প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সাত কলেজের সাতকাহন

ড. জোবাইদা নাসরীন :  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সাত কলেজের অধিভুক্তি প্রথম থেকেই স্বস্তির ছিল না। ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর চাওয়া’ তরিকার মধ্য দিয়েই প্রথম ধাপের অস্বস্তি অতিক্রম করা গেছে। শুরু থেকেই আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেওয়া এই অধিভুক্তির মধ্যে অনেকেই হয়তো আশাও দেখেছিলেন। কলেজ শিক্ষার্থীরা হয়তো খুশি ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সনদ ঝুলিতে যাবে বলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বড় ধরনের প্রতিবাদ না আসায় তাদের এই খুশিতে প্রথমদিকে কোনো ধরনের দুশ্চিন্তাও ছিল না। তবে তাদের এই খুশি আসলে ছিল তাসের ঘরের মতো। অধিভুক্ত হওয়া, না হওয়া নিয়ে যতটুকু আন্দোলন বা বিরোধিতা হয়েছে, তার থেকে অনেক বেশি মাত্রায় আন্দোলন হয়েছে অধিভুক্ত হওয়ার পর এবং সেগুলোও এসেছে মূলত অধিভুক্ত কলেজের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে। পরপর তিন দফা তাদের আন্দোলনে যেতে হয়। গত বছরের জুলাই মাসে দ্রুত ফল প্রকাশ এবং পরীক্ষা নেওয়ার দাবিতে শিক্ষার্থীদের প্রথম আন্দোলন শুরু হয়। দ্বিতীয় আন্দোলনটি পাখা মেলে গত অক্টোবরে পরীক্ষার ফল প্রকাশের দাবিতে। এই আন্দোলনেই একজন শিক্ষার্থীর দৃষ্টিশক্তি চিরতরে হারিয়ে এখন একটি সরকারি ওষুধ কোম্পানির টেলিফোন অপারেটর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ পাওয়ার বিনিময়ে হারাতে হয়েছে মূল্যবান চোখটি। কলেজের শিক্ষার্থীদের সর্বশেষ আন্দোলনটি দানা বাঁধে এই মাসের প্রথম সপ্তাহের শেষদিকে। তারা আবারও একত্রিত হয় ফল প্রকাশ এবং ক্লাস শুরুর ঘোষণার দাবিতে।

তবে কোনো ধরনের প্রস্তুতি এবং জনবল ছাড়াই এই অধিভুক্তি প্রশাসনিক নানা জটিলতা সৃষ্টি করছে। কারণ এখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় দুই লাখ। এত শিক্ষার্থীর জন্য সিলেবাস, প্রশ্ন করা, উত্তরপত্র দেখা, নম্বরের সমন্বয়, টেবুলেশন, ফলাফল তৈরি ও প্রকাশ এগুলোর জন্য আলাদা কোনো সেল করা হয়নি। এই জায়গায় অনেক তথ্য জমা পড়বে, অনেক তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে, অনেক বেশি কাজ বাড়বে। অনেকেই হয়তো তর্ক দেবেন যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নতুন সাত কলেজ বাদেও আরও অনেক কলেজ রয়েছে। ঢাকা ও এর আশপাশের জেলার সরকারি-বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ, ডেন্টাল কলেজ, গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ এবং এগুলো ছাড়াও আরও কিছু প্রতিষ্ঠান অনেক দিন থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন এদের জন্য ইতোমধ্যে যে জনবল আছে, বাড়তি জনবল নিয়োগ না দিয়ে এই সাতটি কলেজের কার্যক্রম পরিচালনার বাস্তবতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেই। আমার এক সহকর্মী সেদিন জানিয়েছিলেন, তিনি তার বিভাগের ২২ হাজার প্রশ্ন করেছেন, আরও করবেন, তবে পরীক্ষা কবে হবে, কারা কারা বহিঃপরীক্ষক হবেন, কীভাবে এটির রেকর্ড হবে তার কোনো কিছুই তিনি জানেন না। এই অবস্থা শুধু তারই নয়, যারা এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত আছেন তাদের সবার।
তবে মজার ব্যাপার হলো, এই কলেজগুলো কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে যাওয়ার আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনেই ছিল। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এসব কলেজের বেশ কয়েকটি সেরা কলেজের মর্যাদাপ্রাপ্ত এবং বেশ ঐতিহ্যবাহী কলেজ। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা কয়েকটি কলেজকেই অধিভুক্ত করা হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। অধিভুক্তির আগে তাদের শিক্ষার্থীদের উল্লেখযোগ্য কোনো সেশনজট ছাড়াই শিক্ষা কার্যক্রম চলছিল। ক্লাস ঠিকমতো না হলেও পরীক্ষা ঠিকঠাক হচ্ছিল। কিন্তু অধিভুক্তির পাল্লায় পড়ে এসব কলেজের শিক্ষার্থীরা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের থেকে পিছিয়ে পড়েছে কম করে হলেও এক বছর।
এখন আন্দোলনের মোড় অন্যদিকে, ময়দানও ভিন্ন। আন্দোলনের কুশীলবরাও পরিবর্তিত, যদিও এই নতুন রাজনীতির মূল জায়গাও সেই সাত কলেজ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সাধারণ শিক্ষার্থীর’ ব্যানারে আন্দোলন হচ্ছে। আন্দোলনকারীদের দাবি, সাত কলেজের অধিভুক্তি বাদ দিতে হবে। এ দাবিতে আগেও আন্দোলন হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আন্দোলন প্রশমন করেছে, তবে এবার পারা যায়নি। প্রথম দফা আন্দোলন দমাতে ছাত্রলীগের আক্রমণের শিকার হয়েছে নারী শিক্ষার্থীরা। পরে যৌন হয়রানির বিচার চেয়ে আবারও মাঠে নামে বাম ঘরানার ছাত্রছাত্রীরা। গত ২৫ জানুয়ারি আন্দোলনের এক পর্যায়ে তারা উপাচার্য অফিস ঘেরাও করে এবং উপাচার্যের অফিসের গেটের তালা ভেঙে ফেলে। উাপাচার্য নিজেকে বাঁচাতে ছাত্রলীগ লাগান। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা এসে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মারধর করে আন্দোলন ছত্রভঙ্গ করে উপাচার্যকে উদ্ধার করে।

এই বাম সংগঠনের শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের এই আক্রমণে অন্তত তিরিশ জন কর্মী আহত হন। এখন আর আন্দোলনের শেষ জিজ্ঞাসা সাত কলেজে স্থির নেই। এটি ডালপালা ছড়িয়েছে। ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদে সমাবেশ করেছে বাম ছাত্র সংগঠনগুলো। অন্যদিকে মধুর ক্যান্টিন থেকে এই বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছে ছাত্রলীগ। আর শিক্ষকদের ফোরাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি আজ প্রতিবাদ সমাবেশ ডেকেছে এবং এই ডাকার মধ্য দিয়ে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছে কেন তাদের ছাত্রলীগকে ডাকতে হলো। বাড়তি কার্যক্রম হিসেবে আজ ২৯ জানুয়ারি সারা দেশে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অবরোধ ডেকেছে বাম ছাত্র সংগঠনগুলো।
তিন-চার দিন ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র ভিন্ন। সাত কলেজকে ঘিরে আন্দোলনের সূত্রপাত হলেও এখন কোথাও আর সাত কলেজের আলাপ নেই। আছে আলাপ অন্য প্রসঙ্গে। আলাপের সুর ‘বাম ষড়যন্ত্র’, ‘বহিরাগত’ এবং ‘তালা ভাঙা’র ওপর জোর দিয়েই এগোচ্ছে। খোদ আওয়ামী লীগেরই গগনবিদারী সেøাগানÑ ‘জেলের তালা ভাঙব, শেখ মুজিবকে আনব’ কিংবা নজরুলের ‘কারার ঐ লৌহকপাট, ভেঙ্গে ফেল, কর রে লোপাট, রক্ত-জমাট শিকল পূজার পাষাণ-বেদী। ওরে ও তরুণ ঈশান! বাজা তোর প্রলয় বিষাণ! ধ্বংস নিশান, উড়–ক প্রাচীর প্রাচীর ভেদি’ এখন আর আমাদের সে রকম প্রাণদোলা দেয় না। আমাদের কাছে এগুলো কাউকে হত্যার চেয়ে বড় অপরাধ হয়ে ওঠে। আমি তালা ভাঙার পক্ষে সাফাই তৈরি করছি না কিন্তু এটি কীভাবে এত বড় ইস্যু হয়, যেখানে এখনো ছয় বছর আগে হল দখলকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের দুপক্ষের গোলাগুলিতে নিহত আবু বকর হত্যার রায় হলেও আসামিরা খালাস পেয়েছে। সেই বিষয় নিয়ে উচ্চবাক্য করেনি প্রশাসন। তা হলে খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, মৃত্যুর চেয়ে তালা ভাঙা বড়?
আন্দোলন দমাতে কেন প্রশাসনকে ছাত্রলীগের ক্ষমতা ব্যবহার করতে হলো, এটি এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এর বাইরে কোনো বিকল্প কি প্রশাসনের কাছে ছিল না? প্রশাসন কী কী ধরনের চেষ্টা করেছিল আন্দোলনকারীদের সঙ্গে দেনদরবারের? প্রশাসন কি বাম নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছিল? কোনো ধরনের আলোচনার আহ্বানের সুযোগ কি আদৌ প্রশাসনের ছিল না? আমরা সবাই জানি বাম শিক্ষার্থীরা সংখ্যায় বেশি নয়, তবে তাদের মেরুদ-ের জোর বেশি। প্রশাসন তাদের মুখোমুখি হতে চাচ্ছিল না কেন? আমরা বিশ্বাস করি, আলাপে, তর্কে, বিতর্কে কোনো কিছু বের হয়ে আসবেই। কিন্তু প্রশাসন কোনো এক অজ্ঞাত কারণে সে পথে জায়নি। এমনকি উপাচার্য নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হলে পুলিশকে খবর দিতে পারতেন। কিন্তু তা না করে তিনি ছাত্রলীগকে ডেকে এনেছেন, আন্দোলনকারীদের ওপর নিপীড়ন করেছে ছাত্রলীগ, যে ছবি এবং ভিডিও ভাইরাল হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
তবে খুব মনোযোগর বিষয় হলো, যে ঘটনাটি ঘটেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, সেটি খুব বেশি নয়া চিত্র নয়। ক্ষমতাসীন সংগঠনের কাছে প্রশাসনের নতজানু চরিত্রই এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘কাক্সিক্ষত’ সংস্কৃতি। এর আগে আমরা জেনেছিলাম যে, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য ছাত্রলীগ সভাপতির জন্য নিজের আসন ছেড়ে দিয়েছিলেন। যারা আমাদেরই ছাত্র, ক্লাসে থাকে তাদের এই ভয়ঙ্কর নিপীড়ক চেহারা শিক্ষক হিসেবে আমাদের মর্যাদা এবং সম্মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। বছর শেষে আমরা এদেরই সনদ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েট বলে গর্ববোধ করি।

বিশ্ববিদ্যালয়ে যেহেতু ডাকসু নেই এবং হওয়ার বিষয়ে সবাই ‘আন্তরিক’ কিন্তু তার পরও হচ্ছে না, সেখানে প্রতিদিনই কোনো না কোনো আন্দোলন হবে, এটিই বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য। সেটির মুখোমুখি এবং সেটিকে মোকাবিলার দক্ষতা, বুদ্ধিমত্তা এবং ধৈর্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের কাছে খ্বুই কাক্সিক্ষত। আন্দোলনকে ভয় নয়, ভালোবাসা দিয়ে, আলাপ-আলোচনা করেই জয় করতে হবে। সাত কলেজ নিয়ে সৃষ্ট সমস্যার সমাধান খুবই দ্রুত হবে আশা করি। তবে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক মামলা, হয়রানি, নিপীড়নের সংস্কৃতি থেকে কি আদৌ দেশ রক্ষা পাবে?

য় ড. জোবাইদা নাসরীন : সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত