প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

উবার ও পাঠাও এর কাছে ট্যাক্সিক্যাব সার্ভিসের পতন!

সজিব খান: বৈধতা পেলেও অ্যাপনির্ভর পরিবহন সার্ভিস উবার ও পাঠাও এর সাথে ট্যাক্সিক্যাব সার্ভিসের ভাড়া বৈষম্য থেকেই যাচ্ছে। বর্তমানে ঢাকায় পরিচালতি দুটি প্রতিষ্ঠানের ট্যাক্সিক্যাব সার্ভিসের ভাড়া এবং অ্যাপভিত্তিক ট্যাক্সিক্যাবের ভাড়া পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এগুলোর মধ্যে ভাড়ায় ব্যাপক তারতম্য রয়েছে। যার ফলে অ্যাপনির্ভর পরিবহন সার্ভিসের কাছে পতন হতে চলেছে ২০০২ সাল থেকে চলে আসা ট্যাক্সিক্যাব সার্ভিসের।

জনসাধারণের ভোগান্তি দূর করতে রাজধানীতে সরকার ট্যাক্সিক্যাব সার্ভিসের অনুমোদন দিলে ২০০২ সালে সর্বপ্রথম ঢাকায় ট্যাক্সিক্যাব সার্ভিস চালু করে তমা কনস্ট্রাকশন ও ট্রাস্ট ট্রান্সপোর্ট সার্ভিসেসে নামে দুটি প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে রাজধানীতে এ দুটি প্রতিষ্ঠানের মোট ৪২৫টি ট্যাক্সি চলছে।

২০১৭ সালে অ্যাপভিত্তিক পরিবহন সার্ভিস উবার-পাঠাওসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ট্যাক্সিক্যাব সার্ভিস চালু করে। কিন্তু এতে সরকারের কোনও নিয়ন্ত্রণ না থাকায় সোমবার মন্ত্রিপরিষদে ‘রাইড শেয়ারিং সার্ভিস নীতিমালা-২০১৭’-এর খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়। যাতে বলা হয়, বর্তমানে সরকারের ট্যাক্সিক্যাব সার্ভিস নীতিমালা-২০১০ অনুযায়ী এর ভাড়া নির্ধারিত হবে। তাছাড়া কোম্পানিগুলোকে ১১টি শর্ত মেনে চলতে হবে।

সরকারের ২০১০ সালের নীতিমালায় ট্যাক্সিক্যাবকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে— শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ট্যাক্সিক্যাব ও ইকোনোমিক ট্যাক্সিক্যাব। এর মধ্যে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ট্যক্সিক্যাবের প্রথম ২ কিলোমিটারের জন্য ৬০ টাকা এবং পরবর্তী প্রতি কিলোমিটারের জন্য ১৫ টাকা ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। অন্যদিকে, ইকোনোমিক ট্যাক্সিক্যাবের জন্য প্রথম ২ কিলোমিটারের জন্য ভাড়া ৫০ টাকা এবং পরবর্তী প্রতি কিলোমিটারের জন্য ভাড়া ১২ টাকা নির্ধারণ করা হয়।

পুরো কিলোমিটার পথ যাওয়ার আগে যাত্রী নেমে গেলে এক-চতুর্থাংশ কিলোমিটারে ইকোনোমিক ট্যাক্সিক্যাবে ৩ টাকা হারে ও শীতাতপ ট্যাক্সিক্যাবে ৩ দশমিক ৭৫ টাকা হারে ভাড়া দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অ্যাপভিত্তিক পরিবহন সার্ভিসগুলোকেও ভাড়ার ক্ষেত্রে এই নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে।

পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, অ্যাপভিত্তিক ট্যাক্সিক্যাবগুলোতে বর্তমান ভাড়া সরকারের নীতিমালায় উল্লেখ করা ভাড়ার তুলনায় কম। অন্যদিকে, ২০১৪ সালে যাত্রা শুরু করা তমা কনস্ট্রাকশন ও ট্রাস্ট ট্রান্সপোর্ট সার্ভিসেসের ট্যাক্সিক্যাবগুলোর ভাড়া এই নীতিমালার চেয়ে অনেক বেশি। এসব ট্যাক্সিক্যাবে প্রথম দুই কিলোমিটারের ভাড়া ৮৫ টাকা, পরবর্তী প্রতি কিলোমিটারের জন্য ৩৪ টাকা। প্রতি দুই মিনিট অপেক্ষমাণ সময়ের (যানজট, যাত্রাবিরতি ও সংকেত) জন্য ভাড়া সাড়ে আট টাকা এবং ফোনে বুকিং দিলে বাড়তি ২০ টাকা ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। এছাড়া ট্যাক্সিক্যাব যেখান থেকে যাত্রা শুরু করে, সেখান থেকেই মিটার চালু করা হয়।

এদিকে, অ্যাপভিত্তিক কোম্পানিগুলোর মধ্যে উবারের ট্যাক্সিক্যাব সার্ভিসে সর্বনিম্ন ভাড়া ৪০ টাকা, পরবর্তী প্রতি কিলোমিটারের জন্য ১৮ টাকা। প্রতি এক মিনিট ওয়েটিং চার্জ ৩ টাকা। সার্ভিস বাতিলের জন্য দিতে হয় ৩০ টাকা। এই কোম্পানির বাইক সার্ভিসে সর্বনিম্ন ভাড়া ৩০ টাকা, পরবর্তী প্রতি কিলোমিটার ১২ টাকা এবং প্রতি এক মিনিট ওয়েটিংয়ের জন্য ১ টাকা হারে পরিশোধ করতে হয়।

অ্যাপভিত্তিক আরেক সার্ভিস পাঠাওয়ের সর্বশেষ নির্ধারিত ভাড়া অনুযায়ী ট্যাক্সিক্যাবের সর্বনিম্ন ভাড়া ৫০ টাকা। প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া ২০ টাকা এবং প্রতিমিনিট ওয়েটিংয়ের জন্য ভাড়া ৫০ পয়সা। একই কোম্পানির বাইক সার্ভিসের সর্বনিম্ন ভাড়া ২৫ টাকা। ২ কিলোমিটারের পর কিলোমিটারপ্রতি ১২ টাকা এবং প্রতিমিনিট ওয়েটিংয়ের জন্য ৫০ পয়সা হারে ভাড়া ‍গুনতে হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন নীতিমালায় হুমকির মধ্যে পড়বে তমা ও ট্রাস্টের ট্যাক্সিক্যাব সার্ভিস। তাছাড়া, এরই মধ্যে অ্যাপনির্ভর সার্ভিসের কারণে লোকসানের আশঙ্কা জানিয়ে বিভিন্ন সময় সরকারের কাছে অভিযোগও জানিয়েছে এ দুই কোম্পানি।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, যেখানে ২০১০ সালের নীতিমালা অনুযায়ী ট্যাক্সিক্যাবের প্রতি দুই কিলোমিটারের ভাড়া ৫০ বা ৬০ টাকা, সেখানে তমা ও ট্রাস্টের ট্যাক্সিক্যাবের ভাড়া ৮৫ টাকা অনেক বেশি। তাছাড়া এ দুই ধরনের সার্ভিসের মধ্যে পরবর্তী প্রতি কিলোমিটারের ভাড়ায় ১২ থেকে ৩৪ টাকা পর্যন্ত ব্যবধান রয়েছে। ফলে নতুন নীতিমালায় এই দুই কোম্পানি চরম ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) সচিব মুহাম্মদ শওকত আলী বলেন, ‘আগে অ্যাপভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো পূর্বে ভ্যাট, ট্যাক্স, লাইসেন্স ফি দিতে হতো না। এখন তারা নিয়মের মধ্যে আসছে। সে কারণে তাদের নির্ধারিত ভাড়া থেকে বর্তমানে কিছু ভাড়া বেশি দিতে হবে, যা ২০১০ সালের নীতিমালার সমান। এছাড়া ভাড়ার তারতম্যের বিষয়টি নিশ্চই সরকার বিষয়টি বিবেচনা করবে।’

ঢাকা মহানগর ট্যাক্সিক্যাব (লিজ) মালিক কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ওবায়দুল হক  বলেন, ‘এটা অবশ্যই বৈষম্য। এর মাধ্যমে ট্যাক্সিক্যাব শিল্পকে ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে। এতে অবৈধ ট্যাক্সিক্যাবগুলোকে বৈধ করার জন্য উৎসাহ পাবে, বিপরীতে বৈধ ট্যাক্সিক্যাবগুলো নিরুৎসাহিত হবে।’

এ বিষয়ে তমা গ্রুপের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান ভুঁইয়া মানিক বলেন, ‘সরকার নিশ্চয় যাত্রীদের সুবিধা বিবেচনা করেই ভাড়া নির্ধারণ করবে। আমরা তো এমনিতেই ক্ষতিগ্রস্ত, চরম লুজার।’

অন্যদিকে, নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি অ্যাপভিত্তিক কোম্পানির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘আমাদের এখন লাইসেন্সের আওতায় আসতে হবে। বছর বছর লাইসেন্স নবায়ন করতে হবে। ভ্যাট-ট্যাক্স দিতে হবে। এগুলো তো যাত্রীদের কাছ থেকেই আদায় করতে হবে। এখন সরকার নিয়ম করে দিলে আমাদের তা মানতে কোনও সমস্যা নেই। সেক্ষেত্রে যাত্রীদের বেশি ভাড়া গুনতে হবে।’

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত