প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কলেজে এসকেলেটর বিলাস, ৪৫৪ কোটি টাকার প্রকল্প

ডেস্ক রিপোর্ট : মাধ্যমিক স্কুলে এসকেলেটর (চলন্ত সিঁড়ি) স্থাপন নিয়ে বিতর্ক শেষ হতে না হতেই এবার সরকারি কলেজে এসকেলেটর বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সারা দেশে ৬৭টি কলেজে এসকেলেটর বসানোর জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪৫৪ কোটি টাকা। মাধ্যমিক স্কুলে এসকেলেটর প্রকল্পের মতো নতুন এই প্রকল্প নিয়েও প্রশ্ন তুলে পরিকল্পনা কমিশন বলেছে, পুরো প্রকল্পটি মূলত বিজ্ঞান শিক্ষার সম্প্রসারণের জন্য। বিলাসিতার মতো এখানে এসকেলেটর আনার কী প্রয়োজন। তবে শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনা কমিশন ১০ তলা ভবনগুলোতে এসকেলেটর না দিয়ে প্রথম তিন তলা এবং উপরের তিন তলা বাদে বাকি ৪ তলায় এসকেলেটর বসাতে কী পরিমাণ অর্থ খরচ হবে তা জানতে চেয়েছে। এরপর বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখা হবে।

এছাড়া এগুলো রক্ষণাবেক্ষণসহ আরো আনুষঙ্গিক কিছু বিষয়ে মতামত চাওয়া হয়েছে।

কর্মকর্তারা বলছেন, পরিকল্পনা কমিশনের নতুন শর্ত মানতে গিয়ে নতুন করে ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল (ডিপিপি) তৈরি করতে হবে উদ্যোগী সংস্থা মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)কে। আর মাধ্যমিক স্কুলে এসকেলেটর নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের দেয়া বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব এখনো দেয়নি মাউশি। বিষয়টি মৌখিকভাবে সমাধান করতে চায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

গত সোমবার পরিকল্পনা কমিশনে ‘সরকারি বিজ্ঞান কলেজে বিজ্ঞান শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ’ প্রকল্পে ‘প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি’ (পিইসি) বৈঠক হয়। বৈঠকে গত বছর মার্চ মাসে জাতীয় অথনৈতিক নির্বাহী পরিষদ (একনেক) পাস হওয়ার পর প্রকল্পের ব্যয় নতুন করে বেড়েছে ১৯৮৭ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ দ্বিগুণের চেয়ে বেশি বেড়েছে। সাধারণত ১০ ভাগ ব্যয় বৃদ্ধি পেলেই প্রকল্প অনুমোদনের জন্য পুনরায় প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি) করতে হয়। এই প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে ১১০ ভাগ। তাই ব্যয় এত বাড়ার কারণ জানতে চাওয়া হয় পিইসি সভায়। এ সময় মাউশি’র প্রতিনিধি জানান, গত বছর মার্চে কিছু শর্তসাপেক্ষে প্রকল্পটি একনেকে পাস হয়। এসব শর্তের মধ্যে ছিল, ভবনগুলো আদর্শ নকশা করা। টানা বারান্দা, খোলামেলা ক্লাসরুম, ঘুলঘুলির সংস্থান, দরজা ও জানালার উপর লুপ গ্লাসের জানালা স্থাপন, ছাদের পানি বা বৃষ্টির পানি সহজে নেমে যেতে পারে সেজন্য ছাদ ঢালু করা ও নিকটস্থ জলাশয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা, ছাত্রছাত্রীদের জন্য আলাদা কমনরুম, খেলার জন্য মাঠ, ভবনের দু’পাশে দুটি জরুরি বের হওয়ার জন্য গেইট এবং লিফটের পরিবর্তে এসকেলেটর বসানো। এসব শর্ত সংযোজন করতে গিয়ে এই ব্যয় বেড়েছে। এর মধ্যে এসকেলেটর স্থাপনের জন্য ধরা হয়েছে ৪৫৪ কোটি টাকা। নতুন নকশা ও ব্যয়ের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে দেখিয়ে পুনরায় অনুমোদন করতে শর্তে বলা হয়। গত ২০শে জুলাই প্রধানমন্ত্রীকে দেখিয়ে তা অনুমোদন নেয়া হয়েছে বলেও পিইসি সভায় জানানো হয়।

নতুন প্রস্তাবিত ডিপিপি নিয়ে প্রশ্ন তুলে পরিকল্পনা কমিশন বলেছে, প্রস্তাবিত ১০ তলা ভবনের একাডেমিক ভবনে লিফট, এসকেলেটর ও ডিজেল জেনারেটর কীভাবে পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত হবে তা স্পষ্ট হওয়া দরকার। এছাড়া লিফট ও এসকেলেটর চালু রাখার জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও প্রকল্প শেষ হওয়ার পর ডিজেল জেনারেটর জ্বালানি কীভাবে সরবরাহ করা হবে তাও স্পষ্ট হওয়া উচিত। এছাড়া, এ ধরনের বিনিয়োগ কতটুকু টেকসই হবে তা বিবেচনায় নেয়া দরকার। এসকেলেটর স্থাপনের জন্য অনেক জায়গা প্রয়োজন বা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে অতিরিক্ত খালি জায়গা রাখতে হবে। সেই জায়গা আছে কিনা? আর এসকেলেটর স্থাপন করতে গেলে প্রতিটি ভবনের মাঝের ও নিচের ফ্লোর দুই দিক থেকেই অতিরিক্ত জায়গা রাখতে হবে। তাছাড়া, স্কুল শুরু ও ছুটির সময় শত শত শিক্ষার্থী একসঙ্গে ওঠানামা করতে গেলে তা সময়সাপেক্ষ হবে। এসকেলেটর বা লিফট স্থাপনের পর রক্ষণাবেক্ষণে যে অর্থের প্রয়োজন হবে তা যথাসময়ে সংকোলন করতে পারবে না কী, এগুলো সচল রাখার জন্য সার্বক্ষণিক নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত কিনা, এগুলো চালু হওয়ার পর কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে তা গণপূর্ত অধিদপ্তর বা সরকারি সংস্থার মাধ্যমে দ্রুততার সঙ্গে মেরামতের ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হবে কিনা? এ ছাড়া আর্থিক সংশ্লেষ ও মফস্বল শহরে এর ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য পেশাদার দক্ষ জনশক্তির প্রয়োজন। এসব প্রশ্ন তোলা হয় পিইসি সভায়। আর মাধ্যমিক স্কুলে এসকেলেটর প্রকল্পে একই ধরনের প্রশ্ন তোলা হয়। এতে বলা হয়, এসকেলেটর বা লিফটের মধ্যে শিক্ষার্থীরা আটকে থাকার মাধ্যমে তাদের মধ্যে আতঙ্ক ও মানসিক বিপর্যয়ের মতো নেতিবাচক মানসিক ঘটনা সৃষ্টি হতে পারে। এছাড়াও পার্শ্ববর্তী কোনো দেশে মাধ্যমিক পর্যায়ের বিদ্যালয়ে বহুতল ভবনে এসকেলেটরসহ এ ধরনের সুবিধা নেই।

প্রকল্পের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছর মার্চ মাসে পাস হওয়ার সময় এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৮০৫ কোটি টাকা। হঠাৎ করে ১০তলা ভবনে এসকেলেটর বসানো, ভবনের নকশা পরিবর্তনসহ আরো কিছু পরিবর্তন করে প্রকল্পের ব্যয় দ্বিগুণের চেয়ে বেশি অর্থাৎ ১১০ ভাগ বেড়ে তা দাঁড়ায় ৩৭৯২ কোটি টাকায়। এই ব্যয় বাড়ার বিষয়টি মানতে নারাজ পরিকল্পনা কমিশন। সাধারণত একনেকে পাস হওয়ার পর প্রকল্পের ব্যয় ১০ ভাগ বেড়ে গেলেই পিইসি করতে হয়। সেখানে ১১০ ভাগ বেড়ে যাওয়াকে অস্বাভাবিক বলছে কমিশন।

এ ব্যাপারে মাউশির পরিচালক (পরিকল্পনা) প্রফেসর জাহাঙ্গীর হোসেন মানবজমিনকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা মানতে গিয়ে প্রকল্প সংশোধন করে এসকেলেটরের বিষয়টি আনা হয়েছে। এছাড়া আরো কিছু নতুন বিষয় যোগ হয়েছে। এতে প্রকল্পের ব্যয় ১১০ ভাগ বেড়েছে। এ নিয়ে পরিকল্পনা কমিশন আমাদের কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন। এটি এখন পাইনি। পেলে নতুন করে ডিপিপি তৈরি করে পরিকল্পনা কমিশনে জমা দেব। নতুন নির্দেশনায় ব্যয় অনেক কমে আসবে বলে জানান তিনি। মানবজমিন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত