প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রাজধানীতে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় চালু হচ্ছে আইটিএস

হামিম আহসান : রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় চালু হচ্ছে ইন্টেলিজেন্ট ট্রাফিক সিস্টেম (আইটিএস)।  সম্প্রতি শুরু হয়েছে এর কাজ। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার বাস্তবতায় এ ব্যবস্থা কোনো কাজে আসবে না। আইটিএসের সুফল নিয়ে সন্দিহান প্রকল্পসংশ্লিষ্টরাও। এর আগে চার ইন্টারসেকশনে আইটিএস স্থাপনের একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প নেয়া হয়েছিল ২০১৬ সালে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগ এবং ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) তথ্য অনুযায়ী, ইন্টেলিজেন্ট ট্রাফিক সিস্টেমে ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা (সিসি ক্যামেরা) বা রাস্তায় বসানো ভেহিকল ডিটেক্টরের (গাড়ি শনাক্তকরণ যন্ত্র) মাধ্যমে গাড়ি সংখ্যা হিসাব করা হয়। নির্দিষ্ট সময়ে একটি লেন দিয়ে কতগুলো গাড়ি পার হয়েছে, সে হিসাব রাখে এ যন্ত্র।

এ অনুযায়ী যে লেনে চাপ বেশি থাকে, সেদিকের গাড়িগুলোর জন্য জ্বলে ওঠে সবুজ সিগন্যাল বাতি। কোনো গাড়ি ট্রাফিক আইন অমান্য করলে সেটিকেও শনাক্ত করা যায়। এছাড়া রাস্তায় থাকা পথচারীদেরও হিসাব করে সে অনুযায়ী পথচারী পারাপারের সংকেত দেয় আইটিএস। সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হয় একটি কন্ট্রোল রুম থেকে।

তবে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ইন্টারসেকশনের সব রাস্তায় যদি গাড়ির প্রচুর চাপ থাকে তাহলে এ ব্যবস্থাটি ঠিকমতো কাজে দেয় না।

তাদের মতে, অনেক সময় একটি গাড়ির বাম্পারের সঙ্গে আরেকটির বাম্পার লেগে থাকে। তখন সেখানে কয়টি গাড়ি রয়েছে তা শনাক্ত করতে পারে না ক্যামেরা। এছাড়া সড়কে গাড়ির চাপ বেশি থাকলে যন্ত্রটি ঠিকমতো কাজ করতে পারে না। তখন ম্যানুয়ালি ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের কোনো বিকল্প থাকে না।

আইটিএস স্থাপনের লক্ষ্যে ২০১৬ সালে একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প হাতে নেয় ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ। জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) সহায়তায় গুলশান-১, মহাখালী, পল্টন ও ফুলবাড়িয়া ইন্টারসেকশনে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৬ কোটি ৩৭ লাখ টাকা।

চার স্থানে পরীক্ষামূলক প্রকল্পটি সফল হলে তা ঢাকার সবগুলো ইন্টারসেকশনে স্থাপন করা হবে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির কর্মকর্তারা।

মাঠ পর্যায়ে সমীক্ষা, নকশা প্রণয়ন, দরপত্রের ধাপ পেরিয়ে গত বছরের ডিসেম্বরে শুরু হয়েছে প্রকল্পের পূর্ত কাজ। গতকাল মহাখালী ইন্টারসেকশন ঘুরে প্রকল্পের কাজ চলতে দেখা গেছে। সেখানে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের জন্য অবকাঠামো উন্নয়ন কাজ করা হচ্ছে। পাশাপাশি ইন্টারসেকশনটিরও উন্নয়ন কাজ চলমান। কাজটি করছে নাবিলা করপোরেশন নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

প্রকল্প কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ চলছে। আইটিএস ডিভাইস সরবরাহ করবে জাইকা। সেগুলো চারটি ইন্টারসেকশনে ইনস্টল (স্থাপন) করা হবে।

ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়নে কোটি কোটি টাকা খরচ করে এর আগেও একাধিক প্রকল্প নেয়া হয়েছিল। আধুনিক সিগন্যাল বাতি, স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল, টাইমার কাউন্টডাউন, রিমোট কন্ট্রোলার কোনোটিই ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার পরিবর্তন আনতে পারেনি। এমন পরিপ্রেক্ষিতে আইটিএস পদ্ধতিও ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা পরিবর্তনে কোনো ভূমিকা রাখতে পারবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বিশ্লেষকরা কারণ হিসেবে এর অপর্যাপ্ত রাস্তা ও এর বিপরীতে প্রচুর গাড়ির চাপের কথা বলছেন। পাশাপাশি ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়ন নয়, সড়ক বৃদ্ধি ও যানবাহন নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।

এ সম্পর্কে পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. শামছুল হক বলেন, ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ভীষণ রকমের বিশৃঙ্খল। এখানে রাস্তার পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। অন্যদিকে যানবাহনের সংখ্যা ধারণক্ষমতার কয়েক গুণ বেশি, যা বছর বছর বেড়েই চলেছে। মানুষও ট্রাফিক আইন মেনে চলে না। এমন অবস্থায় এখানে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার কোনো পদ্ধতিই কাজে দেবে না। আইটিএসের ক্ষেত্রেও একই রকম ঘটবে। ঢাকার জন্য আদর্শ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করার আগে চিন্তা করতে হবে রাস্তার ক্ষমতা কতটুকু? রাস্তার একটা নির্দিষ্ট ধারণক্ষমতা আছে। তার বাইরে যদি চাপ চলে আসে তাহলে কোনো ব্যবস্থাপনাই কাজ করবে না। হয় রাস্তা বাড়াতে হবে, না হয় গাড়ির সংখ্যা কমাতে হবে। এ দুটো কাজ না করলে কোনো ব্যবস্থাই কাজ করবে না। এ জিনিসটা আমাদের আগে বুঝতে হবে। এগুলো না করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করে অর্থের অপচয় করার কোনো মানে হয় না।

তিনি আরো বলেন, গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি সাধন, ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমিয়ে আনা, সড়কের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হলে চাপ কমে আসবে। চাপটা যখন একটা সহনীয় মাত্রায় আসবে, তখন সিগন্যালের মাধ্যমে সিস্টেমগুলো সুন্দরভাবে কাজ করবে।

ঢাকার চার ইন্টারসেকশনে আইটিএস পদ্ধতির সিসি ক্যামেরাগুলো ৩০০ মিটার এলাকার যানবাহনের হিসাব রাখতে সক্ষম হবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প কর্মকর্তারা।

তারা বলছেন, আইটিএস স্থাপনের পর সেটি পরিচালনার দায়িত্ব ঢাকা মহানগর পুলিশ হেডকোয়ার্টারকে দেয়া হবে। প্রকল্পটি চলতি বছরের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনো বেশকিছু কাজ বাকি। এজন্য প্রকল্পের মেয়াদ বাড়াতে হবে।

বাস্তবায়নকারী সংস্থার কর্মকর্তারাও মনে করছেন, প্রকল্পের সফলতা নির্ভর করছে আইনের কঠোর প্রয়োগ ও মানুষের সচেতনতার ওপর।

এ বিষয়ে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ আহম্মেদ বলেন, আইটিএস ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার আধুুনিক পদ্ধতি। ঢাকার চারটি ইন্টারসেকশনে পরীক্ষামূলকভাবে এটি স্থাপন করা হচ্ছে। সফলতা পাওয়া গেলে পরবর্তীতে সবগুলো ইন্টারসেকশনে স্থাপন করা হবে। তবে সফলতার অনেকখানিই নির্ভর করছে মানুষের সচেতনতা ও আইনের কঠোর প্রয়োগের ওপর। তাই আমরা আইটিএস স্থাপনের পাশাপাশি মানুষকে ট্রাফিক আইন সম্পর্কে সচেতন করার কার্যক্রম হাতে নিয়েছি।

সূত্র: বণিক বার্তা

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত