প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আড়াই কোটি টাকা আত্মসাতে কানাডায় বাংলাদেশ দূতাবাস নিশ্চুপ সরকারি প্রজ্ঞাপন সত্ত্বেও কর্মকর্তা ফেরেননি, ঢাকায় দুদকের মামলা

মোহাম্মদ আলী বোখারী, টরন্টো থেকে : কানাডায় বাংলাদেশ দূতাবাসে নিয়োজিত রাষ্ট্রদূত মিজানুর রহমান বরাবরে সপ্তাহকাল আগে সরাসরি গণমাধ্যমের জন্য দশটি প্রশ্নের উত্তর চেয়ে ই-মেইল করা সত্ত্বেও কোনো প্রত্যুত্তর পাওয়া দূরে থাক, বরাবরের মতো ন্যূনতম প্রাপ্তি স্বীকারের সৌজন্যতাটুকুও দেখানো হয়নি। অথচ পাসপোর্ট ফি বাবদ সংগৃহীত যে সরকারি আড়াই কোটি টাকা অর্থ আত্মসাতকে কেন্দ্র করে প্রশ্নসমূহের অবতারণা, তাতে ২০১৭ সালের ২ মে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব নুমেরী জামান ও মোহাম্মদ কামরুজ্জামান স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে সংশ্লিষ্ট দূতাবাস কর্মকর্তা মোহাম্মদ মকসুদ খানকে তার পূর্বতন চাকরিস্থল বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডে স্থানান্তরের নির্দেশ দিলেও ফিরে না আসায়, ওই অর্থ আত্মসাৎ সম্পর্কিত বিষয়টি নিশ্চিত হয়েই দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি ঢাকার শাহবাগ থানায় একটি মামলা করে। যদিও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, অভিযোগ আমলে নিয়ে দুদকের মামলার ৪ মাস আগেই তাকে জরুরিভিত্তিতে ঢাকায় ফেরার ‘স্ট্যান্ড রিলিজ’ দেওয়া হয়। আর সেই সরকারি আদেশের প্রেক্ষিতে হাইকমিশনের দায়িত্ব থেকে গত সেপ্টেম্বরেই তাকে তাৎক্ষণিক অব্যাহতি দেওয়া হয়।

তথাপি মোহাম্মদ মকসুদ খান ওই সরকারি প্রজ্ঞাপনের ভিত্তিতে ঢাকায় গেলেও তার নির্ধারিত কর্মস্থলে যোগ না দিয়ে অজানা কারণেই কানাডার রাজধানী অটোয়ায় ফিরে আসেন এবং সেখানে তার পরিপূর্ণ অর্থে ক্রয়কৃত বাড়িতেই থাকছেন। অবশ্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র তার অটোয়ায় অবস্থানের কথা জানালেও বাড়ি ক্রয়ের বিষয়টি জানায়নি। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে মকসুদ খানের সঙ্গে তার সর্বশেষ ব্যবহৃত ‘কুডো মোবাইল ফোন’ (৬১৩) ৭১৫-৪২৭২ নম্বরে বারংবার ডায়াল করেও বন্ধ পাওয়া গেছে।

একটি সূত্রে প্রকাশ, মোহাম্মদ মকসুদ খান কানাডায় বাংলাদেশ দূতাবাসে ‘ফার্স্ট সেক্রেটারি’ হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। যদিও ২০১২ সালে রাজনৈতিক বিবেচনায় কানাডায় বাংলাদেশ দূতাবাসে কাউন্সিলর (স্থানীয়) হিসেবে নিয়োগ পান এবং একই বছর ৫ সেপ্টেম্বর কাজে যোগ দেন। এর আগে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের এই কর্মকর্তা ২০০৯ সাল থেকে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনির একান্ত সহকারী সচিব বা এপিএস ছিলেন।

অভিযোগে প্রকাশ, মোহাম্মদ মকসুদ খান মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট খাতে সরকারিভাবে সংগৃহীত ৪ লাখ ১২ হাজার ৩৮১ কানাডিয়ান ডলার অর্থাৎ বাংলাদেশি মুদ্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ ৫৩ হাজার ৩০৫ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এছাড়া একই ব্যাংক ড্রাফট একাধিকবার ব্যবহার করে ১ হাজার ৫০০ ডলার এবং জনৈক খালিদ হাসানের পাসপোর্ট ফি বাবদ তার ব্যক্তিগত হিসাবে পাঠানো আরও ৩২০ কানাডিয়ান ডলার অন্যায়ভাবে অসৎ উদ্দেশ্যে আত্মসাৎ করেছেন। ফলে ক্ষমতার অপব্যবহারসহ তার উপর অর্পিত আর্থিক দায়িত্বের বিশ্বাস ভঙ্গ করায় পূর্বানুমতি সাপেক্ষে গত ১৩ ডিসেম্বর দুদকের উপপরিচালক মাহাবুবুল আলম শাহবাগ থানায় একটি মামলা করেন।

এই মামলা সম্পর্কিত মোদ্দা তথ্যটি জানিয়ে গত ৯ জানুয়ারি স্থানীয় সময় বিকালে কানাডায় বাংলাদেশ দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত মিজানুর রহমানকে যে সকল প্রশ্নসহ ই-মেইল পাঠানো হয়, তাতে প্রত্যুত্তর না করা কিংবা ন্যূনতম প্রাপ্তি স্বীকার না করার হেতুটি কোনোক্রমেই বোধগম্য নয়! যদিও পূর্বাহ্নে দূতাবাসের অনুষ্ঠানবিষয়ক আমন্ত্রণ ও সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রেরণে নিয়োজিত ফার্স্ট সেক্রেটারি (বাণিজ্যিক) দেওয়ান মাহমুদুল হকের মুঠোফোনে এ বিষয়ে ফোন করতেই তিনি ফার্স্ট সেক্রেটারি (প্রশাসন) আলাউদ্দিন ভূঁইয়াকে দূতাবাসের কনস্যুলার সার্ভিসের ফোনে কল দিতে বলেন। এতে দূতাবাসীয় ওয়েবসাইটের দুটি নম্বরে বহুবার ফোন করেও ব্যস্ত টোনের কারণে ই-মেইলের অবলম্বনটি নিতে হয়। একইসঙ্গে দেওয়ান মাহমুদুল হককে সেটির কপি দেওয়াসহ রাষ্ট্রদূত বরাবরে তা প্রেরণের বিষয়টি মুঠোফোনেই জানানো হয়। ই-মেইলে জিজ্ঞাস্য ছিলÑ দূতাবাস কখন এই অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি জেনেছে ও কী পদক্ষেপ নিয়েছে, বিষয়টি কানাডীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে জানানো হয়েছে কি না ও না জানালে কেন হয়নি, দূতাবাস মোহাম্মদ মকসুদ খানের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে জানে কি না, অর্থ আত্মসাতের পরিমাণ কী করে এত বিশাল অংকে দাঁড়ালো ও কী মেয়াদে তা ঘটেছে, দূতাবাসের হিসাবনিয়ন্ত্রক তা জানতেন কি না ও জানলে নিশ্চুপ ছিলেন কেন, কে সেই হিসাবনিয়ন্ত্রক, মকসুদ খান কী করে ওই হিসাব নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পেলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে মকসুদ খানের দায়িত্ব ন্যস্তের সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্তটি কী এবং রাষ্ট্রদূত দূতাবাসের অন্য কোনো দুর্নীতি বা অব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জানেন কি না?

তা সত্ত্বেও একটি বিশ্বস্ত সূত্র নিশ্চিত করেছে, মোহাম্মদ মকসুদ খান কানাডীয় ৪ লাখ ৩৫ হাজার ডলারের সমুদয় অর্থ পরিশোধ করে অর্থাৎ আত্মসাতের কাছাকাছি অংকে গত গ্রীষ্মের শেষে অটোয়ার অরলিন্সে ৯৯০ সেরেনিটি ওয়েতে চার বেডরুমের একটি অসংলগ্ন বাড়ি কিনে সেখানেই পরিবার নিয়ে থাকছেন এবং কানাডায় সম্ভাব্য অভিবাসনের পন্থাটি খুঁজছেন। এর আগে আবৃত্তিকার হিসেবে স্থানীয় সাংস্কৃতিকগোষ্ঠীর সঙ্গেও তার সখ্য গড়ে ওঠে।

উপরন্তু, ১৯৭৬ সাল থেকে অটোয়াপ্রবাসী অবসরপ্রাপ্ত কানাডীয় রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা ও ‘বাংলাদেশের যুদ্ধশিশু’ গ্রন্থের খ্যাতিমান লেখক মোস্তাফা চৌধুরী দূতাবাস সম্পর্কে যথেষ্ট উদ্বেগপূর্ণ দৃষ্টিপান তুলে ধরে জানিয়েছেন যে, তার কন্যা সীমা চৌধুরী, যিনি নিজেও রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা তার নতুন কানাডিয়ান পাসপোর্টে গত বছর সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে ‘নো ভিসা’র জন্য ফিসহ দিলে কাউন্টারের কর্মকর্তা নিঃসঙ্কোচে ঘুষ চান। এমন দুর্নীতির ঘটনা দূর-দূরান্ত থেকে কনস্যুলার সেবা নিতে আসা অধিকাংশ প্রবাসীকেই নিত্যনৈমিত্তিক সইতে হচ্ছে। তার প্রশ্ন, ‘মকসুদ সম্পর্কিত এত বড় অর্থ আত্মসাতের ঘটনা দূতাবাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কানাডার আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাকে জানিয়েছেন কি না, তা প্রবাসীদের জানতে দিচ্ছেন না কেন’?

ই-মেইল : [email protected]

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত