প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন
বিদ্রোহী প্রার্থীর শঙ্কায় দু’দল

মাইকেল : সরগরম তৃণমূলের রাজনীতি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে ভোটের হাওয়া বইছে। উভয় দলেই প্রতিটি আসনে রয়েছে একাধিক প্রার্থী। এ কারণে দু’দলেই বিদ্রোহী প্রার্থী নিয়ে শঙ্কা বিরাজ করছে। জয়ের ক্ষেত্রে গলার কাঁটা হতে পারে বিদ্রোহীরাই। বিগত নির্বাচনে বিদ্রোহীদের শাস্তি না দেয়ায় আগামীতেও দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে অনেকেই প্রার্থী হতে পারেন। অন্যদিকে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে ধানের শীষের জয় নিশ্চিত এমন আশ্বাসে বিএনপিতেও প্রার্থীর ছড়াছড়ি। প্রতিটি আসনে একাধিক প্রার্থী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। সংস্কারপন্থী ও সুবিধাবাদীরা অনেকেই বিদ্রোহী প্রার্থী হতে পারেন বলে আশঙ্কা দলটির নীতিনির্ধারকদের।

ঘর সামলানো কঠিন হবে আ’লীগের

দলের বিরুদ্ধে এমপি নির্বাচনে অংশ নেয়া আওয়ামী লীগ নেতারা এখনও বহাল-তবিয়তে। শাস্তি হয়নি উপজেলা নির্বাচনের বিদ্রোহী নেতাদের। সেই ধাক্কায় পৌরসভা, ইউনিয়ন নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থীর সংখ্যা তিনগুণ। বাদ যায়নি দলীয় প্রার্থীর নির্বাচন জেলা পরিষদেও। সিদ্ধান্ত থাকার পরও বিদ্রোহী প্রার্থীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এ অবস্থায় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ ধরনের প্রার্থীর সংখ্যা বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে দলীয় প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত করার চেয়ে ক্ষমতাসীনদের ঘর সামলানো কঠিন হবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফর উল্লাহ সোমবার বলেন, বিদ্রোহী প্রার্থীরা দলের জন্য অস্বস্তিকর। তারা দলকে বিব্রতকর পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেয়। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে নির্বাচন করা নেতাদের কেউ পছন্দ করে না। বিদ্রোহীরা দলেও বিতর্কিত হয়। তিনি বলেন, সিটি কর্পোরেশন, জেলা, উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলের বাইরে গিয়ে নির্বাচন করা নেতাদের বিরুদ্ধে অ্যাকশনে যাচ্ছে না আওয়ামী লীগ। এটা খুব সহজ কাজ নয়। তবে সামনে এ ধরনের দলীয় শৃঙ্খলাপরিপন্থী কাজ কাউকে করতে দেয়া হবে না। দল এখন থেকেই সে ব্যবস্থা নিয়ে রাখছে। তাই আগামী নির্বাচনে সবাই ঐক্যবদ্ধ থেকে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

জানা গেছে, বিগত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন, জেলা-উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন। অনেকে জয়ী হয়েছেন। নির্বাচন নিয়ে নিজ দলের নেতাদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়েছে। নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগের হিসাবে বহিষ্কারের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। তবে এসব বহিষ্কারে কেন্দ্রের সায় না থাকায় বহাল-তবিয়তে আছেন বিদ্রোহীরা। অনেক স্থানে দলের অনুগতরাই বিদ্রোহী নেতাদের ভয়ে থাকেন তটস্থ।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার সোমবার বলেন, ‘দলের মধ্যে এই অশুভ প্রতিযোগিতা বন্ধ না হলে আগামী নির্বাচনে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। স্থানীয় নির্বাচনের মতো জাতীয় নির্বাচনেও খুনাখুনি হবে। এটা মোকাবেলা করতে না পারা রাজনৈতিক দল হিসেবে তাদের (আওয়ামী লীগের) চরম ব্যর্থতা।’ তিনি বলেন, ‘দলীয় নেতাদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার অর্থ তাদের (আওয়ামী লীগের) দেউলিয়াপনার প্রতিফলন।’ অনেক স্থানে মনোনয়ন বাণিজ্যের জন্য বঞ্চিত যোগ্যরা বিদ্রোহী প্রার্থী হয় উল্লেখ করে মজুমদার বলেন, দলের কারণে স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে অনেক যোগ্যরা প্রার্থী হতে পারেননি। সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় এসব প্রার্থী দলের বাইরে গিয়ে নির্বাচন করে জয়লাভ করেছেন। সামনের নির্বাচনে এ রকম ভুল করলে বিদ্রোহী প্রার্থী সামলানো তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ১০ নেতা এমপি হয়েছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়ে তারা এখন আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি। বিষয়টিকে বিদ্রোহীদের পুরস্কৃত করার মতো দেখছেন দলের অনুগতরা। ২০১৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচন। এই নির্বাচনে ১৩ জেলায় জয় পায় দলের বিদ্রোহীরা। অন্যান্য জেলায় দলের বিদ্রোহী প্রার্থী ছিল। কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

বিএনপিতে প্রার্থীর ছড়াছড়ি

নির্বাচনকালীন সরকারের ধরন চূড়ান্ত না হলেও আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে মাঠের বিরোধী দল বিএনপি। একাদশ সংসদ নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই সক্রিয় হচ্ছেন বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা। নির্দলীয় সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে বিএনপির প্রার্থীরা বিপুল ভোটে জয়লাভ করবে বলে মনে করছেন দলটির সব পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। তাই সবাই যে কোনো মূল্যে দলের মনোনয়ন পেতে চেষ্টা চালাবে। কোনো কারণে মনোনয়নবঞ্চিত হলে বিদ্রোহী হিসেবে নির্বাচন করতে পারেন অনেকে। এরই মধ্যে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় একাধিক যোগ্য প্রার্থী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। প্রতিটি আসনে কমপক্ষে তিন থেকে চারজন সম্ভাব্য প্রার্থী রয়েছেন। দলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাদের সরব উপস্থিতি লক্ষ করা যাচ্ছে। দীর্ঘদিন যারা মামলা-হামলার ভয়ে ও সম্পদ রক্ষায় নিজেদের গুটিয়ে রাখছিলেন, তারাও সব শঙ্কার খোলস ছেড়ে বের হচ্ছেন। অংশ নিচ্ছেন দলীয় নানা অনুষ্ঠানে। এদের অনেকে আবার নিজ নিজ সমর্থকদের মাধ্যমে নির্বাচনী এলাকায় সোডাউনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আর যেসব নেতা বিগত আন্দোলনে রাজপথে ছিলেন, তারা আরও বেশি সক্রিয় হচ্ছেন। যেখানে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া উপস্থিত হচ্ছেন, সেখানেই নেতাকর্মীদের উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। উপস্থিত হচ্ছেন দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা সিনিয়র নেতারাও। তাদের সবাই মনোনয়ন পাওয়ার আশায় সক্রিয় হচ্ছেন। মনোনয়ন না পেলে অনেকেই হতে পারেন বিদ্রোহী প্রার্থী। এছাড়াও কতিথ সংস্কারপন্থীদের দলে ভেড়ানোর কারণেও বিদ্রোহী প্রার্থী বেশি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। সংস্কারপন্থী যাদের দলে বেড়ানো হয়নি, তারাও হাইকমান্ডের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ধানের শীষের বিপক্ষে প্রার্থী হতে পারেন। অনেক আসনে দল ছাড়াও জোটের শরিকদের কেউ কেউ প্রার্থী দিতে পারেন। বিশেষ করে আসন নিয়ে সমঝোতা না হলে জামায়াত স্বতন্ত্র প্রার্থীর ব্যানারে একাধিক আসনে নির্বাচন করতে পারে।

জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বিএনপি দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দল। এ দলে একাধিক যোগ্য নেতা রয়েছেন। আগামী নির্বাচনে প্রতিটি আসনে আমাদের দুই থেকে তিনজন যোগ্য প্রার্থী রয়েছেন। তবে তাদের মধ্য থেকে জনপ্রিয় এবং নেতাকর্মীদের বিপদে-আপদে যারা পাশে ছিলেন, তাদেরই অগ্রাধিকার দেয়া হবে।

সূত্র জানায়, মনোনয়ন নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণে নিশ্চিত জয় যাতে হাতছাড়া না হয়, সেজন্য তৃণমূলের নেতাকর্মীরা এখন থেকেই কেন্দ্রকে কঠোর হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। সম্প্রতি তৃণমূল সফরে যাওয়া কেন্দ্রীয় নেতাদের এ ব্যাপারে অবহিত করা হচ্ছে। তারাও বিষয়টি হাইকমান্ডকে অবহতি করছেন।

জানতে চাইলে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলেন, এবারের নির্বাচন শুধু বিএনপি নয়, দেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয়তাবাদী শক্তির জয় না হলে দেশের অস্তিত্বই বিপন্ন হবে। তাই নির্বাচনে যাতে ধানের শীষের বিপুল জয় হয়, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা হবে। বিদ্রোহী বা দলে কোন্দল সৃষ্টি করে ধানের শীষের জয় যাতে হাতছাড়া করতে না পারে, সে ব্যাপারে হাইকমান্ড এখন থেকেই সতর্ক বলে মনে হচ্ছে। যোগ্য এবং জনপ্রিয় প্রার্থীদের মনোনয়ন দেয়া হবে যাতে কেউ বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার সুযোগ না পান।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত