প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ভয়ঙ্কর ছিনতাইয়ে বাড়ছে আতঙ্ক

ডেস্ক রিপোর্ট : ছিনতাইকারীদের হাতে নিহত হেলেনা ও ইব্রাহিম দ্রুতগতির গাড়ি, মোটরসাইকেলে রাজধানীর মহাসড়ক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ভয়ঙ্কর ছিনতাইকারী। ব্যবহার করছে অস্ত্র। সাধারণ পথচারীদের হাতে থাকা ব্যাগ, গায়ের গহনা টেনে মুহূর্তে উধাও হয়ে যাচ্ছে তারা। আর বাধা এলেই হারাতে হচ্ছে প্রাণ। অস্ত্রের আঘাত ক্ষতবিক্ষত হচ্ছেন পথচারী। শুক্রবার ছিনতাইকারীদের নিষ্ঠুরতায় প্রাণ গেছে এক গৃহবধূ ও এক ব্যবসায়ীর।

ধানমন্ডি এলাকায় এদিন ভোরে গাড়িতে করে ব্যাগ ছিনতাইয়ের সময় গাড়ির চাকায় পিষে হত্যা করে হেলেনা নামের এক নারীকে যিনি একটি বেসরকারি হাসপাতালের কর্মী ছিলেন। অন্যদিকে সায়েদাবাদ এলাকায় ছিনতাইকারীদের ছুরিতে রক্তাক্ত হয়ে দৌড়ে হাসপাতাল পর্যন্ত গিয়েছিলেন ব্যবসায়ী ইব্রাহিম। কিন্তু ছিনতাইকারীদের নিষ্ঠুরতার শিকার এ ব্যবসায়ী প্রাণে বাঁচতে পারেননি। এর আগে কয়েকটি ঘটনায় এভাবে ছিনতাইকারীদের নির্মমতার শিকার হয়েছেন আরো কয়েকজন নারী ও পুরুষ। ছিনতাইয়ের শিকার কারও মৃত্যু হলে বা বড় কোনো অঘটন হলেই এর তথ্য পাওয়া যায়। এর বাইরে প্রতিদিনই নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে নিয়মিত ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। ছিনতাইয়ে ব্যবহার হচ্ছে প্রাইভেট কার বা মোটরসাইকেল। কোথাও কোথাও থাকছে সংঘবদ্ধ চক্র। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ছিনতাইকারীরা তাদের ছিনতাইয়ের ধরনও পাল্টাচ্ছে। প্রায় প্রতিদিনই নগরীর কোথাও না কোথাও অভিনব কায়দায় ছোট বড় ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। টাকা, স্বর্ণ, মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ ও গাড়ি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে অহরহ।

গত ১৩ই জানুয়ারির ঘটনা। ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলার সামনে থেকে ৪ ব্যক্তি একটি সিএনজি অটোরিকশা ভাড়া করে। চালককে তারা ফার্মগেট যাওয়ার কথা বলে। সড়কে তীব্র যানজট থাকায় গন্তব্যে পৌঁছাতে বিলম্ব হচ্ছিল। এই সুযোগে যাত্রীরা চালকের সঙ্গে খোশগল্পে মেতে উঠে। ফার্মগেট পৌঁছার পর তারা চালককে চা খাওয়ার প্রস্তাব দেয়। চালক রাজি হলে কৌশলে চায়ে কিছু একটা মিশিয়ে দেয় তারা। এতে ধীরে ধীরে সিএনজি চালক ইসকেন্দার নিস্তেজ হতে থাকেন। অসুস্থ হওয়ার কথা বলে তারাই তাকে হাসপাতালে নেয়ার নাম করে সিএনজিতে তুলে। পরে মানিক মিয়া এভিনিউয়ে তাকে ফেলে দিয়ে সিএনজি নিয়ে চলে যায়। পরে ইসকেন্দার সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। এ নিয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় একটি হত্যা মামলা করা হয়।

ক্লুলেস এই মামলা নিয়ে গোয়েন্দারা কাজ করে ২ জনকে গ্রেপ্তার করে। একই সঙ্গে তাদের কাছ থেকে চুরি করা সিএনজিও উদ্ধার করা হয়েছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন তারা মূলত ছিনতাইকারী। এভাবেই তারা মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে ছিনতাই করে। শুধু ইসকেন্দার নন গত বছরের ২৯শে নভেম্বর কর্মস্থল থেকে বাসায় ফেরার পথে টানা পার্টির কবলে পড়ে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিউটের চিকিৎসক ফরহাদ আলম মারা যান। মোহাম্মদপুরের শাহজাহান রোডে রিকশা করে যাওয়ার পথে ছিনতাইকারীরা তার ব্যাগ ধরে টান দেয়। এতে তিনি ছিটকে মাটিতে পড়ে যান। আহত অবস্থায় তিনি একটি হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ৫ই ডিসেম্বর তিনি মারা যান। ওদিকে শুক্রবার হেলেনাকে গাড়ির চাকায় পিষে হত্যা করার ঘটনায় পুলিশ এখনো কাউকে আটক করতে পারেনি।

ধানমন্ডি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুল লতিফ বলেন, ভিডিও ফুটেজে তেমন কিছু পাওয়া যায়নি। শুধু একটি গাড়ি দেখা গেছে। এছাড়া নাম্বার প্লেট বা ভেতরে কে আছে এ ধরনের কিছুই দেখা যায়নি। তবে আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি এই ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করে শাস্তির আওতায় আনার। ওদিকে সায়েদাবাদে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে খুলনার ওয়ার্কশপ ব্যবসায়ী মো. ইব্রাহিম নিহতের ঘটনায় গতকাল একজনকে আটক করেছে গোয়েন্দারা। গত পহেলা জানুয়ারি মিরপুর এলাকায় এক নারীর ব্যাগ টান দিয়ে ধরা পড়ে এক ছিনতাইকারী। তার কাছ থেকে মেলে ছিনতাইয়ের চাঞ্চল্যকর তথ্য-প্রমাণ। পুলিশ তাকে নিয়ে মিতালী হাউজিং এর ১৬ নম্বর বাসায় অভিযান চালালে ৬০টি ব্যাগ, বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালঙ্কার, ডেভিট ও ক্রেডিট কার্ড, ২৫০টি বাসার চাবি, জাতীয় পরিচয়পত্রসহ আরো মূল্যবান অনেক জিনিস পাওয়া যায়। পুলিশ জানিয়েছে, এই ছিনতাইকারী সড়কে নারীদের ব্যাগ টেনে নিয়ে পালাতো।

গত ৮ই অক্টোবর টিকাটুলিতে এক শিক্ষিকাকে ছিনতাইকারীর কবল থেকে বাঁচাতে গিয়ে খুন হন ড্যাফোডিল ইউনিভাসির্টির শিক্ষার্থী খন্দকার আবু তালহা । ১০ই ডিসেম্বর রাতে ওয়ারীতে শাহীদা নামের এক নারীর পায়ে গুলি করে টাকাসহ হাতব্যাগ ছিনিয়ে নেয় ছিনতাইকারীরা। গত ১৮ই ডিসেম্বর রাজধানীর দয়াগঞ্জ এলাকায় ছিনতাইয়ের সময় মায়ের কোল থেকে পড়ে নিহত হয় সাত মাসের শিশু আরাফাত।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র বলছে, রাজধানীর শতাধিক স্পটে প্রায় দেড় শতাধিক ছিনতাইকারী চক্র এখন সক্রিয়। প্রতিটি চক্রে ১০ থেকে ১৫ জন করে সদস্য আছে। এদের মধ্যে কিছু চক্র টানা পার্টি নামে পরিচিত। তারা পথচারীদের কাছে থাকা ভ্যানিটি ব্যাগ, ল্যাপটপের ব্যাগ ও মোবাইল ধরে টান দিয়ে দৌড়ে পালায়। আবার কিছু চক্র পিস্তল ও ছুরি ঠেকিয়ে ছিনতাই করে থাকে। এই চক্রের মধ্যে কিছু আবার প্রাইভেট কার বা মোটরসাইকেল নিয়ে ছিনতাইয়ে নামে। তারা দাপিয়ে বেড়ায় নির্ধারিত এলাকায়। বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলাবাহিনী ছিনতাইকারী চক্রের সদস্যদের আটক করে। কিন্তু তারা জামিনে বের হয়ে আবার ছিনতাইয়ের কাজে নেমে পড়ে।

রাজধানীর ছিনতাই প্রবণ এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে যাত্রাবাড়ী মোড়, জুরাইন রেলগেইট, পোস্তগোলা ব্রিজ ও আশেপাশের এলাকা, কমলাপুর রেলস্ট্রেশন ও পীরজঙ্গি মাজার এলাকা, টিকাটুলি মোড়, গোপীবাগ এলাকা, মতিঝিল কালভার্ট রোড, আরামবাগ, সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল, দয়াগঞ্জ পুরান পল্টন মোড়, কাকরাইল মোড়, রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতাল এলাকা, পুলিশ লাইন থেকে শাহজানপুর, খিলগাঁও রেলগেইট থেকে তেজগাঁও রেললাইন, ফার্মগেট ওভার ব্রিজ এলাকা, তেজতুরি বাজার, তেজকুনি পাড়া, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকা, মৎস্য ভবন, শিশুপার্ক ও শাহবাগ মোড়, দোয়েল চত্বর থেকে চাঁনখারপুল, আজিমপুর, নিউমার্কেটের দক্ষিণের রাস্তা, গাবতলী থেকে টেকনিক্যাল হয়ে দারুসসালাম, মিরপুর গোল চত্বর, বিআরটিএ এলাকা, ভাসানটেক, কামরাঙ্গীরচর এলাকা, মিরপুর বেড়িবাঁধ, খিলক্ষেত থেকে বিমানবন্দর, বনশ্রী থেকে ডেমরা রোডগুলো ছিনতাইয়ের ডেঞ্জার জোন নামে পরিচিত। এসব স্থানে প্রকাশ্য দিনদুপুরে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর থেকে এসব স্থান দিয়ে পথচারীদের আসা-যাওয়ায় আতঙ্ক বিরাজ করে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত দুই মাসে অন্তত ২ শতাধিক ভুক্তভোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেকই প্রাথমিক চিকিৎসা আবার অনেকেই দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা নিয়েছেন।

ঢামেকের জরুরি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চিকিৎসা নিতে আসা বেশিরভাগই ছুরির আঘাতের রোগী। সাধারণ জখম হলে প্রাথমিক চিকিৎসা আর মারাত্মক জখমের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা নিচ্ছেন অনেকে। এর বাইরে ছোটখাটো আঘাতের জন্য বেসরকারি হাসপাতালেও যান অনেকে। তবে ছিনতাইয়ের ঘটনার শিকার ভুক্তভোগীরা অনেকেই থানা পুলিশের ঝামেলা এড়ানোর জন্য মামলা করতে চান না বলে জানিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। অহরহ মানুষ ছিনতাইয়ের শিকার কিন্তু থানায় অভিযোগ দায়েরের সংখ্যা নেই বললেই চলে। রক্তাক্ত জখম বা প্রাণহানি হলেই কেবল মামলা হয় থানায়। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ছিনতাইয়ের ঘটনাগুলোর সঙ্গে জড়িতদের আটকের জন্য বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, অভিযানে বিভিন্ন সময় বেশকিছু ছিনতাইকারীকে আটক করে শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। এছাড়া ছিনতাইকারীদের ধরার জন্য শহরের বিভিন্ন স্থানে সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত