প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি
প্রস্তুতি রাখছে আওয়ামী লীগ : ভাবছে বিএনপিও

তারেক : আস্তে আস্তে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে রাজনৈতিক অঙ্গন। ৮ ফেব্রুয়ারি এ রায় ঘোষণা করা হবে। বৃহস্পতিবার রায়ের তারিখ ঘোষণার দিন থেকে শুরু হয়েছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাদের পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি। এ অবস্থায় শুক্রবার থেকে সারা দেশে সাংগঠনিক সফর শুরু করেছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা। তৃণমূলকে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত করার পাশাপাশি যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে দলীয় নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে এই সফর থেকে। এদিকে রায়-পরবর্তী যে কোনো ধরনের পরিস্থিতি কঠোরভাবে মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামন খান কামাল এরই মধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন। সরকারিভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলার পাশাপাশি দলীয়ভাবেও প্রস্তুতি রাখবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদের বক্তব্যে এরই মধ্যে তা উঠে এসেছে। তারা বলছেন, খালেদা জিয়ার রায় নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা নেই। এটা আদালতের বিষয়। কিন্তু এই রায়কে কেন্দ্র করে দেশে কোনো বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করা হলে তা কঠোরভাবে মোকাবিলা করা হবে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দেশকে অস্থিতিশীল করার সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না।

অন্যদিকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে করা মামলা সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন দাবি করে সরকারকে হুঁশিয়ারি করে বক্তব্য দিচ্ছেন দলটির নেতারা। এ মামলার যেনতেন প্রকারে রায় জনগণ মেনে নেবে না বলে সরকারকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন খোদ বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এছাড়া রায়-পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে শনিবার স্থায়ী কমিটির সঙ্গে বৈঠক করেন খালেদা জিয়া। একই ইস্যুতে আজ জোট নেতাদের সঙ্গে বসবেন খালেদা জিয়া। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, খালেদা জিয়ার রায় নিয়ে দলের মধ্যে দুই ধরনের মত রয়েছে। রায় বিরুদ্ধে গেলে একটি পক্ষ প্রতিক্রিয়া দেখানোর পক্ষে থাকলেও আরেকটি পক্ষ সেই পথে হাঁটতে চায় না। অতীতের মতো বিশৃঙ্খলার সুযোগে তৃতীয় কোনো পক্ষকে সুযোগ করে দিতে চায় না দলটির নেতারা। সরকার যেন নতুন করে মামলা হামলা চালাতে না পারে এ জন্য নিয়মতান্ত্রিকভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে তারা। রায়ের দিন সারা দেশে বড় ধরনের শোডাউন ও শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করার প্রাথমিক চিন্তা রয়েছে। তৃণমূলেও এই ধরনের নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতেই স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বসেন খালেদা জিয়া। পাশাপাশি জোটের পক্ষ থেকে কী ধরনের সাড়া পাওয়া যায় তা জানতে আজ জোট নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করা হবে বলেও দলীয় সূত্রে জানা গেছে। এরই মধ্যে জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার বিচারকাজ শেষ হয়েছে। আদালত ৮ ফেব্রুয়ারি রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেছেন।

আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ক্ষমতাসীন এ দলের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে, দেশে স্থিতিশীল পরিস্থিতি বজায় রাখা। খালেদা জিয়ার রায় কেন, অন্য কোনো ইস্যুতে কেউ যেন দেশকে অস্থিতিশীল করতে না পারে এজন্য আওয়ামী লীগ সব সময় সতর্ক থাকবে। জানুয়ারিতেই কেন্দ্রীয় নেতাদের জেলা সফর শুরুর এটাও একটা কারণ। দলের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি দূর করে ঐক্যবদ্ধভাবে যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করার নির্দেশ দেওয়া হবে। পাশাপাশি খালেদা জিয়াসহ জিয়া পরিবারের দুর্নীতির বিষয়গুলো জনগণের সামনে যৌক্তিকভাবে তুলে ধরার এটাই উত্তম সময় বলে মনে করেন দলটির নেতারা। তাছাড়া খালেদা জিয়ার রায়কে কেন্দ্র করে যদি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় শুধু তা প্রতিহত নয়, সাধারণ জনগণকে বিভ্রান্ত করে বিএনপি যেন কোনো ফায়দা লুটতে না পারে সেই বিষয়েও জনগণকে সচেতন করা হবে এই সফরে। তাই এখন থেকেই খালেদা জিয়ার রায় নিয়ে বিএনপি নেতাদের দেওয়া বক্তব্যের যৌক্তিকতাও জনগণের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে। এদিকে খালেদা জিয়ার রায়কে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলাসহ যে কোনো ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজধানীসহ সারা দেশে প্রতিটি থানাকে সতর্ক থাকার নির্দেশনা এরই মধ্যে পাঠানো হয়েছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্রে জানা গেছে।

রায় নিয়ে বিএনপি মহাসচিবসহ দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদের বক্তব্যের সমালোচনা করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে করা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলার রায় ঘোষণার আগেই বিএনপি হুংকার দিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘রায়কে ঘিরে বিএনপি আদালতকে হুমকি দিচ্ছে। রায় নিজেদের পক্ষে আনতে আদালতকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। দলটির নেতারা রায়কে ঘিরে যেভাবে আগাম মন্তব্য করছেন, হুংকার দিচ্ছেন, তাতে মনে হচ্ছে, রায় কী হবে তা তারা জেনেই গেছেন।’ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘এভাবে হুমকি-ধমকি দিয়ে কোনো লাভ নেই। এ হুমকি সরাসরি আদালতের বিরুদ্ধে। এর মাধ্যমে তারা প্রমাণ করেছেন যে, বিএনপির হাতে দেশ যেমন নিরাপদ নয়, তেমনি দেশের গণতন্ত্র, আইনের শাসন এমনকি স্বাধীন বিচার ব্যবস্থাও নিরাপদ নয়’। ‘বর্তমান সরকারের আমলে বিচার বিভাগ স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বলেই আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যদের অনেকে আজ কারাগারে।’ বিএনপির সমালোচনা করে তিনি বলেন, নির্বাচনের আগেই বিএনপি নির্বাচনে জিততে চায়। ২০১৩-১৪ সালের মতো নির্বাচনের নামে বিএনপি যদি জ্বালাও-পোড়াও করতে চায় তাহলে জনগণ তাদের প্রতিহত করবে।

আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফরউল্লাহ আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, ‘খালেদা জিয়ার রায় নিয়ে আমরা চিন্তিত নই। কারণ রায় দেবেন আদালত। আর আদালতের রায় সবার জন্যই সমান। তবে এটুকু বলতে পারি। রায় নিয়ে কাউকে কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে দেওয়া হবে না। অতীতের মতো জনগণকে নিয়ে তা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে।’

এদিকে বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপিকে চাপে রাখতে খালেদা জিয়ার মামলা ও রায় নিয়ে তাড়াহুড়া করা হয়েছে। বিএনপি যেন নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে না পারে বা দলকে সেইভাবে প্রস্তুত করতে না পারে সেই জন্যই সরকার এই কৌশল নিয়েছে বলে দলটির নেতারা মনে করেন। এ অবস্থায় বিএনপির পাল্টা কৌশল কী হবে, তা নিয়ে নীতি-নির্ধারকদের মধ্যে দুই ধরনের মতামত উঠে এসেছে। দলটির শীর্ষ নেতাদের কেউ কেউ মনে করেন, রায়ের পরপরই কোনো আক্রমণাত্মক কর্মসূচিতে না যাওয়া। তাদের যুক্তি, অতীতে এ ধরনের কর্মসূচির সুযোগ নিয়েছে সরকার। রায়ের পর বিএনপি মারমুখী কর্মসূচি দিয়ে মাঠে নামুক, তা সরকারও চাইছে। যাতে নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে নতুন করে মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার, দমন-পীড়ন চালাতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছেও এসব নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করতে পারে। এ জন্য আপাতত তারা নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচি চালিয়ে নির্বাচন পর্যন্ত যেতে চায়। তবে আরেকটি পক্ষ খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক রায় হলে কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখানোর পক্ষে। তারা খালেদা জিয়াকে বাইরে রেখে বিএনপির নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিরোধী। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেছিলেন, ‘দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মামলায় নেতিবাচক কোনো রায় হলে তার পরিণতি ভয়াবহ হবে।’ তিনি বলেন, ‘৮ ফেব্রুয়ারি যেটা আমরা আশঙ্কা করছি, সেদিন নেতিবাচক কোনো সিদ্ধান্ত সরকার কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে যদি আদালত থেকে প্রকাশ পায়, তাহলে আমার মনে হয়, তখন থেকে এই সরকারের পতনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সময় বলে দেবে কে নেতৃত্ব দেবে, আর কে রাজপথে থাকবে। সরকারকে বলব, জেলের ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু করার ঘোষণা দিই বা না দিই, এমন কিছু যে ঘটবে না সে নিশ্চয়তা আমরা দিতে পারি না।’

অন্যদিকে খালেদা জিয়ার দুর্নীতির মামলায় যেনতেন প্রকারে রায় জনগণ মেনে নেবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ‘এত সোজা নয়, খালেদা জিয়াকে আপনারা যেনতেন প্রকারে একটা রায় দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন, দেশের মানুষ সেটা মেনে নেবে না। সঠিক বিচার করতে হবে, ন্যায়বিচার হতে হবে। আমরা যে কথা বলতে চাই খুব পরিষ্কার করে, আমাদের নেত্রী এদেশের ১৬ কোটি মানুষের আশা-ভরসার স্থল, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের একমাত্র প্রতীক, যার ওপর বাংলাদেশ তাকিয়ে আছে, তাকে তারা রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে চায়। আমরা কী সেটা করতে দেব?’ জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে তার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে করা মামলাগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট এবং এসব মামলার কোনো ভিত্তি নেই বলে দাবি করেছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ। তিনি বলেন, খালেদা জিয়াকে হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য এবং জাতীয়তাবাদী দলকে দুর্বল করার জন্যই এসব মামলা করা হয়েছে। মওদুদ বলেন, ‘ভুয়া মামলা হওয়ায় আদালতে সরকারপক্ষ মামলার স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি। ৩২ জন সাক্ষীর মধ্যে ৩১ জন সাক্ষীর কেউই মামলায় খালেদা জিয়ার সংশ্লিষ্টতা আছে বলতে পারেননি। সুতরাং আমরা আশা করছি, যদি সুবিচার হয়, তাহলে খালেদা জিয়া মামলা থেকে বেকসুর খালাস পাবেন।’

৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায় ঘোষণা করবে ঢাকার পঞ্চম জজ আদালত। বিএনপি-জামায়াত জোটের ২০০১-২০০৬ মেয়াদে সরকারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দুই কোটি ১০ লাখ টাকা আত্মসাতের এ মামলার প্রধান আসামি। রায় বিরুদ্ধে গেলে খালেদা জিয়া আগামী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অযোগ্য হয়ে পড়বেন। আলোকিত বাংলাদেশ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত