প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

জনশক্তি রপ্তানি বাড়লেও প্রভাব নেই রেমিটেন্সে

শিমুল : বিদেশে জনশক্তি রপ্তানিতে রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ। শুধু গত বছরই চাকরি নিয়ে বৈধ পথে বিদেশে গেছেন ১০ লাখ ৮ হাজার ৫২৫ জন কর্মী। জনশক্তি রপ্তানিতে একক বছর হিসাবে এটাই সর্বোচ্চ, যা  আগের বছরের চেয়ে প্রায় ৩৩ শতাংশ বেশি। তবে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যা বাড়লেও প্রভাব পড়ছে না রেমিটেন্স বা প্রবাসী আয়ে। অব্যাহতভাবে কমছে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ও বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

বিশেষজ্ঞরা জানান, দেশের জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করে বিদেশে পাঠালে বর্তমানের চেয়ে চারগুণ রেমিটেন্স আসবে। তবে রেমিটেন্স কমার প্রধান কারণ অবৈধ মোবাইল ব্যাংকিং ও হুন্ডি। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কর্মীদের আয় কমে গেছে। যে টাকা তারা পান, তার বড় অংশই চলে যায় বিদেশে থাকা-খাওয়ায়। দেশে টাকা পাঠাতে পারেন না। ফলে রেমিটেন্স কমছেই।

সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে, গত ৪১ বছরে জনশক্তি রপ্তানির ইতিহাসে ২০১৭ সালে সবচেয়ে বেশি জনশক্তি রপ্তানির রেকর্ড হয়েছে। ১৯৭৬ সালে যেখানে মাত্র ৬ হাজার ৮৭ জন কর্মী নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছিল। ২০১৭ সালের প্রায় ১০ লাখ ৮ হাজার কর্মীর কর্মসংস্থান হয়েছে বিদেশে। এর আগে ২০০৮ সালে ৮ লাখ ৭৫ হাজার জনশক্তি রপ্তানির রেকর্ড ছিল প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের। এর মধ্যে ১৭ সালে সর্বোচ্চ সংখ্যক প্রায় সাড়ে ৫ লাখ কর্মী গেছে সৌদি আরবে। এরপরই মালয়েশিয়ায় ১ লাখ, ওমানে প্রায় ৯০ হাজার, কাতার ৮২ হাজার এবং কুয়েতে প্রায় ৫০ হাজার জন। এছাড়া সিঙ্গাপুর, জর্ডান, বাহরাইন, মরিশাসসহ বিভিন্ন দেশে জনশক্তি রপ্তানি হয়েছে। ২০১৬ সালে বিদেশে কর্মসংস্থান হয়েছিল প্রায় ৭ লাখ ৫৭ হাজার।
অল ইউরোপিয়ান বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশনের (আয়েবা) মহাসচিব কাজী এনায়েত উল্লাহ বলেন, প্রবাসীরা দেশের মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখতে চায়। এজন্য সঠিক ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। দক্ষ জনশক্তিই পারে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশে রেকর্ড পরিমাণ ১ হাজার ৫৩১ কোটি ৬৯ লাখ (১৫.৩১ বিলিয়ন) ডলারের রেমিটেন্স আসে। এরপর প্রতি বছরই রেমিটেন্স কমে যেতে থাকে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আড়াই শতাংশ কমে গিয়ে রেমিটেন্স আসে ১ হাজার ৪৯৩ কোটি ডলার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা সাড়ে ১৪ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ২৭৭ কোটি ডলারে, যা ছিল আগের ছয় অর্থবছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

২০১৭ সালে প্রবাসী আয় ২০১২ সালের চেয়েও কম। অথচ গত ছয় বছরে ৩৭ লাখ ৬৪ হাজার ৮৭২ জন বাংলাদেশি চাকরি নিয়ে বৈধ পথে বিদেশ গেছেন। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের জিডিপিতে ১২ শতাংশ অবদান রাখছে প্রবাসীদের পাঠানো এই বৈদেশিক মুদ্রা।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, তেলনির্ভর নয় এমন দেশ সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া থেকেও রেমিটেন্স কমেছে। এ দুই দেশ থেকে রেমিটেন্স কমার হার মধ্যপ্রাচ্যের চেয়েও বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মালয়েশিয়া থেকে রেমিটেন্স এসেছে ১ হাজার ৩৩৭ মিলিয়ন ডলার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এসেছে ১ হাজার ১০৩ মিলিয়ন ডলার। চলতি অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত এসেছে ৫০৩ মিলিয়ন ডলার। অথচ গত আড়াই বছরে দেড় লাখ বাংলাদেশি নতুন করে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে যুক্ত হয়েছেন। সিঙ্গাপুর থেকে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে রেমিটেন্স এসেছে ৩৮৭ মিলিয়ন ডলার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এসেছে ৩০০ মিলিয়ন ডলার। গড়ে ২৩ শতাংশ কমেছে। সৌদি আরব থেকে ২০১৫ সালে ২ হাজার ৯৫৫ মিলিয়ন ডলার এসেছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এসেছে ২ হাজার ২৬৭ মিলিয়ন ডলার। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের ৬ মাসে এসেছে ১২০২ মিলিয়ন ডলার। বরং সৌদি থেকে চলতি অর্থবছরে রেমিটেন্স প্রবাহ আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে।
বাংলাদেশের রিজার্ভের বড় একটি অংশ আসে রেমিটেন্স থেকে। বছর বছর প্রবাসী আয় কমলে রিজার্ভ কমবে বলে সতর্ক করেছেন অভিবাসন গবেষণা বিষয়ক প্রতিষ্ঠান রামরুর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. সি আর আবরার। তিনি বলেন, দেশে টাকা পাঠানোর পদ্ধতি সহজ করা উচিত। তা না হলে রেমিটেন্স কমতেই থাকবে। কারণ প্রবাসীদের হাতে এখন দেশে টাকা পাঠানোর অনেক বিকল্প পথ রয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিদায়ী বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরে প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলে ১১৬ কোটি ডলারের রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন, যা ২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাসের চেয়ে প্রায় ২২ শতাংশ বেশি। প্রবাসীরা গত নভেম্বর মাসে রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন ১২১ কোটি ৪৭ লাখ ডলার। এর আগে অক্টোবরে পাঠিয়েছিলেন ১১৫ কোটি ৯০ লাখ ডলার। এই হিসাবে নভেম্বর মাসে রেমিটেন্স বেড়েছে পাঁচ কোটি ৫৭ লাখ ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্নমুখী উদ্যোগের কারণে গত অক্টোবর মাস থেকে এই রেমিটেন্স ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে। অক্টোবর মাসে ১১৫ কোটি ৯০ লাখ ডলার রেমিটেন্স আসে দেশে, যা গত সেপ্টেম্বর মাসের চেয়ে ৩০ কোটি ৩০ লাখ ডলার বেশি। আর ২০১৬ সালের অক্টোবরের চেয়ে এই পরিমাণ ১৪ কোটি ৮১ লাখ ডলার বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক কাজী সাইদুর রহমান বলেন, গত বেশ কিছুদিন ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি এই রেমিটেন্স কমে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন ছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। আমরা আশা করছি, ২০১৮ সালে রেমিট্যান্সের খরা পুরোপুরি কেটে যাবে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত