প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

গাড়ি চলে ‘ইচ্ছে আইনে’

ডেস্ক রিপোর্ট : ট্রাফিক আইন বলতে কিছু নেই রাজধানী ঢাকায়। ট্রাফিক পুলিশের ‘ইচ্ছে আইনে’ নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে গোটা ট্রাফিক ব্যবস্থা। হাত দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে সিগন্যাল। যা বর্তমান বিশ্বের উন্নত শহরগুলোর ক্ষেত্রে ভাবাই যায় না। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, রাস্তার স্বল্পতা, চালকদের আইন না মানার প্রবণতা, অতিরিক্ত পরিবহনসহ নানামুখী সঙ্কটের কারণে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক ব্যবস্থায় যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাফিক আইন কার্যকর করতে হলে সবার আগে স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ব্যবস্থাই জরুরী। একমাত্র সিগন্যাল ব্যবস্থাই রাস্তায় ট্রাফিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারে। কার্যকর সিগন্যাল না থাকায় আইনভঙ্গের প্রবণতা বাড়ছে। যানজট সৃষ্টির এটি অন্যতম প্রধান কারণ। সিগন্যালগুলোতে চলে ভিআইপি চলাচলে অযাচিত হস্তক্ষেপ। ইচ্ছেমাফিক চলেন পরিবহন চালকরা। এক কথায় বেপরোয়া চালক। প্রতিবেশী কলকাতাসহ পৃথিবীর সকল ব্যস্ত শহরে এর চেয়ে বেশি গাড়ি থাকলেও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনায় সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। কারো কারো মতে, ট্রাফিক পুলিশের নানামুখী স্বার্থের কারণেই স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল পদ্ধতি চালু হচ্ছে না। সাধারণ সমস্যা সামনে এনে মূল বিষয়টিকে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করা হয়। স্বয়ংক্রিয় সিগন্যালে রাজধানীতে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ সম্ভব তা মিরপুর রোডে দীর্ঘদিন প্রমাণ হয়েছে। বর্তমানে অবশ্য ওখানেও চলছে ইচ্ছে আইন।

রাজধানীর সিগন্যাল বাতি গাড়ির গতি ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে অনেক আগেই। এরপর ফেল মারল হাতের ইশারা এবং বাঁশিও। অবশেষে ট্রাফিক সার্জন বা কনস্টেবল নিজে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে, বাঁশ ও দড়ি দিয়ে চালাচ্ছেন ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা। সড়কে হাত উঁচিয়ে ঝুঁকি নিয়ে প্রতিটি সিগন্যালে ট্রাফিককে গাড়ি থামানোর দৃশ্য এখন চিরচেনা। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এবং ভিআইপি সড়কগুলোতে ক্রমেই বাড়ছে দড়ি আর বাঁশের ব্যবহার যা শুধু দৃষ্টিকটু নয়, অনেকটা মধ্যযুগীয় কায়দাই বলা যায়। বর্বর জাতি হিসেবে দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণœ হচ্ছে এতে। ট্রাফিক বিভাগ বলছে, দুর্ঘটনা রোধ ও যানজট নিয়ন্ত্রণে নিতে হয়েছে এ ব্যবস্থা। প্রশ্ন হলো কোনভাবেই কি প্রযুক্তিগত শৃঙ্খলার মধ্যে ট্রাফিক সিস্টেমকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। আপাতত এমন কোন সুখবর ট্রাফিক বিভাগে নেই। তবে যা আছে রিমোট কন্ট্রোল পদ্ধতিতে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ। তা কবে কার্যকর হবে; এর সময়সীমা কেউ বলতে পারেন না।

রাজধানীর ট্রাফিক জ্যামের অন্যতম প্রধান কারণ চালকদের ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা। চালকদের এই প্রবণতার জন্ম হচ্ছে ‘ইচ্ছে আইনের’ কারণে। তাদের মানসিকতা তৈরি হচ্ছে ‘ট্রাফিক পুলিশ দুই হাত তুলে সামনে না দাঁড়ানো পর্যন্ত তার গাড়ি থামানোর প্রয়োজন নাই’। এক্ষেত্রে যেসব এলাকায় ট্রাফিক পুলিশ থাকে না সেখানে চলে চালকদের ইচ্ছে আইন। তারা রাস্তা বন্ধ করে দাঁড়িয়ে যাত্রী নিতে কুণ্ঠা বোধ করে না। যেখানে সেখানে পার্কিং করতে কোন অসুবিধা নেই। এমনকি উল্টো পথে চলতেও তাদের কোন সমস্যা নাই। স্বাভাবিকভাবেই ট্রাফিক পুলিশবিহীন এলাকাগুলোতে যানজট সৃষ্টি হয়। কয়েক মিনিট এই অবস্থা থাকলে যানজট দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের এলাকায়। পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চালককে ট্রাফিক আইন মানতে অভ্যস্ত করতে হবে। এক্ষেত্রে অবশ্যই তা স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল থেকে। প্রতিটি মোড়ে স্বয়ংক্রিয় সিগনালে গাড়ি চলাচল করলে এত জনবলের প্রয়োজন হবে না। তখন এসব জনবল সিগন্যাল অমান্যকারীদের শাস্তির কাজে লাগানো যাবে। কেবলমাত্র কঠোর নিয়ন্ত্রণে স্বয়ংক্রিয় সিগন্যালেই ফিরে আসতে পারে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোর ট্রাফিক শৃঙ্খলা।

পরিবহন চালকসহ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তারাও চান স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনায় আনা হোক গোটা সিগন্যাল সিস্টেমকে। এজন্য গোটা ট্রাফিক সিস্টেমসহ কারিগরি সহযোগিতা পুলিশের হাতে ন্যস্ত করার বিকল্প নেই বলেও মনে করেন তারা। জানতে চাইলে, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, ট্রাফিক সিগন্যাল কন্ট্রোল করে সিটি কর্পোরেশন। আর যানজট সমস্যা সমাধানে কাজ করে ট্রাফিক বিভাগ। দুটি বিভাগের মধ্যে কোন সমন্বয় নেই। মূলত এ কারণে গোটা সিস্টেমে সমস্যা হয়েছে। তিনি বলেন, যে কোন মূল্যে আমাদের স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিস্টেমে যেতে হবে। আমাদের দেশে যেভাবে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চলে তা পৃথিবীর কোথাও নেই। এজন্য সবার আগে পুরো ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা পুলিশের হাতে দেয়া উচিত বলেও মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি-বিআরটিএ সচিব শওকত আলী বলেন, সময় বদলেছে। স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির বাইরে অন্য কোন ব্যবস্থায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ তো ভাবাই যায় না। নানামুখী বাস্তবতার কারণে আমরা ডিজিটাল পদ্ধতির দিকে এগিয়েও বারবার ফিরে আসি। এ নিয়ে সবার ভাবনা জরুরী।

যাত্রী অধিকার নিয়ে কাজ করা যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, পরিবহন নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা ও পরিবহন সেক্টরকে শৃঙ্খলার মধ্যে ফিরাতে কোন গবেষণা না থাকায় আমরা উন্নত কোন প্রযুক্তির দিকে যেতে পারছি না। এ কারণে স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল পদ্ধতি, পরিবহনের ডিজিটাল নম্বর প্লেটসহ প্রযুক্তিগত উন্নয়নের বাস্তবায়ন কঠিন হচ্ছে। ফলে আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি। এখন যারা এই সেক্টরে দায়িত্ব পালন করছেন তাদের মতামতের ওপর নির্ভর করে সবকিছু চলছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ট্রাফিক পুলিশের একাধিক কর্মকর্তারা বলেছেন, শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে প্রতিদিন অর্ধশত বেশি ভিআইপি যাতায়াত রয়েছে। দ্রুত চলাচলের জন্য অনেক আগে থেকেই সিগন্যাল পরিষ্কার রাখতে ওয়াকিটকিতে তথ্য সরবরাহ করা হয়। আমরা চাকরির প্রয়োজনে কথা শুনি। এছাড়া কোন উপায় নেই। এর মধ্যে মন্ত্রী, প্রভাবশালী সাংসদ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার লোকজন রয়েছেন। এ কারণে সড়কে যানজট ও ভোগান্তি বাড়ে। যদি স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ব্যবস্থা থাকত তাহলে কারো সুপারিশ করার কিছু ছিল না।

কেন কার্যকর হচ্ছে না স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ব্যবস্থা ॥ স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ছাড়া ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের নজির কোথাও নেই। বাংলাদেশের আশপাশের দেশগুলোও একই পদ্ধতি অনুসরণ করে চলেছে। তবে কেন রাজধানী ঢাকায় এই পদ্ধতি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এ নিয়ে ট্রাফিক পুলিশের রয়েছে নানামুখী বক্তব্য। তারা বলেন, অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা ঢাকা শহরে রাস্তার স্বল্পতা খুবই বেশি। একটি মানসম্মত শহরে ২৫ ভাগ রাস্তার স্থলে ঢাকায় আছে সর্বোচ্চ আট ভাগ। তিন লাখ গাড়ি চলাচলের উপযোগী এই শহরে বর্তমানে যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ১১ লাখ। এই প্রেক্ষাপটে একেক সড়কে গাড়ির চাপ ভিন্ন। তাই স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল পদ্ধতি কার্যকর করা সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন।

কলকাতা ও ব্যাঙ্কক শহরে ঢাকার চেয়ে যানবাহনের সংখ্যা অনেক বেশি। গাড়ির দেশ হিসেবে খ্যাত জাপানের প্রতিটি শহরে বিপুলসংখ্যক যানবাহন চলাচল করে। অথচ প্রতিটি শহরেই স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল পদ্ধতিতে ট্রাফিক সিস্টেম নিয়ন্ত্রণ করা হয়। রয়েছে নিয়ন্ত্রণ কক্ষও। অথচ আমাদের চিন্তা ও পদ্ধতি একেবারেই ভিন্ন। এমনকি অবাস্তবও। বারবার স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল পদ্ধতিতে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। এ নিয়ে রয়েছে নানামুখী প্রশ্ন। অনেকে মনে করেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হাত পদ্ধতি ছাড়া কোন বিকল্প নেই। তাছাড়া স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হলে ট্রাফিক বিভাগের জনবলের প্রয়োজন হবে না। ফলে বেকার হবে বহুসংখ্যক মানুষ। তাদের কাজে লাগানো হবে কোথায় এ নিয়ে দেখা দেবে অনিশ্চয়তা। এছাড়াও ঢাকার রাস্তায় প্রকাশ্যেই ঘুষ নিতে দেখা যায় ট্রাফিকের দায়িত্বে নিয়োজিতদের অনেককে। এ নিয়ে রয়েছে নানা আলোচনা সমালোচনা। যদিও ট্রাফিক বিভাগ বলছে, দুর্নীতিগ্রস্ত ট্রাফিক সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এতেও থামছে না ঘুষ বাণিজ্য। অনেকে মনে করেন, স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল পদ্ধতি কার্যকর না হওয়ার নেপথ্যে ঘুষ বাণিজ্য একটি বড় কারণ হয়ে থাকতে পারে।

টোল দিয়ে চলার নিয়ম কতটা জরুরী ॥ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যানজটমুক্ত বিশেষ সড়কের ব্যবস্থা রয়েছে। এই সড়কে টোল দিয়ে চলাচল করতে হয়। দ্রুত সময়ে যাওয়া যায় গন্তব্যে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো সিঙ্গাপুর। দেশটির বিভিন্ন এলাকায় টোল প্রথা চালু হয়েছে। বিশেষ করে ব্যস্ত সময়ে টোল পরিশোধ করে গাড়ি নিয়ে রাস্তায় চলতে হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গুরুত্বপূর্ণ সময়ে রাস্তা ব্যবহারের জন্য টোল প্রথা চালু করা যেতে পারে। যেসব সড়ক ভিআইপি হিসেবে পরিচিত সেগুলো এর আওতায় আনা হলে ইচ্ছেমতো গাড়ি চলাচল নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।

রিমোট কন্ট্রোল পদ্ধতি চালুর চেষ্টা ॥ ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় আধুনিকায়ন এবং যানজট কমাতে ফিক্সড টাইমিং ট্রাফিকিং সিস্টেম চালুর কাজ চলছে। প্রতিটি সিগন্যাল দিয়ে যাওয়া গাড়ির সংখ্যা এবং গাড়ি যেতে কত সময় লাগে তার ওপর ভিত্তি করে সিগন্যালের টাইম নির্ধারণ করা হবে। রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে এ ব্যবস্থা পরিচালিত হবে। বিশ্বব্যাংক ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের সঙ্গে পুলিশ এটা নিয়ে কাজ করছে। গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে কয়েকটি সিগন্যালে পরীক্ষামূলক সিগন্যাল বাতি চালুর কথা ছিল। কয়েক মাসের মধ্যেই পুরোপুরি রিমোট কন্ট্রোল আমরা হাতে পেয়ে যাব। এরপর রাজধানীর ট্রাফিকব্যবস্থা রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। এতে লোকবলের কাজও কমবে। বর্তমান লোকবল দিয়েই ভালভাবে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। তবে নগরবাসীর সহযোগিতা এবং আইন মানার প্রবণতা না বাড়ালে এ ব্যবস্থার পুরোপুরি সুফল পাওয়া যাবে না।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ শামসুল হক বলেন, রাজধানীতে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় জট পাকিয়ে গেছে। পরিবহন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে নানা ঘাপলা রয়েছে। রুট পারমিট দেয়ার সময় পরিকল্পনা মাফিক কাজ করা হয় না। পরে পুলিশ আইন প্রয়োগ করে ট্রাফিক শৃঙ্খলা ফেরাতে চায়। উন্নত বিশ্বেও ট্রাফিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ হলে মামলা ও জরিমানার বিধান রয়েছে। তবে সেটার চেক এ্যান্ড ব্যালেন্স রয়েছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মামলা ॥ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ট্রাফিক আইন ভঙ্গের দায়ে মামলার শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু ঢাকায় যেখানে ট্রাফিক ব্যবস্থাকেই একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে আনা সম্ভব হয়নি এক্ষেত্রে ইচ্ছেমতো মামলা দায়ের কতটুকু বাস্তবসম্মত এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দিনের পর দিন ইচ্ছেমতো চলা ও ট্রাফিক সিস্টেম উন্নত না হওয়ার কারণে আইন না মানার প্রবণতা বাড়ছে।

ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে ট্রাফিক আইন ভঙ্গের ঘটনায় ২০১৫ সালে মামলা হয়েছে ৫ লাখ ৬৬ হাজার ৬৭টি। এ সময় জরিমানা আদায় করা হয়েছে ১৮ কোটি ২৮ লাখ ৯৫ হাজার ৯৫০ টাকা। ওই সময় গড়ে প্রতি মাসে মামলা হয়েছে ৪৭ হাজার ১৭২টি। এ হিসাবে দিনে গড়ে মামলা হয়েছে ১ হাজার ৫৭২টি ও ঘণ্টায় ৬৫টি। এক বছরের ব্যবধানে রাজধানীতে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের দায়ে মামলার সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৭৫ শতাংশ।

রাজধানীতে পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ চারটি ভাগে বিভক্ত। এগুলো হলো উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম। ট্রাফিকের জোন রয়েছে ২২টি। প্রতিটি জোনের প্রধান একজন সহকারী পুলিশ সুপার পদমর্যাদার কর্মকর্তা। ৭ শতাধিক ট্রাফিক সার্জেন্ট রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে দায়িত্ব পালন করেন। তাদের মধ্যে ২১ জন নারী সার্জেন্ট। তিনটি শিফটে দায়িত্ব পালন করেন ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা। প্রথম শিফট সকাল ৬টায় শুরু হয়ে শেষ হয় দুপুর ২টায়। দ্বিতীয় শিফট চলে দুপুর ২টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত। তৃতীয় শিফটে রাত ১০টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ কিছু এলাকায় সীমিতসংখ্যক ট্রাফিক সদস্য রাস্তায় অবস্থান করেন।

ট্রাফিকের চার বিভাগের মধ্যে ২০১৬ সালের প্রথম ১০ মাসে সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে পূর্ব বিভাগে। এ সময়ে ওই বিভাগে মামলা হয়েছে ২ লাখ ৪৪ হাজার ৬৮৪টি। এছাড়া উত্তর বিভাগে মামলা হয়েছে ২ লাখ ৯ হাজার ৬৫২টি, দক্ষিণ বিভাগে ১ লাখ ৯৭ হাজার ৬৪২টি ও পশ্চিম বিভাগে ১ লাখ ৭১ হাজার ২৩৩টি। গত বছরের প্রথম ১০ মাসে রাজধানীতে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের দায়ে জরিমানা আদায় হয়েছে ২৯ কোটি ৩১ লাখ ৩১ হাজার ২৯০ টাকা।

চলতি বছরের দুই জানুয়ারি মোটরযান আইনে মামলা হয়েছে এক হাজার ২০০। একই দিনে এছাড়া যানবাহন আটক মামলাসহ বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মামলা হয়েছে দুই হাজার ৬৮৭, জরিমানা আদায় ২১ লাখ ২১ হাজার ৬৭৫ টাকা, রেকার হয়েছে ৩৭০টি গাড়ি, ডাম্পিংয়ে পাঠানো হয়েছে ৩০টি গাড়ি। ১ জানুয়ারি ঢাকায় মোটরযান আইনে প্রায় ১১ হাজার মামলা করেছে ট্রাফিক পুলিশ। এছাড়া ট্রাফিক আইন ভঙ্গসহ নানা অপরাধে মামলা হয়েছে দুই হাজার ৫২৪, ডাম্পিং হয়েছে ২৮টি, রেকার ৩০১টি ও জরিমানা আদায় হয়েছে ১৯ লাখ ৭৮ হাজার ৭০০ টাকা।

প্রতি মাসে মামলার সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে ট্রাফিক বিভাগকে পুরস্কৃত করা হচ্ছে। প্রতি মাসে ট্রাফিকের সহকারী পুলিশ সুপার পদমর্যাদার কর্মকর্তাদেরও পৃথকভাবে পুরস্কার দেয়া হচ্ছে মামলার সংখ্যার ভিত্তিতে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুরস্কার পাওয়ার আশায় মাঠপর্যায়ে কর্মরত ট্রাফিক পুলিশের সদস্যদের মধ্যে বেশি মামলা রুজু করার ‘অশুভ প্রতিযোগিতা’ দেখা দিয়েছে। কোন এলাকায় মামলা কম হলে ট্রাফিক দফতর থেকে নোটিসও পাঠানো হচ্ছে সংশ্লিষ্ট এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাছে।

রাস্তায় সার্জেন্টরা বিভিন্ন কারণে যানবাহন আটকে মামলা করতে পারেন। এর মধ্যে রয়েছে গাড়ি চালানোর সময় ট্রাফিক পুলিশের নির্দেশনা না মানা, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, গাড়ির ফিটনেস-সংক্রান্ত কাগজপত্র নবায়ন না করা, ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়ন না করা, নির্ধারিত রুট পারমিটের রাস্তা ব্যবহার না করা, নির্ধারিত গতিসীমা অতিক্রম করা, মোটরবাইকে দুজনের বেশি যাত্রী বহন করা, হেলমেট না পরা, সঠিক জায়গায় গাড়ি পার্ক না করা, ওভারটেক করা, রাতে হেডলাইট না জ্বালিয়ে গাড়ি চালানো, সিটবেল্ট না বাঁধা, গাড়িতে নম্বর প্লেট না থাকা, মদ্যপান বা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো। জানা গেছে, সবচেয়ে বেশি মামলা হয় সঠিক স্থানে গাড়ি পাকিং না করায়। কোথায় কখন পার্কিং সঠিক আর কোথায় সঠিক নয় তার কোন স্পষ্ট নির্দেশনা ট্রাফিক বিভাগের কাছে নেই। তাহলে এসব মামলার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠাই স্বাভাবিক।

অনেক উদ্যোগ আর চোখে পড়ে না ॥ রাজধানীর যানজট নিরসনে সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার ট্রাফিক বিভাগের পক্ষ থেকে কয়েকটি উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু কোন উদ্যোগেই কাজে আসেনি। ২০০৯ সালে রাজধানীতে লেন ধরে যানবাহন চলাচলের উদ্যোগ নেয়া হয়। যা দুই মাসের মধ্যেই ভেস্তে যায়। ২০১৪ সালে উল্টো পথে যানবাহন চলাচল ঠেকাতে মিন্টো রোডে কাঁটাযুক্ত ‘প্রতিরোধক ডিভাইস’ বসানো হয়েছিল। তাও কাজে আসেনি। ২০০৯ সালে ডিজিটাল ইন্টেলিজেন্স পিটিজেড ক্যামেরা ও ট্রাফিক ডিসপ্লে বোর্ড স্থাপনের কাজ শুরু হয়। নগরীর ৫৯টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বসানো হয় ১৫৫টি ক্যামেরা এবং ৩১টি ডিসপ্লে বোর্ড। প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখার আগেই খরচ হয় ২৮ কোটি ৪১ লাখ টাকা। এ উদ্যোগও ভেস্তে গেছে। এছাড়া বিভিন্ন সময় লুপ বন্ধ করা, ইউটার্ন বন্ধ করা, স্টিলের ব্যারিকেড দেয়া সহ নানামুখী কার্যক্রম দেখা যায়।

ঢাকার যানজট নিরসনে আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যালের কাজে গত ১৭ বছরে কয়েকটি প্রকল্প নেয়ার কথাও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ২০০০ সালের দিকে ঢাকা আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রকল্পের আওতায় ৭০টি জায়গায় আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি বসানোর কাজ শুরু হয়। শেষ হয় ২০০৮ সালে। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবহার না হওয়ায় অল্প দিনেই বেশির ভাগ বাতি অকেজো হয়ে পড়ে। সোলার পাওয়ার বসা অনেক এলকায় বিনা কারনেই বাতি জ্বলছে।

বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ২০১০-১১ অর্থবছরে নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ (কেইস) নামে আরেকটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। এই প্রকল্পের আওতায় স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে সরঞ্জাম কেনা হয়। স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা কার্যকর করতে ব্যর্থ হয়ে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন ও পুলিশ আধাস্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেয়। নতুন পদ্ধতিতে মোড়ে দাঁড়ানো ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের হাতে থাকবে রিমোট কন্ট্রোল। যে সড়কে যানবাহনের চাপ বেশি থাকবে, রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে পুলিশ সদস্যরা সেখানে সবুজ বাতি জ্বালাবেন। সিটি কর্পোরেশন ও সংস্থার মধ্যে ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে সমন্বয়হীনতা দেখা দেয়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক এডমিন) জাহিদুল ইসলাম বলেন, প্লানিং, ইঞ্জিনিয়ারিং, এডুকেশন ও এনফোর্সমেন্ট এই চার ভাগে ট্রাফিকের কাজ হয়। এর মধ্যে প্রথম তিনটি ভাগ পরিচালনা করে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন। এবং এনফোর্সমেন্টের কাজটা শুধু পুলিশ করে। অতএব ট্রাফিক বাতি জ্বলার তথ্য বা টাকা-পয়সা খরচের সঙ্গে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। তিনি বলেন, রাস্তার মোড়ে মোড়ে হয়তো ৪ জন ট্রাফিক পুলিশ দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু এই চারজনের পক্ষে যতগুলো গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব তার চেয়ে অনেক বেশি গাড়ি চলাচল করে ঢাকা শহরের রাস্তায়। সেক্ষেত্রে যানজট নিয়ন্ত্রণে পুরনো পদ্ধতিতে ফিরতে বাধ্য হয়েছে পুলিশ। কারণ আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে আইন মানার প্রবণতা নেই। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানীর যানজট নিয়ন্ত্রণ করতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সিগন্যাল মনিটরিংয়ের জন্য সচিবালয়ের পাশে আবদুল গনি রোডে গড়ে তোলা হয়েছিল নিয়ন্ত্রণ কক্ষ। ওই নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে ডিজিটাল ট্রাফিক ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণের কথা। কিন্তু ডিজিটাল ট্রাফিক ব্যবস্থা সেখান থেকে পরিচালনা করা হলেও রাস্তার অবস্থা ভিন্ন। রাজধানীর সব গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও সিগন্যাল পয়েন্টে আগের মতোই ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা হাতের ইশারা আর বাঁশি ফুঁকে নিয়ন্ত্রণ করছেন যানবাহন। কোথাও কোথাও ট্রাফিক পুলিশকে রশি দিয়েও যানবাহন আটকাতে দেখা যাচ্ছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ প্রজেক্টের কর্মকর্তাদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী কর্মকর্তাদের বেতন বাদে রাজধানীর ৭০টি সিগন্যাল বাতিতে বিদ্যুত খরচ, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে প্রতিবছর খরচ হয় প্রায় ৮০ লাখ টাকা। যা সিটি কর্পোরেশনকেই বহন করতে হয়। অথচ এই ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ের কোন সুফলই পাচ্ছে না নগরবাসী। সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, আমেরিকা-জাপানের মতো যেসব দেশে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক ব্যবস্থা চালু আছে। সব দেশেই আমাদের মতো এমন বিশৃঙ্খল অবস্থা ছিল। আমরা স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমের ট্রাফিক ব্যবস্থা চালুর চেষ্টা করছি। এই প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। জনকণ্ঠ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ