প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দ্রুত এগোচ্ছে বড় প্রকল্পের কাজ
ভোটের আগে বাড়তি নজর অবকাঠামোয়

মাইকেল : আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকারের টানা দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী বছরের প্রথম মাসে। এর আগের ৯০ দিনের মধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন আয়োজনের তোড়জোড় চলছে। ক্ষমতাসীন মহাজোটের নির্বাচন প্রস্তুতি এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। জাতীয় সংসদের বাইরে থাকা প্রধান বিরোধী দল বিএনপির বিভিন্ন ফোরামেও আলোচনা হচ্ছে আগামী নির্বাচন নিয়ে। এ অবস্থায় মেয়াদকালের শেষ প্রান্তে এসে অবকাঠামো উন্নয়নের ঝলক দেখাতে চায় সরকার। এরই অংশ হিসেবে বড় আকারের প্রকল্প বাস্তবায়নে দেওয়া হচ্ছে বাড়তি নজর।

২ হাজার ৯৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট প্রকল্পের কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেইপ কেনাভেরালের লঞ্চ প্যাড থেকে উৎক্ষেপণ করা হবে দেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১। স্যাটেলাইট মালিক দেশের তালিকায় ৫৭তম অবস্থানে বাংলাদেশের নাম অন্তর্ভুক্তির অপেক্ষায়। এ অপেক্ষা আনন্দে রূপ দিতে ১ মার্চ থেকে দেশব্যাপী শুরু হবে কাউন্টডাউন উৎসব। এ উৎসবে উঠে আসবে বাংলাদেশের মহাকাশ বিজয়ে সক্ষমতা অর্জনের ইতিহাস। আগামী জাতীয় নির্বাচনে ভোটার টানার অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে উঠতে পারে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ প্রকল্প। এ প্রকল্প ছাড়াও বড় আকারের ১০টি প্রকল্পকে শীর্ষ অগ্রাধিকার ধরে বাস্তবায়ন কার্যক্রম বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। এ লক্ষ্যে গঠন করা হয়েছে ফাস্ট ট্র্যাক প্রজেক্ট মনিটরিং কমিটি।
ইউরোপ-আমেরিকার উন্নত দেশগুলোয় নদীর নিচে সড়ক ও রেল টানেলের গল্প এতদিন ছিল প্রত্যক্ষদর্শীদের মুখে। গল্পকে সত্যে পরিণত করে দেশেও এবার নদীর নিচে টানেল তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কর্ণফুলী নদীর তলদেশে প্রায় সাড়ে ৩ কিলোমিটার বহুলেন টানেল নির্মাণের কাজ চলছে দ্রুত। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৪৪৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। এতে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ সহায়তা দেবে চীন সরকার। এরই মধ্যে চীনের এক্সিম ব্যাংক ১ হাজার ১০৮ কোটি টাকা ছাড় করেছে। অনেক দেন-দরবারের পর অর্থ ছাড় হওয়ায় প্রকল্পে গতি এসেছে। সবকিছু ঠিকঠাক এগোলে ২০২০ সালে এ টানেল নির্মাণের কাজ শেষ হবে। তবে আগামী ভোটের আগেই প্রকল্পের অগ্রগতি দৃশ্যমান হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বড় আকারের ১০টি প্রকল্পকে শীর্ষ অগ্রাধিকার ধরে বাস্তবায়ন কার্যক্রম বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। এ লক্ষ্যে গঠন করা হয়েছে ফাস্ট ট্র্যাক প্রজেক্ট মনিটরিং কমিটি। বাস্তবায়ন জোরদার করতে তালিকায় নতুন প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিটি। কমিটির তদারকিতে বড় প্রকল্পগুলো প্রত্যাশিত গতি পেয়েছে। কথিত দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ ওঠায় সরকারের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প। বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য সহযোগী সংস্থার সহায়তা না নিয়ে সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে সরকার। এরই মধ্যে প্রকল্পের অর্ধেকের বেশি কাজ হয়েছে বলে ফাস্ট ট্র্যাক প্রজেক্ট মনিটরিং কমিটির সর্বশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পদ্মা সেতুর নদী শাসন কাজ হয়েছে ৩৪ দশমিক ৪০ শতাংশ। দুই প্রান্তের সংযোগ সড়কের কাজও শেষ। সার্ভিস এরিয়া নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে অনেক আগেই। দ্রুত এগিয়ে চলছে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের কাজ। পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে দুই প্রান্তে রেল সংযোগ প্রতিষ্ঠায় নেওয়া প্রকল্পের কাজও এগিয়ে যাচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে প্রতিবেদনে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পের সর্বশেষ সংশোধনীতে ব্যয় ধরা হয়েছে ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ১৪ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকা।

ইআরডির সচিব ও ফাস্ট ট্র্যাক প্রজেক্ট মনিটরিং কমিটির সদস্য সচিব কাজী শফিকুল আযম বলেন, ফাস্ট ট্র্যাকভুক্ত মেগা প্রকল্পগুলোর বেশিরভাগের অগ্রগতি বেশ ভালো। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার তালিকায় থাকা এসব প্রকল্পের সব বাধা দূর করার চেষ্টা চলছে। বড় প্রকল্পের বাস্তবায়ন ভালো হওয়ায় বিদেশি সহায়তা ছাড় বাড়ছে বলেও তিনি মনে করেন।

এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিচার্স ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, পদ্মা সেতু, মেট্রো রেল ও দোহাজারী রেললাইনের মতো কিছু কাজ আগেই শেষ হওয়ার কথা ছিল। সময়মতো কাজ শুরু না হওয়ায় এসব প্রকল্পের সুফল পেতেও বাড়তি সময় লাগছে। তিনি আরও বলেন, বড় প্রকল্প শুরু করতেই অনেক সময় চলে যায়। প্রাথমিক জটিলতা শেষে বেশকিছু প্রকল্প বাস্তবায়নের মুখ দেখছে। এসব প্রকল্পের কাজ শেষ হলে দেশের অর্থনীতি গতি পাবে। নির্বাচন সামনে রেখে কিছু প্রকল্প দৃশ্যমান করার চেষ্টা চলছে বলেও তিনি মনে করেন।

চীনের অর্থায়ন নিয়ে জটিলতা থাকলেও পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। গেল অর্থবছরে অনুমোদন পাওয়া এ প্রকল্পে ২ হাজার ২৪২ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার ৯৮৯ কোটি টাকা। এ হিসেবে প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি ৬ দশমিক ২৭ শতাংশ। তবে মাঠ পর্যায়ে প্রায় ৯ শতাংশ কাজ হয়েছে বলে জানা গেছে।

প্রায় চার বছর ধরে প্রাথমিক প্রস্তুতির পর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের মূল পর্বের কাজ সম্প্রতি শুরু হয়েছে। ১ লাখ ১৩ হাজার ৯২ কোটি ৯১ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রকল্পে এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৫ হাজার ৫৩ কোটি টাকা। প্রকল্পটির সার্বিক অগ্রগতি ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ। রাশিয়ান ফেডারেশনের সঙ্গে স্বাক্ষরিত দুটি চুক্তির আওতায় এ প্রকল্পের কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। মূল কাজ প্রথম রিয়্যাস্টর স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।

রাজধানীর যানজট নিরসনে মেট্রো রেল প্রকল্পের কাজ এখন অনেকটাই দৃশ্যমান। উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত এলাকায় দিনরাত অবিরাম চলছে প্রকল্পের কাজ।

এ প্রকল্পে মোট ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি ৭ লাখ টাকা বরাদ্দ আছে। ডিসেম্বর পর্যন্ত এ কাজে ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৮৮১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। এ হিসেবে সার্বিক অগ্রগতি ১৩ দশমিক ১৬ শতাংশ।

বিতর্ক ও বিরোধিতা থাকলেও রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ ধীরগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। ১৬ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ২৯৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। প্রকল্পের ১৪ দশমিক ৩০ শতাংশ অর্থ ব্যয় করে মাঠ পর্যায়ে ভৌত অগ্রগতি হয়েছে। এ প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৪ দশমিক ৪৫ শতাংশ। ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়ার পর পরামর্শকরা কাজ শুরু করেছেন। মাটি ভরাটের কাজ শতভাগ, সীমানা প্রাচীর ৯৮ শতাংশ, সংযোগ সড়ক ও ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণের কাজ চলছে।

মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়েছে রোববার। এর আগেই প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৪ হাজার ৯১৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ৩৫ হাজার ৯৮৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা ব্যয়ের অনুমোদন রয়েছে। এ হিসেবে আনুষ্ঠানিক কাজ শুরুর আগে প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি ১৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ। অবশ্য মাঠ পর্যায়ে প্রকল্পটির কাজ ১৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ এগিয়েছে বলে জানা গেছে। প্রকল্পের জন্য দেড় হাজার একর জমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

গ্যাসের চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়লেও উৎপাদন প্রতিনিয়ত কমছে। এ অবস্থায় শিল্প খাতের প্রয়োজন মেটাতে গ্যাস আমদানির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবা হচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে এলএনজি টার্মিনাল প্রকল্প। প্রকল্পের জিওটেকনিক্যাল সার্ভের কাজ শুরু হয়েছে। বাণিজ্যিক কাজ মার্চ মাসে সমাপ্ত হবে। বর্তমানে ডিজাইনের কাজ চলছে।

পর্যটন নগরী কক্সবাজারকে রেল সংযোগের আওতায় আনা হচ্ছে। রামু থেকে মিয়ানমার নিকটবর্তী ঘুমধুম পর্যন্ত স্থাপন করা হচ্ছে রেললাইন। এর অংশ হিসেবে ২০১০ সালে নেওয়া হয়েছিল দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু থেকে মিয়ানমারের কাছে ঘুমধুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েল গেজ ট্র্যাক নির্মাণ প্রকল্প। দীর্ঘদিন স্থবির থাকা প্রকল্পটি সংশোধনের মাধ্যমে সম্প্রতি গতি আনা হয়েছে। ১৮ হাজার ৩৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকার প্রকল্পে ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৬৬১ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। প্রকল্পটির অগ্রগতি হয়েছে ১৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ।

পটুয়াখালীর পায়রা এলাকা ঘিরে চলছে অবকাঠামো উন্নয়নে বিশাল কর্মযজ্ঞ। এরই অংশ হিসেবে সেখানে একটি গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের কাজ চলছে। ১ হাজার ১২৮ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ব্যয়ে নেওয়া প্রকল্পের আওতায় জমি অধিগ্রহণ, ওয়্যার হাউজ নির্মাণ, সার্ভে বোট, পাইট ভেসেল ইত্যাদি ক্রয় করা হচ্ছে।

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত