প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ছিনতাই ঠেকাতে উদাসীন পুলিশ

ডেস্ক রিপোর্ট : রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকার সাতরাস্তার (পোস্ট অফিস রোড) দিন ব্যস্ত সড়কে দুপুরে ছিনতাইয়ের শিকার হন একজন রিকশাযাত্রী সংবাদ কর্মী। ছিনতাইকারীরা তার হাতে থাকা স্বর্ণের আংটি ও মোবাইল ফোন নিয়ে চলে যায়। থানায় গেলে পুলিশ ওই সংবাদকর্মীকে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। এরপর থানায় নিয়ে বলা হয় একটা জিডি করেন। এ ঘটনাটি ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহের। জিডির পর আর কোনো অগ্রগতি নেই। একই ভাবে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকার আহসান উল্ল্যাহ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে সন্ধ্যার দিকে একই ভাবে ছিনতাইয়ের শিকার হন একজন কলেজ ছাত্রী। এ ঘটনায় পুলিশকে জানালেও পুলিশ কোনো ধরনের আইনি পদক্ষেপ নেয়নি। একই ভাবে প্রতিনিয়ত ভোর ও রাতে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে হাতিরঝিল এলাকায়। অথচ এলাকাটি খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর। শুধু তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল নয়, রাজধানীর অধিকাংশ এলাকার চিত্রও একই।

গত ১৪ ডিসেম্বর রাত ১২ টার দিকে মালিবাগ রেলগেট মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্লাব সংলগ্ন রাস্তায় মাথায় চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে এক সংবাদকর্মীর মোবাইল ফোন সেট ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। ওই ছিনতাইয়ের ২০ মিনিট আগে রবিন নামে আরো এক ব্যক্তি একই স্থানে ছিনতাইয়ের শিকার হন। ভুক্তভোগী সংবাদকর্মী শাজাহানপুর থানায় একটি জিডি করেন। এই জিডির তদন্তের কোনো কুল কিনারা হয়নি।

এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, বেশিরভাগ ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলার পরিবর্তে পুলিশ জিডি গ্রহণে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, থানায় ছিনতাইয়ের ঘটনার কথা বললে তাদেরকে বসিয়ে রাখা হয়। এরপর টহল টিম ঘটনাস্থলে পাঠিয়ে দিয়ে এর সত্যতা নিশ্চিত করতে হয়। ভুক্তভোগীরা আরো জানান, গভীর রাতে বা ভোরে ফাঁকা স্থানে ছিনতাইয়ের পর পুলিশ তদন্ত করে কীভাবে নিশ্চিত হবে যে ঘটনা ঘটেছে? এ কারণে অনেক ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীরা মামলা তো দূরের কথা জিডি পর্যন্ত করতে আগ্রহ পান না।

সর্বশেষ গতকাল শুক্রবার ভোর রাতে তিন ঘণ্টার ব্যবধানে রাজধানীর ধানমন্ডি ও গেন্ডারিয়া এলাকায় ছিনতাইকারীদের হাতে নিহত হয়েছেন একজন হাসপাতাল কর্মী ও একজন ব্যবসায়ী। এর আগে গত ১৮ ডিসেম্বর ভোরে ওয়ারীর দয়াগঞ্জে ছিনতাইয়ের সময় মায়ের কোলে থাকা সাত মাসের শিশু আরাফাত পড়ে গিয়ে মৃত্যু হয়। ৫ ডিসেম্বর মোহাম্মদপুরের শাহজাহান রোডে টানা পার্টির কবলে পড়ে মারা যান জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের চিকিত্সক ফরহাদ আলম। ২৯ নভেম্বর বিকালে তিনি কর্মস্থল থেকে রিকশায় মোহাম্মাদিয়া হাউজিং সোসাইটির বাসায় ফেরার পথে ছিনতাইকারীরা টান দিয়ে তার ব্যাগ নিয়ে যায়। এ সময় ছিটকে রাস্তায় পড়ে গুরুতর আহত হন তিনি। গত ৮ অক্টোবর ওয়ারীর কেএম দাস লেনে বাসা থেকে বের হওয়ার পর একশ’ গজের মধ্যে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে নির্মমভাবে খুন হন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র খন্দকার আবু তালহা। এর আগে ৩০ জুন ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে জালাল নামে এক তরুণ খুন হন ওয়ারী এলাকায়।

পুলিশের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, পুলিশ যে প্রক্রিয়ায় ছিনতাইয়ের পরিসংখ্যান নথিবদ্ধ করে তা অত্যন্ত জটিল। পিআরবি অনুযায়ী চারজনের অধিক ব্যক্তি কারও টাকা ছিনিয়ে নিলে তা ‘ডাকাতি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। হাতেনাতে ছিনতাইকারী গ্রেফতার হলে তা ‘দ্রুত বিচার’ আইনের আওতায় ফেলে নথিবদ্ধ করা হয়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) প্রাপ্ততথ্য থেকে জানা যায়, গত চার মাসে রাজধানীতে ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা হয়েছে মাত্র ২১টি। তবে অধিকাংশ ঘটনায় থানা পুলিশ জিডি নিয়ে দায়িত্ব শেষ করেছে। ৪৯টি থানায় এই চার মাসে প্রায় দেড়শ’ ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। ছিনতাইকারীরা কয়েকটি ধাপে তাদের অপারেশন সম্পন্ন করে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংক, আর্থিক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে ছিনতাইকারীদের কাছে গোপনে অর্থ পরিবহনের তথ্য আগাম জানিয়ে দেওয়া হয়। এরপর ভুয়া নম্বর প্লেটের গাড়ি নিয়ে ছিনতাইকারীরা অপারেশনের পরিকল্পনা সাজায়। ছিনতাইকারী চক্রের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ ও রেসকিউ টিম রয়েছে। অপারেশন সফল হলে জড়িত সবার মধ্যে টাকা ভাগবাটোয়ারা করে দেওয়া হয়। অনেক সময় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নকল পোশাক পরে ছিনতাই করা হয়।

ছিনতাইকারী চক্র ছিনতাই কাজে ব্যবহার করছে মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেল। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ‘টানা পার্টি’র দৌরাত্ম্য, যারা ছোঁ মেরে ব্যাগ, মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, স্বর্ণালংকার, ভ্যানিটি ব্যাগ, হাতব্যাগ ছিনিয়ে নেয়। ছিনতাইয়ের এরকম স্পট রয়েছে প্রায় দেড়শ’। এর মধ্যে ভয়ঙ্কর জোন হচ্ছে রাজধানীর শাপলাচত্বর থেকে টিকাটুলি মোড়, গোপীবাগের রাস্তা, মতিঝিল কালভার্ট রোড হয়ে আরামবাগ, মতিঝিল টিএন্ডটি কলোনির পাশের রাস্তা, পীরজঙ্গির মাজার, সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের আশপাশের এলাকা, যাত্রাবাড়ী মোড়, জুরাইন রেলগেট থেকে পোস্তগোলা ব্রিজ, পুরনো পল্টন মোড়, কাকরাইল মোড় থেকে রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতাল মোড়, রাজারবাগ পূর্বপাশের মোড় থেকে শাহজাহানপুর রেললাইন, মালিবাগ রেলগেট থেকে খিলগাঁও ফ্লাইওভারের নীচ পর্যন্ত, মত্স্য ভবন থেকে শাহবাগ মোড়, দোয়েল চত্বর থেকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের রাস্তা, নিউ মার্কেটের দক্ষিণ দিকের রাস্তা, আজিমপুর মোড়, ধানমন্ডি ২ নম্বর রাস্তা, গ্রীণ রোড, পান্থপথ মোড় থেকে রাসেল স্কয়ার, আগারগাঁও ক্রসিং থেকে শ্যামলী শিশু মেলা, আগারগাঁও তালতলা, টেকনিক্যাল মোড় থেকে মিরপুর-১ নম্বর গোলচক্কর, মহাখালী থেকে তেজগাঁও সাতরাস্তা মোড়, এফডিসি ক্রসিং, হাতিরপুল, কমলাপুর, মানিকনগর, যাত্রাবাড়ী শহীদ ফারুক রোড, গেন্ডারিয়া রেলস্টেশন সংলগ্ন এলাকা, সায়দাবাদ বাস টার্মিনালের সামনের রাস্তা, জনপদ মোড়, মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড, পল্লবীর বেড়িবাঁধ, আব্দুল্লাহপুরসহ বেশ কয়েকটি পয়েন্ট।

ওসিরা গা ছাড়া

অভিযোগ রয়েছে রাজধানীর ৫১ থানার কর্মরত ওসিরা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছেন না। সন্ধ্যার পর অধিকাংশ থানায় দেখা যায় ওসি এলাকার সরকার দলীয় নেতাদের সঙ্গেই বেশি খোশ মেজাজে গল্প করতে ব্যস্ত থাকেন। ডিএমপির উত্তরা বিভাগ ও তেজগাঁও বিভাগের একাধিক ওসি রয়েছেন যারা খোদ ডিসির নির্দেশনা পর্যন্ত মানেন না। উত্তরা বিভাগের একজন ওসি রয়েছেন যিনি খোদ নিজ অফিসের চেয়ারে বসে থেরাপি নিতে ব্যস্ত থাকেন। সন্ধ্যার পর কেউ থানায় গেলে তিনি থেরাপি চেয়ারে বসেই টেনে টেনে কথা বলেন। এই ওসি এতোটাই ‘ক্ষমতাধর’ যে একজন চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য ডিএমপি’র একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্তকর্তা তাকে কঠোর ভাষায় নির্দেশ দেন। অথচ ভুক্তভোগী ব্যক্তি থানায় গিয়ে ওই ওসির সঙ্গে দেখা করেন। ওসি চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছেন, তবে তা ৫০ হাজার টাকার বিনিময়। অপরদিকে তেজগাঁও বিভাগের একজন ওসি আছেন যিনি এলাকার রাজনৈতিক নেতাদের ছাড়া কথা বলেন না।

ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (অপরাধ) কৃষ্ণপদ রায় বলেন, রাজধানীতে ছিনতাই ঠেকাতে ইতিমধ্যে টহল বাড়ানোর পাশাপাশি নিরাপত্তা চৌকি বসিয়ে তল্লাশি চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার। পুলিশ সে মোতাবেকই টহল দিচ্ছে। গতকাল ওয়ারী ও ধানমন্ডি এলাকায় ছিনতাইকারীদের হাতে দুইজন নিহত হবার ঘটনায় তিনি বলেন, মাদক সেবিরাই এখন এসব ছিনতাই ঘটাচ্ছে। পুলিশের এ কর্তকর্তা ছিনতাই বেড়েছে মানতে নারাজ। তিনি বলেন, এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। পুলিশ ছিনতাইকারীদের ধরতে কাজ করছে। ইত্তেফাক

সর্বাধিক পঠিত