প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অশান্ত নারায়ণগঞ্জ
দুই পরিবারের দ্বন্দ্বে উত্তপ্ত রাজনীতি

ডেস্ক রিপোর্ট : একদিকে খানসাহেব ওসমান আলী পরিবার, আরেকদিকে আলী আহমেদ চুনকা পরিবার। নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে এই দুই পরিবারের দ্বন্দ্ব অনেক দিনের। দুই পরিবারের এ বিরোধে স্থানীয় আওয়ামী লীগের যেমন ক্ষতি হচ্ছে, তেমনি বিব্রত হচ্ছেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতারাও। এতে লাভ হচ্ছে তৃতীয় পক্ষের।

খানসাহেব নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের দাদা। আলী আহমেদ চুনকা মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর বাবা। ১৯৭২ সালে শহর আওয়ামী লীগের কাউন্সিলের সময় ওসমান ও চুনকা পরিবারের বিরোধ আর চাপা থাকেনি। ১৯৭৩ সালে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার নির্বাচন নিয়ে আবারও দ্বন্দ্ব দেখা দেয় দুই পরিবারে। তার পর থেকে এই দ্বন্দ্ব আর দূর হয়নি। কখনও প্রকাশ্যে, কখনও পরোক্ষে এই দ্বন্দ্ব-বিরোধ আজও রয়ে গেছে। ১৯৭৩ সালে পৌরসভা নির্বাচনে আলী আহমেদ চুনকা আওয়ামী লীগের সমর্থন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে পরাজিত করেন খোকা মহিউদ্দিনকে। খোকা আওয়ামী লীগ প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন। তাতে সমর্থন ছিল ওসমান আলীর ছেলে এ কে এম শামসুজ্জোহা পরিবারের। শামীম ওসমানের বাবা এই শামসুজ্জোহা।

রাজনৈতিক বিশ্নেষকরা বলছেন, নানা ইস্যুতে এই দুই পরিবারের দ্বন্দ্ব নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের রাজনীতিকেও বারবার প্রভাবিত করছে। বর্তমানে এই দ্বন্দ্বের একদিকে রয়েছেন সেলিনা হায়াৎ আইভী, অন্যদিকে শামীম ওসমান। ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সমর্থন চান চুনকাকন্যা আইভী। তবে আওয়ামী লীগের সমর্থন পান শামীম ওসমান। পর পর দু’বার মেয়র নির্বাচিত হয়ে আইভী তার অবস্থান সংহত করেছেন। যদিও এসব ঘটনাপ্রবাহে দুই পরিবারের বিরোধ আবারও প্রকাশ্যে চলে এসেছে। তাদের এ বিরোধকে পুঁজি করে ফায়দা নিচ্ছে তৃতীয় পক্ষ। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার হকার উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে দু’পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছেন আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা এ ঘটনায় খুবই ক্ষুব্ধ।

মেয়র আইভী ও শামীম ওসমান নারায়ণগঞ্জে সাত খুন, ত্বকী হত্যাসহ বিভিন্ন আলোচিত ইস্যুতে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়ে বারবার আলোচিত হয়েছেন। তবে হকার উচ্ছেদ নিয়ে রাজপথ পর্যন্ত সম্প্রসারিত তাদের এ বিরোধ কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের হস্তক্ষেপে বন্ধ হয় কি-না, তাই এখন দেখার বিষয়।

মেয়র আইভী অবশ্য মঙ্গলবারের ঘটনাকে ‘দুই পরিবারের দ্বন্দ্বের ফল’ বলে মনে করছেন না। তিনি বলছেন, শামীম ওসমান হকারদের উস্কে দিয়েছেন। হকার উচ্ছেদের পরিকল্পনা তার আসনে না হলেও তিনি আলোচনার টেবিলে মীমাংসাধীন এ বিষয়কে সংঘাতের দিকে ঠেলে দেন। তার চার খলিফার একজন নিয়াজুল হক তাকে মারতে অস্ত্র নিয়ে এগিয়ে আসেন বলে দাবি করেন তিনি।

এদিকে শামীম ওসমানের ভাষ্য, আইভীকে অন্য কেউ বাইরে থেকে বুদ্ধি-পরামর্শ দিচ্ছে। বিএনপি এই মেয়রকে নারায়ণগঞ্জে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তার কারণে বিএনপির অনেক প্রার্থী কাউন্সিলর হয়েছেন। বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীরা তার আশপাশে থাকে। সর্বশেষ মঙ্গলবার বিএনপি নেতা সুমনকে অস্ত্র হাতে তার পাশে দেখা গেছে। তবে নিয়াজুলকে তিন দফা মারধর করার পর সে লাইসেন্স করা অস্ত্র বের করেছিল বলে দাবি করেছেন শামীম। আইভীও পাল্টা অভিযোগ করেছেন, শামীম ওসমানের কারণে নারায়ণগঞ্জে বিএনপি-জামায়াত প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।

সমকালের অনুসন্ধান ও বিশ্নেষণে দেখা গেছে, দুই পরিবারের দ্বন্দ্বকে কাজে লাগিয়ে বিএনপি গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রায় সমানসংখ্যক ওয়ার্ডে এবং জেলার পাঁচটি উপজেলা পরিষদের মধ্যে তিনটিতে জয় ছিনিয়ে নেয়। আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর মধ্যে এ দুই পরিবারের অনুসারী থাকায়, সেগুলোতেও অভ্যন্তরীণ কোন্দল চলছে। এ দ্বন্দ্ব শুধু স্থানীয় নির্বাচনেই নয়, দলের মধ্যেও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে। এতে ক্ষতি হচ্ছে আওয়ামী লীগের। গত মঙ্গলবারের সহিংসতার পর আইভী এবং শামীম ওসমান উভয়েই সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন, আঁতাত করে স্থানীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অনেক দলীয় প্রার্থীকে পরাজিত করা হয়েছে।

আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের স্থানীয় নেতাদের মতে, স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে দলের প্রার্থীদের জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রেই এই পারিবারিক দ্বন্দ্বে দলের প্রার্থী পরাজিত হচ্ছেন। বিভক্তির সুযোগে জয় ছিনিয়ে নিচ্ছে বিএনপি।

ফল বিশ্নেষণে দেখা যায়, গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ২৭টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১৩টিতে আওয়ামী লীগ ও ১২টি ওয়ার্ডে বিএনপি প্রার্থী জয়ী হন। পাশাপাশি একজন জাতীয় পার্টির এবং আরেকজন বাসদের প্রার্থী জয়ী হন। মেয়র পদে জয়ী হন আওয়ামী লীগ প্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। যেসব ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে বিএনপি প্রার্থীরা জয়ী হন, সেগুলোতেও বিএনপির মেয়র প্রার্থী পরাজিত হন।

যেসব ওয়ার্ডে আইভীপন্থি ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী ছিলেন, গত নির্বাচনে তাদের বেশির ভাগই পরাজিত হয়েছেন। জয়ী হয়েছেন শামীম ওসমানপন্থি ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থীরা। যার প্রমাণ মেলে ১৪ ও ১৬ নম্বর ওয়ার্ডে। ওই দুই ওয়ার্ডের একটিতে আইভীপন্থি হিসেবে পরিচিত ওবায়দুল্লাহ এবং অপরটিতে মনিরুজ্জামান মনির প্রার্থী ছিলেন। তারা শামীম ওসমানের প্রার্থীদের কাছে পরাজিত হয়েছেন। তবে ২০১১-এর প্রথম সিটি নির্বাচনে ওই দুই ওয়ার্ডে তারা জয়ী হয়েছিলেন। ১৮ নম্বর ওয়ার্ডে শ্রমিক লীগ নেতা দু’বারের কাউন্সিলর কামরুল হাসান মুন্নার বিপরীতে প্রার্থী হিসেবে স্বতন্ত্র হিসেবে দাঁড়ান কবির হোসেন। ওই ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মুন্নার বিপরীতে আইভীপন্থি কবির হোসেন জয়ী হন।

সিটি করপোরেশনের সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকা পরিচিত শামীম ওসমানের এলাকা হিসেবে। এখানে ৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬টিতে আওয়ামী লীগ এবং ৩টিতে বিএনপি প্রার্থীরা জয় পান। কিন্তু সিটি করপোরেশনের বন্দর অংশ আইভী অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে পরিচিত থাকলেও ওই এলাকার ৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬টিতেই জয়ী হয় বিএনপি, আওয়ামী লীগ জয়ী হয় মাত্র ২টিতে। অপর একটিতে জয় পায় জাতীয় পার্টির প্রার্থী। এ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ অংশে থাকা ৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৩টিতে বিএনপি, ৫টিতে আওয়ামী লীগ এবং একটিতে বাসদের প্রার্থী জয়ী হন।

গত বুধবার নগর ভবনে আইভী সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন, শামীম ওসমানের আঁতাতের কারণে নারায়ণগঞ্জ সদর ও বন্দর উপজেলা নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী জয়ী হয়। ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ফতুল্লার কুতুবপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে পরাজিত করে জয়ী হন বিএনপি প্রার্থী।

এদিকে শামীম ওসমানও দাবি করেছেন, দলের স্বার্থে তিনি সব কিছু বলতে পারছেন না। তবে সময় হলেই বলবেন, গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কীভাবে আইভী জয়ী হয়েছিলেন। তিনি জানান, এখন অবস্থার এত অবনতি ঘটছে যে তিনি প্রমাণসহ মুখ খুলতে বাধ্য হবেন।

ওসমান ও চুনকা পরিবারের মধ্যকার দ্বন্দ্ব কখনও কখনও এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে অনেক সময় কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগকে হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল হাই বলেন, মঙ্গলবারের ঘটনাটি অবশ্যই অনাকাঙ্ক্ষিত। বিষয়টি কেন্দ্রীয় কমিটি দেখছে। তাই এ বিষয়ে বলার কিছু নেই। সমকাল

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ