প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

খালেদার মামলার রায় ৮ ফেব্রুয়ারি, দলের হাল কে ধরবে?

কেএম হোসাইন : বিচার প্রক্রিয়া শেষ। রায় ঘোষনার দিনক্ষণ ঠিক হয়েছে, আর দুশ্চিন্তা বেড়েছে বিএনপির। বিদেশ থেকে জিয়া এতিমখানা ট্রাস্টের নামে আসা দুই কোটি ১০ লাখ টাকা আত্মসাতের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভাগ্যে কি আছে- সেই রায় জানা যাবে আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি। ৯ বছর আগে জরুরি অবস্থার মধ্যে দুদকের দায়ের করা এ মামলায় দুপক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ মো. আখতারুজ্জামান রায়ের এই দিন ঠিক করে দেন। বিচারক যখন রায়ের দিন ঠিক করে দিচ্ছেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও তখন বিচারকক্ষে উপস্থিত ছিলেন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে এ মামলায় তার সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। সাবেক কোনো প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতির বিচারের রায় বাংলাদেশে এটাই প্রথম। এর আগে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের দুর্নীতি মামলার রায় ঘোষিত হয়েছে। তিনি প্রায় ছয় বছর সাজা খেটেছেন।

খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানও এ মামলার আসামি। মুদ্রা পাচারের দায়ে সাত বছর কারাদণ্ডের রায় মাথায় নিয়ে বিদেশে পালিয়ে থাকা তারেকের বিরুদ্ধে এ মামলাতেও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। মামলার ছয় আসামির মধ্যে খালেদা জিয়া জামিনে রয়েছেন; মাগুরার সাবেক সাংসদ কাজী সালিমুল হক কামাল ও ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ রয়েছেন কারাগারে। তারেক ছাড়াও সাবেক মুখ্য সচিব ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমান মামলার শুরু থেকেই পলাতক।

দলীয় প্রধান খালেদা জিয়ার এই মামলার শুরু থেকেই দুশ্চিন্তায় রয়েছে বিএনপি। আইনজীবীরা জানিয়েছেন, এই মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসনের সাজা হওয়ার মতো উপাদান রয়েছে। এটাই দলটির দুশ্চিন্তার কারণ। নেতাদের আশঙ্কা, সাজা হলে খালেদাকে জেলে যেতে হবে। সে ক্ষেত্রে বিএনপি নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়বে। সিনিয়র নেতাদের মধ্যে শুরু হবে নেতৃত্ব দখলের লড়াই। এমন কি দল ও জোটে ভাঙনও ধরতে পারে। কারণ দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা তারেক রহমান সাজা মাথায় নিয়ে যুক্তরাজ্যে ফেরারি হওয়ায় খালেদার অনুপস্থিতিতে দলের হাল ধরার মতো সর্বজনগ্রাহ্য নেতা বিএনপিতে আর নেই। তাই খালেদা জিয়ার মামলায় বিএনপি নেতাকর্মীদের দুশ্চিন্তার শেষ নেই। কারণ তারা ধরেই নিয়েছেন, এই মামলায় খালেদার সাজা হবে।

দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল মামলা বিষয়ে বলেন, আমরা অভিযোগ আদালতে প্রমাণ করেছি। আমাদের বিশ্বাস, ছয় আসামিই সর্বোচ্চ সাজা পাবে। অন্যদিকে খালেদা জিয়ার প্রধান আইনজীবী আবদুর রেজাক খান এ প্রসঙ্গে বলেন, এটি একটি অসার মামলা। খালেদা জিয়ার খালাস পাবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি।

জিয়া এতিমখানা ট্রাস্টে এতিমদের জন্য বিদেশ থেকে আসা অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় এই মামলা করে দুদক। তদন্ত শেষে ২০০৯ সালের ৫ আগস্ট তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে অভিযোগপত্র দেন। পাঁচ বছর পর ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ ঢাকার তৃতীয় বিশেষ জজ অভিযোগ গঠন করে খালেদা জিয়াসহ ছয় আসামির বিচার শুরু করেন। আলোচিত এ মামলায় দুদক ও আসামিপক্ষ মোট ১৬ কার্যদিবস যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেছে। মোট ২৩৬ কার্যদিবস শুনানির পর মামলাটি রায়ের পর্যায়ে এলো।

এদিকে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া অপর মামলা জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার যুক্তিতর্কের জন্য আগামী ৩০ ও ৩১ জানুয়ারি এবং ১ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করেছেন আদালত।

মামলার রায় নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যা চাইবেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিচারে তাই হবে। তিনি বলেন, মামলার রায় পূর্বনির্ধারিত? এই অবৈধ সরকার আগেই রায় লিখে রেখেছে?

তিনি বলেন, দেশে যে আইনের শাসন নেই, ন্যায়বিচার সুদূর পরাহত সেটাই প্রমাণিত হচ্ছে। প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাকে বলপূর্বক দেশ থেকে বের করে দেয়া ও পদত্যাগে বাধ্য করার মধ্য দিয়ে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিঃশেষ হয়েছে। নিম্ন আদালতের বিচারকদের আচরণবিধি সরকারের ইচ্ছে মতোই হয়েছে। নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে। আমরা যারা স্বাধীনতা সংগ্রামে এবং যুদ্ধের সঙ্গে জড়িত ছিলাম তাদের ভাবতে কষ্ট হয়, বাংলাদেশ আজ এ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। যে যুদ্ধ ছিল অধিকার আদায়ের যুদ্ধ, যে স্বাধীনতা ছিল রাজনৈতিক স্বাধীনতার, সেই যুদ্ধকে অপমানিত করে সেই চেতনাকে ধূলিস্যাৎ করে আজ একদলীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা পাকাপোক্ত করা হচ্ছে।

বিএনপির মহাসচিব বলেন, এ সরকার খালেদা জিয়াকে ভয় করে বলেই তাকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে চায়। আমরা সরকারের এ অপচেষ্টার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। যেভাবে পুলিশ-র‌্যাব দিয়ে আদালত ও আদালত সংলগ্ন এলাকা ঘিরে রাখে তাতে মনে হয় কোনো সামরিক শাসনের অধীনে সামরিক আদালতে এই বিচারকার্য চলছে। তার সঙ্গে এই ধরনের অবমাননাকর, অমানবিক আচরণ শুধু সামরিক শাসন এবং ফ্যাসিবাদের কথা মনে করিয়ে দেয়।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেয়া হয়েছে। এতদিন আমরা আইনিভাবে মোকাবেলা করেছি। আমরা স্পষ্টভাষায় বলতে চাই, যদি এ মিথ্যা, বানোয়াট ও পাতানো মামলায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয় তাহলে আমরা তা রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করব। তিনি বলেন, এ মামলার সঙ্গে খালেদা জিয়ার কোনো প্রকার সম্পৃক্ততা নেই। কুয়েতের আমির জিয়াউর রহমান ট্রাস্টে টাকা সরাসরি দান করেছিলেন। এটা প্রধানমন্ত্রীর রিলিফ ফান্ডে আসেনি, তাই প্রধানমন্ত্রীর এতে সম্পৃক্ততা নেই। তারপরেও গায়ের জোরে উনার বিরুদ্ধে মামলা চালিয়ে গেছে। সপ্তাহে তিন দিন আদালতে তাকে বসে থাকতে হয়েছে- মানসিকভাবে তাকে নির্যাতন করা হয়েছে, তাকে পর্যুদস্ত করা হয়েছে। আজকে খালেদা জিয়াকে কারাগারে নেয়ার যত ষড়যন্ত্রই করেন না কেন, আমরা এর মোকাবেলা রাজনৈতিকভাবে করব।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, মামলায় খালেদা জিয়াকে সাজা দেয়া হলে বাংলাদেশে প্রলয় কাণ্ড ঘটে যাবে। প্রধানমন্ত্রী মনে করছেন, তার অশুভ ইচ্ছা খালেদা জিয়ার ওপর বাস্তবায়ন করবেন। প্রতিদিন আপনি ৩০/৩৫ জনকে গ্রেপ্তার করছেন। তারপরও শক্তিতে কমে না। নিজের শার্ট খুলে বুক পেতে যারা গ্রেপ্তারবরণ করতে পারে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে কোনো অশুভ কিছু হলে তারা এ দেশে প্রলয় কাণ্ড ঘটাবে। দেশে তুমুল ঝড়ো হাওয়া বইবে। প্রধানমন্ত্রীকে বলে রাখতে চাই, এদেশ আওয়ামী লীগের বাপ-দাদার মুুলুক নয়। এখানে রক্ত ঝরিয়েছেন আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের সাহসী মানুষরা। আমরা সেই প্রেরণার উত্তরসূরী।

কে ধরবে হাল দলের তা নিয়ে শঙ্কা আছে কাজ করছে নেতাদের মধ্যে। ভেঙ্গে যাবে না তো বিএনপি। ঐক্যবদ্ধ রাখতে এমনই একজন খুঁজছে হাল ধরতে। সেটা জিয়া পরিবারের কেউ হবে মনে হয়।

খালেদা জিয়া আদালতে দণ্ডিত হলে বিএনপির হাল কে ধরবে, সেই চিন্তাও মাথায় রেখেছে। তবে এসব কৌশলই অত্যন্ত গোপনে নেয়া হয়েছে। খালেদা জিয়ার ছেলে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও তার পরিবারের ঘনিষ্ঠ দুয়েকজন ছাড়া দলের কেউই এ ব্যাপারে তেমন কিছু জানেন না।

তারেক রহমান ইতোমধ্যে দুটি মামলায় দণ্ডিত হয়ে নির্বাচনের অযোগ্য হয়েছেন। দেশে এসে বিএনপির হাল ধরা এখন তার জন্য একেবারেই অসম্ভব। সে ক্ষেত্রে তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমানের নাম বিবেচনায় রয়েছে। কিন্তু তার প্রশ্নেও দ্বিমত রয়েছে দলীয় ফোরামে। সে ক্ষেত্রে এমন কারো নাম ঘোষণা হতে পারে- যা কারো চিন্তায়ই নেই। তবে দলের হাল কে ধরবেন তা নির্ভর করছে খোদ খালেদা জিয়ার ওপর। তিনি কী করবেন এ জন্য অপেক্ষা করতে হবে আরো কয়েকটা দিন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি- বিএনপির হাল কে ধরবেন তা আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি রায় ঘোষণার আগে জানা যাবে না। রায়ে যদি খালেদা জিয়া খালাস পান তবে তো কথা নেই, যদি তার বিরুদ্ধে সাজা ঘোষণা হয় তবে আদালত চত্বরেই খালেদা জিয়া তার উত্তরসূরির নাম ঘোষণা করতে পারেন। ওই সূত্রের মতে, আগেই খালেদা জিয়া তার উত্তরসূরি নির্ধারণ করে রেখেছেন। কাক্সিক্ষত সময়েই সে ঘোষণা আসবে।

সূত্র আরো জানিয়েছে, আগামী ৮ ফেব্রুয়ারির আগেই খালেদা জিয়া সংবাদ সম্মেলন করে মিডিয়ার সামনে তার বিরুদ্ধে চলমান মামলা নিয়ে কথা বলতে পারেন। এমন কি তাকে কারাগারে যেতে হলে দল ও জনগণকে কি করতে হবে তার প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও তিনি দিতে পারেন ওই সংবাদ সম্মেলনে।

খালেদা জিয়ার মামলার রায় ঘোষণার তারিখ ঘোষণা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তীব্র প্রতিক্রিয়া এসেছে বিএনপির তরফ থেকেও। দলটির নেতারা এ জন্য সরকারকে দায়ী করেছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ মামলার কার্যক্রমকে নজিরবিহীন বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি দাবি করেছেন রাজনীতির ময়দান ও নির্বাচন থেকে দূরে রাখতেই সরকার এ মামলা ত্বরান্বিত করেছে। ভোরের কাগজ থেকে নেয়া।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত