প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

উপকমিটি ‘অগঠনতান্ত্রিক’, বলছেন আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় নেতারা

ডেস্ক রিপোর্ট : প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভাপতিকে পাশ কাটিয়ে উপকমিটি গঠন হয়েছে দাবি করে তাকে ‘অগঠনতান্ত্রিক’ বলছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা। বিষয়টিকে স্পর্শকাতর মনে করে আওয়ামী লীগের বেশির ভাগ কেন্দ্রীয় নেতা পাশ কাটিয়ে যাচ্ছেন। দূরে থাকছেন আওয়ামী লীগের ধানমন্ডির কার্যালয় থেকে।

চার-পাঁচজন নেতাই ঘুরেফিরে ধানমন্ডির দলীয় কার্যালয়ে যাচ্ছেন। কয়েকদিন ধরেই কার্যালয়ে আসছেন না দলের দফতর সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ। তবে দলের বিভিন্ন দাফতরিক কার্যক্রম চলছে। এসব সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দফতর সম্পাদকের স্বাক্ষরও রয়েছে।

ঘোষিত উপকমিটি নিয়ে দলের পক্ষ থেকে বাতিল বা স্থগিত বলা হলেও আনুষ্ঠানিক কোনো সংবাদ বিজ্ঞপ্তি আসেনি গণমাধ্যমে। তবে সূত্র জানায়, অনেক উপকমিটির সহসম্পাদককে আনুষ্ঠানিক চিঠি দেওয়া হয়েছে।

উপকমিটি নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই গঠণতন্ত্রের ধারা উল্লেখ করে দলের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভাপতিকে পাশ কাটিয়ে এ উপকমিটি গঠন ‘অগঠণতান্ত্রিক’।

আওয়ামী লীগের গঠণতন্ত্রের ২৫-এর ‘ক’ উপধারায় দলের সভাপতির কার্যাবলিতে বলা হয়েছে, ‘সভাপতি বিভাগীয় (সম্পাদকীয় বিভাগ) উপ-কমিটিসমূহ গঠন করিবেন। তিনি প্রত্যেক উপ-কমিটির জন্য অনূর্ধ্ব পাঁচজন সহ-সম্পাদক মনোনীত করিবেন। সভাপতি উপ-কমিটিসমূহের কার্যাদি তদারক ও সমন্বয়ের ব্যবস্থা করিবেন।’

আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রের ২৫-এর ‘চ’ উপধারায়ও একই কথা বলা হয়েছে, ‘সংগঠনের সভাপতি কর্তৃক উপ-কমিটির সদস্য সংখ্যা নির্ধারিত হইবে এবং তিনি উপ-কমিটিসমূহ গঠন করিয়া দিবেন।’

হাতে গোনা চার-পাঁচ নেতা গত তিন দিন ধানমন্ডির কার্যালয়ে গিয়েছেন। কাজ ছাড়াও বিতর্ক এড়াতেই অনেক কেন্দ্রীয় নেতা নিজ নির্বাচনী এলাকায় সময় কাটাচ্ছেন। তবে আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা বলছেন, উপকমিটির বিষয়টি দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রীর অগোচরে হয়েছে। দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের উচ্চ পর্যায়ের এক নেতা আজকালের খবরকে বলেন, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী উপকমিটি গঠনের এখতেয়ার দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। সভাপতির নির্দেশে দলের সাধারণ সম্পাদকের স্বাক্ষরে উপকমিটি হতে পারে। কিন্তু দলের দফতর সম্পাদকের স্বাক্ষরে উপকমিটি গঠন হলে এটা ‘অগঠনতান্ত্রিক’। এটা অবৈধ কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রক্রিয়া অগঠনতান্ত্রিক হলে এর বৈধতা কে দিবে?

এ ছাড়া সাংগঠনিক সম্পাদকদের সঙ্গে সহ-সম্পাদক দেওয়ার বিষয়টি নিয়েও কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। তবে আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রে সাংগঠনিক সম্পাদকদের ‘সংগঠন বিভাগ’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। দলের কয়েকজন নেতা সাংগঠনিক সম্পাদকদের সঙ্গে সহ-সম্পাদক দেওয়াকেও অগঠনতান্ত্রিক বলে দাবি করেছেন। কিন্তু যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকদের সঙ্গে সহসম্পাদক দেওয়ার কোনো বিধান গঠনতন্ত্রে নেই।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সূত্রগুলো বলছে, উপকমিটি গঠনে দলের সংশ্লিষ্ট নেতাদের অন্ধকারে রাখা হয়েছে। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন কেন্দ্রীয় কমিটির দুজন নেতা। তারা সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় সম্পাদকদের কাছে সহসম্পাদকের জন্য নামের তালিকা চেয়েছিলেন। পরবর্তীতে ওই তালিকার বাইরে থেকে সহসম্পাদকদের তালিকা তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

দ্বিতীয় দিনেও বিক্ষোভের মুখে কাদের
আওয়ামী লীগের উপকমিটির সহসম্পাদকের তালিকা নিয়ে দ্বিতীয় দিনের মতো রবিবার সাবেক ছাত্রলীগ নেতাদের বিক্ষোভের মুখে পড়লেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। এ সময় ‘যোগ্যতাসম্পন্ন’ সবাইকে কমিটিতে পদ দেওয়ার কথা বলে বিক্ষোভকারীদের শান্ত করার চেষ্টা করেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক। কিন্তু বিক্ষুব্ধদের দাবি উপকমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি বা সংবাদ সম্মেলন করে বাতিল ঘোষণা করতে হবে।

সাবেক ছাত্রলীগ নেতাদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগের উপকমিটিতে সহসম্পাদক হিসেবে যাদের নির্বাচন করা হয়েছে তাদের মধ্যে অনেকের বিএনপি-জামায়াত-শিবির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এমনকি নেতার বাড়ির কাজের লোকও স্থান পেয়েছে। এ সময় একজন আওয়ামী লীগের কমিটিতে ‘কাউয়া’রাও স্থান পেয়েছে বলে অভিযোগ করেন।

রবিবার বিকাল থেকেই সাবেক ছাত্রনেতারা আওয়ামী লীগ সভাপতির ধানমন্ডির কার্যালয়কে ঘিরে বিক্ষোভ করতে থাকেন। তারা দফায় দফায় মিছিল করে শেখ হাসিনার পক্ষে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। এ সময় কার্যালয়ের ভেতরে ছিলেন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এ কে এম এনামুল হক শামীম, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী, উপদফতর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া।

ওবায়দুল কাদেরের আগে বিকালে সুজিত রায় নন্দী দলীয় কার্যালয়ে প্রবেশপথে বিক্ষোভের মুখে পড়েন। তাকে ঘিরেও হইচই করতে থাকেন সাবেক ছাত্র নেতারা। অনেকক্ষণ পরে ভিড় ঠেলে তিনি কার্যালয়ে ঢুকেন। এরপর থেকে সাবেক ছাত্রনেতারা টানা মিছিল করে যাচ্ছিলেন। রাত ৭টা ৪২ মিনিটের দিকে ওবায়দুল কাদের ধানমন্ডি ৩/এ কার্যালয়ে আসেন। তিনি গাড়ি থেকে নামার পর পর তাকে ঘিরে আগের দিনের মতোই হইচই করতে থাকেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতারা।

ছাত্রলীগের সাবেক গণশিক্ষা সম্পাদক বীর আবু আব্বাস ভূইয়া এ সময় ওবায়দুল কাদেরকে বলেন, ‘নেত্রী আমাদের নাম রাখার জন্য সুপারিশ করেছিলেন। কিন্তু আমাদের রাখা হয়নি। কী কারণে রাখা হয়নি? আমরা তো জেলও খেটেছি।’ এ সময় কাদের তাদের বলেন, ‘সাবেক ছাত্রনেতা সবাইকে রাখা হবে।’ তখন পেছন থেকে একজন ফোড়ন কাটেন, ‘তাহলে তো এক লাখ হয়ে যাবে’। তখন কাদের বলেন, ‘যোগ্যতাসম্পন্ন সাবেক ছাত্রনেতা সবাইকে রাখা হবে।’

ওবায়দুল কাদেরকে ঘিরে সাবেক ছাত্রলীগ নেতাদের এই বাক্যবিনিময় চলার সময় বাঁশিতে ফুঁ দিতে দিতে পুলিশ আসতে থাকে। তবে তারা কাউকে বাধা দেয়নি।

এর আগে বিকাল থেকেই ধানমন্ডি কার্যালয়ের সামনে জড়ো হতে থাকে সাবেক ছাত্রলীগ নেতারা। তারা দফায় দফায় মিছিল করেন। কথা বলেন সাংবাদিকদের সঙ্গেও। ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান জীবন বলেন, আমাকে বাদ দিয়েছে সমস্যা নেই। কিন্তু আমার চেয়ে মেধাবী ও সিনিয়র সাবেক ছাত্রলীগ নেতাদের কমিটিতে যেন জায়গা দেওয়া হয়। সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক তরিকুল ইসলাম বলেন, কমিটিতে অনেক বিএনপি-জামায়াতপন্থিদের জায়গা দেওয়া হয়েছে। বাড়ির কাজের লোককেও জায়গা দেওয়া হয়েছে। তাদের বাদ দিয়ে ছাত্রলীগের ত্যাগী, আন্দোলন সংগ্রামে যারা রাজপথে ছিল তাদের যেন জায়গা দেওয়া হয়।

গতকাল শনিবার রাতেও ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে সাবেক ছাত্রলীগ নেতাদের তোপের মুখে পড়েন ওবায়দুল কাদের। এ সময় তিনি বলেন, ফেসবুকে যে তালিকা গেছে, ওটা তারা চূড়ান্ত করেননি। তিন মাস যাচাই-বাছাই শেষে তালিকা প্রকাশ করা হবে। রবিবার সচিবালয়ে ওবায়দুল কাদের দাবি করেন, ধানমন্ডিতে ছাত্রলীগের সাবেক নেতাদের হইচইয়ের ঘটনাটি বিক্ষোভ ছিল না, ছিল ‘আনন্দ মিছিল’। আর সংবাদমাধ্যমে খবরটি যেভাবে এসেছে, তাতে ‘খুব কষ্ট’ পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন সরকারের সেতুমন্ত্রী কাদের।

সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, তখন তারা আনন্দ মিছিল করছিল। আর এটাকে বলে বিক্ষোভ মিছিল! সেক্রেটারিকে নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল! এটা অন্যায় এটা কষ্টকর।

শনিবারের ঘটনা সংবাদপত্রে যেভাবে ছাপা হয়েছে, তাতে সন্তুষ্ট নন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। তিনি বলেন, লিখেছে, শনিবার বিক্ষোভ করেছে, কাদের সাহেবকে কনফাইন করছে, আমি তো এসব দেখলাম না। আমি তো নামাজ পড়ছিলাম। তখন দরজা বন্ধ ছিল। ওজু করে আমি নামাজ পড়ি, হুট করে দরজা খুলে দেব? খুব কষ্ট পেয়েছি, বিশ্বাস করেন। ওবায়দুল কাদের বলছেন, যারা তার কাছে গিয়েছিলেন, তাদের তিনি উপকমিটি নিয়ে সঠিক তথ্য দেওয়ার পর তারা আনন্দ প্রকাশ করেছেন, বিক্ষোভ নয়। তাদের কাছে যখন বিষয়টা পরিষ্কার হয়েছে, তখন তারা আনন্দ মিছিল করছিল। আর এটাকে বলে বিক্ষোভ মিছিল!

তিনি বলেন, এখানে স্থগিত বা বাতিলের বিষয় নেই। আসলে এখানে সহসম্পাদক বিষয় নয়, বিষয়টা হলো সাব কিমিট। ১৯ ডিপার্টমেন্টের সাব কমিটি হবে, আগে দুই-একটা বিভাগ ছাড়া সাব কমিটি ছিল না। এবার সমস্যাটা কেন হয়েছে? যাদের উপকমিটিগুলো চূড়ান্ত হয়নি, সেই সম্পাদকদের কাছে অফিস সেক্রেটারির স্বাক্ষরে খসড়া কমিটি পাঠানো হয়েছিল। এটা প্রস্তাবিত বিষয়, এটা করতে গিয়ে সেটা চলে গেছে ফেসবুকে এবং ফেসবুকে যাওয়াতে বিভ্রান্তি হয়েছে।

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, কমিটি চূড়ান্ত হলে সভাপতি তাতে সায় দিলে তারপর সেখানে তার (কাদের) সই নেওয়া হবে। সেই কমিটির আদেশ তখন সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাঠানো হবে। এটা আমাদের নিয়ম। এ নিয়ম নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি আছে। আমি এক মাস আগে বলেছি, সব উপকমিটিতে সবাই সদস্য থাকবে।

এক প্রশ্নের জবাবে কাদের বলেন, এই যে অনুপ্রবেশকারী, তিন মাস সময় নিয়েছি এদের চিহ্নিত করতে। কিছু লোক আছে পোস্টার ব্যানার বানিয়ে অভিনন্দন এবং ফেসবুকে প্রচার করে বিষয়টা দেখতে হবে। সহসম্পাদক পদ নিয়ে সিটিং এমপিদের এরা ডিস্টার্ব করে। এসব কারণে যাচাই-বাছাই পদ্ধতি বেছে নিয়েছি। আজকালের খবর

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত