প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নির্বাচনি বছরে ঝুঁকিতে পড়তে পারে অর্থনীতি

ডেস্ক রিপোর্ট : সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। গত অর্থবছর ব্যাংকসহ আর্থিক খাতে বড় ধরনের কেলেঙ্কারি হয়েছে। বিনিয়োগ, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য, খাদ্য মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতিও খারাপ হচ্ছে। এ অবস্থায় জাতীয় নির্বাচনের ডামাডোল শুরু হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে। নির্বাচনি বছরে জাতীয় অর্থনীতি বাড়তি ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। ঝুঁকি মোকাবিলায় অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় রক্ষণশীল নীতিতে চলার পরামর্শ দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। সংস্থার ‘বাংলাদেশ অর্থনীতি-২০১৭-১৮ অর্থবছর, প্রথম অন্তর্বর্তীকালীন পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এসব বিষয় উঠে এসেছে।

চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বাংলাদেশের অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি ও পরবর্তী অর্ধেক সময়ের করণীয় তুলে ধরতে শনিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে সিপিডি। এতে বক্তব্য রাখেন সংস্থার সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, ড. মোস্তাফিজুর রহমান, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, গবেষণা পরিচালক খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থার গবেষণা ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এক দশক ধরে দেশে ভালো প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তবে এ প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সংগতি রেখে কর্মসংস্থান হচ্ছে না। দারিদ্র্যবিমোচনের হারের গতি কমে এসেছে। অর্থনৈতিক বৈষম্যও বেড়েছে। আয় আর ভোগের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি বৈষম্য বেড়েছে সম্পদে। ব্যাংকে ঋণের টাকা ফেরত না দেওয়া ও বড় প্রকল্পের ভেতর থেকে বিভিন্ন ধরনের ঠিকাদারি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অর্থ ভিন্ন দিকে পরিচালনা করায় বৈষম্য বেড়েছে বলে তিনি মনে করেন। ২০১৭ সালকে ব্যাংকিং কেলেঙ্কারির বছর হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্যাংকে অপরিশোধিত ঋণ বেড়েছে, সঞ্চিতির ঘাটতি বেড়েছে, অপরিশোধিত ঋণে গুটিকয়েকের প্রাধান্য তৈরি হয়েছে, জনগণের করের টাকায় রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকে মূলধন ঘাটতি পূরণ করা হয়েছে। ব্যক্তি খাতের ব্যাংকে প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে মালিকানার বদল করা হয়েছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় দেওয়া নতুন ব্যাংক কার্যকর হয়নি। ব্যক্তি খাতের ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা পাচারের ঘটনা ঘটছে। তিনি আরও বলেন, অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০১৭ সাল শুরু হলেও, তা বাস্তবায়িত হয়নি। সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কিছুটা দুর্বল হয়ে গেছে; চাপের মুখে পড়েছে। এটা সামাল দিতে সংস্কারের বিষয়টি সামনের দিকে এগোয়নি। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ব্যাংকিং খাত। এ খাতে প্রতিষেধক ব্যবস্থা না নিয়ে সরকার উল্টো ব্যাংকিং আইন সংশোধন করে ব্যাংকে পরিবারের নিয়ন্ত্রণ বাড়াচ্ছে। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় আগামীতে যথাযথ উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ড. দেবপ্রিয়। তিনি বলেন, ২০১৮ সালের সব কর্মকা- নির্বাচনমুখী। আগে সংস্কার হওয়ার কথা থাকলেও, তা হয়নি। চলতি বছর এমন ম্যাজিকেল কিছু ঘটবে না, যাতে বড় ধরনের সংস্কার হবে। সংস্কার করার মতো রাজনৈতিক পুঁজিও নেই। গত বছরের আর্থিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার সঙ্গে চলতি বছরের নির্বাচনি বাড়তি ঝুঁকি যোগ হবে। এজন্য রক্ষণশীল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা কার্যকর করতে হবে। ঋণ কমাতে হবে, টাকার মূল্যমান ঠিক রাখতে হবে, মূল্যস্ফীতি; বিশেষ করে চালের দাম কমাতে হবে। নির্বাচনি বছরে বহুমুখী চাপ সামলাতে রাজনৈতি দূরদর্শিতা প্রয়োজন।

ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমদানির আড়ালে অর্থ পাচার হচ্ছে। বিশেষ করে পোশাক শিল্পের কাঁচামাল তুলা আমদানি ৭৫ শতাংশ বেড়েছে। উৎপাদনে তার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার হিসাবে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর ৮ বিলিয়ন থেকে ৯ বিলিয়ন ডলার পাচার হচ্ছে। এর মধ্যে ৮০ শতাংশই আমদানি-রপ্তানিতে মূল্য কারসাজির মাধ্যমে। বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) খতিয়ে দেখা উচিত। তিনি বলেন, নির্বাচনি বছরে অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত। বর্তমান সমস্যা ও নির্বাচনের বাড়তি ঝুঁকি যোগ হলে অর্থনীতি বড় ধরনের চাপে পড়বে।

ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যে ব্যাংকে লুটপাট চলছে। ব্যাংকের অনিয়ম প্রতিরোধের উদ্যোগ নেই। পৃথিবীর অনেক দেশে আর্থিক খাতে সংকট থেকে বড় ধরনের সংকট হয়েছে। বাংলাদেশের আর্থিক সংকট সেদিকে যাচ্ছে কিনা, তা দেখতে হবে?

মূল প্রবন্ধে তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত ৬ লাখ ৫৫ হাজার ৫০০ রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে এসেছেন। তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার আলোচনা চলছে। বর্তমান প্রেক্ষাপট অনুযায়ী প্রতিদিন যদি ৩০০ জনকে ফেরত পাঠানো হয়, তাহলে সময় লাগবে কমপক্ষে সাত বছর। এত দিনে খরচ হবে কমপক্ষে ৪৪৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার। মূল প্রবন্ধে আরও বলা হয়, ২০১০ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে মানুষের আয়ের বৈষম্য বেড়েছে। ২০১৬ সালে দেশের মানুষের মোট আয়ের দশমিক ২৩ শতাংশ আসে সবচেয়ে দরিদ্রদের ৫ শতাংশ থেকে, যা ২০১০ সালে ছিল দশমিক ৭৪ শতাংশ। অন্যদিকে ২০১৬ সালে মোট আয়ে সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশের অবদান ২৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ, যা ২০১০ সালে ২৪ দশমিক ৬১ শতাংশ ছিল বলে সিপিডির হিসাব। অর্থাৎ ধনীরা ২০১০ সালে যা আয় করতেন, ২০১৬ সালে এসে এর চেয়ে বেশি আয় করছেন; অন্যদিকে আয় কমেছে গরিবদের। ২০১০ সালে দেশের মোট সম্পদের ৫১ দশমিক ৩২ শতাংশ ছিল সর্বোচ্চ ধনী ৫ শতাংশের কাছে; অন্যদিকে ০.০৪ শতাংশ ছিল সবচেয়ে দরিদ্র ৫ শতাংশের কাছে। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কাছে প্রবৃদ্ধির সুফল পৌঁছায়নি। গরিবরা আরও গরিব হচ্ছেন, ধনীরা আরও ধনী হচ্ছেন। আলোকিত বাংলাদেশ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ