প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রক্তে দাস

সাম্য শরিফ : প্রায় দুইশত বছরের বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসন আমাদের মনোজাগতিক-সাংস্কৃতিক চেতনাবোধের উপর যে প্রভাব ফেলেছে সেখান থেকে বের হতে আরও দুইশত বছর লেগে যাবে কিংবা আদৌ বের হওয়া যাবে কি না তা এখন প্রশ্নবিদ্ধ ছবি হয়ে ভেসে উঠেছে ভারতীয় হাইকমিশন ভবন হয়ে সকল মিডিয়ায়। কোনো কিছু রক্তে মিশে গেলে তা জিন পরস্পরায় কয় জেনারেশন বয়ে চলে তার সময়সীমা নেই। আমাদের পূর্বপুরুষদের খুবই দুর্ভাগ্যজনকভাবে মানবজীবনটা ঔপনিবেশিক শাসনের দাসত্বে মাথানত করে কাটিয়ে দিতে হয়েছে। সেই মাথার উপর মনিব থাকা জীবনে, সেই ’সুটেড-বুটেড’ ইংরেজদের কাছে নিজেদেরকে অতিতুচ্ছ ভাবা মর্যাদাহীন অস্তিত্বে, সেই অস্তিত্বহীনতার হীনমন্যতায় ন্যুব্জ হয়ে বেড়ে ওঠা ব্যক্তিত্বরহীত জীবনযাপনের দাসমনোবৃত্তির অন্তর্জগতে যে আকৃতি ও ব্যাপ্তী সৃষ্টি হয়েছিল তা জৈবচক্রের অমোঘ নিয়মে প্রায় শত বছর পরে এখনও আমরা ধারণ করে চলেছি লজ্জা ও ব্যক্তিত্বহীনতার বোধশুন্যতায়।

কেমন ছিল সেই বৃটিশ শাসনের দুইশত বছরে আমাদের নাগরিক ভাবনা, জাতীয় চেতনা ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদাবোধ? প্রথম দুটো ভিন্ন মাত্রায় কখনো প্রকাশিত, কখনো অপ্রকাশিত ও অধিকাংশ সময়ে সুপ্ত অবস্থায় থাকলেও রাষ্ট্রীয় মর্যাদাবোধ বলে কিছইু ছিলনা কারণ কলোনিয়াল শাসনে জনগণের রাষ্ট্র বলে কিছু থাকেনা। আমাদের ভূখন্ডে এখন নিজস্ব রাষ্ট্র আছে মৌলিক সব উপাদানসহ। কিন্তু আমাদের কারো কারো রক্তে হয়ত এখনও বয়ে চলেছে আমাদের সেই দুর্ভাগ্যজনক উপনিবেশ আমলের অসহায় পুর্বপুরুষদের রক্তের ধারা। জিনগতভাবে পাওয়া শত বছর আগের উপায়হীন ’তুমি উত্তম, আমি অধম’ মানসিকতার বৈশিষ্ট্য তাই এখনও বিরাজমান।

আমাদের যে রাষ্ট্রীয় পদাসীন মর্যাদাবান মাননীয়গণ ভারতের সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জীকে সামনে রেখে ’তুমি বড় আমি ছোট’ নামের যে ’প্রামাণ্য চিত্র’টি করলেন তাতে আমাদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদাবোধ ও জাতীয় সন্মান ভাবনাটা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে যে আমরা সেই বৃটিশ শাসিত কলোনিয়াল যূগের মানসিকতা এখনও ধারণ ও লালন করি কি না। হতে পারে যারা ছবিতে অংশ নিয়েছেন তারা হয়ত মনে করেন যে তাদের আজকের এই দাঁড়িয়ে থাকার পেছেনে যেহেতু প্রণব মুখার্জীর অবদান আছে তাই কৃতজ্ঞতাস্বরুপ তাকে ’বিগ ব্রাদার’ হিসেবে মেনে নিয়ে সামনে বসিয়েছেন। কিন্তু যেভাবেই তারা দাড়িয়ে থাকুন না কেন যতক্ষণ পর্যন্ত কেউ রাষ্ট্রীয় পদে আসীন থাকবেন রাষ্ট্রীয় মর্যাদা সমুন্নত রাখা তার প্রথম কর্তব্য।

তবে ভারতীয় হাইকমিশন ভবনের ওই ছবিতে অংশ নেয়া পাত্রপাত্রীদের দৃষ্টিভঙ্গী ও মর্যাদাবোধের সাথে এদেশের নাগরিক সমাজের দৃষ্টিভঙ্গী ও মর্যাদাবোধের যে মিল নেই তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রতিক্রিয়ায় স্পষ্ট। যদিও কারো কারো দৃষ্টিভঙ্গীতে ছবিটি নির্দোষ এবং স্বাভাবিক। রক্তে কলোনিয়াল যূগের দাস মানসিকতা বয়ে না চললে বিষয়টিকে কেউ স্বাভাবিক হিসেবে ভাবতে পারে না। বিষয়টি যে স্বাভাবিক নয় তা ভারতীয় হাই কমিশনের ওয়েবসাইট থেকে ওই ছবি সরিয়ে নেয়ার মাধ্যমেই স্পষ্ট। বিষয়টিকে ভারত বিরোধীতার অংশ হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। গ্লোবাল এই সময়ে একটি রাষ্ট্রের জনগণের সাথে আরেকটি রাষ্ট্রের জনগণের অকারণ আবেগি বিরোধীতার সময় শেষ হতে চলেছে। এখন বিরোধিতা তা হয় পাস্পরিক সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রমের কারণে। ছবিতে যে চেয়ারে প্রণব মুখার্জী ’বিগ ব্রাদার’ হয়ে বসে রয়েছেন ওই চেয়ারে পৃথিবীর অন্য যে কোনো দেশের সাবেক বা বর্তমান রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান বসে থাকলেও তা আমাদেরকে একই রকম ’ইনফেরিয়র’ করে দেয়।
ই-মেইল: [email protected]

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত