প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

চতুর্মুখী সংকটে আলু রপ্তানি

ডেস্ক রিপোর্ট : নগদ অর্থের স্বল্পতা; রপ্তানিমুখী ও শিল্পনির্ভর জাত; পরিকল্পিত বাজার ব্যবস্থাপনা ও কৃষি জ্ঞানের অভাবে বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ আলু রপ্তানি সম্ভব হচ্ছে না। রপ্তানিকারকরা বলছেন, সঠিক নজরদারি না থাকায় পরিস্থিতি ক্রমেই নেতিবাচক দিকে ধাবিত হচ্ছে।

এ ছাড়া উৎপাদন বাড়লেও পর্যাপ্ত রপ্তানির ব্যবস্থা না থাকা এবং স্বল্পমূল্যে বিদেশি আলু দেশের বাজারে ঢুকে পড়ায় প্রান্ত্মিক চাষিরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত্ম হচ্ছেন। সংশিস্নষ্টরা মনে করছেন, সরকারিভাবে দ্রম্নত কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে ধস নামতে পারে দেশের আলু উৎপাদনে।

বাংলাদেশ আলু রপ্তানিকারক সমিতির (বিপিইএ) সভাপতি শেখ আবদুলস্নাহ কাদের  জানান, প্রতি বছর আলু রপ্তানির মাধ্যমে মোটা অংকের অর্থ আয়ের সুযোগ থাকলেও প্রতিবন্ধকতার কারণে সম্ভব হচ্ছে না। নিম্নমানের আলু, ভারত থেকে কম সুবিধা, পোর্টে সমস্যা, সঠিক সময়ে আলু তুলতে না পারা এর অন্যতম কারণ। ফলে প্রতি বছর অধিক পরিমাণ আলু উৎপাদিত হলেও রপ্তানি করতে না পারার কারণে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত্ম হচ্ছেন প্রান্তিক চাষিরা। বছর শেষে আলু বিক্রি করে তারা উৎপাদন খরচও তুলতে পারছেন না। সরকার এসব সমস্যা সমাধান করতে পারলে বছরে ২০ লাখ টন আলু রপ্তানি করা সম্ভব। ফলে কৃষকরাও ন্যায্যমূল্য পাবেন।
রপ্তানিকাররা বলছেন, বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী দেশ ভারত আলু রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য ২০ শতাংশ, পাকিস্ত্মান ৪০ শতাংশ, চীন ২৫ শতাংশ হারে নগদ সহায়তা প্রদান করে। এজন্য তারা বিশ্ববাজারে কম দামে আলু সরবরাহ করতে পারে। বাংলাদেশে আগে ২০ শতাংশ হারে নগদ সহায়তা দেয়া হলেও এখন ১০ শতাংশে নেমে এসেছে। দেশের আলু যখন ক্ষেতে থাকে তখন ভারতের আলু বাজারে চলে আসে। ক্রেতারা তখন আগাম আলু কিনে নেয়। দেশে রপ্তানিযোগ্য মাত্র একটি জাতের আলু উৎপাদন হয়।

এ ছাড়া দেশে মোট যে পরিমাণে আলু উৎপাদিত হয় তার মাত্র ২০ শতাংশ সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়। বাকিগুলো সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যায়। ফলে সংরক্ষিত আলু দিয়ে দেশের চাহিদা মিটিয়ে সামান্য কিছু রপ্তানির সুযোগ থাকে। বর্তমান সময়ের থেকে ১৫ দিন আগে আলু তুলে যথাযথ সংরক্ষণ করা সম্ভব হলে রপ্তানি অনেকগুণ বাড়ত।

এ ব্যাপারে কৃষি অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান জানান, দেশে সামান্য কিছু রপ্তানিযোগ্য আলু উৎপাদন হয়ে থাকে। বাকিটা গতানুগতিক। আরেকটি বড় সমস্যা আলু সংরক্ষণ। এখনো মোট উৎপাদনের মাত্র ২২ শতাংশ আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করা যায়। ফলে বেশির ভাগ আলুর গুণগত মান ঠিক থাকে না। ফলে এই মানহীন আলু রপ্তানি হলে বর্তমানে যতটুকু আলু রপ্তানি হয়, তা-ও বন্ধ হয়ে যাবে।
তিনি বলেন, তাই সবার আগে গুণগত মান ও উন্নত জাতের দিকে নজর দিতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে চাষিকেও প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এ ছাড়া শুধু আস্ত্ম আলু না, এর তৈরি বিভিন্ন পণ্যও রপ্তানি করা যেতে পারে। যেমন চিপস, ফ্রেন্স ফ্রাই ইত্যাদি এখন বিশ্বব্যাপী ব্যাপক জনপ্রিয় একটি খাবার। সরকারকে এটি নিয়ে ভাবতে হবে। নগদ সহায়তার ব্যাপারে তিনি বলেন, এটার কোনো প্রয়োজন নেই। এই দাবি পকেট ভরার জন্য। নগদ সহায়তা বাড়ালে অর্থ পাচার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০১৭ সালে দেশে মোট ৫.২৮ লাখ হেক্টর জমিতে প্রায় ১১৩ লাখ মেট্রিকটন আলু উৎপাদিত হয়। দেশে মোট চাহিদা ৬৫ লাখ মেট্রিক টনের কিছু বেশি। অথচ ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছে মাত্র ৫৫ হাজার ৬৫২ মেট্রিক টন। এ ছাড়া কিছু আলু বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যে রূপান্ত্মরিত হয়ে রপ্তানি হয়েছে। ২০১৭ সালে প্রতি কেজি আলুর গড় উৎপাদন খরচ ছিল ৭ টাকা ৪০ পয়সা এবং কৃষকপর্যায়ে যৌক্তিক ধার্যমূল্য ছিল সাড়ে ৮টাকা থেকে ৯ টাকা। অথচ বছর শেষে কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হয়েছে মাত্র ৬৫ পয়সা। এ বছরও ৫ লাখ হেক্টরের অধিক জমিতে আলু উৎপাদন হয়েছে। তবে ন্যায্য দাম নিয়ে শঙ্কায় চাষিরা।

এডিবির এক গবেষণায় বলা হয়, শুধু দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো বছরে গড়ে ৪ কোটি ১০ লাখ ডলারের আলু আমদানি হয়। সেখানে বাংলাদেশ প্রতি বছর গড়ে আলু রপ্তানি করে আয় করে ৮ লাখ ডলার। অথচ প্রতি বছর দেশটিতে এর কয়েকগুণ বেশি মূল্যের আলু ব্যবহার করতে না পারায় নষ্ট হয়ে যায়।

রপ্তানিকারকদের মতে, সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারলে বছরে ২০ লাখ মেট্রিক টন আলু রপ্তানি করা সম্ভব হতো। এতে একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রা বাড়তো অন্যদিকে কৃষক ও ব্যবসায়ীরাও লাভবান হতো। ফলে প্রতি বছর কৃষকদের আলু নিয়ে পথে বসতে হতো না। কৃষকরা প্রতি কেজি আলুর সর্বনিম্ন মূল্য ১২ টাকা পেত। গত বছর যা ছিল ৭০ পয়সার কাছাকাছি।

তাদের আশঙ্কা, এই বছর আলু রপ্তানি আরও হ্রাস পাবে। কারণ, বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এখনো আলু তুলতে পারেনি কৃষকরা। অন্যদিকে ভারত ইতিমধ্যেই রপ্তানি করা শুরম্ন করেছে। ফলে ক্রেতারা আগাম আলু পেতে ভারতের ব্যবসায়ীদের থেকে আলু সংগ্রহ করছে। অথচ গবেষণার মাধ্যমে যদি উন্নত ও আগাম ফলনশীল আলু উৎপাদন করা যেত, তাহলে বাংলাদেশও আগে থেকে আলু রপ্তানি করতে পারত।

রপ্তানি উন্নয়ন বু্যরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, বিশ্ববাজারে আলু রপ্তানি শুরম্ন হয় জানুয়ারি থেকে। এই সময়ে মূলত বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্ত্মান আলু রপ্তানি করে। মার্চ মাস থেকে চীনও আলু রপ্তানি শুরম্ন করে। তবে চীন ও ভারতের আলু থেকে বাংলাদেশের আলুর স্বাদ বেশি হওয়ায় ক্রেতাদের আগ্রহ বাংলাদেশের আলুতে। বিশ্ববাজারে উন্মুক্ত কনটেইনারে প্রতি টন আলু ২২৫ থেকে ২৩৫ ডলারে, আর কুল চেইন পদ্ধতিতে ২৮০ থেকে ২৯০ ডলারে রপ্তানি হয়। অন্যদিকে ভারত আলু রপ্তানি করে ১৮৫ থেকে ২১০ ডলারে। তাই বিশ্ববাজারে ভারতের আলু বেশি রপ্তানি হয়ে থাকে। চীনও কমমূল্যে আলু রপ্তানি করে। শুধু স্বাদের কারণেই বেশি দাম দিয়ে বাংলাদেশি আলু কিনছেন ক্রেতারা। বর্তমানে বাংলাদেশি আলুর প্রধান বাজার মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর। মোট রপ্তানির তিন ভাগের এক ভাগ রপ্তানি হয় এই দুই দেশে। এ ছাড়া রাশিয়াও বাংলাদেশি আলুর বড় বাজার।যায়যায়দিন।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত