প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

এমন ভাগ্য ক’জনার জোটে?  

জাহারা মিতু। ‘মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ ২০১৭’ প্রতিযোগিতার প্রথম রানার আপ। এর আগে তিনি ছিলেন কর্পোরেট ওয়ার্ল্ডের বাসিন্দা। বর্তমানে মিডিয়ায় যে ক’জনা তরুণ কর্মদক্ষতায় আলোকদ্যুতি ছড়াচ্ছেন, তিনি তাদের অন্যতম। সম্প্রতি নিজের কর্মব্যস্ততা, পরিকল্পনা ও ভালো লাগা-মন্দ লাগা নিয়ে মুখোমুখি হলেন ইমতিয়াজ মেহেদী হাসান’র।

বিকেল গড়িয়ে পড়েছে। ব্যালকনির আবছা আলোয় মিতুর চুলগুলো উড়ছিল। কিছুটা উদাস দেখাচ্ছিল তাকে। মন খারাপ, ভীষণ মন খারাপ তার। সূর্য ডুবে গেলে, আলো চলে গেলে মন খারাপ হয় চার সুন্দরী প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে তিনবারের এই চ্যাম্পিয়নের। হাত দিয়ে চুল ঠিক করতে করতেই শোনালেন তার আজকের মিতু হওয়ার গল্প।

বাবার চাকরির সুবাধে খুলনায় স্কুল জীবন কেটেছে মিতুর। সেখানেই তৃতীয় শ্রেণিতে থাকা অবস্থায় বাবার হাত ধরে থিয়েটারে যাওয়া। এরপর প্রশিকা এনজিও’র হয়ে শিশুশিল্পী হিসেবে টানা তিন বছর কাজ করা। জীবনের ‘সুন্দর’ মুহুর্তগুলো সেখানে কাটানোয় বাবার চট্টগ্রামে বদলির দরুণ ‘মন খারাপ’ রোগ পেয়ে বসে তার। ততদিনে বয়স হামাগুঁড়ি দিয়ে বেশ খানিকটা এগিয়েছে। স্কুলে যাওয়া-আসার পথেই মেলে প্রেমের প্রস্তাব-প্রেমপত্র, সবকিছুই। কিন্তু তাতে মন গলেনা এই সুন্দরীর। সে প্রস্তাবগুলোকে পায়ে ঠেলে, টেকনিক্যালি এভয়েড করে মনোনিবেশ করে পড়ালেখায়। এভাবে স্কুল পেরিয়ে কলেজের গণ্ডি। সেখানেও থেমে নেই প্রস্তাব আর প্রেমের উপদ্রব। টিনেজ পেরোনোয় বুদ্ধির পরিপক্কতাও এসেছে ততদিনে মিতুর। একারণে কৌশলী হয়ে প্রেম প্রস্তাব দিতে আসা ছেলেদের সে ভাই বানিয়ে দিতে শুরু করে। কাটলো একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ও। এখন বয়স বেড়েছে, তাই আগের তুলনায় একটু কম প্রস্তাব পান তিনি। ধোঁয়া ওঠা কফির মগে চুমুক দিতে দিতে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপনে এভাবেই নিজের কথা বলছিলেন ‘মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ ২০১৭’ প্রতিযোগিতার প্রথম রানার আপ মিতু।

দেখতে দারুণ ফুটফুটে, সুন্দর এবং চপলা প্রকৃতির মেয়ে মিতু। কিন্তু তাকে দেখে বোঝার উপায় নেই। দেখলে মনে হয়, দুপুরের দীঘির শান্ত জলের মত। এই মিতুই কিনা সুপার মডেল বাংলাদেশসহ মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশের মঞ্চ কাঁপিয়েছেন। শত শত প্রতিযোগিকে পেছনে ফেলে প্রমাণ করেছেন, নারীরা ফেলনা নয়। তারাও পারে। জিতেতে পারে। জয়ী হয়ে মুকুট মাথায় হাসতে পারে। সমাজের নামি-মেধাবীদের একজন হয়ে দেশ বিনির্মাণে কাণ্ডারি হতে। হ্যাঁ, মিতু আজ সে সারিরই একজন। নিজ চেষ্টা-প্রতিভাগুণে তিনি অদম্য গতিতে এগিয়ে যাচ্ছেন।

তবে এতকিছুর পরেও মিতু নিজেকে সফল ভাবতে নারাজ। সফলতা কিংবা মানুষের ভালোবাসা পাওয়া, কাছে যাওয়া নাকি এত সহজ নয়-কথাটি বলেই হাত দিয়ে এলোচুল ঠিক করলেন। বললেন, সফল হতে হলে, বিশেষ কিংবা জনপ্রিয়দের একজন হতে হলে কঠিন অধ্যবসায়ের পাশাপাশি ধৈর্য্যধারণটা গুরুত্বপূর্ণ। কেননা তাড়াহুড়ো করে কিছু হয়না, কখনো হয়ওনি। শুটিং কাকডাকা ভোরে কলটাইম থাকবে, মধ্যরাতে বাড়ি ফিরতে হবে, এক শট একাধিকবার দিতে হবে-এই মানসিকতা, কাজের প্রতি আন্তরিকতা না থাকলে ‘বড়’ হওয়া যাবেনা। মানুষের কাছে যাওয়া যাবেনা। কারণ, ভালোবাসাটা ধীরে ধীরে আসে। কাজের মাধ্যমে আসে। তাই এটার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া উচিত। আর অবশ্যই এমন কোন কাজের জন্য অপেক্ষা করা উচিত যেটার সাহায্যে মানুষ ‘মনে’ রাখবে।

নিজে নতুন হলেও সিনিয়র সহশিল্পীদের কাছ থেকে আশাতীত সহযোগিতা পাচ্ছেন মিতু। সিনিয়ররা যুক্তি-পরামর্শ দিয়ে তাকে কাজে পটু করে তুলছেন। এজন্য নিজেকে ভাগ্যবতী ভাবেন তিনি। বলেন, এমন ভাগ্য ক’জনার জোটে? সিনিয়রদের আদর-ভালোবাসা-শাসন আমাকে আপ্লুত করে, বহুদূর এগিয়ে যাওয়ার-নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত অভিনেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন দেখায়।

অভিনয়-চরিত্রের ব্যাপারে দারুণ খুঁতখুঁতে মিতু। অফার পেলেই কাজ করেন না। আগে গল্প-চরিত্রের গুরুত্ব-প্রভাব বোঝেন, তারপর সায় দেন। এজন্যই বোধহয় ক্যারিয়ারের ঝুলিতে তার খুব বেশি কাজ নেই। কয়েকটা মিউজিক ভিডিও আর স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ছাড়া। অবশ্য এতে কোন আফসোস নেই তার। বললেন, কোয়ান্টিটি নয়। কোয়ালিটিতে বিশ্বাসী আমি। তাইতো সিনেমার অফার পেয়েও কাজটা ‘ইচ্ছে করেই’ হাতছাড়া করলাম। কারণ আমি মিডিয়ায় নতুন, অনেকটা শিশুর মত বলতে গেলে। আমি প্রচুর শিখতে চাই। তারপর বুঝেশুনে পা ফেলতে চাই। মিসওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতা থেকে বের হওয়ার পর থেকেই অফার পাচ্ছি সিনেমার, কিন্তু রাজি হচ্ছিনা। অভিনয় না শিখে কি করে নামের আগে ‘নায়িকা’ পদবি জুড়ি বলুন? তবে হ্যাঁ, আমি এতটুকু বলতে পারি যে ব্যাটে-বলে মিলে গেলে অবশ্যই দর্শক আমাকে বড় পর্দায় দেখতে পাবেন। হতাশ হওয়ার কিছু নেই।

প্রয়াত গুণী অভিনেতা হুমায়ূন ফরিদীর অভিনয় দারুণ ভালো লাগে মিতুর। এখনো সময় পেলে তাই তিনি ইউটিউব ঘেঁটে এই অভিনেতার কাজগুলো দেখেন। পাশাপাশি সুবর্ণা মুস্তফা, সুমাইয়া শিমুর অভিনয়ও তার ভালো লাগে। আর এ প্রজন্মের মোশাররফ করিম, আরফান নিশো বলতেই যেন এ সুন্দরী অজ্ঞান। বললেন, মানুষ এত প্রাণবন্ত অভিনয় কিভাবে করে, ভাবতেই অবাক লাগে। মোশাররফ ভাইয়ের তো জবাব নেই। আর নিশো ভাইয়ের পাগলামির অভিনয়তো আমার ‘দারুণ’ পছন্দ। মনে হয় আসলেই যেন একটা ছেলে এ রকম। দেশের বাইরে বিদ্যা বালানের অভিনয়ও রিয়েল লাইফের মত মনে হয় মিতুর। তার মতে, অভিনয়ের অনেক পাঠ বিদ্যার থেকে শেখার আছে। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এ দেশের সংস্কৃতি-ভাষা। সবকিছুই। কারণ, বাংলা ভাষার জন্য রফিক-শফিক-বরকতরা প্রাণ দিয়েছে। যা পৃথিবীর অন্যত্র নেই। তাই সবার আগে পা্রধান্য দেশীয় সংস্কৃতি।

আগামী তিনবছর ডানে-বাঁয়ে কিংবা বিয়ে নয়। শুধুই কাজ নিয়ে থাকতে চান মিতু। পরিবারকেও এ কথা ‘সাফ’ জানিয়ে দিয়েছেন তিনি। বলেছেন, সামনের তিন বছর কোন বিয়ে নয়। তবে এর মধ্যে যদি ‘যুতসই’ মনের মানুষ মিলে যায়, মন বিনিময় হয়ে যায় সে কথা ভিন্ন। কারণ ভালোবাসা টাইম শিডিউল করে আসেনা, যেকোনো মুহুর্তে-যেকোনোভাবে হয়ে যায়।

বর্তমানে বেসরকারি স্যাটেলাইট টিভি বৈশাখী’র একটি অনুষ্ঠানের উপস্থাপনা করছেন মিতু। সঙ্গে ব্যস্ত রয়েছেন নাটক-মিউজিক ভিডিও ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নিয়ে। আগামী ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হতে যাচ্ছে তার ‘অন্তর’ শিরোনামের মিউজিক ভিডিওটি। মোহাম্মদ উল্লাস সোহাগের পরিচালনায় নির্মিত এ ভিডিওতে তাকে স্কুল পড়ুয়া গ্রাম্য মেয়ের চরিত্রে দেখা যাবে। এতে তার বিপরীতে নাজাম উদ্দিন তামুর অভিনয় করেছেন। পাশাপাশি ভ্যালেনটাইন্সে মুক্তি পাবে তার অভিনীত বেশ কিছু স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র।

মিউজিক ভিডিওটি নিয়ে দারুণ আশাবাদী তিনি। বললেন, খুব দরদ দিয়েই কাজটি করেছি। এক শট একাধিকবার দিয়েছি, পারফেক্ট না হওয়া পযন্ত। চেষ্টা করেছি নিজের সবটুকু দেয়ার। এখন বাকীটা দর্শক বলতে পারবেন।

‘অন্তর’ গানটির দৃশ্যায়নের সময় দারুণ বেগ পেতে হয়েছে মিতুর সহশিল্পীকে। সে কথা মনে পড়লে নাকি এখনো হাসি পায় তার। এক হাতে হাসি থামানোর ব্যর্থ চেষ্টা এঁটে অপরহাতে সালোয়ার ঠিক করে নিলেন তিনি। এরপর ‘কোনমতে’ নিজেকে শান্ত করে বললেন, কো-আর্টিস্টকে ধাক্কা দিয়ে পানিতে ফেলে দেয়ার একটি দৃশ্য ছিল। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো আমি ধাক্কা দেয়ার আগেই সে বারবার পানিতে পড়ে যাচ্ছিল। সবমিলিয়ে ১০বার এমন হয়েছে। তখন গরমকাল ছিলো বলে রক্ষা। না হলে কি যে হতো।

স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, টেলিফিল্ম, নাটক আর সিনেমা দেখেই অবসর কাটে এ মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ’র প্রথম রানার আপের। চলে বন্ধু-স্বজনদের সঙ্গে হৈ-হুল্লোড়ও। কারণ মিতুর কাছে জীবন মানেই সুন্দর করে বেঁচে থাকা, শত ঝড়েও ভেঙে গিয়ে ‘কিচ্ছু হয়নি’ বলে চোখ মুছে এগিয়ে যাওয়া।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত