প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সরকারের ফাঁদে পা দেবে না বিএনপি

হোসাইন : বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ১৮ অক্টোবর লন্ডন থেকে দেশে ফেরার পর থেকেই কৌশলী রাজনীতি করে যাচ্ছে বিএনপি। আক্রমণাত্মক ও সহিংস কর্মসূচির পরিবর্তে শান্তিপূর্ণভাবে সারাদেশে বিক্ষোভ, প্রতিবাদ, মিছিল, সভা-সমাবেশ করে যাচ্ছেন দলের নেতাকর্মীরা। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে পুলিশ এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা বাধা ও হামলা করলেও এই কৌশল থেকে সরে আসেনি দলটি। সুফলও পাচ্ছে বিএনপি। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সুশীল সমাজ সকলেই এটিকে বিএনপির রাজনৈতিক পরিপক্কতা হিসেবে উল্লেখ করছেন। এর সূচনা হয়েছিল ১৮ অক্টোবর বিমানবন্দরে বিশাল জনসমুদ্রে খালেদা জিয়াকে অভ্যর্থনা জানানোর মাধ্যমে। এরপর সড়ক পথে রোহিঙ্গাদের দেখতে কক্সবাজারের উখিয়া যাওয়ার পথে কোথাও কোন পথসভা-সমাবেশ না করলেও ব্যাপক গণজাগরণ দেখা গেছে ওই অঞ্চলে। ১২ নভেম্বর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মহাসমাবেশেও শান্তিপূর্ণভাবে গণজোয়ার সৃষ্টি করেছিল দলের নেতাকর্মীরা। একই চিত্র দেখা গেছে সম্প্রতি সিলেটে হযরত শাহজালাল (রহঃ) ও হযরত শাহ পরাণের (রহঃ) মাজার জিয়ারতের সময়েও।

এরপর সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়াকে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় ৫ বছরের কারাদÐ দিলেও কৌশলী অবস্থান ধরে রেখেছেন দলের নেতাকর্মীরা। চেয়ারপারসনের নির্দেশে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে শান্তিপূর্ণভাবে আদালতের পথে খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হাজার হাজার মানুষ যুক্ত হয়েছে। হয়নি কোন বিশৃঙ্খলা, পুলিশ শান্তিপূর্ণ পথযাত্রাতে বিনা কারণে টিয়ারশেল নিক্ষেপ, বিভিন্ন জায়গায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলেও উগ্রতা দেখায়নি বিএনপি। এমনকি সাবেক প্রধানমন্ত্রীর রায় ঘোষণার পরও দলের নেতারা সংযত থেকে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদের নির্দেশনা দিয়েছেন সারাদেশেই। যার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে আন্দোলনেও। দলটির নেতারা বলছেন, এই রায় ঘিরে ক্ষমতাসীনদের ফাঁদে পা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত তারা আগেই নিয়ে রেখেছিলেন। সেই কারণে রায়ে বিএনপি চেয়ারপারসনের সাজা হলেও আক্রমণাত্মক কোনো কর্মসূচিতে না গিয়ে দেশব্যাপী দুইদিনের ‘শান্তিপূর্ণ’ বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছে বিএনপি। দলটির সিনিয়র নেতা ও আইনজীবীদের আশা, আইনি প্রক্রিয়ায় বেগম জিয়া উচ্চ আদালত থেকে দ্রæত সময়ের মধ্যে জামিন পাবেন। এদিকে, মামলায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সাজার রায়-পরবর্তী বিএনপির এই অবস্থানকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন সুধীসমাজসহ দেশের অধিকাংশ মানুষ। তাদের চাওয়া, রায়-পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত বিএনপির এই অবস্থান বজায় থাকবে।

বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত দলের শক্তি অক্ষুন্ন রাখতে চায় বিএনপি। দলটির হাইকমান্ড মনে করছে, বিএনপির নিরপেক্ষ সরকারের দাবি উপেক্ষা করে ক্ষমতাসীনরা দলীয় সরকার তথা নিজেদের অধীনে নির্বাচন করে আবারো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকতে চাইবে। সেজন্য নির্বাচনকালীন নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আদায়ে বর্তমান সরকারকে বাধ্য করতে হবে। আর এই দাবি আদায়ে আন্দোলন ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। তবে এজন্য আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত দলের শক্তি অক্ষুন্ন রাখতে হবে। তাই বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব বেগম জিয়ার রায়কে ঘিরে সরকারের কোনো ফাঁদে পা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। একইসঙ্গে রায় ঘিরে তৃতীয় কোনো পক্ষ যাতে কোনো স্যাবোটাজ (অন্তর্ঘাতমূলক কাজ) করতে না পারে, সে ব্যাপারেও সতর্ক দলটি। দলটির নেতাদের শঙ্কা, রায়কে ঘিরে আক্রমণাত্মক কর্মসূচি ঘোষণা করলে সরকারও সর্বোচ্চ হার্ডলাইনে চলে যাবে। এছাড়া হরতালসহ সহিংস কোন কর্মসূচি ঘোষণা করলে বিগত দিনের মতো আবারও সুযোগ নেবে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। এতে দেশে-বিদেশে দলের পরিচ্ছন্ন ইমেজ ক্ষুণœ হবে। একইসাথে সারাদেশে নেতাকর্মীদের আরো ব্যাপক ধরপাকড় করবে। সহজে তাদের জামিনও হবে না।

এর ফলে বিএনপি আবারো ব্যাকফুটে চলে যেতে বাধ্য হবে। ২০১৪ ও ২০১৫ সালে সরকারবিরোধী কঠোর আন্দোলনে নামে দলটি। আন্দোলন দমনে সরকারও বিএনপির নেতাকর্মীদের ব্যাপক ধরপাকড় চালায়। সেই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে দুই-তিন বছর লেগে যায় বিএনপির। এই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নির্দলীয় সরকারের দাবি আদায়ে ভবিষ্যৎ আন্দোলনে সফলে এক্ষুণি কঠোর কর্মসূচিতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বিএনপি। সেই কারণে রায়ে খালেদা জিয়ার পাঁচ বছর সশ্রম কারাদÐ হলেও বিএনপি কোনো আক্রমণাত্মক-সহিংস কর্মসূচি দেয়নি। দলটির আশা, আইনি প্রক্রিয়ায় দ্রæততম সময়ের মধ্যে খালেদা জিয়া জামিন পেয়ে যাবেন। জানা গেছে, বিএনপি চেয়ারপারসনের জামিন দীর্ঘায়িত হলে এবং সারাদেশে নেতাকর্মীদের ধরপাকড়ের মাত্রা যদি আরো তীব্র হয়, তাহলে সেক্ষেত্রে দলটির কর্মকৌশলেও পরিবর্তন আসতে পারে, পাল্টে যেতে পারে কর্মসূচির ধরণ।

এ বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব বলেন, দেশনেত্রী খালেদা জিয়া আমাদের শান্তিপূর্ণ ও অহিংস কর্মসূচি পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। গত বুধবার আমরা যখন তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম যদি রায় আপনার বিপক্ষে যায় তাহলে আমরা কী ধরণের কর্মসূচি দেবো? তিনি খুব স্পষ্ট করে আমাদের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, কোন রকমের হঠকারী কোন কর্মসূচি দেওয়া যাবে না। কোন রকম সহিংস কর্মসূচি দেওয়া যাবে না। সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ, বিক্ষোভ করতে হবে। তবে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির পরও আওয়ামী লীগ ও পুলিশ বিএনপির ওপর চড়াও হচ্ছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ বরাবরই নিজেরাই তারা সন্ত্রাস সৃষ্টি করে, সহিংসতা করে বাংলাদেশের রাজনীতিকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। তারা বরাবরই আমাদের ওপর পুলিশের সহায়তা নিয়ে চড়াও হয়েছে। তারপরও আমরা বলছি, আমরা শান্তি চাই, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আমরা প্রতিষ্ঠিত করতে চাই, দেশনেত্রীর যে স্বপ্ন সেই স্বপ্নকে আমরা বাস্তবায়িত করতে চাই।

কূটনীতিকদের সচিত্র প্রমাণ: এদিকে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে বিনা উস্কানীতে সরকারি দল ও পুলিশের হামলায় সাধারণ মানুষসহ দেশে-বিদেশে বিএনপির জনপ্রিয়তা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে মনে করেন দলের নেতারা। বিশেষ করে গত বৃহস্পতিবার রায়ের দিন গুলশানের বাসা থেকে বকশীবাজারের বিশেষ আদালতে যাওয়ার পথে খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে নেতাকর্মীদের ওপর পুলিশ এবং সরকারি দলের হামলার বিষয়টি সরাসরি দেখেছে সারাদেশের মানুষ। একইসাথে ওইদিনই বিএনপি ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সচিত্র অবহিত করেছে। খালেদা জিয়ার সাজার রায়কে রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক অভিহিত করে বিএনপি বলছে, শুধু রাজনৈতিকভাবে খালেদা জিয়াকে হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য এবং আগামী জাতীয় নির্বাচন থেকে তাকে দূরে রাখার জন্য এই রায়। একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম করার জন্য যে নীলনকশা, তা বাস্তবায়নের জন্যই এই সাজার রায় দেওয়া হয়েছে। রায় নিয়ে দলের এই অবস্থান তুলে ধরে আজ-কালের মধ্যে ঢাকার দূতাবাস ও হাই কমিশনের মাধ্যমে বিদেশী রাষ্ট্রগুলোর কাছে চিঠি দিবে বিএনপি। এছাড়া রায় নিয়ে দলীয় অবস্থান, রায়-পরবর্তী অবস্থা এবং রায়কে ঘিরে নেতাকর্মীদের ব্যাপক ধরপাকড়ের বিষয়টি তুলে ধরে গতকাল বাংলাদেশে কর্মরত বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকর্মীদের ব্রিফিং করেছে বিএনপি। এর মধ্যে ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি, ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি, মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি, জার্মান গণমাধ্যম ডয়চে ভেলে, ভারতীয় গণমাধ্যম জি মিডিয়াসহ ওয়েস অব আমেরিকা অন্যতম। ইনকিলাব

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত