প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিএনপির হুমকি আমলে নিচ্ছে না আওয়ামী লীগ

ডেস্ক রিপোর্ট  : বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারিত হওয়ার পর থেকেই সরকারের প্রতি কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বক্তব্য দিচ্ছেন দলটির নেতারা। গতকাল শনিবারও বিএনপি মহাসচিবসহ কয়েকজন নেতা কঠোর ভাষায় বক্তব্য দিয়েছেন। তবে এসব বক্তব্য বা হুঁশিয়ারি আমলেই নিচ্ছেন না ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নেতারা।

আওয়ামী লীগ নেতারা মনে করছেন, ওই মামলার রায়ে খালেদা জিয়ার সাজা হলেও বিএনপি তেমন কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে পারবে না। তাঁদের মতে, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি আন্দোলনে ব্যর্থ হয়ে এখন পর্যন্ত নতজানু নীতি নিয়ে চলছে। একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে সাংগঠনিক অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে আগামী দিনেও নমনীয় নীতিই নেবে দলটি। তবে রায়-পরবর্তী সম্ভাব্য যেকোনো পরিস্থিতি সামাল দিতে সাংগঠনিকভাবে প্রস্তুত থাকবে আওয়ামী লীগ। দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে এমন আভাস মিলেছে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ৯ বছর আগে দায়ের করা ওই মামলার রায় দেওয়া হবে আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি। গত বৃহস্পতিবার উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি শেষ হলে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫-এর বিচারক এই দিন ধার্য করেন। এটি প্রচার হওয়ার পর বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা দেখা দিলেও কেন্দ্রীয় নেতারা তা প্রকাশ করছেন না। তাঁরা বরং কঠোর বক্তব্য দিচ্ছেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য এমনটিও বলেছেন, খালেদা জিয়ার শাস্তি হলে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে এক আলোচনাসভায় বলেছেন, ‘‘এত সোজা নয়, খালেদা জিয়াকে আপনারা (সরকার) যেনতেন প্রকারে একটা রায় দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন, দেশের মানুষ সেটা মেনে নেবে না। সঠিক বিচার করতে হবে, ন্যায়বিচার হতে হবে। কারণ আজ ‘বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে’। দেশে এখন কেউ কোথাও ন্যায়বিচার পায় না। আমরা যে কথা বলতে চাই খুব পরিষ্কার করে, আমাদের নেত্রী এ দেশের ১৬ কোটি মানুষের আশা-ভরসার স্থল। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের একমাত্র প্রতীক, যাঁর উপরে সব বাংলাদেশ তাকিয়ে আছে, তাঁকে তারা রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে চায়। আমরা কি সেটা করতে দেব?”

একই দিনে আরেক অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘৮ তারিখের জন্য মানুষ অপেক্ষা করছে, বিচারের রায়ের জন্য নয়। মানুষ অপেক্ষা করছে বিচার বিভাগের বিবেক আছে কী নেই সেটার জন্য। যারা আজকে জোর করে ক্ষমতা দখল করে আছে তারা সব কিছু বুঝে শুনেই কাজ করছে। কারণ তারা আজ যেভাবে ক্ষমতায় আছে এগুলো করেই তাদের থাকতে হবে।’

তিনি বলেন, ক্ষমতাসীনরা রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গকে সম্পূর্ণভাবে কুক্ষিগত করেছে। রাষ্ট্রের শেষ আশ্রয়স্থল বিচার বিভাগকেও সম্পূর্ণভাবে কুক্ষিগত করার চেষ্টা করছে। ফলে ৮ ফেব্রুয়ারি দেশের মানুষের সামনে বড় দিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি আরো বলেন, ‘একটা রায় হবে তাতে সরকারের লোকজনের নতুন করে সভা-সমাবেশ করার প্রয়োজন কী? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হুংকার দেওয়ার প্রয়োজন কী? তাদের এ আচরণে জাতির বিবেক জাগ্রত হয়ে গেছে।’

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী গতকাল কুড়িগ্রামে বলেছেন, ন্যায়বিচার হলে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সব অভিযোগ থেকে মুক্তি পাবেন। আর ‘গায়েবি নির্দেশে’ খালেদা জিয়ার মামলার রায় হলে বিএনপি তা রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করবে। কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার বসুনিয়ারহাট বাজারসংলগ্ন একটি মাঠে শীতার্তদের মাঝে কম্বল বিতরণ অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

আওয়ামী লীগের কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা জানান, বিএনপি গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় বুঝে গেছে যে আন্দোলনের পথে গিয়ে কোনো লাভ হয় না। জ্বালাও-পোড়াও করে সরকার উৎখাত কিংবা দাবি আদায় করা যায় না। উল্টো সাংগঠনিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। বিভিন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে বিএনপি বুঝতে পেরেছে, গণতান্ত্রিক পথে গেলেই লাভ হয়। ফলে খালেদা জিয়ার যদি সাজা হয়, তবে সে রায় তারা নিশ্চয়ই আইনগতভাবেই মোকাবেলা করবে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তারা গত নির্বাচনের মতো ভুল পথে হাঁটবে না।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী  বলেন, ‘খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে যেসব মামলা হয়েছে সেগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দেওয়া। আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য কোনো মামলা দেয়নি। রায় কী হবে সেটা আদালতের ব্যাপার। মামলার প্রসঙ্গে বিএনপির নেতারা যেসব কথা বলছেন তা কথার কথা। আর তাঁদের কথার কোনো লাগাম নাই। তাঁরা কখনো দায়িত্বশীল কথাবার্তা বলছেন শুনি নাই। এটাই হলো বাস্তবতা।’

রায় ঘিরে ক্ষমতাসীনদের প্রস্তুতির বিষয়ে জানতে চাইলে মতিয়া চৌধুরী বলেন, “আমরা সরকারে আছি, রায়-পরবর্তী সরকারের যা করণীয় সব করব। দেশের মানুষের স্বাভাবিক শান্তিপূর্ণ জীবনযাত্রা নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব। ‘হেন করেঙ্গা, তেন করেঙ্গা’—এসব কথাবার্তা তারা চিরদিনই বলে। অতীতেও বলেছে, এখনো বলছে। আমরা আওয়ামী লীগ দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আছি, দায়িত্বশীল আচরণই করব। আমরা যা-তা বলব না, আইনানুগভাবে যা হবে অর্থাৎ মানুষের জন্য একটি নিশ্চিন্ত পরিবেশ সৃষ্টির জন্য যা যা করার সব করব।”

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ‘আদালতের নির্দেশ সবাইকে মানা উচিত। সংক্ষুব্ধ হলে উচ্চ আদালতে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে বিশৃঙ্খলার চেষ্টা করলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যবস্থা নেবে। বিএনপি দেখেছে, জ্বালাও-পোড়াও করে লাভ নেই। তাই সেই পুনরাবৃত্তি নিশ্চয় তারা করবে না। আমরা জনগণকে সচেতন করতে ১৪ দলকে প্রস্তুত রাখব।’

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মুহম্মদ ফারুক খান  বলেন, ‘বিএনপির যেসব নেতা আন্দোলনের হুমকি দিচ্ছেন, তাঁদের নিয়ে আমরা ভাবছি না। এসব হুমকির মধ্য দিয়ে তাঁরা স্বীকার করে নিচ্ছেন যে খালেদা জিয়া অপরাধ করেছেন। তাঁদের ভাবটা এমন যে খালেদা জিয়া অপরাধ করেছেন কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না।’ তিনি বলেন, ‘আমরা বহু বড় বড় হুমকি-ধমকি-আস্ফাালন দেখেছি। কিন্তু সরকার বা আওয়ামী লীগ কারো ভয়ে ভীত নয়। আমাদের শক্তিশালী সরকার আছে। এখানে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করে কেউ পার পাবে না। বিএনপির উচিত গণতান্ত্রিক পথে চলা। তারা বহু বাগাড়ম্বর করেছে কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। জ্বালাও-পোড়াও করে তারা দেশবাসীর সমর্থন পায়নি। লাভের বদলে তাদের ক্ষতি হয়েছে। এসব যদি বিবেচনায় নেয়, বিএনপি নিশ্চয়ই আগামীতে আন্দোলনের পথে যাবে না।’

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, ‘রায় কী হবে না হবে তা তাদের (বিএনপি) মেনে নেওয়া উচিত। অহেতুক কথাবার্তা বলে বিভ্রান্তি না ছড়িয়ে আদালতের নির্দেশ মেনে নেবে—এটাই তাদের জন্য ভালো হবে।’

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন  বলেন, ‘খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রায় ইতিবাচক না নেতিবাচক হবে তা আমরা জানি না। তবে আওয়ামী লীগ সদা প্রস্তুত একটি রাজনৈতিক দল। রায় ঘোষণার পর উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো সক্ষমতা আওয়ামী লীগ এবং আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের রয়েছে। আর নতজানু বিএনপির মৌখিক আন্দোলনের হুমকি আওয়ামী লীগ আমলে নিচ্ছে না।’

আওয়ামী লীগের একধিক সূত্রে জানা যায়, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলার রায়ের দিন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকার নির্দেশনা দেওয়া হবে। কোনো বিশেষ পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা হলে যেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও মাঠে ভূমিকা রাখতে পারে।

সূত্রমতে, খালেদা জিয়ার শাস্তি হলে সেদিন রায়কে স্বাগত জানিয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাজপথে মিছিল সমাবেশ করার চিন্তাও আছে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে। খালেদা জিয়া দোষী সাব্যস্ত হলে দেশব্যাপী তাৎক্ষণিক মিছিল করার নির্দেশনাও দেওয়া হতে পারে। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার অনুমতি নিয়ে ৮ ফেব্রুয়ারির আগেই এসব নির্দেশনা দেশব্যাপী নেতাকর্মীদের দেওয়া হবে।

গতকাল জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল আয়োজিত আলোচনাসভায় উপস্থিত নেতাকর্মীদের উদ্দেশে ফখরুল বলেন, ‘আপনারা কি তাঁর জন্য সব জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাঁর জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন?’ ওই সময় উপস্থিত নেতাকর্মীরা সমস্বরে ‘হ্যাঁ’ বলে সম্মতি জানায়।

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আওয়ামী লীগের মন্ত্রীরা হুংকার দিচ্ছেন, হুমকি দিচ্ছেন, রায়ের পরে কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে কঠোর হাতে দমন করা হবে। আপনাদের মাথায় এটা আসল কেন? আমরা তো দেখছি, এই মামলায় কিছুই নেই, কোনো সত্যতা নেই, প্রসিকিউশন ব্যর্থ হয়েছে কোনো কিছু প্রমাণ করতে। সেখানে আপনারা হঠাৎ করে এটা ভাবছেন কেন? ভাবছেন এ কারণেই, রায় আপনারা পূর্বেই নির্ধারণ করে রেখেছেন।’

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির গোলটেবিল মিলনায়তনে আরেক অনুষ্ঠানে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ‘৮ তারিখ আসবে আবার চলেও যাবে। ক্ষমতায় অনেকেই থাকতে চায়, কিন্তু কেউ স্থায়ী হয় না। আগামী দিন হচ্ছে খালেদা জিয়ার দিন। গুম, খুনের অপরাধসহ আমাদের সুধীসমাজকে যেভাবে কটাক্ষ করছেন তাঁর বিচার হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ৮ তারিখের বিষয়ে যে মন্তব্য করেছেন সেটি আদালত অবমাননার শামিল। আর যদি আপনি এটা জেনে থাকেন রায় কী হবে, তাহলে জাতির সামনে তা প্রকাশ করুন।’

উৎসঃ কালের কণ্ঠ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত