প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দুর্নীতির পথে এক দলের গঠনতন্ত্র, আরেক দলের আইন

মঞ্জুরুল আলম পান্না : বাংলাদেশের দুই শাসক দল দুর্নীতির ক্ষেত্র অবাধ এবং প্রশ্বস্থ করার উদ্যোগ নিল খুব সুন্দরভাবে। একটি দল তা করতে যাচ্ছে রাষ্ট্রীয়ভাবে,আরেকটি করল দলীয়ভাবে। বিতর্কিত ৫৭ ধারা বাতিলের দাবিতে তীব্র জনমত গড়ে উঠলেও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮-এর খসড়ায় তা নতুন রূপে ফিরে এসেছে আরও ভয়ঙ্কর হয়ে। বিশেষ করে আইনটির ৩২ ধারা বিস্মিত এবং উৎকন্ঠিত করেছে সচেতন যে কাউকে। এতে বলা হয়েছে ‘কোনো ব্যক্তি বেআইনিভাবে প্রবেশের মাধ্যমে কোনো সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা বিধিবদ্ধ কোনো সংস্থার অতিগোপনীয় বা গোপনীয় তথ্য-উপাত্ত কম্পিউটার, ডিজিটাল যন্ত্র, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ধারণ, প্রেরণ বা সংরক্ষণ করেন বা করতে সহায়তা করেন, তাহলে সেই কাজ হবে কম্পিউটার বা ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধ। এই অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদ- বা সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা অর্থদ- বা উভয় দ- হবে’। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে আমাদের এখন বলতে হবে ‘ফিরিয়ে দাও সে ৫৭ ধারা, লও এ ৩২’।

জাতীয় নির্বাচনের বাকি এক বছরেরও কম সময়। এমন সময়ে এসে এমন একটি আইন যে সরকার হঠকারীভাবে নিয়েছে তা নয়, অবশ্যই অনেক ভেবেচিন্তে নেওয়া হয়েছে বলেই ধরে নেওয়া যায়। অনুসন্ধানি সাংবাদিতার কবর রচনা করে সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের দুর্নীতির পথ প্রশস্ত এবং রাষ্ট্রীয় অনিয়ম নির্বিঘœ করতেই যে আইনটির জন্ম তার বাইরে আর কী কোনো কারণ থাকতে পারে? সরকারি দলের শীর্ষ নেতা বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ তো সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলেই ফেলেছেন, ‘অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে এ আইন করা হয়েছে। আপনারা (সাংবাদিকরা) গণমাধ্যমে যেভাবে বিভিন্ন সংসদ সদস্যের বিরূদ্ধে রিপোর্ট করেন, তাতে তাদের মান-ইজ্জত থাকে না। তাদের সম্মান ক্ষুণœ হয়। তারা তো জনপ্রতিনিধি। তাই এগুলো ঠেকাতেই এ আইন করা হয়েছে।’ জনপ্রতিনিধিদেন প্রতি সম্মান মানুষের অবশ্যই থাকবে। কিন্তু দুর্নীতিপরায়ণ জনপ্রতিনিধিদের সম্মান রক্ষার কবচ হিসেবে আইন করা হবে? সত্যিই অভূতপূর্ব।

কোনো গণমাধ্যম যদি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কারোর বিরূদ্ধে মিথ্যে সংবাদ প্রকাশ করে তবে তার বিরূদ্ধে প্রচলতি একাধিক আইনেই ব্যবস্থা নেওয়া যায়। সত্য মিথ্যা নির্ধারণের আগেই কেন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার গলা টিপে ধরা?

এদিকে বিএনপির গঠনতন্ত্রের ৭ নম্বর ধারার ‘ঘ’তে বলা ছিল, ‘সমাজে দুর্নীতিপরায়ণ বা কুখ্যাত বলে পরিচিত ব্যক্তি বিএনপির কোনো পর্যায়ের কমিটির সদস্য কিংবা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের প্রার্থী পদের অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।

ধারাটি বাদ দিয়ে বিএনপি তার সংশোধিত গঠনতন্ত্র নির্বাচন কমিশনে জমা দিয়েছে গত রোববার। বিএনপির’র যুক্তি, ‘আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে দলটিকে ভাঙতে সরকারের একটি মহল সচেষ্ট। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায়ের পর এই তৎপরতা আরও বাড়তে পারে। মামলায় খালেদা জিয়ার সাজা হলে তাকে ‘দুর্নীতিপরায়ণ’ ব্যক্তি হিসেবে আখ্যা দিয়ে ওই মহল বিএনপিতে বিভক্তি সৃষ্টির জন্য দলের বিশেষ একটা অংশকে ব্যবহার করতে পারে’। অনেকের ধারণা, ধারাটি আসলে সংশোধন করা হয়েছে দুর্নীতিগ্রস্ত লোকদেরকে অবাধে বিএনপিতে প্রবেশ এবং জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আনুষ্ঠানিক সুযোগ করে দিতেই।

কারণ সরকার বিএনপিকে ভাঙতে চাইলে তার সামনে রাজনৈতিক অস্ত্রের অভাব নেই। আর কেউ বিএনপি থেকে বেরিয়ে সমান্তরালে নতুন কোনো দল করতে চাইলে তার জন্য বেগম খালেদা জিয়াকে কেন্দ্র করে ওই অজুহাত দাঁড় করানোরও কোনো প্রয়োজন নেই। দুর্নীতিগ্রস্ত লোকদের পাশে এসে দাঁড়াতে দুই শাসক দলের দুই উদ্যোগ এখন তাদের নিজেদের জন্য কতোখানি বুমেরাং হয় তা দেখার অপেক্ষায় দেশবাসী।
লেখক : কলামিস্ট ও সাংবাদিক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত