প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কেমন আছেন সাভারবাসী

ডেস্ক রিপোর্ট : পালবংশীয় রাজা হরিশচন্দ্রের রাজধানী ছিল এটা; ‘ঠাকুরমার ঝুলি’র দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের জন্মভূমিও। সেই সাভার এখন জর্জরিত সমস্যার কেন্দ্রভূমি। ভূমিদস্যু, মাদক সম্রাট, সন্ত্রাসীদের গডফাদার রূপে রূপকথার সেই দৈত্যরা এখন নানাভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে এটা। ক’জন সাহসী রাজকুমারের মতো রক্ষার চেষ্টাও করছেন কেউ কেউ। তবে সেই চেষ্টা কতটা সফল হবে, তার ওপরেই নির্ভর করবে সংকট নিরসন।

‘সাভারবাসী কেমন আছেন?’

চায়ের দোকানদার মজিদ মিয়া ছাড়া চট করে এ প্রশ্নের উত্তর দিতে চান না কেউ- ‘জি, আছি তো বেশ। বিক্রি-বাট্টা আগের তুলনায় ভালো। সন্ধ্যার দিকে খুব ভিড় হয়। দু-একজন ফাঁকে-ফুঁকে চায়ের দাম না দিয়ে চলেও যায়। সমস্যা নাই। একশ’ জনে দু-একজনের ফাঁকি দেওয়াটা বড় সমস্যা না।’

কিন্তু কর্ণপাড়ার ষাটোর্ধ্ব নাদের আলীর আক্ষেপ, ‘ঢাকার পাশে প্রথম শ্রেণির পৌরসভা সাভারের নাগরিক হয়েও কোনো ধরনের নাগরিক সুবিধা পাই না। পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা নেই কোনো, মূল সড়কের বাইরে গলিপথের সড়কগুলো দীর্ঘদিন সংস্কারবিহীন। শীত মৌসুমে নামকাওয়াস্তে যদিও কিছু সংস্কার হয়, কিন্তু এক বর্ষায় সবকিছু ভেঙেচুরে আবার একাকার।’

কিছুটা থামেন নাদের আলী, ‘সড়কবাতি না থাকার কারণে সন্ধ্যার পর অধিকাংশ এলাকা ঘুটঘুটে অন্ধকার। এর মধ্যে ছিনতাই নিত্যদিনের ঘটনা। এত সমস্যার মধ্যেও ভালো থাকার চেষ্টা করছি এই বয়সেও।’ আরেক প্রৌঢ় নুরুল্লাহ বলেন, ‘সাভারে মাদকের বেচাকেনা

এতটাই বাইড়্যা গেছে যে, সন্ধ্যার পর সাভার বাজার থেকে হেমায়েতপুর সর্বত্র ইয়াবা-গাঁজাসেবীদের ছোট-বড় আখড়া বসে। প্রশাসনের লোকজন দেখেও দেখে না তা।’

ঢাকার উপকণ্ঠে ২৮০ দশমিক ১২ বর্গ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে সাভার উপজেলা। বংশী (বংশাই), তুরাগ ও ধলেশ্বরী নদী বেষ্টিত উত্তরে গাজীপুরের কালিয়াকৈর, দক্ষিণে কেরানীগঞ্জ, পূর্বে মিরপুর, মোহাম্মদপুর ও উত্তরা থানা এবং পশ্চিমে ধামরাই ও মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার অবস্থান। এককালের খরস্রোতা নদীগুলো এখন মৃতপ্রায়। শিল্প-কারখানার দখল ও ট্যানারি শিল্পের বর্জ্যে মারাত্মকভাবে দূষণ ও দখলে সেগুলোর অস্তিত্ব এখন হুমকির মুখে। এ ছাড়া রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি শিল্পকে হেমায়েতপুর এলাকায় স্থানান্তরে নতুন করে হুমকির মুখে পড়েছে বংশী ও ধলেশ্বরী।

গেন্ডা এলাকায় মজিদের চায়ের দোকানে ভালো থাকা-না থাকার অনেক কথা শোনালেন যে ষাটোর্ধ্ব নাদের আলী, তার বাড়ির পাশেই ইটের ভাটা। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন আকাশের নিচে তার পরিবারসহ তিন গ্রামের শত শত মানুষকে বাস করতে হচ্ছে। ক্ষোভ মেশানো গলা তার, ‘এমনিতেই বয়স বাড়ছে, তার ওপর বাসা থাইকা বাইর হলেই ইটভাটার ধোঁয়া লাগে চোখে-মুখে। মনে অইতাছে, বুকের মধ্যে জং ধইরা গেছে। তাকাইয়া দেখেন, এলাকায় কত ইটভাটা অইছে!’

সত্যিই অনেক ইটভাটা ও তা থেকে নির্গত কালো ধোঁয়ায় নীল-সাদা আকাশে পড়েছে কালো আস্তরণ।

বই-খাতা নিয়ে স্কুলে যাচ্ছে ৪-৫টা ছেলে।

‘কোন স্কুলে পড় তোমরা?’

‘গেন্ডা প্রাইমারি স্কুলে।’ চটপটে এক শিশুর ঝটপট উত্তর।

গেন্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঢোকা হলো ওদের সঙ্গেই। সঙ্গে সঙ্গে দুর্গন্ধ এলো নাকে। স্কুলের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া খালের পানির রঙ পাল্টে ধূসর; কিছুটা কালো, কোথাও লাল। কল-কারখানার দূষিত বর্জ্যে কর্ণপাড়ার খালের পানির এমন বিচিত্রতা। দোয়েল গ্রুপ, এইচআরসিসহ একাধিক পোশাক কারখানার দূষিত বর্জ্য ঠাঁই পায় এখানে প্রতিদিন।

একই চিত্র ধামরাইয়ে বংশী নদীর পাড়সহ এলাকার সর্বত্র। হেমায়েতপুরের হরিণধরা এলাকায় নতুন গড়ে ওঠা ট্যানারি শিল্পনগরীর বিভিন্ন কারখানা থেকে দূষিত বর্জ্য ও উৎকট কালো রঙের পানি সরাসরি ঠাঁই পায় ধলেশ্বরী নদীতে। একটি কারখানাতেও বর্জ্য দূষণমুক্ত করার জন্য ইটিপি চালু হয়নি। এলাকাবাসীর আশঙ্কা- বুড়িগঙ্গার মতো হবে এবার ধলেশ্বরী আর বংশী নদীও।

সাভার পরিবেশ আন্দোলনের নেতা কৃষিবিদ ড. রফিকুল ইসলাম মোল্লা বলেন, ‘সাভারে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয় ঘটছে। একদিকে শিল্প-কারখানার দূষিত বর্জ্য, এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ট্যানারি শিল্পনগরীর বর্জ্য। অনুমতি না থাকলেও আবাসিক এলাকায় একের পর এক ইটভাটা স্থাপনের কারণে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে এলাকাবাসী। আর এসবই হচ্ছে প্রশাসনের নাকের ডগায়।’

সাভার ব্যাংক কলোনি মহল্লার স্কুল শিক্ষক আবুল বাশার জানান, সাভার একটি বিশেষ শ্রেণির পৌরসভা। অথচ নাগরিক সুবিধা তৃতীয় শ্রেণির মতো। বর্তমানে পৌরবাসী নানা সম্যসার মধ্যে রয়েছে। প্রধান সমস্যা হচ্ছে, একটু বৃষ্টি হলেই পৌর এলাকার রাস্তাঘাট ডুবে যায়। আধুনিক ও পরিকল্পিত কোনো ড্রেনেজ ব্যবস্থা নেই। সড়কে লাইটপোস্ট আছে, লাইট নেই। সন্ধ্যার পর বিপজ্জনক হয়ে ওঠে পথচলা।

সাভার বাজার এলাকার প্রায় সব সড়কের পাশেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ময়লা-আর্বজনার স্তূপ। এলাকাবাসী জানান, তিন-চার দিন পরপর একবার ময়লা পরিস্কার করা হয়। কখনও এক সপ্তাহও চলে যায়। সাভারের বড় আরেকটা প্রকট সমস্যা হচ্ছে- সন্ত্রাস। পোশাক শিল্প-কারখানার ঝুট আর ভূমির দালালি বাণিজ্য নিয়ে মাঝেমধ্যে অশান্ত হয়ে ওঠে শিল্পাঞ্চল। আগের চেয়ে খুন-খারাবি কিছুটা কমলেও মাঝেমধ্যে ভয়াবহ সংঘাত সংঘটিত হয় এখানে। এই অবারিত আতঙ্কের মধ্যেই দিন কাটাতে হয় সাভারবাসীকে।

স্থানীয় সংসদ সদস্য ডা. এনামুর রহমান সমকালের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘পৌর এলাকার নাগরিক সংকট নিরসনে পৌর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে উদ্যোগ নিচ্ছি। সাভারকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলার জন্যও পরিকল্পনা তৈরি করেছি একটা। সবার সহায়তা পেলে পরিকল্পিত সাভার নগরী গড়ে তোলা সম্ভব।’

বাজার থেকে গেন্ডা পর্যন্ত অনেক বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতাল রয়েছে সাভারে। রাস্তার দু’পাশে তাকালে মনে হয় ক্লিনিকের নগরী। তবে এসব হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবার মান নিয়ে নানা অভিযোগ এলাকাবাসীর। অনেক ক্লিনিকই সাইনবোর্ড ও নামসর্বস্ব। আধুনিক ল্যাবরেটরির কথা বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে এসব ক্লিনিকে শুধু বিভিন্ন পরীক্ষার জন্য রোগীর শরীর থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়; পরীক্ষা করা হয় অন্যত্র। ফলে চড়া মূল্য দিয়েও সঠিক পরীক্ষা নিয়ে আশঙ্কা থেকে যায় রোগীদের। তবে এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসা সেবায় খুবই সন্তুষ্ট এলাকাবাসী। ২০১৩ সালে সংঘটিত রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির সময় এ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মানবিক ও আন্তরিক চিকিৎসা সেবার কথা এখনও এলাকাবাসীর মুখে মুখে। এ ছাড়া সাভারে অবস্থিত পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পূনর্বাসন কেন্দ্র সিআরপি, কোরিয়া মৈত্রী হাসপাতাল, শেখ ফজিলাতুন্নেছা কেপিজে হাসপাতাল, আশুলিয়ার আধুনিক মা ও শিশুস্বাস্থ্য পরিচর্যা কেন্দ্র, নারী ও শিশুস্বাস্থ্য কেন্দ্র শিল্প এলাকার স্বল্প আয়ের কর্মজীবী লোকজনের পাশাপাশি সামাজের বিভিন্ন পর্যায়ের বাসিন্দাদের জন্য কম খরচে উন্নত চিকিৎসার জন্য নির্ভরতার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

সাভারবাসী গর্বিত কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্যও। সাভারে সর্বপ্রথম শিক্ষা ব্যবস্থার সূচনা করেন রাখাল চন্দ্র সাহা। পিতার নামে অধরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। মায়ের নামে ছেলেদের থাকার বোর্ডিং এবং মহেশচন্দ্র দাতব্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা করেন কাকার নামে। সেই অধরচন্দ্র সাহা বিদ্যালয়টি এখন সাভারের মাধ্যমিক শিক্ষার প্রধান বিদ্যাপীঠ। এ ছাড়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, সাভার বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, সাভার মহিলা কলেজ উচ্চশিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছে।

কয়েকটি জাতীয় সরকারি প্রতিষ্ঠানও সাভারকে দিয়েছে জাতীয় পরিচিতি। প্রাণিসম্পদ গবেষণা কেন্দ্র ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশন, শেখ হাসিনা জাতীয় যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন কেন্দ্র, বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি), জাতীয় মাশরুম উন্নয়ন কেন্দ্র সাভারবাসীর কাছে গর্বের প্রতিষ্ঠান। তবে সাভারের সবচেয়ে বড় গৌরব জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর শহীদদের মহান আত্মত্যাগের স্মৃতিবিজড়িত জাতীয় স্মৃতিসৌধ। শত সংকটের মধ্যেও অনেক কিছুই সাভারবাসী ভুলে যায় প্রতি বছর ১৬ ডিসেম্বর বাঙালির বিজয় দিবস ও ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে লাখো মানুষের মিলন মেলায়। সমকাল

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত