প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

গোপনে গঠনতন্ত্র সংশোধন, নানা প্রশ্ন বিএনপিতে

ডেস্ক রিপোর্ট : গোপনে বিএনপির গঠনতন্ত্র সংশোধনের ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্গনে তো আলোচনা চলছেই, বিএনপির ভেতরেও দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। বিএনপির অনেক সিনিয়র নেতাই গঠনতন্ত্র সংশোধনের বিষয়টি জানতেন না। গণমাধ্যমে গঠনতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ ৭ ধারাটি বাতিলের খবর দেখে বিস্মিত হয়েছেন তাদের অনেকে। দলের জাতীয় কাউন্সিলে সংখ্যাগরিষ্ঠদের ভোটে গঠনতন্ত্র সংশোধন করে অনুমোদনের কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকলেও তা করা হয়নি। যদিও দলের সংশ্নিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা দাবি করছেন, কাউন্সিলে যেসব সংশোধনী অনুমোদিত হয়েছিল, সেটাই নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হয়েছে। অবশ্য বিগত ষষ্ঠ কাউন্সিলে অনুমোদিত সংশোধনীর তালিকা খুঁজে দেখা গেছে, গঠনতন্ত্রের ৭ ধারাটি তখন বাতিলের প্রস্তাব উত্থাপন করাই হয়নি।

দেশে গণতন্ত্র ‘পুনঃপ্রতিষ্ঠা’য় আন্দোলনরত বিএনপির অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের এই হাল দেখে হতাশ হয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্নেষকরা। তারা বলছেন, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া একক ক্ষমতাবলেই গঠনতন্ত্র সংশোধন করেছেন। বিএনপি গঠনতন্ত্রের ১১(খ) ধারায় ‘জরুরি কারণে যদি কোনো সংশোধনী প্রয়োজন হয়ে পড়ে, দলের চেয়ারম্যান গঠনতন্ত্রে সেই সংশোধন করতে পারবেন। তবে জাতীয় কাউন্সিলের পরবর্তী সভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভোটে তা গৃহীত হতে হবে।’ বিশ্নেষকদের মতে, এটাও প্রমাণ করে, বিএনপিতে আদৌ গণতন্ত্রের চর্চা নেই। জরুরি প্রয়োজনে বিএনপি চেয়ারপারসনের দলের গঠনতন্ত্র সংশোধনের ক্ষমতা থাকলেও সেটা অনৈতিক।

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ভারপ্রাপ্ত সচিব হেলালুদ্দীন আহমেদ গতকাল বলেছেন, বিএনপির জমা দেওয়া গঠনতন্ত্র যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে। আরপিও অনুযায়ী গঠনতন্ত্রটি ঠিক আছে কি-না, তা খতিয়ে দেখবেন তারা।

আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দুর্নীতির মামলার রায়ের তারিখ নির্ধারিত হওয়ায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। দলের গঠনতন্ত্রের ৭ ধারা অনুযায়ী দণ্ডিত ব্যক্তি দলের পদে থাকা এবং নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য হবেন। সরকার দল ভাঙার হাতিয়ার হিসেবে এ সুযোগ ব্যবহার করতে পারে- এ আশঙ্কায় গঠনতন্ত্রের ওই ধারা বাদ দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন।

সংশোধিত গঠনতন্ত্র রোববার নির্বাচন কমিশনে জমা দিয়েছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে গঠনতন্ত্রে কিছু সংশোধনী প্রস্তাব পাস হয়। তবে এত দিন দলটি সেটা নির্বাচন কমিশনে জমা দেয়নি। এ নিয়ে নির্বাচন কমিশন বিএনপিকে চিঠিও দেয়।

২০১৬ সালের কাউন্সিলে গঠনতন্ত্রের ৭ ধারা বাতিলের কোনো প্রস্তাব উত্থাপিত হয়নি। বিএনপির গঠনতন্ত্রে ওই ধারায় ‘কমিটির সদস্যপদের অযোগ্যতা’ শিরোনামে বলা আছে, ‘নিল্ফেম্নাক্ত ব্যক্তিগণ জাতীয় কাউন্সিল, জাতীয় নির্বাহী কমিটি, জাতীয় স্থায়ী কমিটি বা যেকোনো পর্যায়ের যেকোনো নির্বাহী কমিটির সদস্যপদের কিংবা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের প্রার্থিতা অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। তাঁরা হলেন :(ক) ১৯৭২ সালের রাষ্ট্রপতির আদেশ নম্বর ৮-এর বলে দণ্ডিত ব্যক্তি, (খ) দেউলিয়া, (গ) উন্মাদ বলে প্রমাণিত ব্যক্তি, (ঘ) সমাজে দুর্নীতিপরায়ণ বা কুখ্যাত বলে পরিচিত ব্যক্তি।’

এই ধারার ‘ঘ’তে বলা ছিল, ‘সমাজে দুর্নীতিপরায়ণ বা কুখ্যাত বলে পরিচিত ব্যক্তি’ বিএনপির কোনো পর্যায়ের কমিটির সদস্য কিংবা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের প্রার্থী পদের অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গতকাল সোমবার দিনভর বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটি, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদ এবং জাতীয় নির্বাহী কমিটির একাধিক নেতা বিষয়টি নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনায় মুখর ছিলেন। তবে প্রকাশ্যে তারা কেউই মুখ খুলতে রাজি হননি। তারা বলছেন, দলীয় ফোরামে সিদ্ধান্ত ছাড়া গঠনতন্ত্র সংশোধন হয়েছে- এটা গণতান্ত্রিক হয়নি। দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে আগে দলের ভেতর গণতন্ত্র চর্চা জরুরি।

অবশ্য বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেছেন, বিষয়টি নিয়ে অনেক আগেই দলের স্থায়ী কমিটির সভায় আলোচনা হয়েছে। অপর এক সদস্য বলেছেন, গঠনতন্ত্র সংশোধন করা হচ্ছে, সেটা তারা জানতেন। তবে সর্বশেষ গত শনিবার স্থায়ী কমিটির বৈঠকে তা প্রস্তাব আকারে ওঠেনি। স্থায়ী কমিটির অন্য একজন সদস্য জানান, স্থায়ী কমিটির ওই বৈঠকে দলের কাউন্সিলে সংশোধিত গঠনতন্ত্র জমা দেওয়া হবে- শুধু এটুকুই নজরুল ইসলাম খান বলেছেন। নতুন কিছু সংযোজন বা বিয়োজনের বিষয়ে কিছু উল্লেখ করেননি।

যোগাযোগ করা হলে নজরুল ইসলাম খান বলেন, তিনি কাউন্সিলে ওই ধারা সংশোধনের প্রস্তাব করেছিলেন। আর কাউন্সিলরদের মতামতের ভিত্তিতেই তা পাস হয়েছিল। নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া গঠনতন্ত্রের বিষয়ে তিনি বলেন, দলের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে যেসব প্রস্তাব পাস হয়েছিল, তার ভিত্তিতেই সংশোধিত নতুন গঠনতন্ত্র তৈরি করা হয়েছে এবং নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হয়েছে। একই কথা বলেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদও।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহ্‌দীন মালিক বলেন, গঠনতন্ত্রের পরিবর্তন বা সংশোধন করার যে বিধান বা পদ্ধতি আছে, সেটা অনুসরণ করাই বাঞ্ছনীয়। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, প্রায়ই সরকার ও রাজনৈতিক দল ব্যক্তির কথা চিন্তা করে অথবা ব্যক্তিস্বার্থে আইন ও নিয়মনীতি পরিবর্তন করে থাকে। ফলে গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও উন্নয়ন কোনো কিছুই গতিশীল হচ্ছে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজনৈতিক বিশ্নেষক ও সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গণতন্ত্রের চর্চা নেই। প্রতিটি দলের প্রধান যা বলেন, তা-ই তাদের নিয়ম। বড় দলগুলোর মধ্যে গণতন্ত্র চর্চা থাকলে এসব পরিবর্তনের দরকার হতো না বলেও তিনি মত প্রকাশ করেন।

আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক বলেছেন, বিএনপির পরিবর্তিত গঠনতন্ত্রের মাধ্যমে দুর্নীতিবাজদের প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে। আর এ ধরনের সিদ্ধান্ত গণতন্ত্রের বিকাশ ও সুস্থধারার রাজনীতির জন্য অন্তরায়।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক অ্যাডভোকেট শ. ম. রেজাউল করিম বলেন, বিএনপি গণতান্ত্রিকভাবে প্রতিষ্ঠিত দল নয় এবং তাদের দলের অভ্যন্তরেও গণতান্ত্রিক চর্চা নেই। বিএনপি শীর্ষ নেতৃত্বের অন্যতম তারেক রহমান এরই মধ্যে দুর্নীতির দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছেন। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে। সমকাল

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত