প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

‘বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রে’ বেড়ে চলেছে বাক স্বাধীনতার ওপর আঘাত

পি কে বালাচন্দ্রন : ২০১৭ সালে ভারতে ১১ সাংবাদিক নিহত হয়, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে ভারতের অবস্থানের আরো অবনতি ভারতকে যখন ‘বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্র’ বলে যুক্তরাষ্ট্র চারিদিকে বলে বেড়াচ্ছে তখন ১৮০টি দেশের মধ্যে এর অবস্থান ১৩৬তম। অথচ এই দেশটির ৬৭ বছরের পুরনো সংবিধানটিকে বলা হয় বিশ্বের অন্যতম গণতান্ত্রিক সংবিধান।

দু:খজনক হলো দেশটির গণতান্ত্রিক কাঠামো ও প্রতিষ্ঠান এখন নিগৃহীত হচ্ছে রাষ্ট্র, ক্ষমতাধর রাজনীতিক, কায়েমী ব্যবসায়ী স্বার্থ এবং রাজনৈতিকভাবে উদ্বুদ্ধ বর্ণ, গোত্র ও ‘জাতীয়তাবাদী’ গোষ্ঠীগুলোর হাতে। তাই মিডিয়া, সাংবাদিক, শিল্পী, লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতারাই এখন তাদের প্রধান টার্গেট।

এর কারণ খানিকটা এই মানুষগুলো জনগণের মনজগতে পরিবর্তনের ক্ষমতা রাখেন, আর খানিকটা এরা আত্মরক্ষায় অসমর্থ, সহজেই ভয় দেখানো যায়। তাছাড়া এদেরকে টার্গেট করলে মানুষের মনযোগ আকর্ষণ করা যায় সবেচেয়ে বেশি। এতে একজনকে আতংকিত করে গোটা সমাজকে আতংকিত করার কাজটি হয়ে যায়।

গত বছর এপ্রিলে ‘রিপোর্টার্স উইদআউট বার্ডার’ যে র‌্যাংকিং প্রকাশ করে তাতে এই অবনতিশীল পরিস্থিতির জন্য কোন রাখ ঢাক না রেখেই দায়ী করা হয়েছে নরেন্দ্র মোদির হিন্দু জাতীয়তাবাদী সরকারকে। এতে বলা হয়, ‘হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা জাতীয় পর্যায়ের আলোচনা থেকে স্বাধীন মতপ্রকাশকে ঝেটিয়ে বিদায় করতে চায়। তাই মূল ধারার মিডিয়ায় সেল্ফ-সেন্সরশিপ ক্রমেই বাড়ছে।’ আগের বছরের চেয়ে র‌্যাংকিংয়ে তিন ধাপ নিচে নেমে যায় ভারত।

সাংবাদিকরা ক্রমেই অনলাইনের বিদ্বেষমূলক প্রচারণা ও হুমকির সম্মুখিন।

সরকারের সমালোচনা করে আইনের রোষানলেও পড়তে হচ্ছে সাংবাদিকদের। পেনাল কোডের ১২৪এ ধারা অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহীতার মামলা করা হচ্ছে, যার শাস্তি যাবজ্জীবন জেল। কোন সাংবাদিক এখনো এই ধারায় শাস্তি না পেলেও এই হুমকি তাদের মধ্যে সেলফ-সেন্সরশিপ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বিস্তারিত গবেষণা

প্রবীণ সাংবাদিক সেবন্তি নিনান ও তার দলের করা এক গবেষণায় ভারতের সাংবাদিকতার করুণ চিত্রটি উঠে এসেছে। তাদের গবেষণাকর্মটি ‘দিহটডটঅর্গ’ ওয়েবসেইটে প্রকাশিত হয়। ২০১৭ সালের ওপর ‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বাক স্বাধীনতা’ শীর্ষক ওই গবেষণায় বলা হয়, ‘২০১৭ সালে ভারতে সাংবাদিকতার পরিবেশ ক্রমেই প্রতিকূল হয়ে উঠে। বেশ কিছু সাংবাদিককে খুন, অনেকের ওপর হামলা, অনেককে হুমকি প্রদান এবং অনেকের বিরুদ্ধে মানহানি, রাষ্ট্রদ্রোহীতা এবং ইন্টারনেট সংশ্লিষ্ট অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। এই বছরেই দুইজন সাংবাদিককে খুব কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়। একজনকে উন্মত্ত জনতা কুপিয়ে হত্যা করে। পুলিশ পাশে দাঁড়িয়ে থাকলেও কিছু বলেনি। যারা হামলারর শিকার হয়েছেন তাদের মধ্যে রিপোর্টার, ফটোগ্রাফার, এমনকি সম্পাদকও রয়েছেন।’

তিন সাংবাদিকের হত্যাকাণ্ডের সুস্পষ্ট কারণ সাংবাদিকতা; হামলা হয়েছে ৪৬টি, ২৭টি ঘটনায় পুলিশ আটক ও মামলা দিয়েছে; ১২টি হুমকি প্রদানের ঘটনা ঘটেছে।

গবেষণায় বলা হয়, এটা একেবারেই রক্ষণশীল হিসাব। কারণ, শুধু ইংরেজি পত্রিকাগুলোতে আসা খবর এখানে স্থান পেয়েছে।

হেনস্তাকারীদের বেশিরভাগ পুলিশ, রাজনীতিক ও রাজনৈতিক কর্মী। এরপরেই আছে উগ্র ডানপন্থী এক্টিভিস্ট ও অন্যান্য রাষ্ট্র-বহির্ভুত এ্যাক্টররা।

‘আইন প্রণেতারাই আইন ভাংছেন। হামলা বা হুমকিদাতাদের মধ্যে সাংসদ ও বিধায়কের নামও পাওয়া যায়। সাংবাদিককে পুড়িয়ে মারার হুমকিও দিয়েছেন উত্তর প্রদেশের এক মন্ত্রী। একজন ম্যাগাজিন সাংবাদিকের ওপর নৃশংস হামলা চালানোর পেছনে অন্ধ্রপ্রদেশের একজন বিধায়ক ও তার ভাইয়ের হাত থাকার খবর প্রকাশ পেয়েছে।

লালু প্রসাদ যাদবের দুর্নীতির বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করার পর তার বাড়িতে যখন সাংবাদিকরা যায় তখন তিনি রিপাবলিক টিভির এক সাংবাদিকের মুখে ঘুষি মারার হুমকি দেন এবং তার ছেলে তেজস্বীনির দেহরক্ষীরা রিপোর্টার ও ফটোগ্রাফারদের অপদস্ত করে।

বাঙ্গালুরুতে গত ৫ জুন নিজের ফ্লাটের বাইরে কর্নাটকের সাংবাদিক গৌরি লঙ্কেশকে গুলি করে খুন করা হয়। এই খুনের দায়ে আজো কেউ গ্রেফতার হয়নি। একই মাসে ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলায় একটি রাজনৈতিক দলের সড়ক অবরোধের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে ওই দলেরই একদল কর্মীর হাতে খুন হয় টিভি সাংবাদিক শান্তনু ভৌমিক। অথচ কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলো পুলিশ, যারা ওই সাংবাদিককে রক্ষার চেষ্টা করেনি।

গতবছর নভেম্বরে ত্রিপুরা স্টেট রাইফেলের কমান্ডেন্ট-এর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মকর্তা গুলি করে সুদীপ দত্ত ভৌমিক নামে আরেক সাংবাদিককে হত্যা করে। ভৌমিক ছিলেন আগরতলার শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা ‘সন্ধানপত্রিকা’র সিনিয়র সাংবাদিক। অথচ এপয়েন্টমেন্ট নিয়েই ওই কমান্ডেন্টের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন তিনি।

এক ধর্মীয় নেতা ধর্ষণের মামলায় অভিযুক্ত হওয়ার পর হরিয়ানা ও দিল্লির কিছু অংশ জুড়ে যে তাণ্ডব চলে তার গুরুতর শিকার হয় টিভি সাংবাদিকরা। তাদের বিরুদ্ধে আতংক ছাড়ানোর অভিযোগ এনে তথ্যমন্ত্রী স্মৃতি ইরানিও টুইট করেন এবং সাংবাদিকদেরকে সম্প্রচার কর্তৃপক্ষের আইনের ‘ধারা-বি’ স্মরণ করিয়ে দেন।

অন্ধ্রপ্রদেশে টিভি স্ট্রিংগাররা হামলাকারীদের সহজ টার্গেট বলে জানান রাজ্যের সাংবাদিক ফোরামের নেতা কৃষ্ণানজেনেইলু।

পার্লামেন্টে প্রশ্নোত্তরকালে ছত্তিশগড়ের সরকার স্বীকার করেছে যে ২০১৭ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ১৪ সাংবাদিককে গ্রেফতার করা হয়েছে।

অবমাননার অভিযোগ

২০১৭ সালে কর্নাটক রাজ্যের দুই বিধায়ক সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে কাজ করেন। জুনে রাজ্য বিধান সভার স্পিকার কে বি কালিপদ দুটি স্থানীয় সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদকদের এক বছর করে কারাদণ্ড এবং ১০,০০০ রুপি করে জরিমানা করেন। সম্পাদকরা নাকি একটি প্রতিবেদন ছাপিয়েছেন যা বিধায়কদের মানহানি এবং তাদের বিশেষ অধিকার খুন্ন করেছে।

এমন আরো ঘটনার উল্লেখ করে গবেষণা রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘সেন্সরশিপ চলছে এবং বেশ ভালোভাবেই কাজ করছে। এই বছরে অরুনাচল প্রদেশে পত্রিকা পোড়ানো ও নিষিদ্ধ করার ঘটনাও দেখা গেছে।’

‘ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর এডুকেশন রিসার্চ এন্ড ট্রেইনিং-কে মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড চাপ দেয় যেন দ্বাদশ শ্রেণীর রাজনীতি বিজ্ঞান বই থেকে ‘গুজরাটে মুসলিম বিরোধী দাঙ্গা’ শব্দগুচ্ছ বদলিয়ে সেখানে ‘গুজরাটের দাঙ্গা’ লেখা হয়। গত জুনে প্রকাশক ‘জগন্নাথ বুকস’-কে ‘ফ্রম গডমান্তো টাইকুন: দ্য আনটোল্ড স্টোরি অব বাবা রামদেব’ বইটি প্রকাশ করতে বারণ করে দিল্লির আদালত। এই যোগগুরু কাম ব্যবসায়ী বইটি প্রকাশের বিরুদ্ধে পিটিশন দাখিল করলে আদালত ওই নিষেধাজ্ঞা দেয়।

জাতীয় বাঘ সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষ পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করে বিবিস ‘কে যেন পাচ বছর কোন সংরক্ষিত বনে শুটিং করতে না দেয়া হয়। এমনকি বিবিসি’র দক্ষিণ এশিয়া সংবাদদাতা জাস্টিন রোলাট-এর ভিসা নবায়ন না করার অনুরোধও জানানো হয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে। আসামের কাজিরঙ্গা জাতীয় পার্কে কিভাবে সংরক্ষণের নামে বাঘ হত্যা করা হচ্ছে তার ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরি ও সম্প্রচারের কারণে রোলাটেরও পর ক্ষুব্ধ হয় বাঘ সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষ।

মোদি সরকারের ‘আধার’ প্রকল্পের নাজুক অবস্থা নিয়ে রিপোর্ট করায় দিল্লি পুলিশের সাইবার সেল মামলা করে সাংবাদিক সমির কোচ্ছারের বিরুদ্ধে। এই রিপোর্ট নাকি গুজব ছড়াচ্ছে, অভিযোগ পুলিশের। তার এই রিপোর্ট প্রকাশ হয় গত বছর ফেব্রুয়ারিতে এবং তাতে বলা হয়- চাইলে যে কেউ ‘আধার’ থেকে তথ্য হাতিয়ে নিতে পারে।

গত জুনে দার্জিলিংয়ের জেলা মেজিস্ট্রেট মৌখিকভাবে গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনকারীদের কোন বিক্ষোভের ছবি ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় সম্প্রচার না করার নির্দেশ দেন। রাজস্তানের সরকার ২০১৭ সালে একটি অর্ডন্যান্স জারি করে। তাতে সরকারি কর্মকর্তা, মেজিস্ট্রেট ও জাজদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে কোন খবর প্রকাশ করতে হলে আগাম অনুমতি গ্রহণের বিধান রাখা হয়। তবে, প্রবল প্রতিবাদের মুখে অর্ডন্যান্সটি বাতিল করা হয়েছে।

অমিত শাহের ঘটনা

গত অক্টোবরে দি ওয়্যার ম্যাগাজিনের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয় যে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)’র সভাপতি অমিত শাহ’র ছেলে জয় শাহ’র কোম্পানির বিরুদ্ধে রিপোর্ট করা থেকে অন্য মিডিয়া কোম্পানিগুলো সেল্ফ-সেন্সরশিপ আরোপ করে রেখেছে। অক্টোবরে কমেডিয়ান সায়েম রঙ্গিলা অভিযোগ করেন যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি’কে অনুকরণ করে তার একটি অভিনয় স্টার প্লাস সম্প্রচার করতে রাজি হয়নি। ‘গ্রেট ইন্ডিয়ান লাফটার চ্যালেঞ্জ’ রিয়েলিটি শো’র জন্য তিনি অভিনয়টি করেছিলেন। এর আগে ২০১৭ সালেই রেডিও মিরচি’কে তার জনপ্রিয় ‘মিত্রন’ অনুষ্ঠানটি বন্ধ করে দিতে হয় ওই একই কারণে- মোদিকে নিয়ে কৌতুক করার জন্য।

সবচেয়ে খারাপ অবস্থা যেসব রাজ্যে

এতে বিস্ময়ের কিছু নেই যে মিডিয়া সেন্সরশিপের ক্ষেত্রে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা জম্মু-কাশ্মিরের। আর ভালো অবস্থায় আছে সিকিম। পুরো দেশের দেশে যখন ৭৭ বার ইন্টারনেট বন্ধের ঘটনা ঘটেছে তখন শুধু কাশ্মিরেই ঘটেছে ৪০ বার। দিল্লিতেও বহু সংখ্যক মানহানি মামলা, সেন্সরশিপ ও সেল্ফ-সেন্সরশিপের ঘটনা ঘটেছে। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মহারাষ্ট্রে সর্বাধিক মানহানি মামলা এবং অন্ধ্রপ্রদেশে সবচেয়ে বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছে। ইন্টারনেট ও সামাজিক গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ব্যবস্থা নিয়েছে কর্নাটক সরকার।

রাষ্ট্রদ্রোহ

রাজনৈতিক ভিন্ন মতাবলম্বী এবং যারা নিজেদের অধিকারের জন্য লড়াই করে তাদের বিরুদ্ধে প্রায়ই এই অভিযোগ আনা হয়। ভারতে ছাত্র, ক্রিকেটের ফ্যান, ডেরা সাচ্চা সওদার প্রধান গুরুমিত সিং-এর অনুসারী- কেউ এই অভিযোগ থেকে বাদ যায়নি। এমনকি জাতীয় পতাকার অবমাননা হয়েছে হোয়াটস্যএ্যাপে এমন মেসেজ ছাড়ানোর অভিযোগেও এক তরুণের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হয়।

গত বছর সবচেয়ে বেশি রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হয়েছে হরিয়ানায়, ১৫২টি। ধর্ষণের অভিযোগে গুরুমিত সিংকে দণ্ড দেয়া হলে তার অনুসারিরা যে তাণ্ডব চালায় তাদের বিরুদ্ধে এসব মামলার বেশিরভাগ দায়ের করা হয়। এর পরেই ১১১ ব্যক্তির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে উত্তর প্রদেশ। নগর নির্বাচনে কংগ্রেস জয়ী হলে দলটির সমর্থকরা যেসব শ্লোগান দেয় সেগুলো নাকি ছিলো ‘রাষ্ট্র-বিরোধী’। এছাড়া কেরালা, কর্নাটক ও মধ্যপ্রদেশে বহু সংখ্যক রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দায়ের করা হয়েছে।

আসামের দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনের পরিচিত মুখ অখিল গগৈকে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় সাড়ে চার মাস জেলে কাটাতে হয়েছে। নদী সংযোগ প্রকল্পের বিরোধিতা করায় এন্টি-মাথানি প্রজেক্ট ফেডারেশনের চিফ কোঅর্ডিনেটর টি জয়রামনও এই মামলার শিকার। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি বাড়ানোর প্রতিবাদ করায় পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬৬ জন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দেয়া হয়।

মানহানি

গবেষণা মতে, ১৯টি মামলা নিয়ে ভারতে ‘মানহানি মামলার রাজধানী’ হিসেবে খ্যাতি পেয়েছে মহারাষ্ট্র। এর পাঁচটি চলচ্চিত্র ও টিভি ব্যক্তিত্বদের বিরুদ্ধে। ইকনমিক এন্ড পলিটিক্যাল উইকলি’র প্রকাশক সমীক্ষা ট্রাস্ট, এর সম্পাদক ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মানহানি মামলা করে আদানি গ্রুপ।

সাতটি মানহানি মামলা করে সবচেয়ে নিচে আছে তামিলনাড়ু। বহুবছর পর ২০১৭ সালে এআইএডিএমকে মাত্র একটি মানহানি মামলা করে, তাও আবার এক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে। প্রয়াত জয়ললিতা ২০১১ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে মিডিয়া, বিরোধী নেতা ও সমাজকর্মীদের বিরুদ্ধে ২০০ মানহানি মামলা করেছিলেন।

এসব মামলার বাদিদের বড় অংশ রাজনীতিক, এরপরেই আছে কর্পোরেট হাউজগুলো।

ইন্টারনেট বন্ধ

ইন্টারনেট বন্ধের ক্ষেত্রে ভারত ক্রমেই কুখ্যাতি অর্জন করছে-বলেছে গবেষণা রিপোর্ট।

এতে বলা হয়, ২০১৭ সালে এমন কোন মাস ছিলো না যখন দেশের কোথাও না কোথাও ইন্টারনেট বন্ধের ঘটনা ঘটেনি। এর বেশিরভাগ ঘটে জম্মু-কাশ্মিরে।’

চলচ্চিত্র সেন্সরশিপ

গবেষণায় বলা হয়, বহু-ধর্ম ও বহু-জাতির গণতন্ত্রে এমনিতেই চলচ্চিত্র নির্মাণ একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয়। কিন্তু চলচ্চিত্রকে ছাড়পত্র দেয়ার ব্যাপারে ২০১৭ সালটি ছিলো একটি গোলযোগপুর্ণ বছর।

ফিল্ম সেন্সর বোর্ডের নতুন প্রধান প্রসুন জোসি বলেন, ‘সিনেমা একটি শিল্প হতে পারে, কিন্তু এটা বেশি সংখ্যক মানুষকে দেখানোর জন্যও। তাই চলচ্চিত্র নির্মাতারা জনগণের মনোভাবকে অপদস্ত করতে পারেন না।’

রাজনৈতিক নেতা, শব্দ ও ঘটনাগুলোর ব্যাপারে খুবই আপত্তি সেন্সর বোর্ডের। ‘মোদি কা গাও’, ‘ইদু সরকার’ ও ‘এন ইনসিগনিফিকেন্ট ম্যান’-এসব চলচ্চিত্র নির্মাতাদের বলা হয় রাজনীতিকদের কাছে গিয়ে ‘অনাপত্তি সার্টিফিকেট’ নিয়ে আসতে।

‘মোদি কা গাও’ ছিলো নরেন্দ্র মোদির উন্নয়ন এজেন্ডা নিয়ে। ইন্দিরা গান্ধির আমলে জরুরি অবস্থার উল্লেখ আছে ‘ইদু সরকারে’। আর, আম আদমি পার্টি ও অরবিন্দ কেজরিওয়ালের উত্থান কাহিনী নিয়ে চিত্রায়িত হয় ‘এন ইনসিগনিফিকেন্ট ম্যান’। ‘কফি ইউথ ডি’ ছবিতে রাহুল গান্ধীর উল্লেখ থাকা অংশটুকু বাদ দিতে নির্দেশ দেয় সেন্সর বোর্ড।

নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেনের জীবনীভিত্তিক প্রামান্যচিত্র ‘দ্য আর্গুমেন্টিভ ইন্ডিয়া’-কে ছাড়পত্র দিতে রাজিই হয়নি ভারতের চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড। কারণ, এর পরিচালক প্রামান্যচিত্রটি থেকে ‘হিন্দুত্ব’, ‘গরু’ ও ‘গুজরাট’ শব্দগুলো বাদ দিতে রাজি হননি।

‘হামে হক চায়ে হক’ ছবিটি থেকে ‘পতিদর’ ও ‘পাতিল’ শব্দগুলো বাদ দেয়া হয়। কারণ, শব্দ দুটি গুজরাটে পতিদরদের চাকরির কোটা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃপক্ত। শ্রীলংকার গৃহযুদ্ধ নিয়ে নির্মিত ছবি নীলমকে ছাড়পত্র দিতে অস্বীকৃতি জানায় সেন্সর বোর্ড।

জিএসটি’র সমালোচনা থাকায় তামিলনাড়ুর ছবি ‘মেরসাল’কে ছাড়পত্র দেয়া হয়নি। জিএসটি’র অংশটুকু নীরব করে দেয়া বা মুছে ফেলার দাবি জানায় বিজেপি সরকার।

আর এখন বলিউডের ছবি ‘পদ্মাবতী’ নিয়ে রাজস্তান, মধ্যপ্রদেশ, হরিয়ানা, উত্তর প্রদেশ, পাঞ্জাব, বিহার ও গুজরাট উত্তাল। এই ছবির বিরুদ্ধে ‘ইতিহাস বিবৃতি’র অভিযোগ আনা হয়েছে।

চলচ্চিত্র প্রদর্শনী

গত জুনে কেরালায় অনুষ্ঠিত ১০ম আন্তর্জাতিক প্রামাণ্যচিত্র ও স্বল্পদৈর্ঘ চলচ্চিত্র উৎসবে তিনটি প্রামাণ্যচিত্রের প্রদর্শনী নিষিদ্ধ করে সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। এগুলো হলো: ‘ইন দ্য শেড অব ফলেন চিনার’, ‘মার্চ মার্চ মার্চ’ এবং ‘দ্য আনবেয়ারেবল বিং অব লাইটনেস’। এসব ছবি ছিলো যথাক্রমে কাশ্মির, জওয়াহরলাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আন্দোলন এবং দলিত স্কলার রোহিত ভেমুলার আত্মহত্যার ঘটনা নিয়ে।

# পি কে বালাচন্দ্রন ভারতীয় সাংবাদিক। সাউথ এশিয়ান মনিটরে তিনি এ লেখাটি লিখেছেন।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত