প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অপরাধের মূলেই মাদক

মামুন : মাদক বাণিজ্য ও সেবনকে কেন্দ্র করে বাড়ছে খুনোখুনি; ঘটছে ছিনতাই, অপহরণ, ডাকাতি, ধর্ষণ। সবচেয়ে বেশি অপরাধের ক্ষেত্র তৈরি করছে ইয়াবা ট্যাবলেট ও ফেনসিডিল। এর ফলে যেমন যুবসমাজ ধ্বংস হচ্ছে, তেমনি তছনছ হয়ে যাচ্ছে সাজানো সংসার। তবে সব অপরাধের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করছে সব ধরনের মাদক। ঢাকা মহানগর পুলিশের সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এসব তথ্য। অনুসন্ধান আরও দেখা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নির্মাণাধীন ও পরিত্যক্ত অসংখ্য ভবন এখন মাদকের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। এ ধরনের স্থাপনায় মাদক বিকিকিনির পাশাপাশি সেবনও চলে, বিশেষ করে ইয়াবা ও ফেনসিডিল। মাদক নির্মূলে ওইসব স্থাপনায় নিয়মিত জোরদার অভিযান পরিচালনা করতে সব থানার ওসিদের বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে সম্প্রতি।

গত ১২ ডিসেম্বর টঙ্গীর দত্তপাড়ায় একটি নির্মাণাধীন ভবনে খুন হন আক্তার হোসেন ও আসিবুর রহমান মিম নামে দুই যুবক। বিজয় দিবসের রাতে রাজধানীর শুক্রাবাদ বাজার এলাকায় নির্মাণাধীন একটি ভবনে হত্যা করা হয় মেরিন ইঞ্জিনিয়ার রফিকুল হাসান রিমনকে। ২৮ অক্টোবর রাতে কদমতলী থানা এলাকার মালেক চাঁদের রিকশা গ্যারেজে নৃশংসভাবে খুন হন যুবক হেলাল উদ্দিন। পৃথক হত্যাকা-গুলোর তদন্তে নেমে র্যাব-পুলিশ জানতে পারে, মাদক সেবন ও ব্যবসায় আধিপত্য বিস্তারে সৃষ্ট দ্বন্দ্বের জেরেই পরিচিতজনের হাতে প্রাণ গেছে ওই ৪ জনের। শুধু এরাই নয়, ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে রাজধানীতে ঘটে যাওয়া আরও চারটি হত্যাকা-ের পেছনে মাদকের ভূমিকা ছিল বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে উঠে এসেছে।

বিশিষ্ট অপরাধবিশ্লেষক অধ্যাপক এম মোজাহেরুল হক বলেন, অপ্রতিরোধ্য মাদক এখন নানা অপরাধের প্রধান নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ভয়াল নেশা তারুণ্য, মেধা, বিবেক, লেখাপড়া, মনুষ্যত্ব শুধু ধ্বংসই করছে না, বিনষ্ট করে দিচ্ছে স্নেহমায়া, ভালোবাসা, পারিবারিক বন্ধন। মাদকাসক্ত সন্তানের হাতে বাবা-মা, ঘনিষ্ঠ স্বজন নির্মম হত্যাকা-ের শিকার হচ্ছে। নেশাখোর বাবার হাতেও বলি হচ্ছে প্রিয় সন্তান। নেশার টাকা না পেয়ে স্ত্রীকে পুড়িয়ে মারা, মাকে জবাই, আদরের সন্তানকে বিক্রি করে দেওয়ার মতো অমানবিক ঘটনাও ঘটেছে প্রায়ই। মাদককে জাতীয় ক্রাইসিস আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, এর ভয়াল থাবা থেকে বাঁচতে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতাই যথেষ্ট নয়। মাদক নির্মূলে আপামর জনসাধারণ সবাইকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে।

গত ১৩ জানুয়ারি ঢাকা মহানগর পুলিশের সদর দপ্তর থেকে একটি চিঠি পাঠানো হয় ক্রাইম জোনের সব ডিসি ও ওসির কাছে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়Ñ ‘বিভিন্ন মামলা পর্যালোচনায় দেখা যায়Ñ খুন, ডাকাতি, দস্যুতাসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকা-ের মূলে রয়েছে মাদক। এসব মামলার অধিকাংশ আসামি মাদকাসক্ত অথবা মাদক ব্যবসায়ী। উদাহরণস্বরূপ গত ডিসেম্বর মাসে রুজুকৃত মামলাগুলোর মধ্যে নিউমার্কেট থানার ১১(১২)১৭ নম্বর মামলার ভিকটিম ও আসামি উভয়ই মাদকাসক্ত। কদমতলী থানার ৬০ (১২)১৭ নম্বর মামলার ভিকটিম ও আসামিরাও মাদক ব্যবসায়ী। মাদক নিয়ে সৃষ্ট দ্বন্দ্বের জেরেই ওই হত্যাকা- ঘটেছে। তেজগাঁও থানার ২৩(১২)১৭ নম্বর ও উত্তরখান থানার ১৬(১২)১৭ নম্বর মামলার আসামিরাও মাদকাসক্ত। এ ছাড়া মাদকের টাকা সংগ্রহ করতে মাদকসেবীরা প্রতিনিয়ত চুরি এবং ছিনতাইয়ের ঘটনায় জড়িয়ে পড়ছে। এ ধরনের অনেক ঘটনার নজির রয়েছে।’ এ পরিস্থিতি উত্তরণে চিঠিতে জোনাল এসিদের নেতৃত্বে থানায় কর্মরত অফিসারদের সমন্বয়ে মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার করে মাদকসেবী ও মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে ডিসিদের বিশেষ নির্দেশ দেওয়া হয়।

ডিএমপির যুগ্ম কমিশনারের (অপরাধ) দপ্তর থেকে ৮ জানুয়ারি আরেকটি চিঠি ইস্যু করা হয় ক্রাইম জোনের সব ডিসির কাছে। চিঠিতে নির্মাণাধীন ও পরিত্যক্ত ভবনে মাদকবিরোধী অভিযান প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়, ‘ডিএমপি মনিটরিং সেলের মামলা পর্যালোচনাসভায় বিভিন্ন মামলা সম্পর্কে আলোচনাকালে দেখা যায়Ñ ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন নির্মাণাধীন ও পরিত্যক্ত ভবন মাদকসেবীদের আড্ডাস্থলে পরিণত হয়েছে এবং সেখানে তারা অবাধে মাদক সেবন করছে। এ মাদকের টাকা সংগ্রহ করতে গিয়ে তারা নানা ধরনের অপরাধ যেমনÑ খুন, ডাকাতি, দস্যুতা এবং চুরি-ছিনতাইয়ের মতো ঘটনায় জড়িয়ে পড়ছে। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে।’ এ অবস্থায় সবকটি নির্মাণাধীন ও পরিত্যক্ত ভবন জোনাল এসিদের নেতৃত্বে থানার ওসির মাধ্যমে নজরদারিতে আনতে হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার করে মাদকসেবী ও মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (অপরাধ) কৃষ্ণপদ রায় বলেন, আমরা সব সময় অপরাধের ধরন, প্রকৃতি ও ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করি। এর পর প্রতিরোধে কর্মকৌশল নির্ধারণ এবং সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ দিয়ে থাকি, যারা এনফোর্সমেন্টে আছেন।

বর্তমানে সারা দেশে ভয়াবহভাবে মাদকের বিস্তার ঘটেছে। এতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অনেকটাই উদ্বিগ্ন, যার প্রতিফলন ঘটেছে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে। গত ৯ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকে মাদক নির্মূলের ওপর জোর দিয়ে বলেন, ইয়াবা পরিবার ও সমাজ ধ্বংস করে দিচ্ছে। তিনি মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশকে অভিযান জোরদারের নির্দেশ দেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও বলেছেন, ফেনসিডিল, হেরোইন থেকে এখন ইয়াবার প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে মাদকের ব্যাপারে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছি। তবুও আমরা যেন অন্য দেশ থেকে মাদক প্রবেশ এবং এখানে (বাংলাদেশে) ক্রয়-বিক্রয় বন্ধ করতে পারছি না। যে কোনো মূল্যে মাদক নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। মাদকাসক্ত হয়ে বাবা-মায়ের খুনি আর কোনো ঐশী তৈরি হোক, আমরা চাই না।

পুলিশের মহাপরিদর্শক একেএম শহীদুল হক ৬ জানুয়ারি পুলিশ সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সবচেয়ে বড় সমস্যা ইয়াবা। এটা কোনোভাবেই বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। গত পাঁচ বছরে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে ২ লাখ ৮৭ হাজার ২৫৪ ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তারের সংখ্যাও অনেক। শুধু পুলিশ দিয়ে মাদক নির্মূল দুষ্কর বলে অভিমত প্রকাশ করেন তিনি।

মাদক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে বলে স্বীকার করেন মাদক নির্মূলে সরকারের সংস্থা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও। তারা বলছেন, ইয়াবার বিক্রি ও ব্যবহার অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণের বার্ষিক প্রতিবেদনে (২০১৭ জুনে প্রকাশিত) বলা হয়, ২০০৮-এর তুলনায় ২০১৬ সালে ইয়াবার ব্যবহার ৮০ শতাংশ বেড়েছে। ২০১৫-এর তুলনায় ২০১৬ সালে বেড়েছে ৪৬ শতাংশ। ২০১২ সালে মোট মাদকসেবীর মধ্যে ইয়াবায় আসক্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ, ২০১৬ সালে তা হয়েছে ৩১ দশমিক ৬১ শতাংশ।
বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের ১৫টি স্থান দিয়ে ইয়াবা পাচার হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ২০১১ সালে জব্দ হওয়া ইয়াবার পরিমাণ ছিল ১৩ লাখ ৬০ হাজার, আর ২০১৬ সালে হয়েছে ২ কোটি ৯৪ লাখ। আর ২০১৭ সালে ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে ৩ কোটি ৮০ লাখ ৯১ হাজার। দৈনিক আমাদের সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত