প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ভারতের ৮৩ বিলিয়ন ডলারের দুগ্ধশিল্পকে হুমকিতে ফেলেছে গো-মাতা

অনিন্দা উপাধ্যায় : নয়া দিল্লির উপকণ্ঠে একটি নার্সিং হোম রয়েছে। এখানে বিনা পয়সায় খাওয়া ও থাকার সুযোগ রয়েছে, এর হাসপাতালটিও বেশ সমৃদ্ধ। ৩০০ কর্মী অতিথিদের সব প্রয়োজন মেটানোর জন্য সদা-প্রস্তুত। অতিথিরা হলো গরু।

শ্রীকৃষ্ণ গোশালাটির আয়তন ৩৭ একর। হাঁস চড়ানোর একটি পুকুর আছে এতে। বার্ষিক বাজেট ১৫০ মিলিয়ন রুপি (২৪ লাখ ডলার)। এটি ভারতজুড়ে পরিত্যক্ত, অসুস্থ ও উৎপাদনক্ষমতা হারিয়ে ফেলা গরুদের জন্য তৈরি হাজার হাজার গোশালার একটি। গত মে মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার ভারতজুড়ে বাজারগুলোতে পশু বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির পদক্ষেপ গ্রহণের পর এসব গোশালার অবস্থা ফুলে ফেঁপে ওঠে।

ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের কাছে গরু পবিত্র বিবেচিত হয়। মোদির হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) ২০১৪ সালের জয়, গো-রক্ষক গ্রুপগুলোকে আরো সাহসী করে তোলে। তারপর থেকে গরু ব্যবসায়ীদের ওপর হামলা বাড়তে থাকে। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট মে মাসে নিষেধাজ্ঞার ওপর স্থগিতাদেশ দিলেও গো-রক্ষাকারী অনেক গ্রুপ কোনো না কোনোভাবে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কোনো কোনো রাজ্য গরু জবাইয়ের ওপর নিজস্ব বিধিনিষেধ জারি করেছে, অনেক রাজ্য আবার আগের নিয়ম কঠোর করেছে।

এতে কেবল গোশালা বা চামড়ার ট্যানারিগুলোই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না। বুড়িয়ে যাওয়া গরুগুলোকে কসাইখানায় পাঠিয়ে দিয়ে বাড়তি কিছু আয় করতে চাওয়া ভারতের ৫.৩ ট্রিলিয়ন ডলারের দুগ্ধ শিল্পটি এখন ওই সুযোগ হারিয়ে তাদের গরুর পাল বড় করার কাজে কমই উৎসাহ পাচ্ছে। এতে করে দুধ সরবরাহ বাড়ানোর সরকারি পরিকল্পনা হুমকির মুখে পড়েছে।

উত্তর প্রদেশের ৬২ বছর বয়স্ক পুরানমাসি ভার্মা বলেন, হাটে এখন আর গরুর চাহিদা নেই। আমরা গরুগুলোকে রাস্তায় ছেড়ে দিলে সেগুলো আমাদের ফসল নষ্ট করে। তিনি নিজে দুটি গরু আর তিনটি মহিষের মালিক। এখন তিনি কেবল মহিষের ওপর নির্ভর করতে চান।

এমনকি গত দুই দশকে দুগ্ধজাত সামগ্রীর চাহিদা বছরে গড়ে ৪.৩ ভাগ হারে বাড়লেও দেশটির সাত কোটি ছোট আকারের ডেইরি ফার্মের মালিকদের সমস্যা আরো বেড়েছে। এমনকি যেসব কোম্পানি তাদের কাছ থেকে দুধ কেনে তারাও ক্রমাগত সমস্যার মুখে পড়ছে। ঘোল প্রস্তুতকারী ড্যানোন এস এ দিল্লির কাছে তাদের কারখানাটি বন্ধ করে দিচ্ছে। অবশ্য তারা তাজা দুধের চাহিদা পূরণের দিকে মনোনিবেশন করতে চাইছে। ১২ জানুয়ারি প্যারিসভিত্তিক কোম্পানিটি এ তথ্য জানিয়েছে। তবে কোম্পানিটির প্রতিনিধি এ ব্যাপারে আর কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকার করে।

ডেইরি ইন্ডিয়ার সম্প্রাদক ও প্রকাশক শরদ গুপ্তের মতে, দুধ ও দুগ্ধজাত সামগ্রীর বিক্রি ২০১৫ সালের ৫.২৬ ট্রিলিয়ন ডলার থেকে ২০২০ সাল নাগাদ ১০.০৫ ট্রিলিয়ন ডলারে দাঁড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে।

কোয়ালিটি লিমিটেডের চেয়ারম্যান রতন সাগর খান্না বলেন, আয় বাড়লে লোকজন দুগ্ধজাত সামগ্রী বেশি কেনে। আমরা দুগ্ধজাত সামগ্রীর চাহিদা দ্বিগুণ হতে পারে বলে আশা করছি।

গরুর উৎপাদনক্ষমতা দ্বিগুণ করার জন্য মোদি সরকার তিন বছর মেয়াদি যে কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল, তারা মাঝামাঝি পর্যায়ে রয়েছে। ১২৬ মিলিয়ন ডলারের এ কর্মসূচির লক্ষ্য গরুর স্বাস্থ্য ও জেনেটিক মান উন্নয়ন করে খামারের আয় বাড়ানো। কিন্তু সরকার সমর্থকের কিছু পদক্ষেপ এই পরিকল্পনা ভণ্ডুল করে দিতে পারে।

গত বছর তথাকথিত গো-রক্ষকদের হামলায় ১১ জন নিহত হয়েছে। তথ্য সাংবাদিকতাবিষয়ক ওয়েবসাইট ইন্ডিয়াস্পেন্ডের মতে, এটি ছিল ২০১০ সালে তথ্য সংরক্ষণ কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর ভারতের সবচেয়ে প্রাণঘাতী বছর। গরু জবাই হয়ে থাকতে পারে- এমন সন্দেহের বশেও হামলার আশঙ্কা থাকে।

গরু জবাই নিষিদ্ধ করার ফলে কৃষকেরা বছরে মোট ২৫০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি রুপি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আর এর ফলে বছরে দুই কোটি গরু পরিত্যক্ত হচ্ছে। এ তথ্য দিয়েছেন মহারাষ্ট্রের গান্ধী রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ডিন ড. জন চেলাদুরি।

উত্তর প্রদেশের কৃষক ভার্মা বলেন, কসাইখানার পরিবহনকর্মীদের কথা বাদ দিন, কৃষকেরা পর্যন্ত এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে গরু নিয়ে যেতে পারে না।

উত্তর প্রদেশের নেতৃত্ব গরুর ওপর নির্দয় ব্যবহারের জন্য কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের হুমকি দিয়ছেন। এর ফলে অনেকেই গরুর বদলে মহিষ পালন শুরু করেছে। মহিষ থেকে ভারতের দুধের চাহিদার অর্ধেক পূরণ হয়। কিন্তু ভারতের হলস্টেইন শঙ্কর জাতের একটি গরু যতটুকু দুধ দেয়, একটি মহিষ দেয় তার চেয়ে অনেক কম। আমেরিকান গরুর দুধ উৎপাদন ক্ষমতা আরো বেশি।

আবার মহিষের দুধে বেশি ফ্যাট থাকায় এর দাম হয় গরুর দুধের চেয়ে বেশি। পুরোপুরি বাণিজ্যিক কারণেও গত কয়েক বছরে অনেক কৃষক গরুর বদলে মহিষের দিকে ঝুঁকেছে বলে জানিয়েছেন গুজরাট কোঅপারেটিভ মিল মার্কেটিং ফেডারেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

পরিত্যক্ত গরুর জন্য ২০১১ সাল থেকে ভারতব্যাপী প্রায় ৫০০০ আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে বলে ভারতীয় গো-রক্ষা দলের চেয়ারম্যান পবন পন্ডিত জানিয়েছেন। এসব কেন্দ্রে বুড়ো ও অসুস্থ গরুর চিকিৎসা করা হয়ে থাকে। তিনি বলেন, বিজ্ঞানও গরু রক্ষাকে সমর্থন করে। তিনি বলেন, যেখানে গরু বসে, সেখানকার পরিবেশ বিশুদ্ধ থাকে। গরু অক্সিজেন ছাড়ে।

শ্রীকৃষ্ণ গোশালায় ৮,১০০ গরুর জন্য পর্যাপ্ত খাবার ও পরিচর্যার ব্যবস্থা রয়েছে। হিন্দু ধর্মাবলম্বী ও মোদি সরকারের উদারতায় তাদের কোনো সমস্যা নেই। গরু রক্ষার জন্য বাজেট ৫.৮ বিলিয়ন ডলার। গোশালার ৮১ বছর বয়স্ক প্রতিষ্ঠাতা চাগনলাল গুপ্ত বলেন, এই সরকার বিশ্বাস করে গরু ‘আমাদের মা।’ আমরা যদি এই সরকারের আমলে তহবিল না পেতাম, তবে কখনোই পেতাম না। সূত্র : ব্লুমবার্গ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত