প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অ্যাকশনের বিমূর্ত বয়ান

কাকন রেজা : ‘স্যাটায়ার’ ধরনের লেখা আসলে মানুষ পড়তে চায় না। ‘বিমূর্ত’ কোনো কিছুতে এখন আর মানুষের আগ্রহ নেই। তারা সবই চায় ‘মূর্তিমান’। বলতে পারেন ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন’ ধরনের চাওয়া। প্রায়োগিক জীবনে নিজেরা ‘মূর্ত’ হতে ভয় পান কিন্তু লেখায় চান সবকিছু বিমূর্ত। অনেকটা বাড়িতে হাড় জিরজিরে বউ রেখে বাংলা সিনেমার মোটাতাজা নায়িকা দেখে চোখ জুড়ানোর মতন। মনোবিদ্যা বলে, ভীতুদের অনেকেই সাধারণত মানসিকভাবে স্যাডিস্ট ধরনের হয়। তারা সরাসরি যা করতে ভয় পায় তারই আস্বাদ পেতে চায় গল্পে, সিনেমায়। আরেকটু অগ্রসররা চায় ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন’ জাতীয় প্রবন্ধে নিবন্ধে অথবা ‘ইয়ে’ দেখানো কলকাতা টাইপ আর্টফিল্মে।

‘ডাইরেক্ট এ্যাকশন’ জাতীয় লেখায় অবশ্য দ্রুত পরিচিতি পাবার ‘এক্সট্রা’ সুবিধা এবং অসুবিধা দুই’ই রয়েছে। এই ‘এক্সট্রা’ সুবিধার কারণে এখন অনেকেই পরিচিত, তারা রয়েছেন সমুখ সারির ঝলমলে জীবনে। আবার উল্টো দিকে কেউ রয়েছেন দৌড়ের উপর। এই পরিস্থিতি অবশ্য সময়ের সাথে বদলে যায়। তখন হয় ‘মিরর ইফেক্ট’। চিত্রটা একই থাকে চরিত্রের অবস্থান বদলে যায়।সে যাহোক ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশনে’ আসি। ইদানিং ‘ডুবন্ত’ তথা ডুবে যাওয়া বিষয়ে খুব চর্চা চলছে। বেগম খালেদা জিয়াও নাকি চীন আনা সাবমেরিন বিষয়ে ‘ডুবে যাবার’ কথা বলেছেন। এমন যদি বলে থাকেন তবে কথাটায় ‘সহনশীল’ মাত্রায় আপত্তি আছে, যা ‘ডুবন্ত’ তা আবার ডুববে কী ভাবে! বরং বললে ভালো হতো, ওই জিনিস আর ভাসবে না। অবশ্য খালেদা জিয়ার বিপরীত মেরুতেও ডুবে যাবার বিষয় নিয়ে চর্চা চলছে। গণমাধ্যমের ভাষ্য অনুযায়ী সদ্যমন্ত্রী বিজয়খ্যাত আব্দুল জব্বার বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আমাকে ডুবন্ত নৌকার দায়িত্ব দিয়েছেন’। ইতিহাসবিদ এবং বুদ্ধিজীবী মুনতাসির মামুনের ভাষ্য ‘নৌকা ডুবলে সবাইকে ডুবতে হবে’।

এখানে ‘অ্যাকশন’ হলো ‘ডুবে যাওয়া’ বা ‘ডুবন্ত’ শব্দটির মধ্যে। যার চর্চা এবং তার পেছনের মন্তব্য সবই ‘ডাইরেক্ট’ দৃষ্টিগ্রাহ্য। যদিও কেউ কেউ টাইটানিকের ক্যাপ্টেনের মতন বেশ আত্মবিশ্বাসী। তবে কাহিনীর পরেরটা সবারই জানা টাইটানিক সিনেমার প্রেমিকহারা রোজের বর্ণনায়।বায়োস্কোপের কথা থাক বাস্তবে আসি। হাসিমুখে অনশনরত শিক্ষকরা বাড়ি ফিরে গেছেন। দাবি পূরণে প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস পেয়েছেন তারা। এবার অনশনে বসেছেন মাদরাসার শিক্ষকগণ। অবশ্য এ বিষয়ে খ্যাত একজন শিক্ষাবিদ টেলিভিশনের বিভীষণসম টকশোতে অনেকটা এভাবেই বলেছেন, ‘রাস্তায় কেউ এসে বসবেন, সরকার দাবি মেনে নেবেন, কোয়ালিটি তথা যোগ্যতা দেখবেন না। এই টাকাতো আমাদের টাকা, জনগণের ট্যাক্সের টাকা।’ এখানে ‘আমাদের টাকা’ এই শব্দদ্বয়েও সহনশীল মাত্রায় আপত্তি রয়েছে। হলমার্ক, বেসিক ব্যাংক, বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা যখন হাওয়া হলো তখন অনেকের গায়ে লাগেনি।

তখন দেখেছি কারো মৃদু অনুযোগ, কারো নিস্তব্ধতা। হয়তো সেই টাকা তাদের ছিল না, কিন্তু শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির টাকাতে তাদের ভা-ারে টান পড়েছে। প্রশ্ন উঠেছে ‘আমাদের টাকা’ ‘জনগণের টাকা’ বলে। প্রশ্ন উঠেছে ‘কোয়ালিটি’ বিষয়েও। কোয়ালিটির এমন প্রশ্নে সামনে চলে আসে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকার বদ্ধ ঘরে ‘যৌথ গবেষণা’র চিত্র। মনে পড়ে যায় গবেষণা কর্মে ‘দাতার অজ্ঞাতে ঋণ গ্রহণে’র চতুর কথকতা।তবে ‘কোয়ালিটি’ বিষয়টি নিয়ে অবশ্যই ভাবতে হবে। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় যাদের বেতন দেবেন তারা যেন ‘বাহাত্তুরা’সম না হোন। ‘বাহাত্তুরা’ মানে যে সময় শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার খাতায় প্রশ্নের উত্তরের জায়গায় লিখতেন, ‘শার্টের বুক পকেটে তেরো নম্বর প্রশ্নের উত্তর রয়েছে’; সে অনুসারেই ‘বাহাত্তুরা’ শব্দটির প্রচলন।

সুতরাং কোয়ালিটির প্রশ্নে ‘বাহাত্তুরা’সমদের বাদ দেওয়াই ভালো। তবে গড়পরতা সবাইকে ‘বাহাত্তুরা’ গণ্য করাও ঠিক হবে না, ‘পাঁকে পদ্ম ফোঁটে’ কথাটাও মনে রাখতে হবে।
পুনশ্চ : বাদ দেওয়ার প্রশ্নে অনেকে আবার ‘কম্বল উজারে’র প্রবাদটি তুলবেন। জানি প্রবাদটির বহুলতার কথা, কিন্তু তারপরেও তো ঝুঁকি নিতে হবে। ‘নো রিস্ক নো গেইন’ কথাটিও ভুলে গেলে চলবে না।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সম্পাদনা : মোহাম্মদ আবদুল অদুদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত