প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নির্বাচনে গুরুত্ব পাচ্ছে সরকারের ১০ মেগা প্রকল্প

তারেক : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গুরুত্ব পাচ্ছে ফার্স্ট ট্র্যাক প্রজেক্ট নামে সরকারের হাতে নেওয়া ১০ মেগা প্রকল্প। নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে ততই ওই সব প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজে উচ্চপর্যায়ের তদারকি বাড়ছে। সরকারের নীতি-নির্ধারকরা চান, এই গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণকাজের অগ্রগতি নির্বাচনের আগে জনসাধারণের সামনে তুলে ধরতে। তাই উচ্চপর্যায়ের তদারকিতে ১০ মেগা প্রকল্পের কাজে আগের চেয়ে গতিও বেড়েছে।

১০ মেগা প্রকল্প হলো– পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প, বঙ্গোপসাগরের সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্প, পদ্মা রেলসেতু সংযোগ প্রকল্প, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ও দোহাজারী থেকে গুনদুম পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ প্রকল্প, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন প্রকল্প, রামপাল মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্রজেক্ট, মাতারবাড়ি আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কোল ফায়ার্ড পাওয়ার প্রজেক্ট, ঢাকা মাস র‌্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প (মেট্রোরেল), এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ ও পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্প।

সরকারের বাজেট পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এবারও মেগা প্রকল্পগুলোয় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাওয়া ১০টি মেগা প্রকল্পের জন্য ৩২ হাজার ৫৩১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এটি মোট উন্নয়ন বাজেট বা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ২১ দশমিক ২১ শতাংশ। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১০ হাজার ১৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৭ হাজার ৬১০ কোটি টাকার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ‘পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ’ প্রকল্পে। বরাদ্দের ক্ষেত্রে তৃতীয় সর্বোচ্চ স্থানে রয়েছে ‘পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ’ প্রকল্প। এ প্রকল্পে ৫ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরে সংশোধিত এডিপিতে এ প্রকল্পে বরাদ্দ রয়েছে ৪ হাজার ৬৭৪ কোটি ১০ লাখ টাকা। ঢাকার যানজট নিরসনে চলমান মেট্রোরেল প্রকল্পের জন্য ৩ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা এবং মাতারবাড়ি (২৬০০) মেগাওয়াট আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কোল্ড ফায়ার পাওয়ার প্রজেক্টের জন্য দেওয়া হয়েছে ২ হাজার ২২০ কোটি টাকা। দোহাজারী থেকে রামু হয়ে গুনদুম পর্যন্ত রেল নির্মাণ প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্পের জন্য এবছর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৪০০ কোটি টাকা। রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকার সামান্য কিছু অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মাত্র ১ কোটি টাকা।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ১০ প্রকল্পই সরকারের অগ্রাধিকারে রয়েছে। এর মধ্যে বেশি অগ্রাধিকার পাচ্ছে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প। মহাজোট সরকারের শুরুর দিকেই এ প্রকল্প নেওয়া হয়। দুর্নীতির অভিযোগে বিশ্বব্যাংক ২০১১ সালে এ প্রকল্প থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়। শেষপর্যন্ত সরকার নিজস্ব অর্থায়নে এ সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয় এবং প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকার পর ২০১৩ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত দরপত্র আহ্বান করা হয়। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতু নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকা। ইতোমধ্যে গত ৩০ সেপ্টেম্বর সেতুতে প্রথম স্প্যান ওঠেছে। সেতুর দ্বিতীয় স্প্যানও ওঠার অপেক্ষায় রয়েছে। মূল সেতুর ৫১ শতাংশ ও সার্বিক সেতুর কাজ ৫৬ শতাংশ শেষ হয়েছে। ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সেতুর মূল অংশের নির্মাণকাজ শেষ করার পরিকল্পনা নিয়ে সংশ্লিষ্টরা কাজ করছে।

রাজধানীর যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ ও যানজটমুক্ত করতে ২০১২ সালে মেট্রোরেল প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। ওই বছরই প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন পায়। জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেটিভ এজেন্সি (জাইকা) ও বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে এ প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় হবে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাইকা ১৬ হাজার ৫৯৫ কোটি ও বাকি ৫ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা সরকার নিজস্ব তহবিল থেকে জোগান দেবে। প্রকল্পটির কাজ চলছে। এমআরটি-৬ প্রকল্পের দৈর্ঘ্য হচ্ছে উত্তরা তৃতীয় প্রকল্প থেকে আগারগাঁও হয়ে মতিঝিল পর্যন্ত। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, ২০১৯ সালের মধ্যে উত্তরা তৃতীয় প্রকল্প থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত বাণিজ্যিকভাবে মেট্রোরেল চলাচল শুরু হবে। বাকি কাজ কয়েক ধাপে ২০২২ সালে শেষ হবে।

কক্সবাজারের সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছে ৬টি দেশ। দীর্ঘদিন ধরে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের ব্যাপারে আগ্রহ দেখাচ্ছে সরকার। পরবর্তী সময়ে কক্সবাজারের কাছে বঙ্গোপসাগরের সোনাদিয়ায় এই সমুদ্রবন্দর নির্মাণের স্থান ঠিক করা হয়। সরকারের অগ্রাধিকারে থাকা প্রকল্পগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম।

রাশিয়ান ফেডারেশনের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ ও রুশ সরকারের মধ্যে ২০১১ সালের ২ নভেম্বর একটি দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা চুক্তি সই হয়। এ প্রকল্পে ২০২২ সালের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এ চুক্তির আওতায় পরমাণু শক্তি কমিশন ও রাশিয়ান ফেডারেশনের এটমস্ট্রয় এক্সপোর্টের মধ্যে স্বতন্ত্র আরও তিনটি চুক্তি হয়েছে। চার ধাপে এ প্রকল্পের কাজ শেষ হবে। ইতোমধ্যেই এ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রায় একলাখ কোটি টাকা ব্যয় হবে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে। ২০২৪ সালের মধ্যে এ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার লক্ষ্যস্থির করা রয়েছে।

লিকুইড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পটি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করেছে সরকার। দেশের গ্যাস সংকট নিরসনে এ প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। প্রতিদিন ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আমদানির জন্য টার্মিনালটি নির্মাণ করা হবে। সাড়ে ১৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে এ প্রকল্প বাস্তবায়নে।

অনেক আলোচনা-সমালোচনার পরও সরকার রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নে নিজের অবস্থানে অনড় রয়েছে। জানতে চাইলে এ প্রকল্পের পরিচালক রবীন্দ্রনাথ জানান, প্রকল্পের কাজ চলছে। প্রকল্পের ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের কাজসহ বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ হচ্ছে।

ঢাকা-ভাঙ্গা ও ভাঙ্গা-যশোর রেললিংক বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকা। এ রেলপথ নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হলে ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত দূরত্ব হবে ১৬৬ কিলোমিটার।

পর্যটন শিল্পকে উৎসাহিত করতে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে যোগাযোগ সহজ ও আরামদায়ক করতে দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু থেকে মিয়ানমারের কাছে গুনদুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েল-গেজ ট্র্যাক নির্মাণ প্রকল্পটি এরই মধ্যে একনেক বৈঠকে অনুমোদন পেয়েছে। প্রকল্পটির কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এ প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে এডিবি দেবে ১৪ হাজার কোটি টাকা। বাকি টাকা সরকার তার নিজস্ব তহবিল থেকে জোগান দেবে। আগামী ২০২২ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়নের কাজ শেষ হবে বলে আশা করছে সরকার।

মাতারবাড়ী প্রকল্পের অধীনে মহেশখালীর-মাতারবাড়ী ও ধলঘাটা ইউনিয়নে ৬০০ মেগাওয়াট করে ১২শ’ মেগাওয়াটের দু’টি আলট্রাসুপার ক্রিটিক্যাল কোল ফায়ার্ড পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণ হবে। এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা।

পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ ২০২৩ সাল নাগাদ শেষ হবে বলে লক্ষ্যস্থির করা হয়েছে। এ প্রকল্পের কাজ চলছে। এখানে বন্দরসহ সরকার অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের কাজও চলমান রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, ‘দেশের উন্নয়ন ও অর্থনীতিতে এই ১০ প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। প্রকল্প ১০টি বাস্তবায়ন হলে দেশের চেহারা বদলে যাবে। তাই সরকার অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে এসব প্রকল্পে অর্থায়ন অব্যাহত রাখবে এবং এসব প্রকল্প বাস্তবায়নকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।’ অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, ‘নিয়মিত বৈঠকের মাধ্যমে এই প্রকল্পগুলো ১০টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অধীনে বড় এডিপিতে বরাদ্দের প্রকল্প বাস্তবায়নে নিরীক্ষণ করা হয়েছে।’ বাংলা ট্রিবিউন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত