প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ক্ষমতায় ‘ভাগ’ বসাতে তৎপর ধর্মভিত্তিক দলগুলো

মামুন : ক্ষমতায় ‘ভাগ’বসাতে তৎপরতা শুরু করেছে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো। আসন্ন একাদশ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক জোটগুলোর সঙ্গে জোটবন্দি হতে নানা ধরনের ইস্যু নিয়ে মাঠে কাজ করে যাচ্ছে ধর্মভিত্তিক দলগুলো। রাজনীতির মাঠে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করার পাশাপাশি বিভিন্ন জোটে শক্তিশালী অবস্থান তৈরিতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে দলগুলো। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে নবগঠিত ‘সম্মিলিত জাতীয় জোট’-এ যুক্ত হয়েছে বেশ কয়েকটি ইসলামী দল। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটে ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটে যুক্ত হবার জন্য বেশ কিছু ইসলামী দল দৌঁড়ঝাপ শুরু করেছে। রাজপথের মাঠে আন্দোলনের চাপ কমিয়ে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে ক্ষমতার অংশীদার হতে ভোটের হিসাব- নিকাশ করতে শুরু করেছেন এসব সংগঠনগুলোর শীর্ষ নেতারা। প্রকাশ্যে নিজেদের অভিমত প্রকাশ না করলেও গোপনে গোপনে সব জোটের সঙ্গে হিসাব মেলাতে ব্যস্ত রয়েছে। এমনটি জানিয়েছে দলগুলোর কয়েক শীর্ষ নেতা।

এদিকে জাতীয় নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে, ভোটের রাজনীতি ততই দৃশ্যমান হচ্ছে। ইতোমধ্যেই নিজেদের সমর্থক ও ভোট ব্যাংকের পাশাপাশি ধর্মভিত্তিক দলগুলোর সমর্থকদের ভোট কাড়তে বড় দুই দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও ক্ষমতার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির ভোট রাজনীতি অনেকটাই সামনে চলে এসেছে। এবার হিসাব-নিকাশ করতে শুরু করেছে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো। সে ক্ষেত্রে বড় দুই দলের সঙ্গে জোট বেঁধে ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবেই এই অঙ্ক কষছে ইসলামী দলগুলো। নির্বাচনকে প্রাধান্য দিলেও দলীয় কৌশল প্রণয়ন করছে নিজেদের মতো করেই। দলগুলো সাংগঠনিক ও জনপ্রিয়তা বিচার সাপেক্ষে সর্বোচ্চ ১০-২০টি আসনকেই টার্গেটে নিয়েছে। তাদের নেতারা বলছেন, আগামী নির্বাচন নিয়ে আলাপ আলোচনা চলছে।

জানা গেছে, শাসক দল আওয়ামী লীগ ইসলামী দল এবং সংগঠনগুলোর বিভিন্ন দাবি-দাওয়া মেনে নিয়ে তাদের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে উদ্যোগ নিয়েছে। প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ইতিমধ্যে ইসলামী ঘরানার বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল নিয়ে নতুন একটি জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। দলটির চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ইতিমধ্যে একাধিক ইসলামী দলের সঙ্গে এ ইস্যুতে কথাবার্তা চূড়ান্ত করেছেন। চলতি মাসেই তার নেতৃত্বে নয়া একটি জোটের রাজনীতির মাঠে আত্মপ্রকাশ ঘটতে যাচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব উদ্যোগের কারণে রাজনীতির মাঠে হঠাৎ করেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে নানা ভাগে বিভক্ত ছোট ছোট ধর্মভিত্তিক ইসলামী দলগুলো। তারা মনে করেন, সম্প্রতি হেফাজতে ইসলামের দাবি ও চাপের মুখে স্কুলের পাঠ্যবইয়ে বেশকিছু সংশোধনী আনা হয়। সংগঠনটির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে মঙ্গলবার গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বৈঠক এবং এ বৈঠকে শর্তহীনভাবে কওমি মাদ্রাসাকে স্বীকৃতি প্রদান- প্রভৃতি ঘটনা ইসলামী দল ও সংগঠনগুলোর সঙ্গে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সম্পর্কোন্নয়নেরই অংশ।

অন্য জোটের বাইরে চরমোনাই পীরের নেতৃত্বে বিকল্প একটি জোট গঠনের চিন্তা-ভাবনা চলছে বলে জানা গেছে। চরমোনাই পীরের অনুগামী, ভক্ত, মুরিদ মিলিয়ে দলটির সাংগঠনিক পরিস্থিতি ধর্মভিত্তিক অন্য দলগুলোর চেয়ে ভালো। ফলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কাছে বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে এই পীরের নেতৃত্বাধীন দলটি। এ জোটে নিবন্ধিত চারটি ইসলামী দলসহ কয়েকটি দল ভিড়তে পারে। এতে থাকতে পারে চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলন, মুফতি আমিনী প্রতিষ্ঠিত ইসলামী ঐক্যজোট, হাফেজ্জি হুজুর প্রতিষ্ঠিত খেলাফত আন্দোলন এবং শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। এ দলগুলোর নেতারা এরই মধ্যে নিজেদের মধ্যে প্রাথমিক আলাপ-আলোচনা সেরেছেন বলে জানা গেছে। উল্লেখিত চারটি দল কওমি মাদরাসা ভিত্তিক সংগঠন হওয়ায় তাদের সঙ্গে আদর্শগত মিল থাকায় এ জোটের প্রতি মৌন সমর্থন থাকতে পারে আরেকটি কওমি মাদরাসাভিত্তিক বড় ও অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের।

বিশ্লেষকরা আরো বলছেন, জাতীয় নির্বাচনের জন্য হঠাৎ করেই বড় ফ্যাক্টর করে তোলা হয়েছে হেফাজতে ইসলামকে। ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে নাস্তিক ব্লগারদের ফাঁসি দাবি করে সুসংগঠনটি আন্দোলন ও সমাবেশের নামে ব্যাপক তাণ্ডব চালায়। এরপরই রাজনৈতিক দলগুলো ধর্মভিত্তিক এই সংগঠনটির সমর্থন পাওয়া নিয়ে টানাটানি শুরু করে। যদিও সে সময় সংগঠনের কর্মসূচিতে বিএনপি-জামায়াত সমর্থন দিয়েছিল। কিন্তু সময়ের পেক্ষাপটে বিএনপির সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয় ও সে সুযোগ নেয় আওয়ামী লীগ। দূরত্ব কমিয়ে আনে সরকারের সঙ্গে। গত বছর গণভবনে কওমি মাদরাসার আলেমদের সঙ্গে নিয়ে হেফাজতে ইসলামের আমির শাহ আহমদ শফী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এরপর কওমি মাদরাসার সর্বোচ্চ স্তর দাওরায়ে হাদিসের সনদকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রির সমমান দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এরআগে তাদের দাবি অনুযায়ী, পাঠ্যপুস্তক সংশোধন ও নববর্ষ অনুষ্ঠানে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করে। সর্বশেষ আদালত প্রাঙ্গণ থেকে গ্রিক দেবীর ভাস্কর্য সরানোর দাবির প্রতিও সমর্থন জানিয়েছে সরকার। এ নিয়ে অবশ্য বেশ সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছে তাদের। সে নিয়ে হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে সরকারের সখ্যেরও অভিযোগ ওঠে। অবশ্য সরকার এটিকে রাজনৈতিক কৌশল বলে দাবি করেছে। তবে এর মধ্য দিয়েই প্রথম ইসলামপন্থি দলগুলোর ভোট রাজনীতি সামনে চলে আসে।
সে সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বসে নেই হেফাজতে ইসলাম। আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংগঠনটিকে রাজনৈতিক দলে রূপান্তরের কথা শোনা যাচ্ছে। যদিও সংগঠনের এক নেতা তাদের রাজনীতিতে আসার কোনো পরিকল্পনা নেই বলে দাবি করেছেন। কিন্তু সূত্রগুলো বলেছে, হেফাজতে ইসলামের ভেতর কয়েক ধরনের নেতৃত্ব রয়েছে। এই নেতৃত্বের একটি বড় অংশ বিভিন্ন ইসলামী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এরাই হেফাজতকে রাজনৈতিক দলে রূপ দিতে চাচ্ছেন। তারা নির্বাচন কমিশনেও (ইসি) গিয়েছিলেন রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধনের ব্যাপারে খোঁজখবর নিতে। তবে হেফাজতের পক্ষে দলটির সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী অস্বীকার করে বলেন, হেফাজত কোনো রাজনৈতিক দল নয়। হেফাজতের কাজ হচ্ছে ইসলামকে কেউ অপব্যবহার ও অসম্মান করলে তার বিরুদ্ধে জেহাদে শরিক হওয়া।

নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ৪০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ১১টি ইসলামী দল রয়েছে। এর বাইরে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী। তবে নির্বাচন কমিশন নিবন্ধন বাতিল করায় এ দলটি এখন ভিন্ন কৌশলে তৎপর রয়েছে। এ ছাড়া ২০ দলীয় জোটে আরো ৪টি নিবন্ধিত ইসলামী দল রয়েছে। দলগুলো হলো- খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, ইসলামী ঐক্যজোট (একাংশ) ও ইসলামিক পার্টি (একাংশ)। তারাও জোটগতভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটেও রয়েছে ইসলামী দল বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন। এ দলটি জোটগতভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিগত নির্বাচনে অংশ না নেয়া ভুল সিদ্ধান্ত ছিল জানিয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইসলামী ঐক্যজোটের এক সিনিয়র নেতা বলেন, নির্বাচনে না গেলে দলের অস্তিত্ব টেকে না। তাই অস্তিত্ব টেকানোর দায় থেকে আগামী নির্বাচনে অংশ নিতেই হবে। পরিবর্তন, মানবকণ্ঠ, যুগান্তর

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত