প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অনিশ্চয়তা কাটছে না

মামুন : নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু প্রকল্পের ৫৬ শতাংশ কাজ শেষ হলেও চীনের সঙ্গে ঋণচুক্তি না হওয়ায় এখনো শুরুই হয়নি সেতুর রেলসংযোগ প্রকল্পের কাজ। ফলে পদ্মায় রেল সংযোগ প্রকল্প নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না। তাই পদ্মা সেতুতে গাড়ি চলাচলের সঙ্গেই রেল চলাচল নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছে অনেকেই। এ ছাড়া পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পের নির্মাণ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ বছর। সেই অনুযায়ী ২০১৮ সালে নির্মাণ কাজ শুরু হলেও ২০২২ সালের আগে প্রকল্প শেষ করা সম্ভব নয় বলে রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে।

পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ স্থাপনে ঢাকা থেকে মাওয়া হয়ে যশোর পর্যন্ত ১৬৯ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ করা হবে। এ জন্য ২০১৬ সালের আগস্টে চায়না রেলওয়ে গ্রুপের সঙ্গে চুক্তি সই করা হয়। দেড় বছরের অধিক সময় পরও ঋণের নিশ্চয়তা মেলেনি। এ জন্য চলতি অর্থবছর ৬ হাজার ৬১৭ কোটি টাকা বরাদ্দ বাতিল করতে হচ্ছে। চলতি অর্থবছর প্রকল্পটিতে বরাদ্দ ছিল সাত হাজার ৬০৯ কোটি ৮১ লাখ টাকা। তবে চীনের ঋণ না পাওয়ায় তা কমিয়ে ৯৯৩ কোটি আট লাখ টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রকল্পটির বরাদ্দ ৮৭ শতাংশ কমানো হচ্ছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালককে সম্প্রতি এ সংক্রান্ত একটি চিঠি দিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক। এতে বলা হয়েছে, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের ঋণচুক্তি ২০১৭ সালের জুনের মধ্যে সম্পন্ন হবে বিবেচনায় ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) সাত হাজার ৬০৯ কোটি ৮১ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। এর মধ্যে ঠিকাদারকে ২০ শতাংশ অগ্রিম প্রদান ছাড়াও মালামাল সরবরাহ ও নির্মাণ কাজের ব্যয় এবং সিডি-ভ্যাট অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ ছাড়া ডিজাইন রিভিউ ও নির্মাণ তত্ত্বাবধানের জন্য পরামর্শক খাতেও বরাদ্দ ছিল।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ প্রকল্পের অর্থায়নের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে চীন সরকার। গত বছর প্রকল্পের অর্থায়ন বিষয়ে চূড়ান্ত করা হলেও চীনের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে ঋণ চুক্তি না হওয়ায় এখনো অনিশ্চয়তায় পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পটি। ট্র্যান্স এশিয়া রেলওয়ে রুটে অন্তর্ভুক্তির জন্য পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকা-যশোর পর্যন্ত দুই অংশে প্রায় ২১৫ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণের প্রকল্প নেয়া হয়। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে চীনের এক্সিম ব্যাংক ঋণ সহায়তা দেবে ২৪ হাজার ৭৪৯ কোটি টাকা। বাকি ১০ হাজার ২৩৯ টাকার সরকারি ফান্ড থেকে ব্যয় করা হবে। ইতোমধ্যে পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পের প্রথম অংশে ঢাকা-ভাঙ্গা পর্যন্ত ৬ জেলায় ৩৫৮ দশমিক ৪১ হেক্টর জমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ পর্যায় রয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রকল্পের কন্সট্রাকশন সুপারভিশন কনসালট্যান্ট (সিএসসি) কাজের সহায়তা ও তত্ত্বাবধান করছেন।

ইআরডির অতিরিক্ত সচিব (এশিয়া উইং প্রধান) জাহিদুল হক বলেন, যথা সময়ে প্রকল্পটির কাজ ত্বরান্বিত করতে গত বছরের মাঝামঝি সময় থেকে আমরা চীনের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি করতে জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করি। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহের মধ্যে চুক্তি সম্পাদনের কথা থাকলেও এখনো আমরা সেই চুক্তি করতে পারিনি।
ইআরডির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেছেন, চীন সরকার শেষ মুহূর্তে জানিয়েছে, এটি অনেক বড় বিনিয়োগ প্রকল্প হওয়ায় তাদের আইন অনুযায়ী চূড়ান্ত চুক্তির আগে চীনের স্টেট কাউন্সিলের অনুমোদন নিতে হবে। ওই প্রক্রিয়া করতে গিয়ে নির্ধারিত সময়ে চুক্তি করা সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে পদ্মা রেলসংযোগ প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী গোলাম ফখরুদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্পের অর্থায়নের বিষয়ে চীনের আশ্বাস পাওয়া গেছে। কিন্তু ঋণ চুক্তির বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কিছু জানায়নি। কিন্তু প্রকল্পের কাজ থেমে নেই। ইতোমধ্যে ৬টি জেলার জমি অধিগ্রহণ শেষ হয়েছে। এ ছাড়া চলতি মাসেই ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে গ্রুপের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় আসার কথা রয়েছে।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পে ঢাকা-যশোর পর্যন্ত ১৬৯ কিলোমিটার মেইন লাইন, ঢাকা-গেণ্ডারিয়া পর্যন্ত ৩ কিলোমিটার ডাবল লাইন, লুপ, সাইডিং ও ওয়াই-কানেকশনসহ মোট ২১৫ দশমিক ২২ কিলোমিটার ব্রডগেজ রেললাইন নির্মাণ করা হবে।

এ ছাড়া ২৩ দশমিক ৩৭ কিলোমিটার ভায়াডাক্ট, এক দশমিক ৯৮ কিলোমিটার র‌্যাম্পস, ৬৬টি বড় সেতু, ২৪৪টি ছোট সেতু ও কালভার্ট, একটি হাইওয়ে ওভারপাস, ২৯টি লেভেল ক্রসিং, ৪০টি আন্ডারপাস, ১৪টি নতুন স্টেশন ভবন নির্মাণ, ছয়টি বিদ্যমান স্টেশনের উন্নয়ন ও অন্য অবকাঠামো নির্মাণ, ২০টি স্টেশনে টেলিযোগাযোগসহ কম্পিউটার ভিত্তিক রেলওয়ে ইন্টারলক সিস্টেম সিগন্যালিং ব্যবস্থা, ১০০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী গাড়ি সংগ্রহ, ১ হাজার ৭০০ একর ভূমি অধিগ্রহণ করা হবে। প্রথম পর্যায় রাজধানীর গেণ্ডারিয়া থেকে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া হয়ে পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত ৮২ কিলোমিটার ও দ্বিতীয় পর্যায় ভাঙ্গা থেকে নড়াইল হয়ে যশোর পর্যন্ত ৮৫ রেলপথ নির্মাণ করা হবে। এই প্রকল্পেই বুড়িগঙ্গা ও ধলেরশ্বরী নদীসহ ছোট-বড় ১২৫টি সেতু নির্মিত হবে। এ ছাড়া এই রেলপথে তিনটি ফ্লাইওভারসহ ৪০ পয়েন্টে নির্মাণ করা হবে লেভেল ক্রসিং ও আন্ডারপাস। এ ছাড়া ঢাকা-মাওয়া পর্যন্ত ২২ কিলোমিটার উড়াল রেলপথ নির্মাণ করা হবে।

পদ্মা সেতুর রেল সংযোগসহ উড়াল রেলপথ হবে পাথরবিহীন আধুনিক প্রযুক্তিতে। ঢাকা-ভাঙ্গা-যশোর রেলপথ প্রকল্পের আওতায় মোট ২৮ কিলোমিটার অংশে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করবে রেলওয়ে। কনক্রিটের ঢালাই করা ভিত্তির (বেইজ) ওপর রেলপাত বসানো হবে। এ ধরনের রেলপথের আয়ুষ্কালও অনেক বেশি। মূলত উচ্চগতির ট্রেন পরিচালনার জন্য বিভিন্ন মেট্রো ও টানেলে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। ইতোমধ্যে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শেষে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অস্ট্রেলিয়ার স্ম্যাক ইন্টারন্যাশনাল এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। কিন্তু প্রকল্পের অর্থায়নের জন্য চীনের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে এখনো ঋণ চুক্তি না হওয়ায় অনিশ্চয়তা কাটছে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানায়।
এ ব্যাপারে রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আমজাদ হোসেন বলেন, পদ্মা রেলসংযাগ প্রকল্পের ঋণচুক্তির জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ। ৮৫ শতাংশ ঋণের বিষয়ে চূড়ান্ত করা হয়েছে। ঋণের খসড়া চুক্তিপত্র চীনের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। ইতোমধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও পরামর্শক বিস্তারিত নকশা পর্যালোচনা শুরু করেছে। সেতু বিভাগের সঙ্গে এ জন্য কয়েক দফা বৈঠক করা হয়েছে। যুগান্তর

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত