প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিধি ভেঙে দেওয়া হচ্ছে বড় ঋণ

ডেস্ক রিপোর্ট : আইন সংশোধন না করেই সরকারি খাতের বেসিক ব্যাংক বিধি ভেঙে বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণ করছে। ব্যাংকের সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী যা তারা পারে না। মূলত ছোট ছোট শিল্পে অর্থায়নের জন্যই এ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়। নাম দেওয়া হয় বাংলাদেশ স্মল ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক লিমিটেড (বেসিক)। আইন দ্বারা নির্ধারিত রয়েছে এর ঋণ বিতরণ কাঠামো। বেসিক ব্যাংকের মোট বিনিয়োগের ৭০ শতাংশের বেশি দিতে হবে ছোট শিল্পে। বাকি ৩০ শতাংশ দিতে পারবে এসএমই ও বড় শিল্পে। ব্যাংকটি সেই লক্ষ্য থেকে সরে এসেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য পাওয়া যায়।

বেসিক ব্যাংক বেশিরভাগ ঋণই দিচ্ছে বড় শিল্পে। বড় শিল্পের ঋণ ব্যবস্থাপনা করার মতো দক্ষ জনবল ব্যাংকে নেই। ফলে বড় অঙ্কের ঋণের প্রায় সবই লুটপাট হয়ে যাচ্ছে। ২০১২ ও ২০১৩ সালে ব্যাংকে বড় ধরনের লুটপাট হয়। যার মাধ্যমে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। এর বেশিরভাগই ছিল বড় অঙ্কের ঋণ। গত তিন বছরে ব্যাংকটি মোট ঋণের ৯০ শতাংশই বিতরণ করেছে কোটি টাকার ওপরে। এর মধ্যে শতকোটি টাকার বেশি ঋণ দিয়েছে ৯ জন গ্রাহককে, যা মোট ঋণের ২৭ শতাংশ। ৫০ কোটি টাকার বেশি থেকে ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দিয়েছে ২৩ গ্রাহককে, যা মোট ঋণের ১৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ। কোটি টাকার নিচে বিতরণ করা ঋণের হার মাত্র ১০ শতাংশ।

বেসিক ব্যাংকে জালিয়াতির পর নতুন নেতৃত্ব প্রায় ৩ বছর ধরে ব্যাংকটি পরিচালনা করছেন। কিন্তু তারাও আগের মতোই কিছু ব্যক্তির হাতে সিংহভাগ ঋণ তুলে দিয়েছেন। একক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে বেশি হারে ঋণ দিয়ে ব্যাংকটি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
এ বিষয়ে বেসিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মুহাম্মদ আউয়াল খান বলেন, ঋণ দেওয়ার নিয়ম আছে দেখেই ঋণ দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকের কোনো বিষয়ে কোনো ধরনের কমেন্টস না দিতে আমাদের কাছে নির্দেশ আছে। তাই এই বিষয়ে মন্তব্য করতে চাই না।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, ২০১৪ সালের মে মাসে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ ও ম্যানেজমেন্টে পরিবর্তনের পর থেকে ১৭ ডিসেম্বর ২০১৭ পর্যন্ত সর্বমোট ১০ হাজার ৬৫৯ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে বেসিক ব্যাংক। ১১ হাজার ১৩৭ গ্রাহক ওই ঋণ পেয়েছেন। তাদের মধ্যে ১০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ পেয়েছেন ৯ জন। যার পরিমাণ ২ হাজার ৮৬৯ কোটি টাকা। ৫০ কোটি থেকে ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ তুলে দিয়েছেন ২৩ গ্রাহকের কাছে। এর পরিমাণ ১ হাজার ৫৭৫ কোটি টাকা। কোটি টাকার ওপরে ঋণ দিয়েছে ৮৬৯ গ্রাহককে। এর পরিমাণ ৯ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা। বাকি ১ হাজার ৯১ কোটি টাকা দিয়েছে ছোট ঋণগ্রহীতাদের। মোট ১০ হাজার ২৬৮ গ্রাহক এ ঋণ পেয়েছেন।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধি অনুযায়ী কোনো ব্যাংক একক কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে তাদের পরিশোধিত মূলধনের ১৫ শতাংশ নগদ আকারে দিতে পারে। পরোক্ষভােেব অর্থাৎ ব্যাংক গ্যারান্টি, এলসি গ্যারান্টি, এলসির বিপরীতে ঋণ হিসাবে দিতে পারে আরও ২০ শতাংশ। এই মোট ৩৫ শতাংশ দিতে পারে। যা বড় অঙ্কের ঋণ হিসাবে চিহ্নিত। বিধি অনুযায়ী বেসিক ব্যাংক বড় অঙ্কের ঋণ দিতে পারে সর্বোচ্চ তাদের মোট ঋণের ৩০ শতাংশ। বাকি ৭০ শতাংশ ছোট অঙ্কের ঋণ হতে হবে। কিন্তু তারা ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে এ বিধি মানেনি।
বেসিক ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ১ হাজার ৮৪ কোটি টাকা। এ হিসাবে তারা বড় অঙ্কের ঋণ হিসেবে কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ২৭১ কোটি টাকা দিতে পারে। এর মধ্যে নগদ আকারে দিতে পারে ১৬২ কোটি টাকা।
তবে শর্ত থাকে যে, কোনো ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি থাকলে তারা এই হারে ঋণ বিতরণ করতে পারে না। বর্তমানে বেসিক ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২ হাজার ৫২৩ কোটি টাকা। নিজস্ব মূলধন নেই বলে তারা কোনো বড় অঙ্কের ঋণ দিতে পারে না।
এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমদ বলেন, যে কোনো ব্যাংকের অনিয়ম ধরা পড়লে বাংলাদেশ ব্যাংককেও তা শক্ত হাতে হ্যান্ডেলিং করতে হবে। এতে সরকারের কোনো হস্তক্ষেপ করা চলবে না। তা না হলে এ সমস্যা সংক্রমণের মতো সব ব্যাংকে ছড়িয়ে পড়বে।
তিনি বলেন, যে কোনো বড় ঋণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ঋণ নিতে হয়। তাই বেসিক ব্যাংকের এই ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক কীভাবে অনুমোদন দিল তা দেখতে হবে। ব্যাংকের ঘাটতি আছে। তারপরও এমন হারে ব্যাংক কীভাবে ঋণ দিচ্ছে তা জবাবদিহির মধ্যে আনতে হবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেসিক ব্যাংক বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাট্রিজ করপোরেশনকে ১ হাজার ১৮৮ কোটি ৯৩ লাখ, এসকিউ হুস লিমিটেড ৩৮৫ কোটি ৪১ লাখ, ব্র্যাককে ৩১২ কোটি ৯৫ লাখ, ইব্রাহিম নিট গার্মেন্টস লিমিটেডকে ২৪৯ কোটি ৯১ লাখ, ম্যাক্স সোয়েটারকে ২৪২ কোটি ৫২ লাখ, জামান জুট ডাইভারসেশন মিলসকে ১৪১ কোটি ৯২ লাখ, ফাবিয়ান ইন্ডাস্ট্রিজকে ১২৫ কোটি ৪৮ লাখ, রিসোর্স ইন্টিগ্রেশন সেন্টারকে ১১৪ কোটি ২৬ লাখ, কাজী সোবহান অটো রাইস মিল অ্যান্ড কোংকে ১০৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকা ঋণ দিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেসিক ব্যাংকের ৫০ থেকে ১০০ কোটি টাকার ঋণ দেওয়া আছে ২৩ গ্রাহকের কাছে। এ ২৩ গ্রাহক বেসিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন ১ হাজার ৫৭৫ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। ১০ থেকে ৫০ কোটি টাকার ঋণ বাবদ ১৪৭ জন নিয়েছেন ৩ হাজার ২৩১ কোটি ৯৪ টাকা, যা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৩২ শতাংশ। ঋণের ৬ দশমিক ৪৬ শতাংশ ঋণ দেওয়া হয়েছে ৫ থেকে ১০ কোটি টাকার ১০০ গ্রাহকে। ১ থেকে ৫ কোটি টাকার ঋণ দেওয়া হয়েছে ৫৯০ গ্রাহককে। এদের দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ২০৪ কোটি টাকার ঋণ।
যা মোট ঋণের ১১ দশমিক ৩০ শতাংশ। আর ১ কোটি টাকার ঋণ দেওয়া হয়েছে ১০ হাজার ২৬৮ গ্রাহককে। যা মোট ঋণের মাত্র ১০ দশমিক ২৪ শতাংশ। অঙ্কের হিসাবে এই টাকার পরিমাণ মাত্র ১ হাজার ৯১ কোটি ১৫ লাখ টাকা। সূত্র : আমাদের সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত