প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নাগরিকত্ব-নিরাপত্তা ইস্যুতে চ্যালেঞ্জে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন

ডেস্ক রিপোর্ট: মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও বৌদ্ধ মিলিশিয়াদের নির্যাতনের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে চুক্তি সই করেছে দু’দেশ। তবে নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তার বিষয়টি সুরাহা না হলে মিয়ানমারে ফিরতে ইচ্ছুক নন রোহিঙ্গারা।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে দু’দেশের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর হওয়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। তবে তারাও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে ‘সবকিছু’ বিবেচনায় নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর জন্য চুক্তি হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে তাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। রোহিঙ্গারা বলছেন, মিয়ানমারে তাদের নাগরিকত্ব, বসতভিটা ফেরত এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত না করলে তারা ফেরত যাবেন না।

এদিকে, জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থাকে পাশ কাটিয়ে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে বাংলাদেশের সঙ্গে যে চুক্তি হয়েছে, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘ মহাসিচব অ্যান্তোনিও গুতেরেস।

জাতিসংঘের সদরদফতরে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, সবচেয়ে খারাপ বিষয় হবে এই মানুষগুলোকে বাংলাদেশের ক্যাম্প থেকে মিয়ানমারের ক্যাম্পে সরিয়ে নেয়া।

জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ যে রোহিঙ্গারা যেন নিজেদের বাড়িতে নিরাপদে ফিরে যেতে পারে, তাদের যেন জোর করে পাঠানো না হয় এবং মিয়ানমারে ফিরে যেন শরণার্থী শিবিরে থাকতে না হয়।

বাংলাদেশ-মিয়ানমার প্রত্যাবাসন পরিকল্পনা রোহিঙ্গাদের বিপন্ন করবে বলে মনে করছে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এইচআরডব্লিউ। তারা বলছে, এই প্রত্যাবাসন চুক্তির ফলে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা এবং স্বার্থ হুমকিতে পড়বে।

মিয়ানমারে ফেরত যাওয়ার ক্ষেত্রে পাঁচ দফা দাবি নিয়ে শনিবার সফররত জাতিসংঘের বিশেষ দূত ইয়াংহি লি’র সামনে বিক্ষোভ করেছে রোহিঙ্গারা। এর আগের দিনও একই দাবিতে বিক্ষোভ করেছে তারা।

গত ১৬ জানুয়ারি বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে যে অ্যারেঞ্জমেন্ট নামে প্রত্যাবাসন চুক্তিটি হয়েছে, তার ধারাবাহিকতায় এরই মধ্যে চূড়ান্ত হয়ে গেছে প্রতি সপ্তাহে দেড় হাজার করে রোহিঙ্গা শরণার্থীকে গ্রহণ করবে মিয়ানমার।

আর সেটার পদ্ধতি ও পথনকশাও চূড়ান্ত। সেই মোতাবেক সীমান্তে বাংলাদেশ অংশে থাকবে পাঁচটি ট্রানজিট ক্যাম্প। প্রত্যেক কর্মদিবসে ৩০০ রোহিঙ্গাকে নিয়ে যাওয়া হবে সেসব ট্রানজিট ক্যাম্পে।

এরপর সেখান থেকে পাঠানো হবে সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের দুটি রিসেপশন ক্যাম্পে। আর রিসেপশন ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গাদেরকে পাঠানো হবে নিজ নিজ গ্রামে, তাদের ঘরবাড়িতে।

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে অধিকাংশ রোহিঙ্গারই কোনো ঘরবাড়ি এখন আর অবশিষ্ট নেই। জায়গা-জমিও বেদখল। কবে তাদের বাড়িঘর পুনর্নির্মাণ হবে আর রিসেপশন ক্যাম্প থেকে কবে তাদেরকে পুনর্বাসন করা হবে তা নিয়ে রোহিঙ্গাদের মধ্যে রয়েছে অনিশ্চয়তা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ছয়জন রোহিঙ্গা নেতা বার্মিজ ভাষায় হাতে লেখা একটি স্মারকলিপির খসড়া তৈরি করেছেন। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের ৪০টি গ্রামের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছেন কক্সবাজারের কুতুপালং ক্যাম্পে থাকা ওই নেতারা। তাদের স্মারকলিপি চূড়ান্ত হলেই তা বাংলাদেশ সরকার এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিদের কাছে তা তুলে ধরা হবে।

ওই খসড়ায় বলা হয়েছে, মিয়ানমার সরকার যতক্ষণ না এসব দাবি পূরণ করছে, ততক্ষণ আশ্রয় শিবির থেকে নিপীড়নের মুখে পালিয়ে আসা কোনো রোহিঙ্গা মুসলমান মিয়ানমারে ফিরে যাবে না।

ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার কূটনীতিকরা অভিমত দিয়েছেন, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন হতে হবে নির্বিঘ্ন। তারা যেন স্বদেশে ফেরেন স্বেচ্ছায় এবং সম্মানের সঙ্গে।

গত রোববার বিকেলে ঢাকার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর ব্রিফিং শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা।

ভারতের হাইকমিশনার হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা, যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্শা ব্লুম বার্নিকাট, যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার অ্যালিসন ব্লেক বলেছেন, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন হতে হবে নির্বিঘ্ন। তারা যেন স্বদেশে স্বেচ্ছায় এবং সম্মানের সঙ্গে যেতে পারেন। তাদের মিয়ানমারে পাঠানোর আগে রাখাইন রাজ্যে জনগোষ্ঠীটির নিরাপত্তা নিশ্চিতের পদক্ষেপ নিতে হবে।

এবিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শমসের মবিন চৌধুরী পরিবর্তন ডটকমেকে বলেন, তাড়াহুড়ার যে বিষয়টি রয়েছে সেটা ঠিক না বেঠিক সেটা নির্ভর করছে রোহিঙ্গাদের ওপর। রোহিঙ্গারা যদি মনে করে যে প্রক্রিয়ায় তাদের ফেরত পাঠানো হবে সেটা নিরাপদ তাহলে তারা ফিরে যাবে। আর যদি তারা মনে করে এখনই নিরাপদ পরিবেশ তৈরি হয়নি তাহলে তারা যেতে চাইবে না।

তিনি বলেন, এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার কী ভাবলো সেটা তো মূল কথা নয়। মূল কথা হচ্ছে রোহিঙ্গারা কী ভাবছে। তারা কী সেখানে নিরাপদে বসবাস করতে পারবে?

শমসের মবিন বলেন, যারা মূলত আক্রান্ত হয়েছে তারা কতটুকু আশ্বস্থ হতে পারছে যে, তারা সেখানে নিরাপদে ফিরে যেতে পারবে, নিরাপদে বসবাস করতে পারবে। এটা নিশ্চিত করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তারা কী সেখানে গিয়ে স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে পারবে এটাই এখন বড় প্রশ্ন। আর এটার উত্তর মিয়ানমারকেই দিতে হবে।

তিনি বলেন, এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে মিয়ানমারকে কিভাবে আমরা বিশ্বাস করব, যখন তারা ধারাবাহিকভাবে আমাদের বিশ্বাসভঙ্গ করছে। ১৯৭৮ ও ১৯৯২ সালের রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংক্রান্ত চুক্তির মূল একটি বিবেচ্য বিষয় ছিল, রোহিঙ্গারা যাতে আর পালিয়ে না আসে সে জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নেবে মিয়ানমার।

সাবেক এই পররাষ্ট্র সচিব বলেন, মিয়ানমার এখনো তাদের ভুলই শিকার করছে না। আর যারা অপরাধ করেছে তাদের কি শাস্তি হবে সেটাও তো কিছুই বলছে না। তাহলে তাদেরকে কিভাবে বিশ্বাস করব? আমার মনে হয় সবকিছু বিবেচনা করেই তাদের ফেরত পাঠানো উচিত।

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের বিষয়ে মিয়ানমারে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত অনুপ কুমার চাকমা পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে যাওয়ার পরে নাগরিকত্ব পাওয়াটা হচ্ছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য তাদেরকে প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে হবে, তারা আবেদন করবে। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ইস্যুটা যদি সমাধান না হয় তাহলে এই সমস্যা থেকেই যাবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ পাঁচটা ক্যাম্পে থেকে রোহিঙ্গাদের পাঠাবে। মিয়ানমার দুইটি ক্যাম্প থেকে সেটা গ্রহণ করবে। কিভাবে রাখবে, কোথায় রাখবে এই পুরো ব্যবস্থাটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। এরপর যে ব্যবস্থায় রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে এভাবে তারা দেশে ফিরে যেতে আগ্রহী কিনা সেটা দেখতে হবে।

সাবেক এই রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, রোহিঙ্গাদের দেশে ফেরত পাঠাতে আগ্রহী করে তোলাও একটা বড় চ্যালেঞ্জ। যদি রাখাইনে অবকাঠামো গত উন্নয়ন না হয়, তাদের নিরাপত্তা যদি নিশ্চিত না হয় তাহলে সমস্যার তো সমাধান হবে না। পরিবর্তন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত