মিউজিক কনসার্ট দিয়ে নির্বাচনীয় প্রচারণা শুরু করেছিলেন। রাহুলের ডেনিম আর লন্ডনের ফ্যাশন বারবি জ্যাকেট নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে বিদ্রুপ করেছিল। বলা হচ্ছে, এর দাম ৭০ হাজার রুপি। ওই অনুষ্ঠানে হাজার হাজার তরুণ সমবেত হয়েছিল।

লোকজন আকৃষ্ট করার এটি একটি চতুর উপায়। বিজেপি এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো সমাবেশ করতে পারেনি। তবে এ ধরনের অনুষ্ঠান করা মানেই যে ভোট প্রাপ্তি নিশ্চিত তা নয়। অনেকেই কেবল গান, নৃত্য দেখতে আর ইন্দিরা গান্ধীর প্রতিষ্ঠিত শাসক পরিবারের পশ্চিমাভাবাপন্ন, সুদর্শন ব্যাচেলর উত্তরাধিকারীকে দেখতে এসেছিল। মেঘালয়ে ঐতিহ্যগতভাবে নারীরাই পুরুষদের প্রস্তাব দেয়। শিলংয়ে পাশ্চাত্য ব্যবস্থা বেশ বড় ব্যাপার।

নারী ভোটারদের মন জয় করার জন্য রাহুল গান্ধী কঠোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। এক সমাবেশে তিনি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) প্রদান মোহন ভগত ও মহাত্মা গান্ধীর ছবি প্রদর্শন করেন। তিনি বলেন, ‘আপনার মহাত্মা গান্ধীর ছবি দেখলে নারীদের পাবেন। আপনি মোগন ভগতের ছবি দেখলে দেখবেন সে একাকী কিংবা পুরুষবেষ্টিত দেখবেন। মোহন ভগত, আরএসএসও বিজেপি হলো নারীবিরোধী।’ তার দাদি ইন্দিরা গান্ধী এখানে এসেছিলেন, কারণ তিনি ছিলেন নারী। তার প্রধানমন্ত্রীর আমলেই আসাম থেকে আলাদা করে ১৯৭২ সালে মেঘালয় নামে আলাদা রাজ্য হয়।

বিজেপি হলো উগ্র ডানপন্থী আরএসএসের রাজনৈতিক শাখা। তারা ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়। ভগতের মতো এর নেতারা কুমার জীবনযাপনের শপথ গ্রহণ করে থাকেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিয়ে করেছিলেন কৈশোরে। তিনি তার স্ত্রী যশোদাবেনকে বর্জন করেছিলেন।

মেঘালয়ের জনসংখ্যা ২০১১ সালে ছিল ২৯ লাখ। নারী ও পুরুষের অনুপাত ৯৮৬:১,০০০। ভারতের অন্যান্য স্থানে প্রতি হাজার পুরুষের বিপরীতে নারী ৯৪০। অর্থাৎ মেঘালয়ে নারীর অনুপাত ভারতের অন্যান্য স্থানের চেয়ে বেশি। মেঘালয়ের ১৮ লাখ ৩০ হাজার ভোটারের অর্ধেক ৫০.৪ ভাগ হলো নারী।

রাহুল গান্ধী রাজনীতিতে নারীদের ক্ষমতায়নের ব্যাপারে জোর দিয়েছেন। মোট ৫৭ জন প্রার্থীর মধ্যে কংগ্রেস মনোনয়ন দিয়েছে ছয় নারীকে। বিজেপির ৪৫ প্রার্থীর মধ্যে নারী মাত্র একজন। সত্যিকারের ক্ষমতা তথা সম্পত্তি ও ব্যবসায়ের মালিকানা হাতে থাকায় নারীরা নির্বাচনী রাজনীতি থেকে দূরে থাকে। পান দোকান থেকে মাল্টি-বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যিক কোম্পানি পরিচালনা করে নারীরা।

রাহুল জোর দিয়ে বলছেন, কংগ্রেস মেঘালয়ের ধর্ম, সংস্কৃতি ও ভাষা রক্ষা করবে। তিনি বলেন, আরএসএস ও বিজেপি ভারতজুড়ে হিন্দু সংস্কৃতি ও হিন্দু ভাষা চাপিয়ে দিতে চায়। মেঘালয়ের সরকারি ভাষা ইংরেজি, লোকজন প্রধানত খ্রিস্টান। ভারতের তিনটি খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্যের একটি এটি। অন্য দুটি হলো নাগাল্যান্ড ও মিজোরাম। রাজ্যটির ৭৫ ভাগ লোক খ্রিস্টান। খ্রিস্টানদের মধ্যে আবার ব্যাপ্টিস্ট, ক্যাথলিক ও প্রেসবাইটারিয়ানদের সংখ্যা বেশি। এছাড়া আরো অনেক প্রান্তিক গ্রুপ আছে।

বিজেপি, আরএসএস এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) ও বজরং দলের মতো এর মিত্ররা ভয়াবহ রকমের মুসলিমবিরোধী ও খ্রিস্টানবিরোধী। তারা উত্তর প্রদেশের অযোধ্যায় রামের নামে মন্দির নির্মাণের জন্য ১৯৯২ সালে ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ভেঙেছে। ১৯৯৯ সালে বজরং দল উড়িষ্যায় এক অস্ট্রেলিয়ান মিশনারি চিকিৎসক গ্রাহাম স্টেইনেস এবং তার ১০ ও ৬ বছরের দুই ছেলেকে পুড়িয়ে হত্যা করেছে। ভারতের মুসলিম ও খ্রিস্টানরা এ দুটি ঘটনা ভোলেনি।

বিজেপি ২০১৪ সালে ভারতে ক্ষমতায় আসার পর থেকে মুসলিম ও খ্রিস্টানদের ওপর আক্রমণ ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। আরএসএস, বিজেপি, ভিএইচপি ও বজরং দলের সমর্থকেরা ক্রিসমাসের দিন নিজ বাড়িতে ভজন গাওয়ার জন্য খ্রিস্টানদের ওপর হামলা চালিয়েছে। গরু জবাই করার জন্য মুসলিমদের ওপর আক্রমণ চালিয়েছে। শুধু মুসলিম হওয়ার কারণে মুসলিমদের নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে।

ভারতের যেকোনো স্থানে খ্রিস্টানদের ওপর হামলা হলেই তা মেঘালয়ে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। এই রাজ্যে শিক্ষার হার ৭৬ ভাগ। সামাজিক মাধ্যমে ওইসব পোস্ট বিজেপির নির্বাচনী সম্ভাবনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। কংগ্রেস পাঁচ দশক ধরে বিভিন্নভাবে খ্রিস্টানদের সমর্থন লাভের চেষ্টা করে যাচ্ছে। নির্বাচনের সময় খ্রিস্টান যাজক পাদ্রিরা বিজেপি’র নিন্দা করে থাকে।

মেঘালয়ের কংগ্রেস প্রধান ভিনসেন্ট হপলা বলেন, বিজেপির ‘গরু খাওয়া নিষিদ্ধ’ কংগ্রেসের জন্য প্রধান বিষয়। উপজাতীয় খ্রিস্টানদের প্রধান খাবার হলো গরু।

দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে এক শীর্ষ ধর্মীয় নেতাকে দিল্লি সফরের ভিসা না দেওয়ায় খ্রিস্টানরা সাধারণভাবে এবং ব্যাপ্টিস্তরা বিশেষভাবে বিজেপি সরকারের প্রতি ক্ষুব্ধ।

গত ৮-১১ ফেব্রুয়ারি ইস্ট গারো হিলস জেলায় গারো ব্যাপ্টিস্তরা বিশাল আয়োজনে সেসকউসেটেনিয়াল উৎসব পালন করে। তারা ব্যাপ্টিস্ত ওয়ার্ল্ড অ্যালায়েন্সের (বিডব্লিউএ) সভাপতি দক্ষিণ আফ্রিকার জুলু (উপজাতীয়) রেভারেন্ড ড. নগুইডলা পল এমসিজাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। কিন্তু জোহানেসবার্গে ভারতীয় কনস্যুলেট তাকে ভিসা না দেওয়ায় তিনি তাতে যোগ দিতে পারেননি। বিজেপি ও আরএসএস ভয় পাচ্ছিল, ওই অনুষ্ঠান হিন্দুদের ধর্মান্তরে ব্যবহৃত হতে পারে।

গারোদের প্রায় সবাই ধর্মান্তরিত হয়ে গেছে। প্রথম যে গারো যিশুখ্রিস্টকে গ্রহণ করেছিল তার নাম ওমেদ ওয়ালত্রে। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি আর্মির সৈনিক। তিনি গৌহাটিতে (আসাম) একটি বাড়ি পাহারা দেওয়ার সময় পরিত্যক্ত একটি কাগজে যিশু শব্দটি দেখতে পান। তিনি তার ভাতিজা ও অন্য কয়েকজন মিলে ১৮৬৩ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি প্রথম গারো চার্চ প্রতিষ্ঠা করেন রাজাসিমলায়। বর্তমানে ব্যাপ্টিস্ট গারোর সংখ্যা ৩০৪,৮১২, চার্চের সংখ্যা ২,০৭৪। ক্যাথলিক চার্চ এবং অন্যান্য গ্রুপেও গারো সদস্য রয়েছে।

ওই ভিসা প্রদান না করার ঘটনায় খ্রিস্টানরা ক্ষুব্ধ হলেও বিজেপি ও তার সমর্থকেরা কিন্তু অনড়। কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি ও পর্যটনমন্ত্রী আলফনস যোশেফ কানানথানাম বলেন, প্রতিদিন শত শত ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়। একটি প্রত্যাখ্যানকে কেন রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করা হচ্ছে? মেঘালয়ে বিজেপির নির্বাচনী প্রচারণার দায়িত্বে রয়েছেন তিনিই। কেরালার এই ভদ্রলোক শিলংয়ের কিং কলেজে পড়াশেনা করার সময় ক্যাথলিক পাদ্রি হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পরে ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসে যোগ দিতে ওই ইচ্ছা ত্যাগ করেন। পরে তিনি ‘বামপন্থী’ হিসেবে কেরালা রাজ্য বিধান সভার সদস্য হন। এরপর তিনি বামপন্থী খোলস ত্যাগ করে হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপিতে যোগ দেন, ২০১৭ সালে নরেন্দ্র মোদির মন্ত্রী হন।

পর্যটনমন্ত্রী হওয়া আলফনস হাসির পাত্র হয়েছেন বিদেশী পর্যটকদের এই উপদেশ দিয়ে যে ‘ভারতে আসার আগে গরুর গোশত খাবেন না।’ -লেখাটি সাউথ এশিয়ান মনিটর থেকে নেয়া।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত