প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আসাম কি হবে ভারতের রাখাইন?

উৎপল বরদোলোই : ভারতের ৭০তম স্বাধীনতা দিবসে তথা ২০১৭ সালের ১৫ আগস্টে কয়েকটি ফটো ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছিল। এতে দেখা যায়, একদল লোক বন্যার পানিতে দাঁড়িয়ে কিংবা নৌকায় অবস্থান করে ভারতের পতাকা দোলাচ্ছে।

পশ্চিম আসাম রাজ্যের সীমান্ত জেলা ধুবরি থেকে ছবিগুলো আপলোড করা। ব্রহ্মপুত্র নদীটি ওখান দিয়েই ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। পতাকা দোলানো লোকজন ডুবে মরা কিংবা সাপের ছোবল খাওয়ার আশঙ্কায় ছিল। তারা পতাকা দুলিয়ে একটি বিষয় পরিষ্কার করছিল: তারা ভারতের নাগরিক।

ধুবরির ৮০ ভাগ লোক মুসলিম, তারা ব্রিটিশ উপনিবেশ আমলে বর্তমান বাংলাদেশ হিসেবে পরিচিত পূর্ববঙ্গ থেকে অভিবাসন করা চাষী কৃষকদের বংশধর। এখন তারা এবং আসামজুড়ে থাকা অন্য লাখ লাখ মুসলিমের মতোই অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে পড়েছে। তাদের নাগরিকত্ব প্রশ্নের মুখে, তারা বহিষ্কৃত হওয়ার ভয়ে আছে।

ভারতের সিনিয়র মুসলিম নেতা, জমিয়তে উলেমা-ই-হিন্দের সভাপতি মওলানা আরশাদ মাদানি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, আসাম হতে পারে ভারতের রাখাইন। মিয়ানমারের ওই রাজ্য থেকে ২০১৭ সালে কয়েক লাখ মুসলিমকে বহিষ্কার করা হয়েছে। জাতিসঙ্ঘ কর্মকর্তা এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার গ্রুপগুলো এই ঘটনাকে ‘জাতি নির্মূল’ হিসেবে অভিহিত করেছে।

গত ৩১ ডিসেম্বর ও ১ জানুয়ারির মধ্যরাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিভাগ ‘রেজিস্ট্রার জেনারেল অ্যান্ড সেনসাস কমিশনার অব ইন্ডিয়ার’ রাজ্য পর্যায়ের কর্মকর্তারা জাতীয় নাগরিক নিবন্ধনের (এনআরসি) প্রথম খসড়া প্রকাশ করেন। পুরোপুরি আসামের জন্য প্রস্তুত করা এই নথির মাধ্যমে বিদেশী নাগরিকদের (বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ অভিবাসী) শনাক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই ইস্যুতে কয়েক দশক ধরে রাজনৈতিক গোলযোগের সৃষ্টি হওয়ায় তা এর মাধ্যমে নিরসন করতে চাওয়া হচ্ছে।

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এই কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছে এবং এর তদারকিও করছে। ওই আদালত বাংলাদেশ থেকে লোকজনের ঢলকে ‘জনসংখ্যা আক্রমণ’ বলে অভিহিত করেছে।

সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী, আসামের জনসংখ্যা ২০১১ সালে ছিল তিন কোটি ১২ লাখ ১০ হাজার। এদের মধ্যে এক তৃতীয়াংশের বেশি তথা এক কোটি ৭০ লাখ তথা ৩৪.৩ শতাংশ মুসলিম। কাশ্মির উপত্যকার পর এখানেই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মুসলিম বাস করে। প্রথম স্থানে থাকা জম্মু ও কাশ্মিরে ৯৬ শতাংশ লোক মুসলিম, তবে রাজ্যটির জনসংখ্যা মাত্র এক কোটি ২৬ লাখ।

নববর্ষের দিনে এনআরসির প্রথম যে খসড়া প্রকাশ করা হয়, তাতে এক কোটি ৯০ লাখ লোককে আসামের নাগরিক হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। বাকি রয়ে গেছে এক কোটি ৩৯ লাখ। তাদের সবাই না হলেও বড় একটি অংশই মুসলিম। তারা এখন আশঙ্কা করছে, তাদেরকে বিদেশী নাগরিক ঘোষণা করে বহিষ্কার করা হবে।

এখনো যারা বাদ পড়েছে, তাদেরকে আতঙ্কিত না হতে সরকার বলছে, এখনো ৭৬ লাখ নাম নথি অনুযায়ী যাচাই-বাছাই চলছে। চূড়ান্ত এনআরসির আগে আরো দুটি খসড়া তালিকা প্রকাশ করা হবে। যাদের নাম এখনো বাদ রয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন আসামের সবচেয়ে লম্বা মুসলিম নেতা মওলানা বদরুদ্দিন আজমল ও তার ভাই মওলানা সিরাজুদ্দিন আজমল। উভয়েই ভারতীয় পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ লোকসভার সদস্য। আসাম আইনসভার ২৯ জন সদস্যের মধ্যে চারজনও তালিকায় নেই। সব আইনপ্রণেতা জন্মসূত্রে ভারতের নাগরিক। ফলে তাদের বাদ পড়াটা দাপ্তরিক ভুলের কারণেই হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

রাখাইনের মতো আসামের পরিস্থিতির উদ্ভবের নেপথ্যে রয়েছে ব্রিটিশ উপনিবেশ শাসন।

আসামে মুসলিম বসতির সন্ধান পাওয়া যায় ১৩ শতকে। ওইসময় তুর্কি জেনারেল মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি বাংলা জয়ের পর কামরুপ (আসাম) দিয়ে তিব্বতে একটি অসফল হামলা চালিয়েছিলেন। গৌহাটির এক পাথরলিপিতে এসব বসতি স্থাপনকারীদের ‘তুরুক্ষ’ বা তুর্কি হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। ১২০৫ সলে মেচ গোত্রের এক গোত্রপতি ইসলামে ধর্মান্তরিত হন, তার নাম হয় আলী মেচ। তিনিই খিলজির সৈন্যদের কামরুপের পথ দেখিয়ে নিয়ে যান। তিনিই আসামের প্রথম স্থানীয় মুসলিম বলে মনে করা হয়। তারপর কোচ, রাভা, গারো, নাথ, যোগী ও কালিতার মতো আদিবাসী সম্প্রদায় ইসলাম গ্রহণ করে। ১৬ শতক নাগাদ অহম রাজ্যে মুসলিমরা নিজেদের ভালোভাবেই প্রতিষ্ঠিত করেছিল। তাদের রাজকীয় নানা পদে নিয়োগ করা হয়, পদবি দেওয়া হয়, ভূমি মঞ্জুর করা হয়, অন্যান্য সুবিধাও তারা পায়। এসব আসামীয় মুসলিম নিজেদের বলে ‘দেশী’ আদিবাসী। আদিবাসী মুসলিমদের জোট দেশী জনগোষ্ঠী মঞ্চের রয়েছে ৪০ লাখ সদস্য। তারা আসামের মোট মুসলিম জনসংখ্যার প্রায় ৪০ ভাগ। তারা বাংলা থেকে অভিবাসন করা মুসলমানদের থেকে ভাষা ও সাংস্কৃতিকভাবে নিজেদের আলাদা রাখে।

সতের শতকে মোগল সাম্রাজ্য ও অহোম রাজ্যের মধ্যকার সঙ্ঘাতের সময় আদি মুসলিমরা ছিল অহোম সেনাবাহিনীর অংশ। এই সঙ্ঘাতের অবসান ঘটে মানস নদী পর্যন্ত কাপরুপের ওপর আহোমদের নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে। ১৮২৬ সালে ব্রিটিশদের আগমনের আগে পর্যন্ত তারা এর ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছিল। মানসের পশ্চিম দিক ছিল মোগলদের নিয়ন্ত্রণে। এর নাম ছিল গোয়ালপাড়া। বাংলা সুবাহর অংশ হিসেবে ১৭৫৭ সালে পলাশি যুদ্ধের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে চলে যায় এই অংশটিও। অহোমরা মোগল যুদ্ধবন্দিদের বসতি স্থাপন করতে দেওয়ায় আসামে মুসলিম জনসংখ্যা বাড়তে থাকে। এসব মুসলিম স্থানীয় নারী বিয়ে করে স্থানীয়দের সাথে মিশে গেলেও তাদের ইসলামি বিশ্বাস ও রীতিনীতি পালন অব্যাহত রাখে।

ব্রিটিশরা ১৮২৮ সালে আসাম দখল করার পর প্রশাসন চালাতে হিন্দু বাঙালি এবং চা বাগানে কাজ করার জন্য ছোট নাগপুর মালভূমি এবং এর আশপাশের এলাকা (এসবের মধ্যে ছিল বর্তমান সময়ের ঝাড়খন্ড, ছত্তিশগড়, পশ্চিমবঙ্গের অংশবিশেষ, বিহার, উড়িষ্যা, তেলেঙ্গানা ও অন্ধ্রপ্রদেশ) থেকে ‘আদিবাসী’ গোত্রগুলোকে নিয়ে আসে। ১৮৭৪ সাল পর্যন্ত আসাম ছিল বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অংশ। তারপর একে আলাদা করে এবং সেইসাথে সিলেটকে জুড়ে দিয়ে ‘নর্থ-ইস্ট ফ্রন্টিয়ার’ বা একটি ‘নন-রেগুলেশন প্রভিন্স’ গঠন করা হয়। এর প্রশাসকের পদবি ছিল চিফ কমিশনার, তার সদরদফতর ছিল শিলং।

তারপর ১৯০৫ সালে প্রথম বাংলা ভাগের সময় বিপুল মাত্রায় বাঙালি মুসলিম অভিবাসন শুরু হয়। ভাইসরয় লর্ড কার্জন বাহ্যত ‘প্রশাসনিক সুবিধার’ জন্য ধর্মীয় রেখার আলোকে প্রদেশটি বিভক্ত করেছিলেন। তার আসল উদ্দেশ্য ছিল ওই সময়ের ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতায় বৃদ্ধি পেতে থাকা জাতীয়তাবাদী আন্দোলন গুঁড়িয়ে দেওয়া। পশ্চিম অংশ ছিল হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ। এর সাথে জুড়ে দেওয়া হয় হিন্দি-ভাষাভাষী বিহার ও উদিয্য ভাষাভাষী উড়িষ্যা। এর রাজধানী থাকে কলকাতা। আর মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব অংশের সাথে নর্থ ইস্ট ফ্রন্টিয়ার জুড়ে দিয়ে প্রদেশটির নামকরণ করা হয় ‘পূর্ব বঙ্গ ও আসাম।’ ঢাকাকে রাজধানী করে এর প্রশাসকের পদবি করা হয লে. গভর্নর।

রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানোর জন্য ব্রিটিশরা ভূমিহীন মুসলিম কৃষকদের আসামে গিয়ে চাষাবাদে উৎসাহিত করত। ১৮৭১ সালে তারা অভিবাসনের টার্গেট করে ৪০ লাখ। কাজটি সমাধা করার জন্য বিশেষ কর্মকর্তাও নিয়োগ করা হয়। অভিবাসীরা আসামের জনসংখ্যার চিত্র পাল্টে দেয়।

বঙ্গভঙ্গ রদ করা হয় ১৯১১ সালে। পরের বছর বাংলার দুই অংশ জোড়া লাগানো হয়। আসাম (সিলেটসহ), বিহার ও উড়িষ্যা আলাদা আলাদা প্রদেশ হয়। ১৯১১ সালে ভারতবর্ষের রাজধানীও কলকাতা থেকে সরিয়ে নয়া দিল্লিতে নেওয়া হয়।

অভিবাসনের প্রভাব প্রথম অনুভূত হয় ১৯৩৫ সালে গভার্নমেন্ট অব ইন্ডিয়া অ্যাক্টের পর। ওই সময় প্রাদেশিক আইনসভার জন্য প্রত্যক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়। হিন্দু ও মুসলিমদের জন্য পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্থা করা হয়। এর ফলে জনসংখ্যা গ্রুপে লোকজন বিভক্ত হয়ে পড়ে। নির্বাচনে তা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অবশিষ্ট ভারতবর্ষের মতো আসামেও প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস ও মুসলিম লিগ।

১৯৩৭ সালে ১০৮টি আসনের মধ্যে কংগ্রেস পায় ৩৩টি। সরকার গঠনের জন্য তা পর্যাপ্ত ছিল না। আসাম ভ্যালি মুসলিম পার্টি পায় ২৪টি, মুসলিম লিগ ১০টি। গভর্নর মুসলিম পার্টি নেতা মওলভী সাইয়িদ স্যার মোহাম্মদ সাদউল্লাহ, কেসিএসআই-কে জোট সরকার গঠন করতে আমন্ত্রণ জানান। এতে কংগ্রেস যোগ দেয়। আঞ্চলিক দল মুসলিম পার্টি সর্বভারতীয় মুসলিম লিগের সাথে একীভূত হয়ে যায়। স্যার সাদউল্লাহ তিন দফায় ১৯৩৭-৩৮, ১৯৩৯-৪১ ও ১৯৪২-৪৬ সময়কালে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৪৬ সালে তিনি ‘অধিক খাদ্য ফলাও’ অভিযান শুরু করেন, বাহ্যত ব্রিটিশ যুদ্ধ প্রয়াসে সহযোগিতার লক্ষ্যে। ভাইসরয় লর্ড ওয়াভেল এতে অভিহিত করেন ‘অধিক মুসলিম বাড়াও’ অভিযান নামে।

১৯৪৬ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও মুসলিম লিগ আসামকে পূর্ব পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান। গোপিনাথ বরদোলোইয়ের (তিনি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ১৯৩৯-৪১ ও ১৯৪৬-৪৭ এবং মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন ১৯৪৭-৫০ পর্যন্ত) আসামের কংগ্রেস এতে হতাশ হয়। তাদেরকে সমর্থন করেন ভারতের ‘লৌহমানব’ সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল এবং মহাত্ম্যা গান্ধী। অবশ্য জওহেরলাল নেহরু এই ইস্যুটির ব্যাপারে উদাসীন থাকেন, সিলেট যাতে এমনিতেই পাকিস্তানভুক্ত হয়, তাতে রাজিও থাকেন বলে মনে হয়েছে।

উদ্বাস্তু বনাম অভিবাসী

বিভক্তির সময় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সিলেট যায় পাকিস্তানে। ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যে মাত্রায় জনসংখ্যা স্থানান্তরিত হয়েছিল, তেমনটি এখানে দেখা যায়নি। বিহার ও পূর্ব উত্তর প্রদেশ থেকে উর্দুভাষী কিছু মুসলিম অবশ্য পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসে। ১৯৪৯ সালের ডিসেম্বরে ভারত ও পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যকার অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হলে দাঙ্গা ও ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে। ১০ লাখ লোক সীমান্ত পাড়ি দিয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তান থেকে হিন্দুরা পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও আসামে যায়, সেখান থেকে মুসলিমরা এদিকে আসে। ১৯৫০ সালের এপ্রিলে ভারত ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীরা – জওহের লাল নেহরু ও লিয়াকত আলী খান- উদ্বাস্তুদের ফেরার অধিকারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে একটি চুক্তিতে সই করেন।

এই চুক্তি সত্ত্বেও পরের কয়েক মাসে আরো ১০ লাখ হিন্দু পূর্ব পাকিস্তান থেকে পালিয়ে পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও আসামে যায়। যেসব মুসলিম আসাম থেকে পালিয়ে পূর্ব পাকিস্তান গিয়েছিল, তারাও ফিরে আসে। এরপর ভূমি-বুভুক্ষু কৃষকরা যায়।

এই প্রবাহ থামানোর প্রয়াস নেওয়া হয়। বিশেষ করে আসামের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী গোপিনাথ বরদোলোই (১৯৪৭-১৯৫০) ও তৃতীয় বিমল প্রাসাদ চালিথা (১৯৫৭-৭০) প্রায় দুই লাখ অভিবাসী মুসলিমকে বহিষ্কার করেন। ১৯৫১ সালে প্রথম আদমশুমারির পর এর ভিত্তিতে বিশেষভাবে আসামের জন্য প্রথম জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি) প্রস্তুত করা হয়। ধারণা করা হচ্ছিল, এটি নিয়মিত হালনাগাদ করা হবে, কিন্তু তা হয়নি। এটি ফাইল চাপা পড়ে বিস্মৃতির আড়ালে চলে যায়। হিন্দু উদ্বাস্তু এবং ভূমি-বুভুক্ষ মুসলিম অভিবাসীর মধ্যে পার্থক্য করতে ভারতের পার্লামেন্ট অভিবাসন (আসাম থেকে বহিষ্কার) অ্যাক্ট, ১৯৫০ প্রণয়ন করে। কিন্তু ১৯৫৭ সালে তা বাতিল হয়ে যায়। ১৯৫০ সালে গৃহীত ভারতের সংবিধান, ইন্ডিয়া সিটিজেনশিপ অ্যাক্ট, ১৯৫৫ এবং অন্যান্য আইনের ফলে অভিবাসীদের জন্য দরজা খোলাই রাখা হয় এবং তা চলতে থাকে। ‘প্রিভেনশন অব ইনফিলট্রারেশন ফ্রম পাকিস্তান (পিআইপি) স্কিম এবং ফরেনার্স (ট্রাইবুন্যালস) অর্ডার প্রণয়ন করা হয়েছিল ১৯৬৪ সালে। কিন্তু কোনোটিই বাস্তবায়িত করা হয়নি।

বাংলাদেশের জন্ম

১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যা চালায়। এর ফলে প্রায় এক কোটি লোক, তাদের বেশির ভাগই হিন্দু, পালিয়ে যায় ভারতে। এর রেশ ধরে ডিসেম্বরে হস্তক্ষেপ করে ভারত, বাংলাদেশ স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। অবশ্য বেশির ভাগ উদ্বাস্তু ভারতেই রয়ে যায়। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ১৯৭২ সালে একটি মৈত্রী চুক্তি সই হয়। ইন্দিরা গান্ধী ও মুজিবুর রহমানের মধ্যকার ওই চুক্তিতে এসব অভিবাসীর কথা উল্লেখ করা হয়নি।

জমি কমছে, জনসংখ্যা বাড়ছে

জনসংখ্যা বেড়েই চলেছে। ১৯০১ সালের আদমশুমারিতে দেখা যায়, ‘অবিভক্ত আসামে’ বাস করছে ৩২ লাখ ৯০ হাজার লোক। ১৯৪১ সালে তা বেড়ে ৬৭ লাখ, ১৯৫১ সালে ৮০ লাখ ৩০ হাজার, ১৯৬১ সালে এক কোটি ৪০ হাজার, ১৯৭১ সালে ১ কোটি ৪৬ লাখ ৩০ হাজার, ১৯৮১ সালে ১ কোটি ৮০ লাখ ৪০ হাজার (এটি আনুমানিক হিসাব, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ওই বছর আদমশুমারি হতে পারেনি), ১৯৯১ সালে ২ কোটি ২৪ লাখ ১০ হাজার, ২০০১ সালে ২ কোটি ৬৬ লাখ ৫০ হাজার এবং ২০১১ সালে ৩ কোটি ১২ লাখ ১০ হাজার হয়।

কিন্তু ১৯৪৭ সালের পর আসামের আয়তন অনেক কমে গেছে। বিভক্তির আগে আসামসহ আসামের ভৌগোলিক এলাকা ছিল ১৪০,১১৮ বর্গ কিলোমিটার (৫৪,১০০ বর্গমাইল)। আসাম থেকে আলাদা করা হয় নাগা হিলস জেলা। ১৯৬৩ সালে গঠন করা হয় নাগাল্যান্ড রাজ্য। ১৯৭২ সালে ইউনাইটেড খাসিয়া ও জৈনতিয়া হিলস এবং গারো পাহাড় নিয়ে গঠিত হয় মেঘালয়। তারপর লুসাই পাহাড়ি জেলাগুলো নিয়ে মিজোরাম গঠিত হয়। এটি দিল্লি থেকে কেন্দ্র-শাসিত অঞ্চল। বর্তমানে আসামের আয়তন ৭৮,৪৩৮ বর্গ কিলোমিটার (৩০,২৮৫ বর্গমাইল)। অর্থাৎ আসামের আয়তন কমে গেছে ৪৪ ভাগ।

মুসলিম বৃদ্ধি

জনসংখ্যা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মুসলিম সংখ্যা বৃদ্ধি। গত শতকের শুরু থেকে ইসলাম হলো আসামের দ্রুততম বৃদ্ধিপ্রাপ্ত ধর্ম। ১৯০১ সালে আসামে মুসলিম ছিল ৫০৩,৬৭০ জন, ১৯১১ সালে ৬৩৪,১০১ জন, বেড়েছে ২৫.৯ ভাগ। ১৯২১ সালে মুসলিমরা ছিল ৮৮০,৪২৬ (৩৮.২৫ ভাগ বৃদ্ধি); ১৯৩১ সালে ১,২৭৯,৩৮৮ জন (+৪৫.৩১ ভাগ), ১৯৪১ সালে ১,৬৯৬,৯৭৮ (+৩২.৬৪ ভাগ); ১৯৫১ সালে ১,৯৯৫,৯৩৬ (+১৭.৬১ ভাগ) জন। মুসলিম বৃদ্ধির হার কমার কারণ ১৯৫০ সালের দাঙ্গার পর মুসলিমদের ব্যাপক হারে চলে যাওয়া। তবে তার পরও বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। ১৯৬১ সালে ২,৭৬৫,৫০৯ (+৩৮.৫৬ ভাগ), ১৯৭১ সালে ৩,৫৯৪,০০৬ (+২৯.৯৬ ভাগ), ১৯৯১ সালে ৬,৩৭৩,২০৪ (+৭৭.৩৩ ভাগ; রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ১৯৮১ সালে আদমশুমারি হয়নি) জন ছিল। ২০০১ সালে ৮,২৪০,৬১১ জন এবং ২০১১ সালে ১০,৬৭৯,৩৪৫ (+২৫.৫৯ ভাগ) জন।

ভারতবর্ষ বিভক্ত হয়েছিল ধর্মের ভিত্তিতে। কিন্তু ৬৪ বছরের মধ্যে আসামের ২৭টি জেলার মধ্যে ৯টি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ। জেলার সংখ্যা বেড়ে হয় ৩৩, ২০১১ সালের পর ছয়টি নতুন জেলা সৃষ্টি হয়েছে। ২০১১ সালে সবচেয়ে বেশি মুসলিম ছিল ধুবরিতে ৭৯.৬৭ ভাগ (হিন্দুরা ১৯.৯২ ভাগ); বরপেটা ৭০.৭৪ ভাগ (হিন্দু ২৯.১১ ভাগ); দারাঙ ৬৪.৩৪ ভাগ (হিন্দু ৩৫.২৫ ভাগ); হেইলাকান্দি ৬০.৩১ ভাগ (হিন্দু ৩৮.১০ ভাগ); গোয়ালপাড়া ৫৭.৫২ ভাগ (হিন্দু ৪৭.২০ ভাগ); ও বনগাইগাঁও ৫০.২২ ভাগ (হিন্দু ৪৮.৬ ভাগ)।

আইনসভার ১২৬টি আসনের মধ্যে মুসলিম ভোটারদের প্রাধান্য আছে ৪৯টিতে। ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত গত প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে মুসলিমরা এসব আসনের ২৯টিতে জয়ী হয়েছে। ১৯৫২ সাল থেকে মুসলিম ভোটারদের মধ্যে একচ্ছত্রভাবে প্রভাব বিস্তার করা কংগ্রেস ১৫টি পেয়েছে। ২০০৫ সালে বদরুদ্দিন আজমলের প্রতিষ্ঠিত ও অভিবাসী মুসলিমদের প্রতিনিধিত্বকারী অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (এডিইউএফ) জিতেছিল ১৩টিতে, বিজেপি পেয়েছে মাত্র ১টি। ২০১৪ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনে নিম্নকক্ষে আসামের ১৪টি আসনের মধ্যে দলটি পেয়েছে তিনটি। এই তিনজন হলেন বদরুদ্দিন (ধুবরি) এবং তার ভাই সিরাজউদ্দিন (বরবেটা)। তৃতীয় আসনটিতে জিতেছেন রাধাশ্যাম বিশ্বাস। এই বাঙালি হিন্দু বরাক উপত্যকার করিমগঞ্জ থেকে জয়ী হয়েছেন।

রাজনৈতিক বিষ্ফোরণ

আয়তন কমলে চাপ বাড়ে। আসামের ভূমি সঙ্কোচন এবং জনসংখ্যা বাড়ায় রাজনৈতিক চাপ বিস্ফোরিত হওয়াটা স্বাভাবিক।

বিস্ফোরণে ইন্ধন দেন ১৯৭৮ সালে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার এস এল শাকধের। তিনি এক সরকারি সভায় অবৈধ অভিবাসীর বিষয়টি উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, উত্তর পূর্বাঞ্চলসহ কয়েকটি রাজ্যের আতঙ্কজনক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ না করলেই নয়। এসব এলাকায় বিদেশী নাগরিকেরা ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হচ্ছেন। একসময় হয়তো সব নির্বাচনী এলাকায় তারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ না হলেও বেশ বড় সংখ্যায় হয়ে যাবে।

অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে কংগ্রেস ও কমিউনিস্টরা তাদের ভোট ব্যাংক বাড়াতে অবৈধ অভিবাসীদের ভোটার করছে। কংগ্রেস দীর্ঘ সময় বলত, ‘আলী, কুলি, বাঙালি’দের ভোটের কারণে তারা কখনো আসামে ক্ষমতা হারাবে না। আলী বলতে বোঝাত অভিবাসী মুসলিম, কুলি বলতে ১৯ শতকে ব্রিটিশদের আমদানি করা চাবাগান শ্রমিক এবং বাঙালি হলো বিভাগ-পরবর্তী বাঙালি হিন্দু উদ্বাস্তু।

দারাঙ জেলার মঙ্গলদই পার্লামেন্ট উপ-নির্বাচনের প্রস্তুতির সময় বিস্ফোরণ ঘটে। আসামিরা দাবি করে, ‘বিদেশীদের’ ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে। আসাম হাইকোর্ট এ ব্যাপারে স্থগিতাদেশ দেয়। তবে দাবি, পাল্টা দাবি অব্যাহত থাকে। এরপর পুরো রাজ্যে ভোটার তালিকা পর্যালোচনা করার দাবি ওঠে। ১৯৭৯ সালে ছাত্রদের নেতৃত্বে অহমিরা ভয়াবহ মাত্রায় বিক্ষোভ শুরু করে। ‘আসাম আন্দোলন’ নামে পরিচিত এমন বিক্ষোভ ভারতেই ছিল নজিরবিহীন। ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত স্থায়ী এই আন্দোলনে কয়েক হাজার নিহত হয়, প্রায় দুই হাজার লোক বাংলাদেশের ময়মনসিংহে অভিবাসন করে। ১৯৮৩ সালে ছোট্ট শহর নেলির আশপাশে ১৪টি গ্রামে ধ্বংসযজ্ঞ চালায় তিওয়া (লালঙ) উপজাতীয়রা।

বিক্ষোভের মূল কথা ছিল ‘শনাক্ত’ (বিদেশীদের), ‘বাদ দেওয়া’ (ভোটার তালিকা থেকে তাদের নাম বাদ দেওয়া) এবং ‘বহিষ্কার’। আন্দোলন প্রশমিত হয় ১৯৮৫ সালের ১৫ আগস্ট অল-আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (এএএসইউ) ও গণসংগ্রাম পরিষদের নেতারা ভারত সরকারের সাথে সমঝোতা সই করার পর। আসাম চুক্তি নামে পরিচিত এই চুক্তিতে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর আসামে আগতদের চিহ্নিত করে বাদ দেওয়া হবে এবং তাদের বিদেশী হিসেবে বহিষ্কারের যৌক্তিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

নতুন নিবন্ধন

চুক্তিতে ১৯৫১ সালের এনআরসি হালনাগাদের কথা সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়নি। তবে তা ছিল বিদেশী শনাক্তে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। ছাত্ররা এ জন্য আরো ২০ বছর তথা ২০০৫ সাল পর্যন্ত আন্দোলন করতে থাকে। তখন সরকার এ ব্যাপারে রাজি হয়। কিন্তু তারপরও গড়িমসি চলতে থাকলে ২০০৯ সালে আসাম পাবলিক ওয়ার্কস নামের একটি এনজিও বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে উত্থাপন করে। আদালত তার তদারকিতে কাজটি শুরু করার নির্দেশ দেয়। ২০১০ সালে রাজ্যের দুটি আইনপরিষদ আসনে পাইলট প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। একটিতে শান্তিপূর্ণভাবে প্রকল্পটি সম্পন্ন হয়, অপরটিতে মুসলিমরা সহিংসভাবে প্রতিবাদ জানায়। পুলিশ উত্তেজিত জনতার প্রতি গুলিবর্ষণ করলে তাদের চারজন নিহত হয়। ২০১৩ সালে সুপ্রিম কোর্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়ে বলে প্রথম হালনাগাদ এনআরসি ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকাশ করতে হবে।

এক বছর প্রস্তুতির পর ২০১৫ সালের মে মাসে এনআরসিতে অন্তর্ভুক্ত হতে লোকজনকে আবেদন করতে বলা হয়, গণনাকারীরা বাড়ি বাড়ি যায়। হালনাগাদ হয় ‘লিগ্যাল ডকুমেন্টস’-এর ভিত্তিতে। ১৯৫১ সালের এনআরসিতে নাম থাকা, ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ পর্যন্ত সব ভোটার তালিকায় নাম থাকাকে ধরা হয় বৈধ নথি। আবেদনকারীকে প্রমাণ করতে বলা হয়, তাদের কিংবা তাদের পূর্বপুরুষদের নাম ওইসব নথিতে রয়েছে। কিংবা তারা অন্য আরো ১২ ধরনের নথি দিয়েও তাদের যুক্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে: জন্ম ও শিক্ষা সনদ, ভূমি দলিল, পাসপোর্ট, সার্টিফিকেট ইত্যাদি। তবে তাদেরকে প্রমাণ করতে হবে, তারা বা তাদের পূর্বপুরুষরা ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ ভারতের অধিবাসী ছিলেন। ২০১৫ সালের মে ও আগস্ট মাসে ৬৮ লাখ পরিবারের তিন কোটি ২৯ লাখ সদস্য ভারতের নাগরিক হিসেবে তাদের দাবির সমর্থনে ছয় কোটি ৬০ লাখ নথি জমা দেয়। ২০১১ সালে আসামের জনসংখ্যা ছিল তিন কোটি ১২ লাখ ১০ হাজার।

দি রেজিস্ট্রার জেনারেল ও সেন্সাস কমিশনার অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, এনআরসি’র প্রথম খসড়া থেকে বাদ পড়া এক কোটি ৩৯ লাখ নাম এখনো যাচাই-বাছাই চলছে। যাচাই-বাছাই করার জন্য প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ নথি অন্যান্য রাজ্যে পাঠানো হলেও ফেরত এসেছে মাত্র দেড় লাখ। দাখিল করা নথিগুলো নিয়ে প্রশ্ন থাকায় ৭৬ লাখ নাম ‘স্থগিত’ রাখা হয়েছে।

আরো দুটি খসড়া তালিকা প্রকাশ করা হবে। তবে চূড়ান্ত নিবন্ধনের পরই কেবল আসল চিত্র পাওয়া যাবে। সুপ্রিম কোর্ট ২০ ফেব্রুয়ারি পরবর্তী শুনানির দিন চূড়ান্ত প্রকাশের তারিখ নির্ধারণ করতে পারে।

প্রথম তালিকা প্রকাশের ফলে আসাম ও ভারত সরকার ২২টি জেলায় সমস্যায় পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছিল। রাজ্যে থাকা ৪০ হাজার আধা সামরিক সদস্যের শক্তি বাড়াতে আরো পাঁচ হাজার পাঠানো হয়। কিন্তু কোনো সমস্যা হয়নি। সম্ভবত লোকজন চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের অপেক্ষা করছে।

এই ইস্যুতে ঝামেলা সৃষ্টি কিংবা রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা দেখা গেছে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে। তা এসেছে আসামের বাইরে থেকে। জমিয়ত উলেমা-ই-হিন্দের সভাপতি আরশাদ মাদানির আরেকটি রাখাইন বানানোর হুঁশিয়ার ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি এনআরসিকে ‘আসাম থেকে বাঙালিদের তাড়িয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার দল তৃণমূল কংগ্রেস এই ইস্যুতে পার্লামেন্টে হৈচৈ করে। তবে এটিকে বিজেপির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ বিবেচনা করা হচ্ছে, কারণ দলটি তাকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে হটিয়ে রাজ্যটি কব্জা করতে চাইছে।

প্রকৃত নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ আসবে এনআরসি তালিকা সম্পূর্ণ প্রকাশ হওয়ার পর। এনআরসিতে নাম না থাকলে বিদেশীতে পরিণত হওয়াদের নিয়ে কী করা হবে তা নিয়ে পরিকল্পনা করে যাচ্ছে ভারত সরকার। ২০১৯ সালে পার্লামেন্টারি নির্বাচন হওয়ার কথা। ধারণা করা হচ্ছে, তাদের নাম ভোটার তালিকায় থাকবে না। কিন্তু তাদের বাংলাদেশে বহিষ্কার করা অসম্ভব। কারণ দেশটি বলে আসছে, তাদের লোকজন গণহারে ভারতে যায়নি। খুবই সম্ভাবনা রয়েছে, যারা এনআরসি থেকে বাদ পড়বে, তারা ভারতের অবশিষ্ট অংশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়বে। এমনটা যাতে না হতে পারে, সেজন্য আসামের প্রতিবেশী রাজ্যগুলো তাদের পুলিশ বাহিনীকে সতর্ক রেখেছে।

কিছু কিছু ঝামেলাপূর্ণ ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। আসামের পত্রিকাগুলো গোয়েন্দা সংস্থার উদ্ধৃতি দিয়ে বলছে, তারা ভারতের অন্যান্য অংশ থেকে বার্তা উদ্ধার করছে। ইসলামি দেশগুলো থেকেও বার্তা ধরা পড়ছে। এসবে আসামে ‘জাতিগত নির্মূলের’ আশঙ্কা ব্যক্ত করা হয়েছে। বিশ্লেষকেরা এ ধরনের আশঙ্কা বাতিল করে দিয়েছেন। তারা বলছেন, ‘ভারত কিন্তু মিয়ানমার নয়।’

হিন্দু জাতি

কংগ্রেস যতদিন ক্ষমতায় ছিল, ততদিন আসামে বিদেশী শনাক্তকরণ কার্যক্রম ফাইলচাপা ছিল। ২০১৪ সালে বিজেপি নয়া দিল্লিতে ক্ষমতায় আসার পরই তা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়। আসামে ২০১৬ সালে তিন দলীয় জোটের আওতায় বিজেপি ক্ষমতায় আসে। ২০১৪ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনে বিজেপির ইস্তেহারে সব হিন্দু উদ্বাস্তুদের ভারতের নাগরিকত্ব প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঘোষণা করেছিলেন, ‘যারা বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে তারা ভারত মাতার সন্তান। তাদেরকে মা ভারতের অন্যান্য সন্তানের মতোই একই মর্যাদা দিয়ে সুরক্ষা করা হবে। কিন্তু অবৈধ বাংলাদেশী অভিবাসীদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে।’

এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ২০১৬ সালে বিজেপি ভারতের নাগরিক আইনে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। দি সিটিজেনশিপ (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল ২০১৬-এ পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান থেকে আসা হিন্দু, খ্রিস্টান, শিখ, পারসি, বৌদ্ধ ও জৈনদের অবৈধ অভিবাসী হিসেবে তালিকাভুক্ত করা থেকে রেহাই দেওয়া হয়। আর ১৯৫৫ সালের সিটিজেনশিপ অ্যাক্টে বৈধ পাসপোর্ট ছাড়া ভারতে প্রবেশকারী কিংবা ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর ভারতে বসবাসকারী সবাইকে অবৈধ অভিবাসী ঘোষণা করার কথা ছিল। এখানে ধর্ম কোনো বিবেচ্য বিষয় ছিল না।

বিলটি ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্য করায় তীব্রভাবে সমালোচিত হয়। আসাম আন্দোলনে ধর্ম-নির্বিশেষে সব অবৈধ অভিবাসীকে বহিষ্কারের দাবি জানানো হয়। আসাম মুভমেন্ট থেকে জন্ম নিয়ে ১৯৮৫-৮৯ এবং ১৯৯৬-২০০১ পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা অসম গন পরিষদ (এজিপি) সব অবৈধ অভিবাসীকে বহিস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু তারা তাতে ব্যর্থ হয়েছিল মূলত দিল্লিতে ক্ষমতায় থাকা কংগ্রেস মুসলিমদের আঘাত দিতে চায়নি। কারণ ভারতজুড়ে মুসলিমরা তাদের সমর্থন করে থাকে। এজিপি তারপর বিভক্ত হয়ে যায়। তাদের বেশির ভাগ সদস্য যোগ দেয় বিজেপিতে। তারা ২০১৬ সালের নির্বাচনে ১২৬টি আসনের মধ্যে ৬১টি লাভ করে। এজিপির বাকি অংশটি ১৬টি আসন পায়, তারাও বিজেপি-নেতৃত্বাধীন সরকারে যোগ দেয়। উপজাতীয়, অভিবাসনবিরোধী দল বোড়ো পিপলর্স ফ্রন্ট (বিপিএফ) ১২টি আসন পেয়ে জোটের তৃতীয় অংশীদার হয়। বিলটি পাস হলে জোট ত্যাগ করার হুমকি দিয়েছে এজিপি। নাগরিক সমাজ গ্রুপ, কংগ্রেস এবং অন্যান্য বিরোধী দলগুলোও বিলের বিরোধিতা করছে। তাদের বক্তব্য, এটি ভারতের সংবিধানের সেক্যুলার নীতিমালার বাইরের বিষয়।

বিজেপি ঘোষণা করেছে, ২০১৯ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগেই তারা বিলটি পাস করাতে পারবে। নতুন জাতীয় নাগরিক নিবন্ধনের সাথে এই বিলটি আসামের লাখ লাখ মুসলিমকে ‘বিদেশীতে’ পরিণত করবে। এটি হবে ডানপন্থী জাতীয় পার্টিটির ভারতকে ‘হিন্দু রাষ্ট্রে’ পরিণত করার লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথে আরেকটি পদক্ষেপ। সূত্র: সাউথ এশিয়ান মনিটর।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত