প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সুন্দরবন দিবস আজ
‘সুন্দরী’রা ভালো নেই

ডেস্ক রিপোর্ট : সুন্দরী। না, কোনো বিশ্বসুন্দরীর কথা বলছি না। এ হলো আমাদের সুন্দরী, বিশ্বঐতিহ্য সুন্দরবনের প্রধান বৃক্ষ। দুঃখজনক হলেও সত্য, সুন্দরীরা ভালো নেই। প্রাকৃতিক বিপর্যয়, জলবায়ুর পরিবর্তন ও লবণাক্ততা বাড়াসহ আরও কিছু কারণে দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে কমছে সুন্দরীর সংখ্যা। এরই মধ্যে হারিয়ে গেছে প্রায় ৫৩ হাজার হেক্টর বনভূমির সুন্দরী। এ অবস্থায় বন, বৃক্ষ ও বৈচিত্র্য রক্ষার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে আজ পালিত হচ্ছে সুন্দরবন দিবস।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মানুষের আগ্রাসনে বিপর্যয়ের মুখে রয়েছে বিশ্বের একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। ক্রমেই সুন্দরী গাছ উজাড় হওয়ায় গত ২৫ বছরে ঘন বনের পরিমাণ কমেছে প্রায় ২৫ শতাংশ। এ অবস্থায় একদিকে কমছে বনভূমি, অন্যদিকে বাড়ছে জলাভূমি ও খালি জায়গার পরিমাণ।

সুন্দরীর সংখ্যা কেন কমছে- জানতে চাইলে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, সুন্দরবনের জন্য এখন সবচেয়ে বড় হুমকি পানি ও মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি। জলবায়ু পরিবর্তন ও বনের ভেতর দিয়ে প্রবহমান নদীগুলোর উৎসস্থল বা উজান থেকে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় ক্রমেই বাড়ছে লবণাক্ততার পরিমাণ ও লবণাক্ত ভূমির বিস্তৃতি। এর ফলে কমছে অপেক্ষাকৃত কম লবণসহিষ্ণুু সুন্দরী, গোলপাতা ও খলিসা গাছের সংখ্যা। অন্যদিকে বাড়ছে বেশি লবণসহিষ্ণুু গেওয়া, কেওড়া, বাইন ও গরান গাছসহ লতাগুল্ম। লবণাক্ততা বাড়ার ফলে বিরূপ প্রভাব পড়ছে কুমিরের প্রজননে। অতিরিক্ত লবণাক্ত পানি পান করে রোগাক্রান্ত হচ্ছে বাঘসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সুন্দরবনের মধ্যে নদীগুলোর পানির উচ্চতা বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে। বিশ্বব্যাংকের ২০১৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বৃদ্ধির হার বছরে ৩ থেকে ৮ মিলিমিটার। সুন্দরবন সংরক্ষণে নিয়োজিত কর্মকর্তারা জানান, এরই মধ্যে বন থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে গণ্ডার, বনমহিষ, মিঠা পানির কুমির, এক প্রজাতির হরিণ, চিতা বাঘ ও চার প্রজাতির পাখি। বিলুপ্ত হতে চলেছে ১৯ প্রকার মাছ। সুন্দরবনের গাছে গাছে আগের মতো দেখা যায় না বানর ও বিভিন্ন প্রজাতির পাখি। কমে গেছে মৌচাকও।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুন্দরবন রিসার্চ সেন্টারের প্রাক্তন পরিচালক অধ্যাপক ড. সরদার শফিকুল ইসলাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সিডর-আইলার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে গাছপালা ও বন্যপ্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একদিকে বেড়েছে নদীভাঙন আর অন্যদিকে পলি পড়ে ভরাট হচ্ছে অনেক এলাকা। ক্রমাগতভাবে কমছে সুন্দরবনের বনভূমির আয়তন, আর বাড়ছে জলাভূমির পরিমাণ। এ বিষয়ে ‘সুন্দরবন জয়েন্ট ল্যান্ডস্কেপ ন্যারেটিভ-২০১৬’ নামে একটি গবেষণা পরিচালনা করে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ট্রাস্টি প্রতিষ্ঠান সিইজিআইএস। তাদের গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, ১৭৭৬ সালে সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশের আয়তন ছিল ১১ হাজার ২৫৬ বর্গকিলোমিটার। ২০১৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৪৬৭ বর্গকিলোমিটারে। এর মধ্যে গত ২৭ বছরে বনভূমির আয়তন কমেছে ৭৬ বর্গকিলোমিটার, তবে জলাভূমির আয়তন বেড়েছে ৩০ বর্গকিলোমিটার।

কমেছে ঘন বন :চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ২০১৪ সাল থেকে তিন বছর ধরে সুন্দরবনের ওপর একটি গবেষণা চালায়। গত সেপ্টেম্বরে তাদের গবেষণা শেষ হয়। গবেষণা দলের প্রধান ও ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. এ এইচ এম রায়হান সরকার জানান, সুন্দরবনে ১৯৮৯ সালে সুন্দরী গাছ ছিল এক লাখ ৬৭ হাজার ৬৪৬ হেক্টর বনভূমিতে। ২০১৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ১২ হাজার ৯৯৫ হেক্টরে। ২৫ বছরে সুন্দরী গাছ কমেছে প্রায় ৫৩ হাজার হেক্টরে।

ড. রায়হান সরকার জানান, ১৯৮৯ সালে সুন্দরবনে ঘন বনের পরিমাণ ছিল তিন লাখ ৭৯ হাজার ৭৫১ হাজার হেক্টর, যা পুরো বনের ৬৩ শতাংশ। ২০১৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ৩০ হাজার ২৩৭ হেক্টরে, যা পুরো বনের ৩৮ শতাংশ। ঘন বনের পরিমাণ কমেছে প্রায় ২৫ শতাংশ।

মানুষের আগ্রাসন :মানুষের চার ধরনের আগ্রাসনে বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে সুন্দরবন। সেগুলো হচ্ছে- বিষ দিয়ে মাছ শিকার, অবাধে গাছ কাটা, বন্যপ্রাণী শিকার এবং বনের ভেতরের নদীতে নৌযান চালানো।

সুন্দরবন একাডেমির উপদেষ্টা রফিকুল ইসলাম খোকন বলেন, বিষ দিয়ে মাছ ধরা এবং গাছ পাচার বন্ধে বন বিভাগের উদ্যোগ পুরোপুরি কার্যকর হচ্ছে না। বনসংলগ্ন এলাকায় প্রকাশ্যেই সুন্দরবনের গাছ বেচাকেনা চলছে।

এদিকে, সুন্দরবনে বাঘ ও হরিণশিকারিরা কিছুদিন পরপর বেপরোয়া হয়ে ওঠে।

নৌযান চলাচল :সরেজমিনে দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে মোংলা বন্দর থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বনের মধ্য দিয়ে ১৩১ কিলোমিটার নদীপথে দেশি-বিদেশি জাহাজ চলাচল করছে। বনের ভেতরের নদী দিয়ে রায়মঙ্গল ও কয়রার আংটিহারা এলাকা দিয়ে জাহাজ যাওয়া-আসা করছে ভারতে।

ওয়াইল্ড লাইফ কনজারভেশন সোসাইটির সিনিয়র গবেষক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বনের মধ্য দিয়ে চলাচল করা ভারী নৌযানের পাখার আঘাতে মারা পড়ছে ডলফিন। এ ছাড়া এসব এলাকায় জেলেদের মাছ ধরা জালে আটকা পড়েও মারা যাচ্ছে শুশুক ও ইরাবতি ডলফিন।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) খুলনার সমন্বয়কারী এম বাবুল হাওলাদার বলেন, একের পর এক জাহাজডুবিতে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়লেও কর্তৃপক্ষের টনক নড়ছে না।

বন বিভাগ যা বলছে :লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে কয়েকটি এলাকায় সুন্দরী গাছ কমার কথা স্বীকার করলেও ঘন বনের পরিমাণ কমার তথ্য মানতে রাজি নন খুলনা সার্কেলের বন সংরক্ষণ কর্মকর্তা মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী। তিনি বলেন, তাদের তথ্য অনুযায়ী, ঘন বন কমেনি বরং বেড়েছে। নদীভাঙনের কারণে বনভূমির পরিমাণ কিছুটা কমলেও সাম্প্রতিক সময়ে পুতনির চর ও বঙ্গবন্ধু চর জেগে উঠেছে। বনের অভয়ারণ্যের মধ্য দিয়ে নৌযান চলাচল বন্ধ করা উচিত। তবে সেজন্য সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। সমকাল

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ