প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শীতবস্ত্র বিতরণের সিদ্ধান্তটি শতভাগ সঠিক

মোহাম্মদ নওশাদুল হক : ৮ জানুয়ারি ২০১৮। বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি স্মরনীয় দিন। যেদিনে পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধায় ২.৬ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা, যা এযাবৎকালের এদেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রার রেকর্ড। কিন্তু বাংলাদেশ বলে কথা। রেকর্ডেরও অনেক রেকর্ড থাকে। ঐ তারিখেই রাত নয় ঘটিকায় দুজন বন্ধুসহ পূর্তভবন থেকে কমলাপুর যাচ্ছি ট্রেনের টিকিট সংগ্রহের উদ্দেশ্যে আর চোখে পড়লো অবিশ্বাস্য কিছু ব্যাপার। যা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন হতো। রাস্তার দুধারের ফুটাপাতে বিশ ত্রিশ জন ভাসমান মানুষ অবস্থান করছে। যাদের কেউ কেউ ফুটপাতে শুয়ে আছে, কেউ কেউ বসে কথা বলছে। তাপমাত্রার রেকর্ডের সময়েও কিছু কিছু লোকের গায়ে দু’একটা পাতলা কাপড় থাকলেও অনেকের গায়ে কোন কাপড় চোপড়ও নাই।

প্রচন্ড শীতে দরিদ্র এই মানুষগুলোর অবস্থা দেখে আমরা তিন বন্ধু খুব আফসোস করছিলাম। সাথে আমাদের মনে খুব পীড়াও দিচ্ছিলো। দরিদ্র অসহায় এই মানুষগুলোর জন্য সাধ্যমতো কিছু একটা করার ব্যাপারে আমরা তিন বন্ধু মোটামোটি একমত হলাম।কমলাপুর ষ্টেশনের কাজ সেরে একই রাস্তায় পুনরায় রওয়ানা হলাম। উদ্দেশ্য পিলখানার বাসিন্দা বন্ধুটিকে আজিমপুর বাসস্ট্যান্ডে ড্রপ করা। রাস্তা যদিও এক, পঞ্চাশ মিনিটের ব্যবধানে চিত্র ভিন্ন। অর্থাৎ কাকরাইল হতে মৎস্য ভবন পর্যন্ত ফুটপাতে কিছুক্ষণ পূর্বে দেখা গরম কাপড়বিহীন দরিদ্র মানুষ গুলো এখন আর আগের অবস্থানে নেই। দেখে মনে হলো কোন একটি সংস্থা দরিদ্র মানুষগুলোকে গরম কাপড় বিতরণ করছে। এ দৃশ্য দেখে আমাদের তিন বন্ধুর নৈতিক মনোকষ্ট কিছুটা লাগব হলো বটে। তার মানে কি আমরা তৃপ্ত হয়ে গেছি? মোটেও না। আমরা তিন বন্ধু এই দাতাদের দেখে অনুপ্রেরণা পেলাম এবং আমাদেরও শীতবস্ত্র বিতরণ করলে কেমন হয়, এই আলোচনা করতে করতে গাড়ীটি আজিমপুর পৌছে গেল। আগামীকাল সকালে শীতবস্ত্র ক্রয় এবং রাত্রে বিতরণের সিদ্বান্ত নিয়েই বন্ধু আমিন গাড়ী থেকে নেমে আমাদের ছেড়ে দিলেন।

আমার আরেক বন্ধু আমাকে মিন্টু রোডে ড্রপ করে মিরপুর যাবে। সুতরাং রাস্তা পুনরায় একই। গাড়ীতে ঝিমুনির বদ অভ্যাসটি আমার বহুদিনের। যেমন অভ্যাস তেমনি কর্ম। আমার বন্ধুটির গুতুনিতে হালকা ঘুমে জিজ্ঞাসা কি হইছে? দেখ না, বলে ফুটপাতের দিকে তর্জনী নিক্ষেপ। চোখ দুটো কছলিয়ে কছলিয়ে ফুটপাতের দিকে তাকিয়ে দেখি স্থান, দৃশ্য এবং মানুষগুলোকে বেশ পরিচিত মনে হচ্ছে। অর্থাৎ ফুটপাতটি মৎস্য ভবন হতে কাকরাইলের রাস্তার ভাসমান সেই মানুষগুলোই যাদেরকে কিছু সময়ের মধ্যে দু’দুবার দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যও বটে! কিছুক্ষণ আগেই একটি দাতা সংস্থা ওদের গায়ে যে শীতের কাপড়গুলো পড়িয়ে দিয়েছিল সেগুলো এখন আর গায়ে নেই। অর্থাৎ প্রথমবার যে অবস্থায় দেখার দুর্ভাগ্য হয়েছিলো, তৃতীয়বার সেভাবে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে।

ওদের গায়ের শীতবস্ত্রগুলো গেলো কোথায়? কাপড়গুলো কি ছিন্তাই হয়ে গেলো! না’কি তীব্র শৈত্য প্রবাহে বাতাসে উড়ে গেলো! না’কি…?

নিজের মনে জড়ো হওয়া প্রশ্নগুলোর কোন উত্তর আমার মাথায় আসছে না। আমার মাথায় আসছে না, ইতোপূর্বে আমাদের তিন বন্ধুর নেয়া সিদ্ধান্তটির ভবিষ্যত কি হবে? বর্তমান পরিস্থিতির বিবরণ শুনে ইতোপূর্বে আজিমপুরে নেমে যাওয়া বন্ধুটির মনে কি সন্দেহের উদ্রেক হবে।
এই ভাবনাগুলো মাথায় যখন এলোমেলোভাবে ঘুরপাক খাচ্ছে ঠিক তখনি পকেটের মোবাইলটি ক্রিং ক্রিং শব্দে বেজে উঠলো।

হ্যালো খতিব সাহেব? ফোনটি ঢাকার পীরের বাগের বস্তির একটি এতিমখানা কাম মাদ্রাসার খতিব সাহেবের। এতিমখানার শতাধিক ছোট ছোট ছেলে-মেয়ের শীতবস্ত্রের আবেদন জানিয়ে খতিব সাহেবের ফোন। মিলে গেলো! কি মিলে গেলো? পাশের বন্ধুটির প্রশ্ন আমাকে। আমাদের শীতবস্ত্র বিতরণের ক্ষেত্র মিলে গেছে। দরিদ্র এতিমখানার বাচ্চাদের মধ্যেই আমাদের শীতবন্ত্র বিতরণ করবো।পরের দিন আমরা পীরেরবাগের এতিমখানাটিতে চলে গেলাম। দরিদ্র হতভাগা ছোট ছোট এতিম বাচ্চাগুলোর জীবন যাপন দেখে আমাদের আবেগ ধরে রাখা কঠিন হলো। ছোট ছোট এতিম বাচ্ছাগুলো শীতে কুঁ কুঁ করছে। শতাধিক ছেলেমেয়ের একজনের গায়েও গরম কাপড়ের লেশ মাত্রও নেই।

এতিম খানার যে ফ্লোরটিতে শিশুগুলো বসবাস করে সেই ফ্লোরের আটটি জানালার সবকটিই গ্লাস বিহীন। শৈত প্রবাহের বরফসম ঠান্ডা বাতাস হু হু করে ফ্লোরটিতে প্রবেশ করছে জানালাগুলো দিয়ে। গরম কাপড় পরিহিত আমরা তিন বন্ধুরও ঠান্ডায় অস্থির লাগছিলো। আমরা তিনজন ছোট ছোট দরিদ্র এতিম ছেলে মেয়েদের হাতে আমাদের ক্ষুদ্র উপহারটুকু তুলে দিতে পেরে আমরা মহান আল্লাহর নিকট শুকরিয়া আদায় করলাম। তারাও মহান আল্লাহর কাছে হাত তুলে আমাদের জন্য মোনাজাত করলো।ভালো-মন্দের এই দীর্ঘ জীবনে শতভাগ সঠিক কোন সিদ্বান্ত কখনও নিতে পেরেছি কি’না আমার মনে আসে না। তবে কাকরাইলের রাস্তার ফুটপাতের রঙ পরিবর্তনশীল ভাসমান মানুষগুলোর পরিবর্তে হতদরিদ্র ও সহায় সম্বলহীন ছোট ছোট এতিম ছেলে-মেয়েদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণের সিদ্ধান্তটি শতভাগ সঠিক।

লেখক : প্রকৌশলী, গণপূর্ত বিভাগ
সম্পাদনা : মোহাম্মদ আবদুল অদুদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত