প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রবৃদ্ধিতে এগিয়ে আকাশপথ ও রেল
যাত্রী কমছে সড়কপথে

ডেস্ক রিপোর্ট : দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে দেশের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার বেহাল দশা। সড়ক-মহাসড়কে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট এখন নিত্যদিনের ঘটনা। কয়েক বছর ধরেই সড়কপথে যানজটের ভোগান্তি চলমান। তার উপর গত বছরের আগস্টের বন্যার পর সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-টাঙ্গাইল, ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-গাজীপুর, ঢাকা-রংপুর, ঢাকা-নীলফামারী, ঢাকা-রাজশাহী, ঢাকা-ফরিদপুর, ঢাকা-বরিশাল, ঢাকা-খুলনাসহ দেশের বেশির ভাগ সড়ক-মহাসড়ককে এখন সৃষ্টি হচ্ছে ভয়াবহ যানজট। সাথে সড়কপথে ভয়াবহ দুর্ঘটনা তো আছেই। এতে করে ক্রমাগত দূরপাল্লার যাত্রী হারাচ্ছে সড়কপথ। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের রোড মাস্টারপ্ল্যানেও সড়কপথে যাত্রী প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

২০০৯ সালে অনুমোদিত অধিদপ্তরের রোড মাস্টারপ্ল্যানে বলা হয়েছিল, পরবর্তী ২০ বছরে দেশে ট্রাক ও প্রাইভেট কারের প্রবৃদ্ধি দ্রæত হলেও বাসের ক্ষেত্রে তা হবে ধীর। এর কারণ হিসেবে বলা হয়, উল্লিখিত সময়ে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে যাত্রীসেবার মান বৃদ্ধি পেলে রেলের দিকে মানুষ ঝুঁকবে বেশি। এ কারণে সড়কপথে যাত্রী পরিবহনে প্রবৃদ্ধি হবে ধীরগতিতে। তবে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করার পরেও কাঙ্খিত উন্নয়ন ঘটেনি রেলপথে। টিকিটপ্রাপ্তি থেকে শুরু করে সময়সূচির অব্যবস্থাপনায় রেলের দূরপাল্লার যাত্রীদের প্রায়ই ভোগান্তি পোহাতে হয়। তবে গত কয়েক বছরে অভ্যন্তরীণ রুটে আসন সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ভাড়া কমিয়েছে সরকারি-বেসরকারি সব এয়ারলাইনস। এর ফলে যাত্রী প্রবৃদ্ধিতে রেল ও সড়কপথের তুলনায় এগিয়ে গেছে আকাশপথ।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৩ সালে আকাশপথের অভ্যন্তরীণ রুটে দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলো ৬ লাখ ৪৮ হাজার ১৯ জন যাত্রী পরিবহন করেছিল, যা ২০১৭ সালে প্রায় ৬৫ শতাংশ বেড়ে ১০ লাখ ৬৭ হাজার ৫৩৭ জনে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ে ২০১২-১৩ অর্থবছরে সারাদেশে ৬ কোটি ২৫ লাখ যাত্রী পরিবহন করেছিল। এ সংখ্যা ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বেড়ে হয় প্রায় সাড়ে ৮ কোটি। সে হিসাবে গত পাঁচ অর্থবছরে রেলওয়ের যাত্রী প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩৬ শতাংশ।

দূরপাল্লার বাস মালিকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সারাদেশে সড়ক-মহাসড়কের বেহাল দশার কারনে দূরপাল্লার বাসগুলোতে যাত্রী সংখ্যা দিন দিন কমছে। ঢাকা-নওগাঁ রুটের শ্যামলী পরিবহনের এক কাউন্টার মাস্টার বলেন, গত কয়েক বছর ধরেই মহাসড়কগুলো অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে। এবারের বর্ষায় আরও খারাপ হয়েছে। তিনি বলেন, মহাসড়কগুলো যেভাবে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ছে সে তুলনায় মেরামতের উদ্যোগ নেই। বরং একটা অংশ মেরামত করতে করতে আরেক অংশ ভেঙে একাকার হয়ে যাচ্ছে। এতে করে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। তিনি বলেন, পাঁচ বছর আগেও ঢাকা থেকে উত্তরাঞ্চলের যে কোনো জেলা শহরে যেতে যে সময় লাগতো, এখন বাড়তে বাড়তে তা দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এতে করে বিকল্প হিসাবে যাত্রীরা রেলপথকে বেছে নিচ্ছে। আবার যাদের সামর্থ্য আছে তারা স্বল্প সময়ে আকাশপথে যাচ্ছেন।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির এক নেতা বলেন, গত তিন বছরে যাত্রীর অভাবে অনেক কোম্পানী বিভিন্ন রুটে বাসের সংখ্যা কমাতে বাধ্য হয়েছে। বাস মালিকদের দেয়া তথ্য মতে, সাধারণ যাত্রী পরিবহন ব্যবসা এখন আর আগের মতো লাভজনক নেই। ভাঙাচোরা সড়কে চলতে গিয়ে বাসগুলোতে প্রায়ই যান্ত্রিক ত্রæটি দেখা দিচ্ছে। সাথে টায়ার,টিউবসহ তেল মবিলও বেশি খরচ হচ্ছে।

রেলওয়ের ট্রাফিক বিভাগের তথ্যমতে, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন রেলপথে দৈনিক ৩৫০টি ট্রেন চলাচল করছে। এর মধ্যে ৮৮টি আন্তঃনগর, ১২৬টি লোকাল , ১৩২টি মেইল ও ডেমু এবং আন্তর্জাতিক চারটি ট্রেন। এসব ট্রেনের যাত্রী ধারণক্ষমতা দৈনিক ২ লাখ ৫০ হাজার। সূত্র জানায়, গত অর্থবছর (২০১৬-১৭) রেলওয়ের যাত্রী পরিবহনে ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে প্রবৃদ্ধির হার আরো বেশি, ২৫ শতাংশ। সংশ্লিষ্টদের মতে, সেবার মান বৃদ্ধি, নিরাপদে যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছাসহ কয়েকটি ট্রেনের রানিং টাইম কমিয়ে দেয়ায় রেলওয়েতে দিন দিন যাত্রীর সংখ্যা বাড়ছে।

অন্যদিকে, যাত্রী পরিবহন প্রবৃদ্ধিতে সড়ক ও রেলপথের তুলনায় বেশ এগিয়ে আছে আকাশপথ। সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৫ সাল থেকে দেশের অভ্যন্তরীণ রুটগুলোয় ফ্লাইট চালু করে রাষ্ট্রায়ত্ত এয়ারলাইনস সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। শুরুতেই অভ্যন্তরীণ সব রুটেই ভাড়া কমিয়ে দেয় বিমান। ব্যবসায় টিকে থাকতে ভাড়া কমাতে বাধ্য হয় অভ্যন্তরীণ রুটে কার্যক্রম পরিচালনা করা বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলো। যার প্রভাবে গত পাঁচ বছরে অভ্যন্তরীণ রুটের যাত্রী বেড়েছে ৬৫ শতাংশ। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের ( বেবিচক) হিসাব মতে, ২০১৩ সালে অভ্যন্তরীণ রুটে যাত্রী পরিবহন হয় ৬ লাখ ৪৮ হাজার ১৯ জন, যা প্রায় ৬৫ শতাংশ বেড়ে ২০১৭ সালে এসে দাঁড়ায় ১০ লাখ ৬৭ হাজার ৫৩৭ জনে। ২০১৬ সালে এ সংখ্যা ছিল ১০ লাখ ৩ হাজার ৩১ জন।

জানা গেছে, বর্তমানে অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, নভোএয়ার, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস ও রিজেন্ট এয়ারওয়েজ। এয়ারলাইনসগুলো ঢাকার হযরত শাহজালাল (রা.)আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে রাজশাহী, সৈয়দপুর, চট্টগ্রাম, বরিশাল, কক্সবাজার, যশোর ও সিলেট রুটে যাত্রী পরিবহন করছে। এর মধ্যে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস ঢাকা থেকে প্রতিদিন চট্টগ্রামে ৬টি, যশোরে তিনটি, সৈয়দপুরে তিনটি, সিলেটে একটি এবং কক্সবাজারে দুটি ফ্লাইট পরিচালনা করছে। এছাড়া ঢাকা-বরিশাল রুটে সপ্তাহে তিনটি এবং ঢাকা-রাজশাহী রুটে সাপ্তাহিক ৬টি ফ্লাইট রয়েছে এয়ারলাইনসটির।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ঢাকা থেকে প্রতিদিন চট্টগ্রামে ৫টি, যশোরে একটি, সৈয়দপুরে একটি, সিলেটে একটি এবং কক্সবাজারে একটি ফ্লাইট পরিচালনা করছে। এছাড়া ঢাকা-বরিশাল রুটে সপ্তাহে দুটি এবং ঢাকা-রাজশাহী রুটে সাপ্তাহিক ৪টি ফ্লাইট রয়েছে বিমানের।

নভোএয়ার ঢাকা থেকে প্রতিদিন চট্টগ্রামে ৫টি, যশোরে তিনটি, সৈয়দপুরে তিনটি, সিলেটে একটি এবং কক্সবাজারে তিনটি ফ্লাইট পরিচালনা করছে। অন্যদিকে রিজেন্ট এয়ারওয়েজ ঢাকা থেকে প্রতিদিন চট্টগ্রামে ৪টি, সৈয়দপুরে দুটি এবং কক্সবাজারে দুটি ফ্লাইট পরিচালনা করছে।

যাত্রীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সড়কপথে যানজটের ভোগান্তির কারনে যাদের সামর্থ্য আছে তারা আকাশপথেই বেশি যাতায়াত করেন। বেহাল সড়কের কারনে সড়কপথে যাত্রীসেবা বলে কিছু নেই বলে অনেক যাত্রীই মনে করেন। আর ট্রেনের টিকিট প্রাপ্তির ঝামেলার কারনে অনেকে রেল সেবা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। ইনকিলাব

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত