প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মালদ্বীপের এফটিএ: ভারতের জন্য ধাক্কা, প্রভাব বাড়িয়েছে চীন

সুধা রামচন্দ্রন : চীনের সাথে মালদ্বীপ সম্প্রতি মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি (এফটিএ) করায় প্রতিবেশী এলাকায় ভারতীয় প্রভাব বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। বেইজিংয়ে মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ ইয়ামিনের চার দিনের সফরকালে ৮ ডিসেম্বর চুক্তিটি সই হয়। কোনো দেশের সাথে মালদ্বীপের এ ধরনের চুক্তি এটিই প্রথম। চীনের সাথে পাকিস্তানের এফটিএ সই করার পর দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় দেশ হিসেবে মালদ্বীপ এ ধরনের চুক্তি করল।

এফটিএ ছাড়াও চীনের উচ্চাভিলাষী বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) গুরুত্বপূর্ণ উপাদান মেরিটাইম সিল্ক রোড-সম্পর্কিত সমঝোতা স্মারকে সই করেছে। ইয়ামিনের সফরকারলে সই হওয়া অন্যান্য চুক্তি স্বাস্থ্য, পর্যটন, প্রযুক্তি ও জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন খাতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা আরো গভীর করবে।

ভারত মহাসাগরের ১২ শ’ দ্বীপ নিয়ে গঠিত মালদ্বীপের কৌশলগত বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। তার কাছ দিয়েই আন্তর্জাতিক নৌ রুট বয়ে গেছে। এই রুট দিয়ে বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ তেল এবং অর্ধেক কন্টেইনার চলাচল করে। ভারতের লাক্ষাদ্বীপ থেকে দেশটি মাত্র ৭০০ কিলোমিটার দূরে এবং ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে মাত্র ১২ শ’ মাইল ব্যবধানে অবস্থিত।

ভারত ও মালদ্বীপের মধ্যকার সম্পর্ক কয়েক শ’ বছর প্রাচীন। ১৯৬৫ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশ শাসন অবসানের পর স্বাধীন মালদ্বীপের সাথে ভারতের সম্পর্ক আরো গভীর হয়। এটি আরো বেগ পায় ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে। মালদ্বীপের অর্থনীতি নির্মাণ ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় ভারত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মামুন আবদুল গাইয়ুমের (বর্তমান প্রেসিডেন্টের সৎভাই) স্বৈরতান্ত্রিক শাসনকে সমর্থন করেছিল ভারত, তাকে তিন দশক ধরে ক্ষমতায় থাকতে সহায়তাও করেছিল। ১৯৮৮ সালে গাইয়ুমকে উৎখাত করার একটি অভ্যুত্থানচেষ্টা দমন করতে সৈন্য পর্যন্ত পাঠিয়েছিল ভারত।

ভারতের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদের ২০১২ সালের নির্বাচনে হেরে বিদায় নেয়ার পর দেশটিতে ভারতের প্রভাব ম্লান হতে শুরু করে। নাশিদের আমলে মালে বিমানবন্দর উন্নয়নকরণের জন্য ভারতের জিএমআরের সাথে সই করা একটি অবকাঠামো চুক্তি হঠাৎ করেই বাতিল করে দেয় তার উত্তরসূরি। চুক্তিটি এরপরপরই দেয়া হয় চীনা রাষ্ট্রায়ত্ত একটি কোম্পানিকে।

তবে ২০১১ সাল পর্যন্ত চীনের পররাষ্ট্রনীতিতে মালদ্বীপ অগ্রাধিকারমূলক অবস্থানে ছিল না, মালেতে চীনা দূতাবাস পর্যন্ত ছিল না। অবশ্য ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সফরের পর থেকে চীন-মালদ্বীপ সম্পর্কে ব্যাপক অগ্রগতি হয়। বিশেষ করে মালদ্বীপের পর্যটন ও অবকাঠামো নির্মাণ খাতে চীনা উপস্থিতি সম্প্রসারিত হয়। মালদ্বীপে চীনা পর্যটকের সংখ্যা ইউরোপিয়ানদের ছাড়িয়ে যায়। মালে ও হুলহুলে দ্বীপের মধ্যে ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ এবং সাগর থেকে ভূমি উদ্ধার করে হুলহুলে এক হাজার এপার্টমেন্ট নির্মাণের মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে চীন।

এফটিএ ও বিআরআই মালদ্বীপের অর্থনীতিতে চীনা ভূমিকা বাড়াবে।

এফটিএর অধীনে ৯৫ ভাগ পণ্যের কর শূন্যে নামিয়ে আনবে। তাছাড়া অর্থনীতি, স্বাস্থ্যপরিচর্যা, পর্যটনের মতো খাতগুলো খুলে দেওয়া হবে।

মালদ্বীপর অর্থনৈতিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, এই চুক্তির ফলে তারা ২০১৮ সালে ৪০ লাখ ডলার কর হারাবে। তবে ‘বাণিজ্য সৃষ্টি’ ও ‘বাণিজ্য সম্প্রসারণের’ ফলে তারা এর চেয়েও বেশি আয় করতে পারবে।

এফটিএর ফলে মালদ্বীপের মৎস্য খাতও চাঙা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের পর্যটন খাতও ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বর্তমানে বছরে যেখানে ১৫ লাখ পর্যটক আসে, চুক্তির ফলে তা বেড়ে ৭০ থেকে ৮০ লাখ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর এসব পর্যটককে ধরে রাখতে বিপুল মাত্রায় অবকাঠামো নির্মাণ করা প্রয়োজন।

অবশ্য এই চুক্তি পার্লামেন্টে পাস করানোর জন্য ইয়ামিন যে ধরনের তড়িঘড়ি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন, তা নিয়ে দেশটিতে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

এফটিএর বিরোধীরা বলছে, এটি আসলে চীনা ঋণের ফাঁদ। ইতোমধ্যেই মালদ্বীপের মোট ঋণের ৭০ ভাগই হয়ে পড়েছে চীনের কাছ থেকে নেয়া। মালদ্বীপের বাজেটের ২০ ভাগই আসে চীনা ঋণে। এই অভিযোগ করেছেন নাশিদ। টাইমস অব ইন্ডিয়াকে তিনি এ তথ্য জানিয়েছেন।

শ্রীলংকাতেও একই ঘটনা ঘটেছে। শ্রীলংকার অবকাঠামো খাতে চীন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ঋণ দিচ্ছে। বড় বড় প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে হাম্বানতোতার বন্দর ও কাছের একটি বিমানবন্দর নির্মাণ। বিমানবন্দরটি পর্যাপ্ত ব্যবসা করতে না পারায় শ্রীলংকা ৮ বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধ করতে পারেনি। পরিণতিতে তাকে হাম্বানতোতা বন্দরটি চীনকে ৯৯ বছরের জন্য ইজারা দিতে হয়েছে।

পাকিস্তানেও একই ঘটনা ঘটছে। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি) নির্মাণের জন্য চীনের কাছ থেকে ৯০ বিলিয়ন ডলার ঋণ গ্রহণ করেছে পাকিস্তান। আগামী ৩০ বছরের মধ্যে এই অর্থ পরিশোধ করতে হবে। পাকিস্তান ইতোমধ্যেই তার গোয়াদর বন্দরটি চীনের কাছে হস্তান্তর করেছে ৪০ বছরের জন্য। চুক্তি অনুযায়ী, বন্দরটির পরিচালনা করে এর ৯১ ভাগ রাজস্ব চীনা রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি চায়না ওভারসিস পোর্ট হোল্ডিংস কোম্পানি গ্রহণ করবে। অর্থাৎ আগামী চারটি দশক বন্দরটির ওপর পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। ঋণ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে চীনা তহবিলপুষ্ট আরো অনেক প্রকল্প চীনকে দিয়ে দিতে হবে।

ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, চীনা ঋণের ফাঁদে পড়ে মালদ্বীপকেও একই পরিণতি বরণ করতে হতে পারে। নয়া দিল্লি মনে করছে, মালদ্বীপে চীন তার নৌ উপস্থিতি ঘটানোর জন্য চাপ দিতে পারে। ২০১৭ সালে মালেতে চীনা রণতরী নোঙর করার অনুমতি দিয়েছে মালদ্বীপ।

তবে ভারতের উদ্বেগ হ্রাসের জন্য মালদ্বীপ তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ আসিমকে নয়া দিল্লি পাঠায়। তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের সাথে বৈঠকের পর জানান, তার সরকার ‘ইন্ডিয়া ফার্স্ট পলিসি’র ওপর গুরুত্ব দেয় এবং ভারতের সাথে সম্পর্ক রক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান করে।

ইয়ামিনও একই ধরনের মন্তব্য করেছিলেন ডিসেম্বরে বেইজিং সফরকালে। তিনি বলেন, মালদ্বীপের ঘনিষ্ঠতম মিত্র, সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উন্নয়ন অংশীদারদের মধ্যে তারা ‘চীনকে গণ্য’ করে। তাই কাজে না হলেও কথার মাধ্যমে মালদ্বীপ ভারত ও চীনের মধ্যে সতর্ক ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা চালাচ্ছে।

লেখক: ভারতীয় সাংবাদিক ও গবেষক।

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত