প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

চীনের সঙ্গে সংঘাতে যেতে চায় না ভারত

শরন সিং : ভারতের পররাষ্ট্রনীতির সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় চীন ক্রমেই প্রভাবশালী চলক হিসেবে আবির্ভুত হচ্ছে। ভারতের বিগত পাঁচ জন পররাষ্ট্রসচিবের চারজনই কর্মজীবনের কোন পর্যায়ে চীনে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেছেন। এমন একজনকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (এনএসএ) পদেও নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ১৯৬২ সালে যুদ্ধের কঠিন দিনগুলোতে চীনে চার্য দ্য এফেয়ার্স-এর দায়িত্ব পালনকারী ভারতের প্রথম এনএসএ নিযুক্ত হন। ১৯৬৮ সালে ভারতে’র বেইজিং মিশনে নেতৃত্ব দিতে ব্রজেশ মিশ্রকে পাঠিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। ১৯৭০ সালের মে দিবসের অনুষ্ঠানে চেয়ারম্যান মাও সেতুং-এর সঙ্গে মিশ্র’র বিখ্যাত করমর্দন পরবর্তীতে চীন-ভারত সম্পর্কের ইতিহাসটিকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিয়েছিলো।

পরবর্তী বছরগুলোতে চীনের প্রভাব আরো স্পষ্ট হয়ে উঠে। এটা বিশেষভাবে ভারতের নীতি উদ্যোগ ও বং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর জন্য সত্য।

গত নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র-জাপান-ভারত-অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে চতুর্দেশীয় জোটের পুনরুজ্জীবন এবং ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসে আসিয়ানের ১০ নেতার সবাইকে হাজির করার মধ্যে মূলত চীনের প্রভাবটিই ফুটে উঠেছে। একই কারণে জাপানের সঙ্গেও সম্পর্ক জোরদারের পথে ভারত এগুচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

কিন্তু এসব ক্ষেত্রে সরকারি পর্যায় থেকে বা প্রেস ব্রিফিংগুলোতে যেভাবে চীনের বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করা হয় তা মূলত বাস্তবতাকে অস্বীকার করা। এটা দুদেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অপ্রতিসাম্যের প্রতিফলন। চীনের ১২ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি ও আসিয়ান দেশগুলোর সঙ্গে বার্ষিক ৪৫০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যের বিপরীতে ভারতের ২.৬ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি ও আসিয়ানের সঙ্গে ৭০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যের মধ্যে ওই অপ্রতিসাম্য ধরা পড়ে।

বেইজিংয়ের কঠোর প্রতিক্রিয়ার মুখে ২০০৭ সালে কোয়াড নামে পরিচিতি চার-জাতি কৌশলগত সংলাপের অপমৃত্যু ঘটেছিলো। এমন কি দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে বিরোধে লিপ্ত আসিয়ানের কাছ থেকেও কোন যৌথ সাড়া মেলেনি। দক্ষিণ চীন সাগরের দুই শক্তিশালী দাবিদার ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামের স্বরও ছিল ক্ষীণ। ফিলিপাইন তার দাবিটি হেগ-এর সালিশ আদালতে নিয়ে গেলেও আদালতের রায় নিয়ে টু শব্দটি করছে না। অন্যদিকে কমিউনিস্ট চীনের বিরুদ্ধে ভিয়েতনাম শুধু লড়াই করেনি এখন তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সঙ্গে অংশীদারিত্বেরও অনুসন্ধান করছে।

চীনের ওপর একই সঙ্গে নির্ভরশীলতা ও অস্বস্তি ভারত ও আসিয়ান দেশগুলোকে তাদের বৈপরীত্য নিরসনে অক্ষম করে তুলেছে। প্রত্যেকেই চীনকে দেখে তাদের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ অংশীদার হিসেবে। ফলে বেইজিংয়ের একান্ত উদ্বেগগুলো নিয়ে বেশিদূর অগ্রসর হওয়ার ব্যাপারে প্রত্যেকেই সচেতন।

এই ক্রমবর্ধমান অপ্রতিসাম্যের ব্যাপারে ভারত ও আসিয়ান সচেতন, এমনকি নির্লিপ্তও বটে। তারা বহুরকম উদ্যোগে বেইজিংয়ের নেতৃত্ব মেনে নিয়েছে। গত সপ্তাহে আসিয়ান-ইন্ডিয়া কোমেমোরেটিভ সামিট শেষে যে দিল্লি-ঘোষণা প্রকাশ করা হয় তাতে নেতৃবৃন্দ একটি ‘রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকনমিক পার্টনাশীপ’ গঠনের কথা বলেন। কিন্তু তাতে চীনকে নেতৃত্বের ভূমিকায় রাখার কথা বলা হয়েছে। চীনের নিয়ন্ত্রিত এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্টেকহোল্ডার ভারত, এখানে আসিয়ান দেশগুলোর সদস্যপদও রয়েছে।

ভারতের ‘এ্যাক্ট ইস্ট’ নীতি মূলত ভূ-সভ্যতাগত কাঠামো অনুসরণ করে কৌশলগত যোগাযোগ বৃদ্ধির প্রচেষ্টা। উদীয়মান চীনকে মোকাবেলার পরিবর্তে এর সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করে চলতে চায় ভারত ও আসিয়ান। চীনের ‘বেল্ট এন্ড রোড’ উদ্যোগে ভারত না থাকলেও সে এর সমান্তরালে আসিয়ানের অন্যান্য কানেকটিভি প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। দিল্লি ঘোষণায় ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড ত্রিদেশীয় মহাসড়ক বাস্তবায়ন দ্রুততর করার পাশাপাশি এটি কম্বোডিয়া, লাওস ও ভিয়েতনাম পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।

বিশ্ব বুদ্ধিস্ট ফোরম জোরদারের ব্যাপারে চীনের দশকব্যাপী প্রচেষ্টার ব্যাপারেও ভারত সচেতন। তাই ভারত বৌদ্ধবাদকে অবলম্বন করে আসিয়ান দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা করছে। কম্বোডিয়ার রাষ্ট্রধর্ম বৌদ্ধ। থাইল্যান্ডের ৯৫%, মিয়ানমারের ৮৭%, সিঙ্গাপুরের ৩৩%, মালয়েশিয়ার ২০% ও ভিয়েতনামের ১২% জনসংখ্যা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। ভারত তার বহু সংস্কৃতিবাদ ও শীর্ষস্থানীয় মহাকাব্য রামায়নের মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে একটি সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়।

চীনের সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা প্রচেষ্টায় শুরু থেকেই ভারতমুখী হয় আশিয়ান দেশগুলো। এখনো বিশেষজ্ঞরা কল্পনা করছেন যে এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা সঙ্কুচিত হয়ে আসায় যে শূণ্যতা সৃষ্টি হয়েছে তা পূরণের চেষ্টা করছে ভারত। কিন্তু ভারত লড়াই করতে ভয় পাচ্ছে এবং বেইজিংয়ের সঙ্গে কোন সংঘাতে যেতে চাচ্ছে না। নয়া দিল্লি এখন যত বেশি সম্ভব দেশের সঙ্গে তাদের যত বেশি সম্ভব খাতে অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে চায়। তাই ভারতের ‘এ্যাক্ট এশিয়া’ নীতিতে কোনভাবেই চীনকে বিক্ষুব্ধ করার কোন বিষয় নেই।

লেখক নয়াদিল্লি’র জওয়াহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্ট্রাডিজের অধ্যাপক।

লেখাটি সাউথ এশিয়ান মনিটর থেকে নেয়া।

সর্বাধিক পঠিত