প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ডলার বাজারে আগুন, কারণ পাচার

ডেস্ক রিপোর্ট : আবারও অস্থির হয়ে উঠছে ডলারের বাজার। দাম বাড়ছে হু হু করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে এক বছরে ডলারের দাম বেড়েছে ৪ টাকা। গত বছর ১৭ জানুয়ারি এক ডলারের দাম ছিল ৭৮ দশমিক ৯০ টাকা আর চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারি তা বিক্রি হয়েছে ৮২ দশমিক ৮৪ টাকায়। বাংলাদেশ ব্যাংকে গতকাল ডলার বিক্রি হয়েছে ৮২ দশমিক ৯০ টাকায়। দেশের অন্য ব্যাংকগুলোতে ৮৪ টাকায় ডলার বিক্রি হয়েছে। কার্ব মার্কেটে দাম আরও চড়া। খোলা বাজারে গতকাল মার্কিন ডলার ৮৫ থেকে ৮৬ টাকায়ও বিক্রি হয়েছে বলে জানা গেছে। ডলারের বাজারে থেমে নেই কারসাজির সিন্ডিকেট। এদিকে রপ্তানি ও রেমিট্যান্স আয় কমায় গত ছয় মাসে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমেছে এক বিলিয়ন ডলার। ফলে সংকট বাড়ছে আমদানি খাতে। অভিযোগ রয়েছে, কয়েকটি ব্যাংক কারসাজি করে ডলারের দাম বাড়াচ্ছে। এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অমান্য করে চড়া দামে ডলার বিক্রি করে বাংলাদেশ ব্যাংককে কম রেট দেখাচ্ছে কয়েকটি। এর আগে নভেম্বরের শেষ দিকে ডলার নিয়ে কারসাজির অভিযোগে তিনটি বিদেশি ও ১৭টি দেশীয় ব্যাংককে বাংলাদেশ ব্যাংক সতর্ক করে নোটিসও প্রদান করে। সে সময় ব্যাংকগুলো সন্তোষজনক কোনো জবাব তো দেয়ইনি, উল্টো এক মাসের ব্যবধানে ডলার নিয়ে নতুন করে কারসাজিতে মেতেছে বলে জানা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ওই ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রা কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এবার ব্যাংকগুলোকে মোটা অঙ্কের জরিমানা গুনতে হতে পারে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

জানা গেছে, বিশেষ একটি গোষ্ঠী হুন্ডির মাধ্যমে বিশাল অঙ্কের অর্থ পাচার বাড়িয়ে দেওয়ায় টাকার বিপরীতে হু হু করে দাম বেড়ে চলেছে ডলারের। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, কানাডায় চলে যাচ্ছে বাংলাদেশের অর্থ। হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠিয়ে এসব দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য ও প্রাসাদ গড়ে তুলছে চিহ্নিত ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট। অনেকে বাণিজ্যিক ভবনও ক্রয় করছেন। আবার কেউ কেউ ভুয়া এলসি অথবা ওভার ইনভয়েস করে অর্থ পাচার করছেন বিভিন্ন দেশে। অব্যাহতভাবে ডলারের দাম বাড়ায় সংকটে পড়েছেন আমদানিকারকরা। আমদানি ব্যয় বাড়ছে। ফলে আমদানি পণ্যের দামও বাড়ছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সার্বিক অর্থনীতিতে। সূত্রমতে, কয়েকটি ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ডলারের প্রকৃত বিক্রয়মূল্যের তথ্য গোপন করছে। তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে যে রেট দিচ্ছে এর চেয়ে কমপক্ষে ২ টাকা বেশি দরে ডলার বিক্রি করছে আমদানিকারকদের কাছে। আমদানিকারকরা জানিয়েছেন, এসব ব্যাংকের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা না নেওয়া হলে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। অন্যদিকে আমদানিকারকদের পাশাপাশি সাধারণ বিদেশগামী রোগীরাও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। এর প্রভাবে বিভিন্ন ধরনের আমদানি পণ্যের দাম বাড়তে পারে এমন আশঙ্কায় রয়েছেন ব্যবসায়ীরা। কেননা ডলারের দাম বাড়ায় আমদানি ব্যয় বাড়ছে। ফলে আমদানি পণ্যের দাম ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ডলারের বাজার এখনই স্থিতিশীল করা প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, চলতি বছর ১৭ জানুয়ারি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৩১৬ বিলিয়ন ডলারে, যা গত বছর ৩০ জুন ছিল ৩৩ দশমিক ২২৫ বিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে ছয় মাসের ব্যবধানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমেছে প্রায় এক বিলিয়ন ডলার। আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (এসিইউ) দেনা পরিশোধের পরিমাণও বেড়েছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমেছে। রিজার্ভ কমার অন্যতম আরেক কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে রেমিট্যান্স আয়ে ধস। এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংক বলছে, বিশ্বের প্রতিটি দেশেই প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রাপ্তি কমেছে। তবে দেশগুলোর মধ্যে প্রবাসী আয় সবচেয়ে বেশি কমেছে বাংলাদেশ ও ভারতে। সে তুলনায় পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় প্রবাসী আয় কমে যাওয়া এতটা প্রকট হয়নি। বিগত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে প্রবাসী আয় কমেছিল সাড়ে ১৪ শতাংশ। ওই অর্থবছর প্রবাসীরা পাঠান ১ হাজার ২৭৬ কোটি ডলার। আর এরও আগের অর্থবছর (২০১৫-১৬) প্রবাসী আয় আসে ১ হাজার ৪৯৩ কোটি ডলার। যদিও চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) প্রবাসী আয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১৬ শতাংশ। ঈদের কারণেই এমনটি হয়েছে বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক। এরপর সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বরেও রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি কমেছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এদিকে ডলারের মূল্য বৃদ্ধিতে আমদানি ব্যয় বাড়ছে অব্যাহতভাবে। ফলে বাণিজ্যঘাটতিও বাড়ছে। চলতি অর্থবছরের (২০১৭-১৮) প্রথম প্রান্তিকে বাণিজ্যঘাটতি ১৩৩ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যেও বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এ সময় চলতি হিসাবে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৭৯ কোটি ১০ লাখ ডলার। আর জুলাই থেকে নভেম্বর প্রান্তিকে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৪৩ দশমিক ২০ কোটি ডলারে। অর্থনীতির সাধারণ গতিধারা অনুযায়ী আমদানি ব্যয় বাড়লে রপ্তানি আয়ও বাড়ে। কারণ বিদেশ থেকে যেসব কাঁচামাল আমদানি করা হয়, এর একটি অংশ প্রক্রিয়াজাত করার মাধ্যমে রপ্তানি করা হয়। অতীতে এমন হয়ে এলেও এবার এর ব্যতিক্রম হচ্ছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, আমদানির নামে ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচার হচ্ছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, গত অর্থবছর রপ্তানি আয়েও কাঙ্ক্ষিত গতি আসেনি। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর এ তিন মাসে বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করে আয় হয়েছে ৮৬৬ কোটি ২৭ লাখ ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৭ দশমিক ২৩ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে আমদানি বেড়েছে ২৮ শতাংশ। ফলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডলার কিংবা অর্থ পাচার হয়ে যাচ্ছে এটা বহুদিন থেকেই শোনা যাচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থার রিপোর্টেও এর প্রমাণ মিলছে। কিন্তু এই অর্থ পাচার বন্ধে বাংলাদেশ ব্যাংক কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘অব্যাহতভাবে ডলারের দাম বাড়ছে। এখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি আরও বাড়ানো দরকার।’ কোনো ব্যাংক কারসাজি করলে তার কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ডলারের মূল্য নিয়ে কেউ কারসাজি করেছে বা করছে এটা যদি চিহ্নিত হয়ে থাকে, তাহলে সবার আগে সে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারক ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হবে। ব্যাংকগুলো যে রেটে ডলার বিক্রি করে আর বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে যে রেট সরবরাহ করে, তা আরও কঠোরভাবে তদারক করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। ডলারের মূল্য বাড়লে সবার আগে এর প্রভাব পড়বে আমদানি খাতে, যা সব ধরনের আমদানি পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে বলে জানান তিনি। সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত