প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

পরিবেশের সর্বনাশ

ডেস্ক রিপোর্ট : ‘ত্রিশ বছর আগেও চার-পাঁচটি জেলেপল্লী ছিল সাভারের সাধাপুর থেকে ধামরাই পর্যন্ত। এখন সব হারিয়ে গেছে। কারণ যেখানে নদীগুলোই মৃতপ্রায়, জীবিকার তাগিদে জেলেদের থাকার কোনো সুযোগই নেই সেখানে। তারা চলে গেছেন অন্যত্র- মুদি দোকানি ও রিকশাচালকের মতো পেশাও বেছে নিয়েছেন অনেকে।’ সাধাপুরের ষাটোর্ধ্ব কলিমউদ্দিন কাতর গলায় বললেন কথাগুলো। সাভার ঘুরে বংশী, ধলেশ্বরী, তুরাগের প্রায় মুমূর্ষু অবস্থা, দখল আর কারখানার দূষিত বর্জ্যে এসব নদীর পাগলপারা স্রোতধারা এখন কেবল হাহাকার জাগানিয়া স্মৃতি। ‘শুধু নদী কেন, নদীগুলোর শাখা খালের অস্তিত্বও এখন পাওয়া যায় না।’ বললেন পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের নেতা কৃষিবিদ রফিকুল ইসলাম। তিনি আরও বলেন, ‘সাভারে পরিবেশের ভয়াবহ দূষণের তিনটি বড় কারণ রয়েছে। প্রথমত, শিল্পকারখানার বর্জ্য অপরিকল্পিতভাবে ফেলা। আশুলিয়া, ইপিজেডসহ অন্যান্য এলাকায় যত শিল্পকারখানা আছে, তার প্রায় প্রত্যেকটির শিল্পবর্জ্য ফেলে রাখা হচ্ছে এখানে-সেখানে। এই বর্জ্য মাটিতে মিশে চাষের জমির উর্বরা শক্তি কমিয়ে দিচ্ছে। বিরুলিয়ায় শিল্পবর্জ্য ফেলার জন্য একটি নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারিত থাকলেও অধিকাংশ শিল্পমালিক সেখানে বর্জ্য ফেলছেন না। এমনকি সাভার পৌর এলাকার মধ্যেও কারখানার শিল্পবর্জ্য ফেলে রাখা হচ্ছে উন্মুক্ত স্থানে, রাস্তার পাশে।

দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে ইটের ভাটা। আমিনবাজার, বলিয়ারপুর এলাকায় শতাধিক ইটের ভাটা গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিতভাবে। এসব ইটের ভাটা একদিকে চাষের জমির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে, অন্যদিকে বাতাসও দূষিত করছে। সম্প্রতি বলিয়ারপুর এলাকার জমিতে উৎপাদিত ধানের চালে রান্না করা ভাত তিতা লাগছে- এমন তথ্য পাওয়ার পর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা যায়, এই চালে একধরনের পদার্থ রয়েছে যা তিতা স্বাদের কারণ। ইটের ভাটায় ব্যবহূত জ্বালানি থেকেই আসছে এই পদার্থ। আবার অনেক ভাটায় অবৈধভাবে গাছ পোড়ানো হচ্ছে। সাভার শুধু নয়, আশপাশের অঞ্চল থেকেও বিপুল পরিমাণ গাছ কেটে কাঠ নিয়ে আসা হচ্ছে এখানে। বসতবাড়ি এলাকার পাশে ইটের ভাটা কোনো দেশেই অনুমোদন দেওয়া হয় না। কিন্তু সাভার এলাকায় লোকালয়ের ভেতরেও ইটের ভাটা গড়ে উঠছে প্রশাসনের সামনেই।

তৃতীয়ত, সাম্প্রতিক সময়ে সাভারে পরিবেশ দূষণের বড় আশঙ্কা সৃষ্টি করেছে হেমায়েতপুরের ট্যানারি শিল্পনগরী। যেভাবে পরিকল্পিতভাবে চামড়া শিল্পনগরী গড়ে তোলার কথা ছিল, বাস্তবে সেভাবে হয়নি। বরং এর অবস্থা হাজারীবাগের চেয়েও

ভয়াবহ হয়ে উঠছে। হাতে গোনা দু-একটি কারখানা ছাড়া আর কেউই ইটিপি স্থাপন করেনি। ফলে উৎপাদনে থাকা কারখানাগুলোর বিষাক্ত বর্জ্য পুরো এলাকার পরিবেশ দূষিত করছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছে ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে থাকা ধলেশ্বরী। ট্যানারি শিল্প থেকে বিষাক্ত বর্জ্যের যথাযথ শোধন নিশ্চিত না হলে তা সাভারের জন্য অদূর ভবিষ্যতে বড় মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনবে।

পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের এক প্রতিবেদনে আছে, প্রায় সাত হাজার শিল্প ইউনিট থেকে প্রায় এক দশমিক তিন মিলিয়ন ঘন মিটার শিল্পবর্জ্য নির্গত হচ্ছে বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী ও তুরাগে।

সরেজমিনে দেখা যায়, সাভারের হেমায়েতপুরে সরাসরি ট্যানারি বর্জ্য ফেলা হচ্ছে ধলেশ্বরীতে। ট্যানারি শিল্প এলাকার সঙ্গে ধলেশ্বরী নদীর মধ্যে যে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে তার মাঝখান দিয়েও পাইপ বসিয়ে দূষিত পানি ফেলা হচ্ছে নদীতে। কঠিন বর্জ্যও নদীতে ফেলা হচ্ছে নির্বিচারে। স্থানীয় অধিবাসী এরফান জানালেন, ‘ট্যানারি এখানে আসার পর এখন ময়লা-আবর্জনা নদীতে ফেলার কারণে ধলেশ্বরীতে একেবারেই আর কোনো মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। ট্যানারি ধলেশ্বরীকে গিলে খাচ্ছে।’

‘কিসের পরিকল্পনা, কিসের কী, আবর্জনার ভাগাড় তৈরি করা হচ্ছে এখানে, নদীর মাছ তো মাছই, দু’দিন পর আশপাশের দু-চার গাঁয়ের মানুষই বাঁচবে না।’ বললেন হারুনুর রশীদ নামে একজন। ট্যানারি শিল্প এলাকার মধ্যে ইটিপি আছে কি নেই এ নিয়ে শিল্পকারখানার কেউ কথা বলতেও রাজি নন। বরং তারা বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ সরকারের কাছ থেকে শিল্পকারখানা স্থাপনে যে ধরনের সহায়তা পাওয়ার কথা, তা না পাওয়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

সরেজমিনে ধামরাই এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নয়ারহাটের কাছে বংশী নদী পরিণত হয়েছে অনেকটাই সরু খালে। নদীর দু’পাশে দখল আর ভরাটের অনেক চিত্র চোখে পড়ে। ভরাট জায়গায় স্থাপনা নির্মাণ করে, পাড় বেঁধে এমনভাবে সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে, দেখে মনেই হবে না আগে নদী কতটা বড় ছিল।

কর্ণপাড়া এলাকায় দেখা যায়, বংশী নদীর বড় খালটির পাশে মোটামুটিভাবে তিনটি শিল্পকারখানা। এই খাল একটি পচা সরু ড্রেনে রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশে কত সহজে নদী-খাল দখল করা যায়, সাভারের কর্ণপাড়ায় না গেলে বোঝা যাবে না।

সাভার পৌর এলাকার ভেতরেও রাস্তার পাশে স্তূপীকৃতভাবে ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকতে দেখা যায়। আবাসিক এলাকার ভেতরে কারখানার পাশে রাখা হয়েছে ময়লার স্তূপ। দুর্গন্ধে এলাকাবাসীর থাকা দায়। তাদের অভিযোগ- এই ময়লা-আবর্জনার অরাজকতা দেখার কেউ নেই।

সাভারে পরিবেশ রক্ষার ব্যাপারে স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ রাসেল হাসান বলেন, ‘পরিবেশ রক্ষায় প্রশাসনের পক্ষে যতটুকু ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব, তা নেওয়া হচ্ছে। অবৈধ ইটের ভাটা এবং অননুমোদিত জ্বালানির ব্যবহার বন্ধেও নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে।’

স্থানীয় সংসদ সদস্য ডা. এনামুর রহমান বলেন, ‘পরিবেশ দূষণ রোধে বিভিন্ন স্থানে গিয়ে মানুষকে সচেতন করেছি। সেই প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি এখনও। বিশেষ করে পৌর এলাকার ভেতরে দূষণ রোধে পৌরসভাকে সঙ্গে নিয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেব আমি।’ সমকাল

সর্বাধিক পঠিত