প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সাগরের মৎস্য জরিপ অনিশ্চিত

ডেস্ক রিপোর্ট : সুবিশাল বঙ্গোপসাগর। সম্পদ আর সম্ভাবনার আধার। বঙ্গোপসাগরে বিচরণ করছে ৩৬ প্রজাতির চিংড়িসহ অর্থকরী ৪৭৬ প্রজাতির মাছ। সাগরের প্রধান তিনটি মৎস্যসহ প্রাণিজগতের বিচরণ এলাকার মধ্যে রয়েছে ‘সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড’। সেখানে সমুদ্রগামী জাহাজ থেকে নীল-সবুজাভ সাগরের বুকে ডলফিনের লাফালাফির দৃশ্য অপরূপ ও অবর্ণনীয়। সমুদ্রসম্পদ বিশেষজ্ঞ সূত্র জানায়, বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) ষাটের দশকে বঙ্গোপসাগরে সর্বপ্রথম একটি পূর্ণাঙ্গ জরিপ ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে। এ জরিপ-গবেষণায় বিদেশি বিজ্ঞানীরা বঙ্গোপসাগরকে ‘মৎস্য খনি’ হিসেবে উল্লেখ করে গেছেন। তারা বলেছেন, এটি অজস্রজাতের মৎস্যরাজির উর্বর ক্ষেত্র। বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশের একান্ত অর্থনৈতিক পানিসীমায় (ইইজেড) সর্বশেষ জরিপ-গবেষণা পরিচালিত হয় দীর্ঘ ২৮ বছর পূর্বে। অথচ এই সুদীর্ঘকালে জরিপ ও গবেষণার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয়নি।
এ অবস্থায় বঙ্গোপসাগরে চিংড়িসহ মূল্যবান হরেক প্রজাতির মাছ শিকার করা হচ্ছে নির্বিচারে। সমুদ্রের অগভীর অংশে অত্যধিক হারে মাছ নিধন চলছে। অথচ গভীর সমুদ্রের দিকে বিচরণশীল মৎস্যরাজি (টুনা ফিশ জাতীয়) খুবই কম আহরণ করা হয়। এতে করে সাগরে মাছের মজুদ, বিচরণ ও বংশ বিস্তারের ক্ষেত্রে মারাত্মক ভারসাম্যহানি ঘটছে। সাগরে অনেক জায়গায় অতিবেশি মাছ নিধনের কারণে মৎস্যরাজি ফুরিয়ে নির্বংশ হয়ে যাচ্ছে। আবার সুগভীর অংশে মাছ শিকার করা তেমন হচ্ছে না। তাছাড়া ভিনদেশী অবৈধ অনুপ্রবেশকারী ট্রলার নৌযানে সাগরের মাছ চুরি ও লোপাট হয়ে যাচ্ছে। এর পরিণতিতে বঙ্গোপসাগরে মৎস্যসম্পদের সর্বোচ্চ আহরণ সহনসীমা (ম্যাক্সিমাম সাসটেইনএবল ইয়েলডিং- এমএসওয়াই) ক্ষতিগ্রস্ত এবং মাছের বিচরণ ও বর্ধনশীল পরিবেশ-প্রকৃতি বিপন্ন হয়ে যাচ্ছে এমনটি শঙ্কা ব্যক্ত করছেন সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ বিশেষজ্ঞরা।
অবাধে ও ভারসাম্যহীন মৎস্য নিধন রোধকল্পে মাছের মজুদ, বংশবৃদ্ধি, বিচরণশীল এলাকা, পরিবেশ-প্রতিবেশ ইত্যাদি বিষয়ে অব্যাহত গবেষণা নিয়মিত পরিচালনা জরুরি হলেও দীর্ঘদিন যাবত তা উপেক্ষিত হয়ে আছে। বঙ্গোপসাগরের ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গ কিলোমিটার ব্যাপী বিস্তীর্ণ পানিসীমায় এবং ২শ’ নটিক্যাল মাইল মহিসোপান নিয়ে একান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চলের (ইইজেড) উপর অধিকার তথা সার্বভৌমত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দেশের সমুদ্রসীমায় মৎস্যভান্ডার ও বিভিন্ন সম্পদরাজির মজুদ, প্রাপ্তি ও বিচরণশীলতা সম্পর্কে নিরবচ্ছিন্ন জরিপ এবং গবেষণার লক্ষ্যে সরকার আগেই পদক্ষেপ গ্রহণ করে। কিন্তু অপরিকল্পিত ও সমন্বয়হীন উদ্যোগের কারণে এই জরিপ ও গবেষণা প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যই মুখ থুবড়ে পড়তে যাচ্ছে।
মৎস্য বিভাগ স¤প্রতি সংগ্রহ করে জরিপ-গবেষণার একটি বিশেষায়িত জাহাজ ‘আরভি মীন সন্ধানী’। তবে জাহাজটির বিভিন্ন ধরনের ত্রুটি-বিচ্যুতি, প্রযুক্তিগত সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা। এসব দিক গবেষক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে ধরা পড়ে। এরফলে দীর্ঘদিন পর দেশের সমুদ্রসীমায় জরিপ ও গবেষণা সমস্যা তৈরি হতে যাচ্ছে নানামুখী জটিলতা। তবে নেপথ্যে একটি মহল জরিপ জাহাজটির ত্রুটি ও সমস্যাগুলো ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা চলছে। ‘আরভি মীন সন্ধানী’ নামক জরিপ ও গবেষণা জাহাজটি ৬৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে মালয়েশিয়া থেকে সংগ্রহ করা হয়। ২০১৬ সালের ১৯ নভেম্বর চট্টগ্রাম পতেঙ্গা বোট ক্লাবে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে জাহাজের কমিশনিং (উদ্বোধন) করেন। সরকারের তরফ থেকে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়, জাহাজটি প্রত্যাশিত বøু-ইকোনমি (সামুদ্রিক অর্থনীতি) বাস্তবায়ন এবং বিশাল সমুদ্র এলাকার জীববৈচিত্রের জরিপ ও মৎস্য সম্পদরাজির সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অন্যদিকে ‘আরভি মীন সন্ধানী’র পদে পদে যান্ত্রিক ত্রুটি-বিচ্যুতি ধরা পড়ে। জাহাজের ডিজাইনে রয়েছে ত্রুটি। এ ধরনের জরিপ-গবেষণা জাহাজে দু’টি ইঞ্জিন থাকারই কথা। কিন্তু এ জাহাজে রয়েছে মাত্র একটি। সমুদ্র উপকূলভাগ থেকে ২শ’ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত গভীর বঙ্গোপসাগরে গিয়ে একটি ইঞ্জিন নিয়ে জরিপ ও সরেজমিন গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে এমনটি আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রতিকূল আবহাওয়ায় এ ধরনের জাহাজের গভীর সমুদ্র পাড়ি দেয়ার সক্ষমতা থাকা জরুরি। ‘মীন সন্ধানী’র সক্ষমতা নিয়ে রয়েছে সংশয়। ইতোমধ্যে কয়েকবার জাহাজের মেরামত কাজও সারাতে হয়েছে। তাছাড়া জরিপ-গবেষণার জাহাজ ‘আর ভি অনুসন্ধানী’র ড্রাফট, দৈর্ঘ্য-প্রস্থ, ওজন, হর্স পাওয়ার নিয়েও সক্ষমতায় ঘাটতির প্রশ্ন রয়েছে। এসব দিক নিয়ে মৎস্য অধিদপ্তর পর্যালোচনা করলেও তদন্ত এখনও শুরু করেনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় তলদেশে বিভিন্ন প্রজাতির মৎস্য সম্পদের বিচরণশীলতা, সমুদ্রের কোন কোন পয়েন্টে পানির কোন স্তরে কী কী ধরনের মাছ রয়েছে, মাছের খাদ্য-শৃঙ্খল কোথায় রয়েছে ইত্যাদি বিষয়ে সরেজমিন জরিপের জন্য বাংলাদেশ মেরিন ফিশারিজ ক্যাপাসিটি বিল্ডিং প্রকল্প নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। উক্ত প্রকল্পের আওতায় দরপত্রের মাধ্যমে ‘আরভি মীন সন্ধানী’ জরিপ ও গবেষণা জাহাজ ক্রয় করা হয়। এর আগে ২০১২ সালে জাহাজের জন্য কার্যাদেশ দেয়া হয়। ২০১৪ সালের জুনে বাংলাদেশ থেকে একটি কারিগরি টিম জাহাজটি দেখতে যায়। এ টিমের একটি প্রতিবেদনে জাহাজটির ডিজাইনে ত্রুটিসহ বিভিন্ন অসঙ্গতি ধরা পড়ে। এতে বলা হয়, এ জাহাজটি দিয়ে সমুদ্রে মৎস্যসম্পদ জরিপ-গবেষণা কার্যকর হবে না। এরপরও জাহাজটি ২০১৬ সালের ৯ জুলাই দেশে নিয়ে আসা হয়।
এদিকে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা সন্দিহান, ‘আরভি মীন সন্ধানী’র সাহায্যে বিশাল ও বিস্তৃত এবং উত্তাল বঙ্গোপসাগরের মৎস্যসম্পদ, প্রাণিরাজ্য শামুক, ঝিনুক, শেওলা, প্রবালসহ সামুদ্রিক সম্পদরাজির সুনির্দিষ্ট ও নির্ভুল তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা সম্ভব নাও হতে পারে। জাহাজটিতে ‘সনার’ যন্ত্রটি থাকলেও বঙ্গোপসাগরের ১৬শ’ মিটার গভীরের সব তথ্য এ জাহাজের মাধ্যমে পাওয়া, অর্থকরী চিংড়িসহ মৎস্যসম্পদের মজুদ নিরূপণ ইত্যাদির মধ্যদিয়ে বের করে আনা কঠিন হতে পারে মৎস্যসম্পদের সর্বোচ্চ আহরণ সীমা (এমএসওয়াই) বিষয়ে সঠিক গাইডলাইন পাওয়া। সমুদ্রের পানিতে ৩৬০ ডিগ্রি অবতলে ২শ’ মিটার গভীরতা পর্যন্ত জীবিত যেকোনো জলজ প্রাণী চিহ্নিত করা সম্ভব হবে কিনা তাও অনিশ্চিত।
বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) বিজ্ঞানীরা জরিপ ও গবেষণা করে পথ দেখিয়েছেন, বাংলাদেশের সমুদ্র এলাকাটি মৎস্যসম্পদে সুসমৃদ্ধ। সাগরে মূল ৩টি মৎস্য বিচরণ এলাকা রয়েছে। সেগুলো হচ্ছে- ‘সাউথ প্যাসেচ’, ‘মিডলিং’ বা ‘মিডল গ্রাউন্ড’ এবং ‘সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড’। সেসব অঞ্চলে মজুদ ও বিচরণশীল রয়েছে রূপচান্দা, কালাচান্দা, কোরাল, ইলিশ, লাক্ষা, ছুরি, পোয়া, লইট্টা, মাইট্টা, চিংড়ি ও টুনাসহ হরেক প্রজাতির অর্থকরী মাছ। প্রাণিজ প্রোটিনের বিরাট অংশের যোগান আসে বঙ্গোপসাগর ও এর সংলগ্ন উপকূলের মাছ থেকে। দেশের সার্বভৌম সমুদ্রসীমা সুনির্ধারিত থাকায় সাগরে মাছের অভয়ারণ্য গড়ে তোলা সম্ভব। বাংলাদেশের পানিসীমা বেড়েছে। ফিশিং জোনও ৫ থেকে ৭ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সাগরে প্রচুর পরিমাণে মাছ আহরণ করে রফতানি ও দেশে আমিষের চাহিদা মেটানো সম্ভব। সামুদ্রিক মৎস্যখাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির সুযোগ খুলে যেতে পারে। তবে এরজন্য পূর্বশর্ত হচ্ছে সাগরে মৎস্যসম্পদের জরিপ-গবেষণার ধারাবাহিকতা।
‘সমৃদ্ধ মৎস্যখনি’ বঙ্গোপসাগরে ১৯৫৮ সালে জাপানি গবেষণা ও সমুদ্র অনুসন্ধানী জাহাজ ‘খুশি মারো’র মাধ্যমে সর্বপ্রথম জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। এরপর ১৯৬০ সালে ‘কাগাওয়া মারো’ থেকে শুরু করে ১৯৮৪-৮৯ সাল পর্যন্ত বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার আর্থিক সহায়তায় ‘অনুসন্ধানী’ নামক জরিপ জাহাজে বাংলাদেশের মালিকানাধীন বঙ্গোপসাগরে বিশাল মৎস্য ভান্ডারের মজুদ, স্থিতি ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য নিরূপন করা হয়। গবেষণা জাহাজযোগে এসব জরিপে বেরিয়ে এসেছে, চিংড়ি, ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছে ভরপুর বঙ্গোপসাগর। মৎস্য বিজ্ঞানীরা জানান, নির্বিচারে মাছ শিকার রোধ, পোনা ও মা মাছ নিধন বন্ধ, পরিবেশ দূষণ রোধ, মাছের বিচরণ এলাকা বা অভয়াশ্রম সংরক্ষণ করা হলে বাংলাদেশ সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ কাজে লাগিয়ে সবল অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারবে। তবে এরজন্য অপরিহার্য হচ্ছে সমন্বিত পরিকল্পনা। সূত্র : ইনকিলাব

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত