প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিভিন্ন এলাকায় চুলা জ্বলছে না দিনের বেলায়
রাজধানীতে গ্যাস সংকটে দুর্ভোগ

ডেস্ক রিপোর্ট : কয়েক বছর ধরে ধারবাহিকভাবে বাড়লেও গেল অর্থবছরে প্রথমবারের মতো ছন্দপতন ঘটে গ্যাস উৎপাদনে। সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসেবে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো গ্যাস উৎপাদন কমে দশমিক ৪১ শতাংশ। বিতরণ খাতে বাড়তি মূল্য সংযোজন দেখিয়ে এ খাতে বছর শেষে প্রবৃদ্ধি দেখানো হয় দশমিক ২৮ শতাংশ। অথচ এর এক বছর আগেও গ্যাস খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ৯১ শতাংশ। এক বছরে অপ্রত্যাশিত হারে গ্যাস উৎপাদন কমে আসায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বিতরণ খাতে। এতে শিল্পকারখানার পাশাপাশি গ্যাসের সংকট দেখা দিচ্ছে বাসাবাড়িতেও। এতে চরম বেকায়দায় রয়েছে রাজধানী ও এর আশপাশের এলাকার গ্যাসনির্ভর পরিবারগুলো।

গভীর রাতে দুপুর ও রাতের খাবার রান্না করি। মধ্যরাতে রান্না শেষ করতে হয়। কারণ, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত গ্যাস থাকেই না। অন্য সময় গ্যাস থাকলেও তাপ নেই বললেই চলে। এক পাতিল পানি গরম করতেও ১ ঘণ্টার বেশি সময় লাগছে। ক্ষুব্ধ হয়ে কথাগুলো বলছিলেন রাজধানীর মিরবাগের বাসিন্দা আরিফা রহমান। তিনি বলেন, বাধ্য হয়ে সকালের খাবার কিনেই আনতে হয়। সেখানেও আরেক বিপত্তি। বাসার আশপাশে যে রেস্টুরেন্ট আছে, সেগুলোয় দীর্ঘ লাইন। সবাই নাস্তার জন্য রেস্টুরেন্টেই ছুটছেন। বনশ্রীর বাসিন্দা জাকিয়া সুলাতানা বলেন, মধ্যরাতেই রান্না করতে হয়। সকালে তো রান্না করতেই পারি না। মধ্যরাতে রান্না করে খাবার ফ্রিজে রেখে খেতে হচ্ছে।

মোহাম্মদপুর, বসিলা, আদাবর, পশ্চিম আগারগাঁও, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, কাফরুল, পশ্চিম ধানমন্ডি, লালবাগ, সোবহানবাগ, ইন্দিরা রোড, তাঁতীবাজার, শাঁখারীবাজার, কামরাঙ্গীরচর, উত্তরা, দক্ষিণখান, উত্তরখান, দক্ষিণ বনশ্রী, মগবাজারসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গেল কয়েক দিন থেকে তীব্র গ্যাস সংকট চলছে। এসব এলাকার বাসিন্দাদের হয় খাবার কিনে খেতে হচ্ছে, না হয় অন্য কোনো উপায়ে রান্না করতে হচ্ছে।

জানা যায়, শীতকালে ঢাকা শহরে গ্যাস সংকট সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এ সময় গ্যাসের চাহিদা বাড়ার কারণেই এমন গ্যাস সংকট হয় বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। এছাড়া বিতরণ লাইনের ত্রুটি এবং অবৈধ সংযোগের কারণেও গ্যাসের সংকট হচ্ছে বলে জানান তারা। তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শীতের শেষে এ সংকট থাকবে না।

এ বিষয়ে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের পরিচালক (অপারেশন্স) এইচএম আলী আশরাফ বলেন, শীতকালে ঢাকা শহরে গ্যাসের চাহিদা বাড়ে। এ কারণেই এ সময় সংকট তীব্র হয়। কিন্তু এ সংকট কেন একেক এলাকায় একেক রকম জানতে চাইলে তিনি বলেন, রাজধানীর অনেক এলাকা খুব দ্রুত উন্নতি হয়েছে। কিন্তু গ্যাসের পাইপলাইন সেই পুরনো আর সরুই রয়ে গেছে। তাই এ বিরক্তিকর গ্যাস সংকট।

রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর মিরহাজারীবাগ এলাকার বাসিন্দা সুলতানা রহমান এক হাতে বাচ্চাকে ধরে রেখেছেন এবং আরেক হাতে গ্যাসের চুলা ধরানোর চেষ্টা করছেন। বাচ্চা খাবারের জন্য কান্নাকাটি করছে আর মা কিছু রান্না করতে চাইছেন বাচ্চাকে শান্ত করতে। কিন্তু যতবারই তিনি চুলায় আগুন দিচ্ছেন ততবারই চুলা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ক্ষুব্ধ ফারহানা বলছেন, বড়রা না হয় হোটেল থেকে খাবার কিনে খেতে পারে, কিন্তু যে বাচ্চা শুধু দুধ খায় তাকে শান্ত রাখা খুব কঠিন। তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে আমরা দুই দিন কিছু রান্না করতে পারিনি।

রাজধানীর নয়াটোলার মাহমুদা ইয়াসমিন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, গ্যাস নিয়ে আর কিছু বলার নেই। গ্যাস তো প্রায় থাকেই না। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে একটি সিলিন্ডার কিনেছি। এতে বাড়তি খরচ হওয়ায় মাসিক বাজেটও কাটছাঁট করতে হচ্ছে। আবার গ্যাস না পেলেও বিল দিতে হচ্ছে। এ বিষয়ে দেখার কেউ নেই।

এদিকে সকালে রাজধানীর বেশ কয়েকটি এলাকার রেস্টুরেন্ট ঘুরে দেখা গেছে, লাইন দিয়ে সবাই নাস্তা কিনছেন। গ্যাস না থাকায় সকালের নাস্তার জন্য মানুষ রেস্টুরেন্টের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। অনেক রেস্টুরেন্টেও গ্যাসের সংকট রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস না থাকায় বিকল্প উপায়ে রান্না করছি। সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করতে গেছে অনেক রেস্টুরেন্টে। অনেক রেস্টুরেন্টে আবার কাঠ পুড়িয়ে রান্না করতে দেখা গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাসাবাড়িতে গ্যাস সংকটের কারণে কাস্টমারও বেড়েছে। এ বাড়তি চাহিদা মেটাতেই বাড়তি ব্যবস্থা রাখা হয়েছে রেস্টুরেন্টগুলোয়।

জানতে চাইলে রামপুরার বাসিন্দা একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত আবদুল হান্নান বলেন, বাসাতে নাস্তা রান্না না হওয়ায় অফিসে হাজিরা দিয়ে তারপর কোনো রেস্টুরেন্টে নাস্তা করি। রেস্টুরেন্ট থেকে নাস্তা আনিয়ে বাসায় যে খাব, সে উপায় নেই। রেস্টুরেন্টে নাস্তা পেতে অনেক সময় লাগছে। অত সময় নিলে অফিসের দেরি হয়ে যায়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৩-১৪ অর্থবছর গ্যাস উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি হয় ১ দশমিক ৬৯ শতাংশ। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি বেড়ে দাঁড়ায় ৫ দশমিক ১৬ শতাংশে। ২০১৫-১৬ অর্থবছর ৯ দশমিক ৯১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও গেল অর্থবছরে তা শূন্য দশমিক ২৮ শতাংশে নেমে আসে। গ্যাস উৎপাদন ও বিতরণে নেওয়া প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) সূত্র জানায়, বাখরাবাদ-সিদ্ধিরগঞ্জ গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন শীর্ষক প্রকল্প নেওয়া হয় ২০০৭ সালে। কয়েক দফায় সময় বাড়ানোর পরও প্রকল্পটির কাজ শেষ হয়নি। ৮৪৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয় ধরে নেওয়া প্রকল্পে গেল ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৫৭৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। চলতি বছর শেষে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন শেষ করার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। ১ হাজার ৪৯৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা ব্যয় ধরে আশুগঞ্জ ও এলেঙ্গায় কম্প্রেসার স্টেশন নির্মাণ প্রকল্প চলছে ২০০৬ সাল থেকে। এ পর্যন্ত প্রকল্পটির অনুকূলে ৯৭৬ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। এ প্রকল্পের কাজও চলতি অর্থবছরের মধ্যে শেষ করার কথা রয়েছে। আলোকিত বাংলাদেশ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ