প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

উত্তরায় ফুটপাত ঘিরে পুলিশের বাণিজ্য

ডেস্ক রিপোর্ট : রাজধানীর উত্তরায় আজমপুরে ফুটপাত ঘিরে চলছে পুলিশের রমরমা বাণিজ্য। কাঁচাবাজার, ইট-বালুর স্তূপ, অটো-লেগুনা পরিবহন স্ট্যান্ড, ভাসমান খাবার হোটেল, রিকশা-সাইকেল-গাড়ি মেরামতের গ্যারেজ এবং সড়কের পাশে অবৈধভাবে দোকান বসিয়ে প্রতি সপ্তাহে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। আর এসবের জন্য স্থানীয়ভাবে গড়ে উঠা চাঁদাবাজদের কাজে লাগাচ্ছে বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের। চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে নেমে আসে তাদের ওপর বর্বর নির্যাতন। আর নির্যাতন ও ব্যবসা বন্ধের হুমকির কারণে মুখ খুলতে চান না কেউই।

এ ছাড়া টাকা উঠানোর জন্য এলাকা ভাগ করে দেয় পুলিশ প্রশাসনই। প্রতিটি এলাকাকে লাখ টাকায় স্থানীয় চাঁদাবাজদের বিক্রি করে দেয় তারা। তারই একটি এলাকা আজমপুর পুলিশ ফাঁড়ির লাইন। এই লাইনটি থেকে আগে টাকা উঠাত উত্তরা পূর্ব থানা যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও এসি পেট্রলের ক্যাশিয়ার আজাদ। সম্প্রতি তাকে বাদ দিয়ে উত্তরা পশ্চিম থানার রাসেলকে টাকা উঠানোর দায়িত্ব দেয় পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ আলমগীর গাজী। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন আজাদ। বের হতে থাকে তাদের অবৈধ নানা কর্মকান্ডের কথা। এই ইনচার্জের বিরুদ্ধে দেড় লাখ টাকায় লাইন বিক্রির অভিযোগও তুলেন তিনি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, আজমপুর ফাঁড়ি এলাকার কাঁচাবাজার, ইট-বালুর গদি, অটো-লাগুনা পরিবহন স্ট্যান্ড, ভাসমান খাবার হোটেল, রিকশা-সাইকেল-গাড়ি মেরামতের গ্যারেজ রয়েছে অসংখ্য। এ ছাড়া সড়কের ওপরে গড়ে উঠা পোশাকপণ্যের বিশাল হকার মার্কেটসহ পাঁচ হাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী রয়েছেন এ এলাকায়। এসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর কাছ থেকে টাকা উঠাতে চুক্তির মাধ্যমে অর্থের লেনদেন হয়। আর এ টাকার একটি বড় অংশ যায় ইনচার্জের পকেটে। আর অবশিষ্ট টাকা থেকে যায় লাইনম্যানের কাছে। আজমপুর ফাঁড়ি এলাকার টাকা উঠানোর দায়িত্ব ছিল আজাদের কাছে।

এদিকে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এবং পিআইর পদ দুটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাদের চাওয়া না চাওয়ার ওপরে ফুটপাতসহ ফাঁড়ি এলাকার সড়কের আশপাশের সব অবৈধ স্থাপনা নির্ভর করে। তাই আজাদ ও তার চাচা নবী বেশ কয়েক বছর ধরে এই লাইন দুটি মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে কিনে নেন। এ ছাড়াও তারা পুলিশ কর্মকর্তাদের ডিউটি রুমের পুরনো আসবাবপত্র পরিবর্তন করে দেন নিজেদের অর্থে। খরচের দিক থেকে এগিয়ে থেকে এক যুগের মতো নিজেদের কাছেই রেখেছেন ফাঁড়ির কালেকশনের পদ দুটি। এ সময়ে ব্যবসায়ীদের ওপর নেমে আসে আজাদের নানা ধরনের নির্যাতন। হয়ে যান এলাকার প্রভাবশালী নেতা।

আজাদের কর্মকান্ড : টাকা ওঠানোর জন্য লোক নিয়োগ দেওয়াসহ সাধারণ ব্যবসায়ীদের মাঝে আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য নিজেরাই মাঝেমধ্যে পুলিশের পোশাক পরে ফুটপাতে নেমে পড়েন। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকসহ বিভিন্ন পিএসের মাধ্যমে পুলিশের ড্রেস পরা ছবি হকারদের মোবাইলে ছড়িয়ে দেওয়াসহ নিজেদের পুলিশ পরিচয় দিতেও সংকোচ বোধ করেন না তারা।

বিনা পরিশ্রমের এই ধান্দায় কেউ বাধা দিলে প্রথমে হুমকি, এতে কাজ না হলে থানায় মিথ্যা অভিযোগ। তাতেও কাজ না হলে যাদের কারণে বছরের পর বছর পেশা টিকে আছে তাদের ধারা হয়রানি। এতেই চুপসে যায় প্রতিবাদী কণ্ঠ, একের পর এক লিখিত আর মৌখিক অভিযোগ আর দলবল নিয়ে খোঁজাখুঁজিতে শেষমেশ ব্যবসা গুটিয়ে পালায় চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। তাই প্রকাশ্যে তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে চান না কোনো ব্যবসায়ী। অনেকটা বাধ্য হয়েই সাধারণ ব্যবসায়ীরা তার হাতে উপার্জিত অর্থ থেকে দৈনিক সর্বনিম্ন ২০০-৫০০ টাকা তুলে দিতেন।

জাকির মোল্লা নামে হাউস বিল্ডিং এলাকার এক ডাব বিক্রেতা বলেন, ‘অল্প পুঁজির ব্যবসা বড় করতে ধারদেনা করে শীতে কাপড়ের ব্যবসায় পুঁজি খাটাই। ঘুর ঘুরে ডাব বিক্রি হলেও কাপড় বিক্রি না হওয়ায় হাউস বিল্ডিং এলাকায় গাড়ি রেখে কাপড় বিক্রি করতে গেলে সারা দিনে ৩৫০ টাকার মতো চাঁদা দিতে হয়। এতে দিনের পর দিন আমার পাঁচ সদস্যের সংসার ধারদেনা আর টানাপড়েনে চলতে থাকে। ধারের পরিমাণ বাড়তে থাকাতে এক দিন চাঁদা দিতে অস্বীকার করি। এতেই ক্ষিপ্ত হয়ে মালামাল রাস্তায় ফেলে দোকান বন্ধ করে দেন রাসেল, আজাদ আর নবী। পুলিশ দিয়ে থানায় ধরে নিয়ে ভয় দেখানো, প্রকাশ্যে মারপিট, মিথ্যা অভিযোগ আর মামলায় বর্তমানে আমি উত্তরা ছাড়া।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আজমপুর রবীন্দ্র সরণির সড়কের এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘প্রতিদিন বিকেলের দিকে একটি হলুদ রঙের নাম্বারপ্লেট ছাড়া আরটিআর মোটরসাইকেল দিয়ে হকার্স লীগ নেতা রাসেল এ লাইনের ৩০০ হকার থেকে ২৮০ টাকা করে টাকা তুলেন। টাকা দিতে একটু দেরি হলে মোটরসাইকেলের চাকা পায়ের ওপরে উঠিয়ে দেন। এ ছাড়াও আমাদের দোকান জোরপূর্বক বন্ধ রেখে উত্তরা ১নং ওয়ার্ডের সরকারদলীয় কমিশনার আফসার উদ্দিন খানের জনসভায় যেতে বাধ্য করেন। কোনো হকার যদি সভাস্থল থেকে কোনো কারণে পালিয়ে আসেন, তাহলে রাজউক মার্কেটের তৃতীয় তলায় কমিশনারের ঘনিষ্ঠ মাজেদ খানের অফিসে নিয়ে মারপিট করা হয়। থানা পুলিশের কাছে এর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করা যায় না। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে টহল পুলিশের গাড়িতে দোকানের মালামালসহ উঠিয়ে দেন। এতে সাধারণ ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়।’

আতিক নামে এক ব্যবসায়ীর অভিযোগ, যুবদল নেতা আজাদ ইয়াবা ট্যাবলেট দিয়ে আমাকে মাদক মামলায় ফাঁসানোর জন্য পুলিশের এক এসআইকে ৫০ হাজার টাকা দেন। কোনো এক কারণে ঘটনাটি ফাঁস হয়ে গেলে টাকার বিনিময়ে তিনি আবার তা দামাচাপা দেন। তার অপরাধ আজাদের অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের প্রতিবাদ করা।

সম্প্রতি ফাঁড়ির ইনচার্জ আলমগীর গাজী আজাদকে লাইন না বুঝিয়ে দিয়ে রনি, সামছু, আজিজুল সর্বশেষ নিজ গ্রামের ছেলে উত্তরা পশ্চিম থানার ক্যাশিয়ার কিশোরগঞ্জের রাসেলকে টাকা উঠানোর দায়িত্ব দেন। আর এতেই ক্ষিপ্ত হয়ে একজন এডিসির কাছে অভিযোগ দেওয়াসহ টাকা লেনদেনের বিষয়টি ফাঁস করে দেন আজাদ।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আজাদ বলেন, ‘চাঁদাবাজির যে অভিযোগ সেটা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এটার সঙ্গে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। যারা আপনাকে বলেছেন, তারা মিথ্যা কথা বলেছেন।’

এ বিষয়ে রাসেল বলেন, ‘আমি চাঁদা উঠাই না। এসব কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িত নই। আমি হকার লীগের সঙ্গে আছি। হকারদের নেতৃত্ব দিই। এর বাইরে আমি কিছুই নই।’

ব্যবসায়ীদের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি গার্মেন্টসে পোশাকের ব্যবসা করি। এই কারণে তাদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ একটু বেশি। তাদেরকে মালামাল দেই, পরে টাকা নিয়ে যাই। যারা আমার বিরুদ্ধে বলেছেন, তারা আমার শত্রু।’

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আজমপুর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ আলমগীর গাজী বলেন, ‘যে বিষয়ে বলেছেন, সেটা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। কারণ আমার কোনো লোক নেই। আজদ, রাসেল, রনি, সামছু নামের কাউকে আমি চিনি না।’ তাহলে ওরা কারাÑএমন বিষয়ে জানতে তিনি বলেন, ‘আপনারা খোঁজখবর নেন, আমি চিনি না।’

ফুটপাতে অবৈধ দোকান বসিয়ে লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায়ের সঙ্গে রাজনৈতিক কোনো সংশ্লিষ্টতা আছে কি নাÑজানতে ১ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার আফসার উদ্দিন খানের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করতে চাইলে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

“প্রতিদিনের সংবাদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত