প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

জাতীয় পার্টি এখন চাঙ্গা

শাকিল : জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা এখন বেশ চাঙ্গা। ১৯৮৭ সালের সোনালী অতীত যেন ফিরে পেয়েছে দলটি। তন্দ্রার রেস নেই তাদের মাঝে, আছে আগামীতে ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন। আর সেই স্বপ্নকে লালন করে ক্ষমতার অংশীদার না হয়ে এককভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন দলের চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও পার্টির মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার। সম্প্রতি তারা দলের যৌথ সভায় এবং এ প্রতিবেদকের সঙ্গে একান্ত আলাপকালে সত্যিই স্বপ্ন ধারণের কথা জানান। গেল বছরের ২১ ডিসেম্বর রংপুর সিটি নির্বাচনে বিজয়ের পর সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে চান এই দুই শীর্ষ নেতা। আর আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্তও এ এমন জয় নিজেদের করে রাখতে চাচ্ছেন দলটির চেয়ারম্যান ও পার্টির মহাসচিব।

দলটির নেতারা বলছেন, রসিক সিটি নির্বাচনের ফল জাপার ঘরে আসায় উজ্জীবিত নেতাকর্মীরা। আগামী নির্বাচন পর্যন্ত এই সুযোগ কাজে লাগাতে বাড়ানো হচ্ছে সাংগঠনিক তৎপরতা। আগামী মাসের ১৫ ফেব্রুয়ারি মহাসমাবেশে চূড়ান্ত সাংগঠনিক রূপরেখা ঘোষণা দেবেন জাপা চেয়ারম্যান।
এদিকে পিরোজপুর-৩ আসনের এমপি রুস্তম আলী নতুন করে দলে ফেরায় জাপার ঘরে এখন খুশির আমেজ। তাই ফুরফুরে এরশাদ দলের মহাসচিবকে নিয়ে সম্প্রতি হেলিকপ্টারে করে কুয়াকাটা বেড়াতে যান। মনের আনন্দে ঘুরছেন ইচ্ছে মতো দেশের এক জেলা থেকে অন্য জেলায়। সঙ্গী ১৬ বছরের পরীক্ষিত মহাসচিব হাওলাদার।
নেতাকর্মীরা মনে করেন পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও পার্টির মহাসচিব হাওলাদারের সুযোগ্য নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি আগামীতে এককভাবে ক্ষমতার স্বাদ গ্রহণ করুক। কেননা এ দুই শীর্ষ নেতা না থাকলে আজ দল এতটুকু অগ্রসর হতো না। তাদের সুযোগ্য নেতৃত্বের কারণে একের পর এক বিজয়ের হাতছানি দেখেছে দলটির হাজার হাজার তৃণমূল নেতাকর্মী। দলটির প্রেসিডিয়ামের এক সদস্য বলেন, হাওলাদারের সঠিক নেতৃত্বের কারণে জাপা এখনো মাঠে বিরোধী দল হিসেবে অবস্থান করছে। তিনি না থাকলে দলটি মুসলিম লীগের পরিণতি বরণ করতো।

১ জানুয়ারি দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে নেতাকর্মীদের উদ্দেশে এরশাদ বলেছিলেন, এখন শুধু জাপাকে ক্ষমতায় নিতে হবে। এর বিকল্প অন্য কিছু নেই। তাই দেশের সব জেলা-উপজেলা-মহানগর থেকে শুরু করে ওয়ার্ড পর্যন্ত নেতৃত্বে থাকা নেতাদের এ বার্তা দেয়া হয়। সম্প্রতি দলের যৌথ সভায়ও এরশাদ এ বার্তা দেন।
এর আগে রংপুর নির্বাচনের পর দলের কাকরাইল কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারাদেশে জাপা নেতাকর্মীরা একে অপরকে মিষ্টি মুখ করছেন। চলছে বিজয় উল্লাস। এবার দলের লক্ষ্য আসন্ন গাইবান্ধা-১ সুন্দরগঞ্জ উপনির্বাচনে জাপার বিজয়।

দলটির শীর্ষ নেতারা মনে করেন, ৯০ দশকে তীব্র গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে সুসময় চলছে জাপার। ক্ষমতার কাছাকাছি অর্থাৎ ছায়া সরকার হয়ে সংসদে বিরোধী দলে আছে দলটি। যদিও সে অনুযায়ী সাংগঠনিক কার্যক্রম শক্তিশালী করতে পারেননি এরশাদ। এর অন্যতম কারণ হলো বারবার ভাঙনের মুখে পড়েছে জাপা। এখন এরশাদের করা দল চারভাগে বিভক্ত।

তবে দলকে শক্তিশালী করতে না পারলেও দেশের রাজনীতিতে জাপা এখন ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে জোটের রাজনীতি চাঙ্গা হওয়ায় কদর বেড়েছে এরশাদের। সব দলই এখন এরশাদের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় যেতে চায়। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে এরশাদ মিলে মহাজোট গঠন করা হয়। এরপর ২০১৪ সালের নির্বাচনে এরশাদ মহাজোট থেকে বেরিয়ে বিরোধী দলে আসে। সরকারে জাতীয় পার্টির তিন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন। আগামী নির্বাচনেও রাজনৈতিক বাস্তবতায় এরশাদ ফের মহাজোট গঠন করতে পারেন। মহাজোট না হলেও আওয়ামী লীগের সক্ষে আপস খেলায় নির্বাচনে অংশ নেবেন, তা অনেকটাই স্পষ্ট। ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগের কাছে ১০০ আসনও চেয়েছেন এরশাদ। এমন তথ্য প্রকাশ্যে না হলেও ভেতরে ভেতরে নেতাকর্মীদের মধ্যে গুঞ্জন শুনা যাচ্ছে।

জাপা নেতারা বলছেন, রংপুর নির্বাচনের পর তৃণমূলে থেকে বারবার একই বক্তব্য আসছে তা হলো আগামী নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেয়া। নেতাকর্মীরাও মনে করছেন, রংপুরের মতো জাতীয় নির্বাচনের ফল লাঙ্গলের পক্ষেই আসবে। এমন দাবি জেলা-উপজেলার নেতাদের। তারা প্রতিদিনই বলছেন একক নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিতে। দলের প্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তারা একই দাবিদাওয়া জানিয়ে আসছেন।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী নির্বাচনের জন্য ইতোমধ্যে জাপা ৩০০ আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে। আসন প্রতি তিনজন করে প্রার্থী বাছাই করা হয়েছে। ইতোমধ্যে অন্তত ৩০ জনকে প্রার্থী হিসেবে নিজ নিজ এলাকার সাংগঠনিক দায়িত্ব দিয়ে চিঠিও দেয়া হয়েছে। অনেকে মৌখিক গ্রিন সিগন্যালও পেয়েছেন। সে অনুযায়ী মাঠে নেমেছেন প্রার্থীরা।

জানতে চাইলে জাপা মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার এমপি বলেন, আমরা রংপুরবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞ। পল্লীবন্ধু এরশাদকে যেদিন বিনা দোষে বন্দি করা হয়েছিল সেদিন এই রংপুরবাসীই নিজেদের জীবন বাজি রেখে তাদের ছাওয়াল এরশাদকে মুক্ত করার জন্য আন্দোলন করেছিল। এরশাদকে উন্নয়নের সিংহপুরুষ বলা হয়। তিনি রংপুরের সন্তান। সন্তান বিপদগ্রস্ত হলে মা ঘরে বসে থাকতে পারে না। তেমনি পল্লীবন্ধুর প্রতিটি দুঃসময়ে রংপুরবাসী মায়ের মতো সন্তানের পাশে এসে দাঁড়ায়।

তিনি বলেন, আমাদের দলে সবাই ঐক্যবদ্ধ, তার প্রমাণ রসিক নির্বাচন। এ নির্বাচনে দলের সব শীর্ষনেতা এমনকি তৃণমূলের কয়েক সহস াধিক নেতাকর্মী দলের প্রার্থীকে জয়ী করার জন্য নিজের অর্থ খরচ করে নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিয়েছেন। দলের প্রতি নেতাকর্মীদের এ কমিটমেন্ট বাংলাদেশের অন্য কোনো দলে আছে বলে আমার জানা নেই। তিনি বলেন, আসন্ন গাইবান্ধা-১ আসনের উপনির্বাচনেও দলের প্রার্থীকে জয়ী করার জন্য আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে যাব। একতাই বল। তার ওপর আমাদের পুঁজি আছে, সে পুঁজি বা মূলধন হচ্ছেন পল্লীবন্ধু এরশাদ। উন্নয়নের কথা ভাবলে, শান্তির কথা ভাবলে, নিরাপত্তার কথা ভাবলে মানুষ আমাদের অবশ্যই সব নির্বাচনে জয়ী করবে। রসিক নির্বাচনের মাধ্যমে এ জয়ের ধারা শুরু হয়েছে। জাতীয় পাটির্র শীর্ষ নেতাদের মতে, দলের এ বিজয় ঘুমিয়ে থাকা কর্মীদের আবার জাগিয়ে তুলবে। উর্বর জমিতে আবারো লাঙ্গলের চাষাবাদ শুরু হবে। আর এ জন্য তারা দলীয় ঐক্যকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন।

জাপা সূত্রে জানা যায়, জয়ের এ ধারা অব্যাহত রাখতে আসন্ন বৃহত্তর রংপুরের গাইবান্ধা-১, সুন্দরগঞ্জ উপনির্বাচনের ফলও নিজেদের ঘরে আবার আনতে চায় জাপা। রসিক নির্বাচনের এ বড় জয় নির্বাচনকে নিজেদের আয়ত্তে আনতে ভূমিকা রাখবে বলে জাপা নেতাদের অভিমত। দলের কর্মীদের মতে, রসিক নির্বাচনের মতো এ উপনির্বাচনকেও যদি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেয়া যায় তাহলে আবারো একটি বড় জয় আসন্ন।

রসিক নির্বাচনে দলের এ বড় জয় সম্পর্কে জাপা কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদের বলেন, মানুষ এখন অনেক সচেতন। ভোটারদের মাঝে উপলব্ধি হয়েছে, দেশ কার শাসনামলে ভালো চলেছে। আমি বিশ্বাস করি, রংপুরবাসীর এ ভোট জাতির জন্য মেসেজ। দেশবাসী পরিবর্তন চায়, হিংসা বা প্রতিহিংসার রাজনীতি দেখতে চায় না। তারা উন্নয়ন ও সহনশীল রাষ্ট্র কামনা করে, এর জন্য এরশাদের জাতীয় পার্টি ছাড়া বিকল্প নেই। লাঙ্গলের এ বড় বিজয় নেতাকর্মীদের উৎসাহ বাড়িয়ে দিয়েছে। আমরা এ ধারা অব্যাহত রাখতে চাই।

তিনি বলেন, রসিক নির্বাচনের মতো গাইবান্ধা উপনির্বাচনও যদি অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়, তাহলে অবশ্যই জাতীয় পার্টি সেখানেও জয়লাভ করবে। দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা এমপি বলেন, রসিকে এ বিপুল জয়ের মাধ্যমে প্রমাণ হলো, দেশবাসী এরশাদকে ক্ষমতায় দেখতে চায়। রসিকে এ জয়ে সারাদেশে দলীয় নেতাদের মাঝে ব্যাপক উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করা গেছে। জাপা প্রেসিডিয়াম সদস্য মীর আব্দুস সবুর আসুদ বলেন, আমরা আশাবাদী জাপা আরো এগিয়ে যাবে। কারণ, মানুষ এখন জাতীয় পার্টিকে ক্ষমতায় দেখতে চায়। সামনের প্রতিটি নির্বাচনে মানুষ জাপার প্রার্থীর পক্ষে রায় দেবেন বলেও তিনি আশাবাদী। মানবকণ্ঠ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত