প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রণবের যে ছবি নিয়ে বিতর্কের ঝড়

দেবদীপ পুরোহিত : একটি ছবি হাজার বাক্যের চেয়েও বেশি মূল্যবান কিন্তু তা অনেকসময় পুরো গল্প বলে না। দিন কয়েক আগে ভারতের সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জির বাংলাদেশ সফরের সময় তোলা একটি ছবিকে কেন্দ্র করে দুটি দেশের সম্পর্ক নিয়ে তুমুল বিতর্ক চলছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

ওই ছবিতে ভারতের সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জিকে বসা অবস্থায় এবং তার পেছনে বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন বিখ্যাত নাগরিক ও ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনারকে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখা যাচ্ছে। প্রণব মুখার্জি বাংলাদেশে ব্যক্তিগত সফরে যান।

এই ছবিটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারী (‘বেঙ্গলি প্রাইড’) কিছু বাংলাদেশিকে আহত করেছে। তীব্র প্রতিবাদ করেছেন তারা। বিষয়টিকে তারা দেখছেন ভারতের বড় ভাইসুলভ আচরণের মত ষড়যন্ত্র তত্ত্ব এবং ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গী পুনরুজ্জীবিত করার প্রয়াস হিসেবে। কেউ কেউ উদ্ধৃতি দিয়েছেন ড্যানিশ ঔপনিবেশিক কর্মকর্তারা যেমন চেয়ারে উপবিষ্ট হতেন এবং ‘ন্যাটিভ’রা মাটিতে বসে তাদের সঙ্গে ছবি তুলতেন এমন উদাহরণের।

প্রণবের ছবি নিয়ে এ বিতর্ক আরো তিক্ত হয়ে ওঠে যখন ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাস তাদের অফিসিয়াল ফেসবুক ও টুইটার পাতা থেকে ছবিটি সরিয়ে নেয়। দূতাবাসের একটি সূত্র বলেন, এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক, আমরা এ নিয়ে আর বিতর্ক চাইনা এবং এজন্যে ছবিটি সরিয়ে ফেলা হয়েছে। কয়েকটি ছবির একটিতে দেখা গেছে প্রণব মুখার্জি বসে আছেন এবং তার পিছনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছেন, ভারতীয় হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলা, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও স্বৈরাচারে পরিণত বাংলাদেশের সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, স্পিকার শিরিন শারমিন চৌধুরী, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। ছবিটি তোলা হয় ভারতীয় হাইকমিশনের একটি অনুষ্ঠানে। যা বাংলাদেশের নির্বাচনী বছরে ভারতবিরোধী মনোভাব উস্কে দেওয়ার জন্যে যথেষ্ট। গত কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবিটি নিয়ে মন্তব্যের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। মন্তব্যে প্রশ্ন তুলে বলা হচ্ছে কিভাবে বাংলাদেশের আইনপ্রণেতারা ভারতের ঔপনিবেশিক প্রবৃত্তির মুখে নিজেদের অধঃপতিত করে মুখার্জির পেছনে দাঁড়িয়ে ছবি তুললেন।

সাবেক ভারতীয় প্রেসিডেন্ট ৫ দিনের ব্যক্তিগত সফর শেষে দেশে ফিরেছেন কিন্তু ছবিটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিতর্ক চলছেই। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার বাংলাদেশে হিন্দি ভাষার যে উজ্জল ভবিষ্যত রয়েছে বলে যে বিবৃতি দিয়েছিলেন তাও প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। কলাম লেখক মাসুদা ভাট্টি বলেন, এরা হচ্ছে চেনা ভারত বিরোধী মুখ এবং তারা যে কোনো সুযোগের সন্ধানে থাকে কখন ভারত বিরোধিতার নামে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করা যায়। যেহেতু এবছর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, এরা তাদের রাজনৈতিক মনিব বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীকে খুশি করতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ভাট্টির মতে প্রণবের ছবি নিয়ে এধরনের বিতর্কে কেবল মাত্র চায়ের কাপে ঝড় তোলার শামিল। এবং এটি স্বার্থান্বেষী মহলের সৃষ্টি।

তবে ড. পিনাকি ভট্টাচার্য যিনি প্রণবের ছবি নিয়ে বিতর্কে একজন নেতৃস্থানীয় বিতার্কিক তিনি বলছেন, এখানে ভারত বিরোধিতার কিছু নই। প্রণবের সঙ্গে বাংলাদেশি প্রখ্যাত নাগরিকদের তোলা এ ছবিকে তিনি গত দশ বছর ধরে বাংলাদেশের ওপর ভারত যে আধিপত্য বিস্তার করছে তারই বহিঃপ্রকাশ এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নেতৃস্থানীয়রা ভারতের কাছে যে ক্রমবর্ধমান বশ্যতা স্বীকারের নজির স্থাপন করছেন তারই প্রতীক। এবং এ বিষয়টি দেশবাসীকে পীড়িত করছে।

তবে মাসুদা ভাট্টি জোর দিয়ে বলেন, ভট্টাচার্য হচ্ছেন সেই সব ভারত বিরোধীদের মধ্যে অন্যতম এবং তাকে বিরোধীদল সমর্থন দিচ্ছে। একটি হিন্দু নাম ব্যবহারের করে নির্বাচনের আগে ভারত বিরোধিতার কল্কে উস্কে দেওয়ার জন্যেই এটা করা হচ্ছে।

ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বারস অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি’র পরিচালক রাশেদুল হোসেন চৌধুরী ভাট্টির বক্তব্যের সমর্থন জানিয়ে বলেন, প্রণব মুখার্জিকে নিয়ে এধরনের বিতর্কেও কোনো মানে হয় না। চেয়ারে তার উপবিষ্ট হওয়ার বিষয়টি কোনো ভুল নয়। তার পাশে যেসব বাংলাদেশি নাগরিক দাঁড়িয়ে ছিলেন তারা জানেন আতিথেয়তা কাকে বলে। বাংলাদেশিদের গর্ব বা মর্যাদা এত ঠুনকো নয় যে একটি ছবির কারণে তা উবে যাবে।

গত ১৪ই জানুয়ারি ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনে সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জির সন্মানে আয়োজিত নৈশ ভোজ শেষে আমন্ত্রিত অতিথিদের কয়েকজন বলেন, অনুষ্ঠান শেষে প্রায় সবাই প্রণব মুখার্জির সাথে হাসিমুখে ছবি তুলতে একে অপরকে সহযোগিতা করেন। অন্তত ১৭ থেকে ১৮টি গ্রুপ তার সঙ্গে ছবি তোলেন যাদের সঙ্গে প্রণব মুখার্জি ধৈর্যের সঙ্গে সময় দেন। এক একটি ফটোসেশন দুই থেকে তিন মিনিট স্থায়ী হয়। এক পর্যায়ে একটি চেয়ারের ব্যবস্থা করা হয় যাতে ৮২ বছর বয়স্ক সাবেক এই প্রেসিডেন্ট সবার সঙ্গে ক্লান্তিহীনভাবে ছবি তুলতে পারেন। ভারতীয় দূতাবাসের একটি সূত্র জানায়, এ নিয়ে বিতর্ক অহেতুক। দি টেলিগ্রাফ থেকে অনুবাদ করেছেন রাশিদ রিয়াজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত